এ ঘটনার জেরে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনের সফলতার পথ বেয়েই ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা ভাষাভাষী জনগণের ভূখণ্ড বাংলাদেশ।
ভাষা আন্দোলন একটা চেতনা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ চেতনার স্মৃতিচিহ্ন হলো বিভিন্ন দলিলপত্র ও আলোকচিত্র। সে সময়ে সদ্য প্রতিষ্ঠিত দেশে আলোকচিত্র শিল্প তেমন বিকাশ লাভ করেনি। ফলে তেমন ব্যাপক আলোকচিত্র ধারণ করাই হয়নি। যতটুকু ধারণ করা হয়েছে ততটুকুও ঠিকমতো সংরক্ষণ করা হয়নি। তবু বেশকিছু আলোকচিত্র এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়, যার কিছু বহুল প্রচারিত ও পরিচিত, কিছু অনাবিষ্কৃত।
ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্র মূলত দুই ধরনের ১. সরাসরি আন্দোলন ঘটনাবলির আলোকচিত্র,
২. ভাষা আন্দোলনসংশ্লিষ্ট আলোকচিত্র।
সরাসরি আন্দোলনের আলোকচিত্র ধারণ করেছিলেন ঘটনাস্থলে থাকা আলোকচিত্রীরা। তাদের মধ্যে মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, মোহাম্মাদ ইয়াকুব, রফিকুল ইসলাম, আমানুল হক, মীজানুর রহমান অন্যতম। এছাড়া আহমেদ রফিক, ডা. এ হাফিজ, ডা. এমআই চৌধুরীর নামও পাওয়া যায় এ সময়ে আলোকচিত্র ধারক হিসেবে।
ভাষা আন্দোলনসংশ্লিষ্ট আলোকচিত্রী হিসেবে সরকারি আলোকচিত্রী (গভর্নর ও মন্ত্রীদের আন্দোলনবিরোধী আলোকচিত্র) এবং পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের স্মৃতিস্থান, উপাদান ও কর্মীদের আলোকচিত্র ধারক হিসেবে কয়েকজনকে পাওয়া যায়। এ নিয়ে আলোকচিত্রী মনোয়ার আহমেদ বেশ ভালো কাজ করেছিলেন। এ নিবন্ধকারও কিছু কাজ করেছেন। এসব আলোকচিত্রের মধ্যে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনাবলি সংগঠনের বিভিন্ন স্থান, ভবন, প্রতিষ্ঠান ও ভাষা আন্দোলনের সৈনিকদের বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র রয়েছে। এসব আলোকচিত্রও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের উপাদান।

আহমদ রফিকের তোলা ছবি
৪ নভেম্বর ১৯২৬ সালে জন্ম নেয়া মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহর তোলা ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের বিক্ষোভের আলোকচিত্রগুলো বহুল প্রচারিত। তার ক্যামেরাটিতে এক রোলে বি-টু সাইজের ছয়টি আলোকচিত্রে ফুটে উঠেছে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বিক্ষোভকারীদের মিছিল, পেছনে বৃক্ষগাত্রে সাটা ‘শিক্ষা ও কৃষ্টির মূলে কুঠারাঘাত’ লেখা পোস্টার, বিক্ষোভ ঠেকাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো হাফপ্যান্ট পরা পুলিশ, পুলিশের সামনে ফেস্টুন হাতে বিক্ষোভকারী ইত্যাদি। ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
১৯৪৮ সালের আন্দোলনের আরেক আলোকচিত্রী শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের জন্ম ১৯১৭ সালে কলকাতায়। কলেজে পড়াকালীন কোডাক বি-টু ফোল্ডিং ক্যামেরায় ফটোগ্রাফি শুরু করেন। এ পর্যন্ত তার তোলা নয়টি আলোকচিত্র পাওয়া গেছে আলোকচিত্রী শাহাদাত পারভেজের গবেষণায় ও আলোকচিত্রী সাইফুল আমিন কাজলের ‘৩৬৫ ফটোগ্রাফি রিসার্চ সেন্টার’-এ রক্ষিত দুর্লভ প্রকাশনায়। আলোকচিত্রগুলোয় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও পুলিশের আক্রমণে আহত ছাত্র এবং বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতারের চিত্র ফুটে উঠেছে। ওই প্রকাশনা দুটিতে কয়েকটি আলোকচিত্রে ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি লেখা আছে, তবে ১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারিতে এ ধরনের কোনো ঘটনার ইতিহাস পাওয়া যায় না। হতে পারে আলোকচিত্রগুলোর শিরোনামে ভুল লেখা হয়েছে বা উনি নিজে ১৯৫২ সালেও তুলেছেন। পত্রপত্রিকা খুঁজলে ওনার তোলা আরো অনেক আলোকচিত্র পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস। তিনি ৭ জুন, ১৯৯৫ সালে ইন্তেকাল করেন।

আহমদ রফিকের তোলা ছবি
১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করা রফিকুল ইসলাম লেখক ও নজরুল গবেষক হিসেবে পরিচিত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন থেকেই আলোকচিত্রী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। তার জার্মান ‘ভয়েগ ল্যান্ডার ক্যামেরা’য় তোলা ও ‘জায়দিস’ স্টুডিওতে ডেভলপ করা আলোকচিত্রে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ২১ ফেব্রুয়ারির আগের প্রস্তুতি, ছাত্রছাত্রীদের মিছিল-সমাবেশ, পতাকা দিবস পালন, কলাভবনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি, পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি কলাভবনের ছাদে কালো পতাকা উত্তোলন, বাহান্ন-পরবর্তী বছরগুলোর বিভিন্ন শহীদ দিবস পালন, ভেঙে দেয়া শহীদ মিনারের স্থানে কালো কাপড়ে ঢাকা শ্রদ্ধাস্থল, বিভিন্ন ছাত্র হলের শহীদ মিনার, ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত, মোনাজাত, শোকযাত্রা, মৌন মিছিল, নারীদের অংশগ্রহণ, ইডেন কলেজের ছাত্রীদের শহীদ স্তম্ভ নির্মাণে বাধাদান, ভাষা আন্দোলন স্মরণে প্রদর্শনী, পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন, সরকারিভাবে ১৯৫৬ সালে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন পর্যন্ত অনেক ঘটনা চিত্রায়িত হয়েছে। তিনি ৩০ নভেম্বর ২০২১ মৃত্যুবরণ করেন।
আলোকচিত্র জগতের আরেক পথিকৃৎ বাংলার পথে-প্রান্তরে, নদী এবং নদী-তীরবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবনসংলগ্ন প্রকৃতির চিত্রায়ন করা আমানুল হকের জন্ম ৬ নভেম্বর, ১৯২৫ সিরাজগঞ্জে। অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালেই ক্যামেরার প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিল্পী ও আলোকচিত্রী হিসেবে চাকরিরত থাকাকালীন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির বিকালে তিনি জাইস আইকন ক্যামেরায় তুলেছিলেন ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের মৃতদেহের আলোকচিত্র। এজন্য সরকারের বিরাগভাজন হওয়ায় তিনি কয়েক বছর এদেশেও বসবাস করতে পারেননি। আমানুল হকের সরাসরি ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্র মাত্র দুটি। দুটিই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তোলা। একটি ‘পুলিশের গুলিতে খুলি উড়ে যাওয়া ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিনের রক্তাক্ত মুখচ্ছবি’। যে প্রিন্টটি আমরা দেখতে পাই তা হয়তো প্রিন্টের সময় শৈল্পিকতার জন্য ‘ক্রপ’ করা। নেগেটিভে আরেকটু বেশি অংশ থাকলেও সেটিও তিনি তার শিল্পীমনের মাধুরীতেই তুলেছিলেন—নিছক প্রামাণ্যতার নিদর্শন হিসেবে নয়। আরেকটি ‘শাহীদদের রক্তের মধ্যে পড়ে থাকা ভাষা আন্দোলনের প্রচারপত্র’। ভাষা আন্দোলন ও তার সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রকাশনায় আমানুল হকের ‘একুশের তমসুক’ প্রকাশনাটি ভাষা আন্দোলনের একটি শৈল্পিক উপস্থাপন। তিনি ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন।

ভাষার দাবিতে আন্দোলন, ১৯৪৮ ছবি: মুহম্মদ তকীউল্লাহ
২১ ফেব্রুয়ারির শহীদ রফিকউদ্দিন আহমেদের মরদেহের আরেকটি আলোকচিত্র এদেশের সংবাদ আলোকচিত্রীদের অন্যতম পথিকৃৎ মীজানুর রহমানের তোলা। আলোকচিত্রী শাহাদাত পারভেজের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে মরদেহ আনার পর তোলা আলোকচিত্রটি আন্দোলনের প্রচারপত্রে ও ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের বিশেষ সংখ্যায় ছাপা হয়। মীজানুর রহমানের জন্ম ১৯৩১ সালে গাজীপুরে। স্কুলে পড়ার সময়ই জয়দেবপুরের এক স্টুডিও ফটোগ্রাফারের কাছে ছবি তোলা শেখেন তিনি। ১৯৫১ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও শহীদ রফিকের আলোকচিত্রটি তোলার পর তিনি আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি ২০০৩ সালের ১৮ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।
ভাষাসৈনিক ও রবীন্দ্র গবেষক আহমেদ রফিকের (১৯২৯-২০২৫) ভাষা আন্দোলন প্রকাশনায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সকালের পুলিশি তৎপরতা ও ছাত্রদের গ্রেফতার করে পুলিশের গাড়িতে ওঠানোর তিনটি আলোকচিত্রে তার নাম রয়েছে। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় তোলা এ আলোকচিত্র তিনটি অন্য কোনো প্রকাশনায় দেখা যায়নি। তবে আলোকচিত্রগুলো আহমেদ রফিকের তোলা না সংগ্রহ তা কোনো স্মৃতিচারণ বা সাক্ষাৎকারে পাওয়া যায়নি।
ডা. এ হাফিজ, ডা. এমআই চৌধুরী প্রমুখ তৎকালের ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের তোলা এক-দুটো আলোকচিত্র পাওয়া যায়। ভাষা আন্দোলনবিষয়ক গবেষক এমআর মাহাবুবের সংগ্রহ করা ও প্রবন্ধকারের কাছে সংরক্ষিত এ আলোকচিত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় এগুলো ভাষাসৈনিকরাই প্রামাণ্যতার জন্যই চিত্রায়ণ করেছিলেন।

আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান, ১১ মার্চ ১৯৪৮ ছবি: মুহম্মদ তকীউল্লাহ
১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত্রে বানানো প্রথম শহীদ মিনারের একটি আলোকচিত্রের আলোকচিত্রী হিসেবে ঢাকা টেলিভিশনের প্রথম কর্তাব্যক্তি জামিল চৌধুরী (৫ জুলাই ১৯৩৪) নাম কোথাও কোথাও পাওয়া গেলেও আলোকচিত্রটি তিনি কারো কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়।
তৎকালের সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ ও ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকায় কয়েকটি আলোকচিত্র ছাপা দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া সরকার পক্ষের পত্রিকাসহ (মর্নিং নিউজ জাতীয়) পাকিস্তান অবজারভার ইত্যাদি পত্রিকায় ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্র থাকার সম্ভাবনা আছে। পরবর্তীকালে প্রকাশিত পত্রপত্রিকায়ও ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্র ছাপা থাকা স্বাভাবিক।
ভাষা আন্দোলনের সরাসরি আলোকচিত্র ও ভাষা আন্দোলনসংশ্লিষ্ট আলোকচিত্রগুলোও আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্রের মধ্যে অনেকগুলো প্রচার হয়েছে। প্রকাশ হয়েছে দু-একটি অ্যালবাম জাতীয় প্রকাশনা। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে তথ্য ত্রুটিও বিদ্যমান। আমাদের উচিত এসব আলোকচিত্র সংগ্রহ ও তথ্যত্রুটি মুক্ত করে যথাযথ সংরক্ষণ ও সঠিক প্রচার। তাহলেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বড় হবে নিজেদের পূর্বপুরুষদের গৌরবজনক অধ্যায় অবলোকনের মধ্য দিয়ে।








