লিওনিদ ব্রেজনেভ ছিলেন স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অত্যন্ত ক্ষমতাশালী নেতা। গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে হয়ে উঠেছেন সোভিয়েত নেতৃত্বের প্রতীক। ১৯৬৪ সালে সোভিয়েত ক্ষমতায় এসে পরবর্তী দুই দশক বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। এশীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সপক্ষে জোরালো প্রস্তাব, চেকোস্লোভাকিয়ায় গণবিদ্রোহ দমন এবং আফগানিস্তান আক্রমণের সময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রতিপক্ষ হিসেবে উত্তর ভিয়েতনামের চেয়ে লিওনিদ ব্রেজনেভকেই বেশি শক্তিশালী মনে করা হতো। সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য তার কৌশল আন্তর্জাতিক ইতিহাসে ব্রেজনেভ তত্ত্ব নামে পরিচিত।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের অকৃত্রিম সাহায্য-সহযোগিতার পেছনে ছিল সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান ব্রেজনেভের অসম সাহসী ভূমিকা। ১৯৭১ সালে ব্রেজনেভ-ইন্দিরার বৈঠকের প্রেক্ষাপট ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইন্দিরা গান্ধী মস্কো সফরে এসে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি সম্পাদনে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান ব্রেজনেভকে ধন্যবাদ জানান। মস্কোতে ইন্দিরা গান্ধী তার বক্তৃতায় শুধু লিওনিদ ব্রেজনেভের নাম উল্লেখ করে বলেন, I am very happy to have come to your country and talked with your leaders. I am especially happy that the General Secretary, Mr. Brezhnev, was able to join the talks. I believe that our talks have been useful and that they will certainly lead to better understanding between us. (The Years of Endeavour; Selected speeches of  Indira Gandhi August 1969-August 1972; p. 725)। বলা বাহুল্য, সোভিয়েত-ভারত মৈত্রী চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তিকে কাছে পায় বাংলাদেশ। এ চুক্তি সম্পাদনে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির  প্রধান লিওনিদ ব্রেজনেভের অত্যন্ত আগ্রহ ছিল এবং যার মূলে ছিল এশিয়ায় একটি যুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন। এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে যেমন বৃহৎ শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নকে পাশে পেয়েছে, উপরন্তু এরপর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাতীয় মুক্তি আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব লিওনিদ ব্রেজনেভ ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ ওয়ারশতে পোলিশ কমিউনিস্ট পার্টির ষষ্ঠ কংগ্রেসে প্রদত্ত ভাষণে সেটাই দেখতে পাওয়া যায়।

জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রশ্নে বিশ্বের বৃহৎ শক্তির অধিকারী সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। ব্রেজনেভ পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে জাতিসংঘে প্রভাব বিস্তার করেন। এ কারণে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের ঊষালগ্নেই ব্রেজনেভ ইন্দিরা গান্ধীকে অভিনন্দন জানান। আরো চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায় সম্প্রতি প্রকাশিত অশোক পার্থসারথির নতুন বই: জি পি ১৯১৫-১৯৯৫-এ। তিনি লিখছেন, ‘১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের সেই দুপুরটিতে। সাউথ ব্লকের ১৫৫ নম্বর ঘরটিতে উপস্থিত তত্কালীন মন্ত্রিসভার রাজনীতি বিষয়ক কমিটির সদস্যরা (অর্থমন্ত্রী ওয়াই বি চহ্বান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম, বিদেশমন্ত্রী স্বর্ণ সিংহ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি) সেনাবাহিনীর তিন প্রধান, প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পি এন হাকসার, র-এর প্রধান আর এন আই কাও, জি পার্থসারথি ও লেখক নিজেও। কিছুক্ষণ আগেই সোভিয়েত খামে একটি চিঠি এসে পৌঁছেছে সাউথ ব্লকে। স্বাক্ষরকারীর নাম লিওনিদ ব্রেজনেভ! পূর্ব পাকিস্তানের জয়লাভের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ইন্দিরাকে লিখেছেন, ‘আপনি যা করেছেন তা এক অনন্য কাজ। একটি নতুন দেশের জন্ম দিয়েছেন। এবার আপনার এবং আপনার মন্ত্রিসভার সতীর্থদের একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার পালা। পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পলিটব্যুরো নিশ্চিত, আপনারা সব দিক বিবেচনা করে ঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। যে সিদ্ধান্তই আপনারা নিন না কেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের নিঃশর্ত সমর্থন আপনার জন্য থাকবে।’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৫ মার্চ ২০১৮)

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম ও নিখাদ বন্ধু ছিলেন লিওনিদ ব্রেজনেভ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে লিওনিদ ব্রেজনেভের পূর্ণ সমর্থন ছিল বলেই পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুর বিচার করতে সাহস পায়নি। ১৯৭২ সালের মার্চে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতায় তার প্রতিধ্বনি মেলে। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, ‘আমাদের সংকটকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের এ সমর্থনের কথা আমরা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারি না।...পাকিস্তানি হানাদাররা সাম্রাজ্যবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা ও উসকানিতে আমাদের দেশে গণহত্যা চালিয়েছিল কিন্তু আমাদের দেশের জনগণ যুদ্ধ করে তাদের উত্খাত করেছে।...আমাদের চরমতম জাতীয় সংকটের দিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের যে সাহায্য দিয়েছে আমরা তা কোনোদিন ভুলব না।...বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি সংগ্রামী মানুষের শুভেচ্ছার বাণী নিয়ে আমি সোভিয়েত দেশে এসেছি।...সোভিয়েত জনগণ ও সরকার যে সম্মান ও গভীর ভালোবাসা আমার প্রতি দেখিয়েছেন আমি তা কোনোদিন ভুলব না।...বাংলাদেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন মৈত্রী দিনে দিনে আরো দৃঢ়তর হয়ে উঠবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণের মহান ঐতিহ্যের ইতিহাস আমরা স্মরণ করি।’

যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সহায়তার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান লিওনিদ ব্রেজনেভ, সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন, সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি প্রমুখ সোভিয়েত নেতার আমন্ত্রণেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে সোভিয়েত সফরে যান। ১৯৭২ সালের ২ মার্চ ক্রেমলিনে বঙ্গবন্ধুর নির্ধারিত সফরসূচিতে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান লিওনিদ ব্রেজনেভের সঙ্গে সাক্ষাৎ পর্ব।  এ এক দারুণ উত্তেজনাকর মুহূর্ত! লিওনিদ ব্রেজনেভ বঙ্গবন্ধুকে সাদর সম্ভাষণ জানান। প্রত্যুত্তরে বঙ্গবন্ধু ব্রেজনেভের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত প্রিমিয়ার লিওনিদ ব্রেজনেভকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের পর্যায়ক্রমিক সাহায্যের জন্য ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তার শর্তহীন মুক্তিতে চাপ প্রয়োগ করার জন্য ধন্যবাদ জানান। এরপর বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিকতাময় পরিবেশে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রায় ৪০ মিনিটের মতো তিনি লিওনিদ ব্রেজনেভের সঙ্গে কাটান। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শামসুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। অন্যপক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকো, বাংলাদেশে নিযুক্ত সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ভ্যালেনতিন পোপভ আলোচনায় যোগদান করেন।

ব্রেজনেভ ও বঙ্গবন্ধু এই দুই নেতার বৈঠকে যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়, তা হলো:

—বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা সুসংহত করা

—পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা ও

—সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা

দুই নেতার আলোচনায় উঠে এসেছিল জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে লিপ্ত মানুষের জয়ধ্বনি। ব্রেজনেভের এশীয় নিরাপত্তা অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে পাশে দেখেছিলেন। এ কারণেই বাংলাদেশ-সোভিয়েত যুক্ত ঘোষণায় প্রতিফলিত হয়েছে এতদঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। দুটি দেশ সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে, তারা উপমহাদেশের সমস্যাগুলোর প্রকৃত রাজনৈতিক নিষ্পত্তি চান। আর তা চান সংশ্লিষ্ট সব তরফের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে, বাইরের হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশে। বিশ্বশান্তির আগ্রহ থেকেই তারা বলেছেন, ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ার মানুষকে বাইরের খবরদারি ছাড়াই তাদের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ দিতে হবে। এরপর তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত আলাপ হয়। লিওনিদ ব্রেজনেভ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সস্ত্রীক মস্কো সফরের আমন্ত্রণ জানান।

১৯৭২ সালের ৩ মার্চ সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় এক ঐতিহাসিক চুক্তি, যা Soviet Union –Bangladesh Joint Declaration 1972 নামে পরিচিত। চুক্তিটি দুই দেশের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, আন্তরিক মনোভাব ও পারস্পরিক বিশ্বাস নিয়ে সম্পাদিত হয়। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের পুনর্গঠনে এ চুক্তির প্রয়োজন ছিল অপরিসীম। সোভিয়েত-বাংলাদেশ যুক্ত ইশতেহারে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের এক অসাধারণ সাফল্যই প্রতিফলিত হয়েছে। পরে এটি জাতিসংঘের অনুমোদনের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে জ্যাকব মালিক উপস্থাপন করেন।

বঙ্গবন্ধু নিজে কমিউনিস্ট ছিলেন না। কিন্তু তিনি পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থার বিপক্ষে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তার ব্যাখ্যা দেখতে পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের ওপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না। পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থে বিশ্বযুদ্ধ লাগাতে বদ্ধপরিকর। নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জনগণের কর্তব্য বিশ্বশান্তির জন্য সংঘবদ্ধভাবে চেষ্টা করা। যুগ যুগ ধরে পরাধীনতার শৃঙ্খলে যারা আবদ্ধ ছিল, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যাদের সর্বস্ব লুট করেছে তাদের প্রয়োজন নিজের দেশকে গড়া ও জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে সর্বশক্তি নিয়োগ করা। বিশ্বশান্তির জন্য জনমত সৃষ্টি করা তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২৩৪) হয়তো এ কারণেই তিনি স্নায়ুযুদ্ধের পুঁজিবাদী বিশ্বের বাইরে সোভিয়েত নেতাদের ঘনিষ্ঠতর হয়েছিলেন। সোভিয়েত-বাংলাদেশ যুক্ত ইশতেহার ছিল তার প্রতিফলন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান ব্রেজনেভ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কতটা নিকটতম হয়েছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭২ সালের মার্চে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে। সমসাময়িক পত্রিকায় এ বন্ধুত্বের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল এভাবে: ‘বিদেশী রাষ্ট্রনেতার সফরকালের প্রচলিত কড়া নিরাপত্তার বেড়া ডিঙ্গিয়ে তুলনাহীন আন্তরিকতায় সোভিয়েত জনগণ তাকে গ্রহণ করেছেন। চিরাচরিত রীতিনীতি থেকে সরে এসে ক্রেমলিন নেতারাও সব আনুষ্ঠানিকতা ঝেড়ে ফেলে পরম আন্তরিকতা দেখিয়ে অবাক করেছেন অনেককেই। পার্টিপ্রধান ব্রেজনেভও একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন ছিলেন সব সময় বঙ্গবন্ধুর পাশে। লেনিনগ্রাদ পর্যন্ত দিয়ে গেছেন এগিয়ে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন মনে রেখেছেন মহান নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভকে। ১৯৭৩ সালে ব্রেজনেভ আন্তর্জাতিক লেনিন শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু এ খবরে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তাকে অভিনন্দন জানান। ১৯৭৩ সালের ৩ মে বঙ্গবন্ধু ব্রেজনেভের কাছে এক অভিনন্দনবার্তা প্রেরণ করেন। এতে বলা হয়: আন্তর্জাতিক লেনিন শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য আপনি আমার আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করুন। আপনার এ পুরস্কার প্রাপ্তির সংবাদে আমার দেশবাসী খুশি হয়েছে। তারা আমার সঙ্গে এ আশা প্রকাশ করছে যে আমাদের দুদেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করবে। সোভিয়েতবাসীর উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য আপনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং সুখী হন—আমি এ কামনা করি।

লেখাটা শেষ করব এই দুই মহান নেতার ভালোবাসার উৎস থেকে। দুজনেরই ভালোবাসার ক্ষেত্র হলো দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অপরিসীম দেশপ্রেম। যেমন ১৯৮১ সালে নভোস্তি প্রেস থেকে লিওনিদ ব্রেজনেভের স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়। শুরুতেই তার বক্তব্য, ‘আমার গোটা জীবনের অর্থ যা ছিল এবং এখনো রয়েছে তা হলো সোভিয়েত জনগণ, লেনিনের পার্টি ও কমিউনিজমের আদর্শের স্বার্থে কাজ করে যাওয়া।’ অন্যদিকে ২০১২ সালে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়। সেখানেও বঙ্গবন্ধু লেখেন, ‘একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়।’ অর্থাৎ এই দুই নেতার সম্মিলন এখানেই, যা হলো নিখাদ দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি উৎসর্গীকৃত ভালোবাসা।

 

ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক উপ-উপাচার্য, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা