অর্থনীতি পরিচালনা তাদের কাজ নয়, যাদের সাহস নেই বা দুর্বল চিত্তের। নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই নিয়মিতভাবে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে হবে এবং যে ধরনের দ্রুতগতির পরিবর্তন অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে, সেগুলো অনুমান করতে হবে। আজকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা প্রত্যয়ন করছে যে এক জায়গার কোনো ঘটনার প্রভাব, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতিতে কোনো ঘটনা ঘটলে তা সুদূরপ্রসারী ও বিস্তৃত হতে পারে। অর্থাৎ অন্য জায়গাতেও অনুভূত হতে পারে।
অপ্রত্যাশিত বাঁক এড়াতে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই স্বল্পমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের তুলনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে এগিয়ে রাখতে হবে। দুই বছর ধরে সংরক্ষণবাদ, নীতি বিভাজন ও সমন্বয়ের অভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুতর পতনের ঝুঁকি তৈরি করতে শুরু করেছে। বিভিন্ন নিয়ামকের বিপুল সমাগম একটি নিখুঁত অর্থনৈতিক ঝড় তৈরি করছে।
কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে তারল্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রো-সাইক্লিক্যাল এক্সপ্যানশনারি পলিসি (কর কর্তন ও ব্যয় বৃদ্ধি) সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি করেছে এবং ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা বাড়িয়েছে। এর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এবং চীন ও ইউরোপের বাণিজ্যনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যকে দুর্বল করে তুলছে। এসব নীতি মিশ্রণের ফলাফল হিসেবে অন্য মুদ্রার তুলনায় ইউএস ডলারের মূল্য বাড়ছে এবং উদীয়মান অর্থনীতিতে মূলধনপ্রবাহ কমছে।
ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছে পুরোদমে চলা ইউএস-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ। এ যুদ্ধ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ দেশগুলো আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে উন্নতি করেছে, তার মোটা অংশের পতন হওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে। কয়েক দশক ধরে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি ও দরিদ্রতা হ্রাসের নিমিত্তে। এখন আমাদের অবশ্যই নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে যদি এ উপকারী চক্রের ইতি ঘটে, তবে কি হবে?
উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এরই মধ্যে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। তাই বিষয়টি মাথায় রেখে এসব দেশের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই বাণিজ্য কৌশল তৈরিতে আরো সক্রিয় হতে হবে এবং একটি বৈশ্বিক নিয়মভিত্তিক সিস্টেম গড়ে তুলতে সমর্থন দিতে হবে। অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নীতিনির্ধারকদের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তিগুলো শক্তিশালী করার ওপর নজর দিতে হবে, ভঙ্গুর দ্রুত জেতার মানসিকতা বাদ দিতে হবে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলকে নজরে রেখে স্বল্পমেয়াদি ইস্যুগুলোরও সমাধান করতে হবে।
সবার ওপরে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর এক জোট হয়ে কাজ করা উচিত। নিজেদের মধ্যে শত্রুতা বৃদ্ধি, তারা যে সমস্যায় পড়েছে, তার সমাধান হওয়াকে অসম্ভব করে তুলবে। ১০ বছর আগে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নীতিনির্ধারকরা রাজনৈতিক সাহস দেখিয়েছিলেন এক জোট হয়ে বৈশ্বিক মন্দাকে প্রতিহত করার জন্য। এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময় এসেছে, এখন ভিন্ন কিছু করা যাবে না।
প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রতিক সময়ে যখন আন্তর্জাতিক কমিউনিটি এক জোট হয়েছিল একসঙ্গে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য, সেটি ২০১৫ সালে। এর ইতি ঘটেছিল প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নিয়ে। সত্যিকারের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসডিজির মাত্রাগুলো তৈরি করা হয়েছে। এটি অংশগ্রহণকারীদের আশাবাদ প্রতিফলিত করে যে নিজেদের জীবনদশায় দারিদ্র্র্য প্রায় পুরোটাই দূর করা সম্ভব হবে এবং সব মানুষ প্রবৃদ্ধি ও উন্নতির সুফল ভোগ করতে পারবে।
প্রায় তিন বছর পর দেখা যাচ্ছে, এ আশাবাদের টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে উঠেছে। বিশ্বের এক জোট হয়ে এক কণ্ঠস্বর হয়ে কথা বলার আইডিয়া এখন প্রাচীন ইতিহাস মনে হচ্ছে। সহযোগিতার জায়গা দখল করেছে শূন্য ফলাফলের একতরফাবাদ। রাজনৈতিক নেতারা আরো বেশি করে দূরদৃষ্টিহীন, প্রো-সাইক্লিক্যাল হয়ে উঠছেন ও নিজের দেশে জনতুষ্টিমূলক নীতি গ্রহণ করছেন। যদিও তাদের দায়িত্ব বৈধ ভারসাম্যহীনতা ঠিক করা নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, পূর্ণ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা দীর্ঘমেয়াদী বাড়তি প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যখন বৈশ্বিক নিয়মকে এড়িয়ে এ ধরনের মীমাংসা করা হয়।
২০১৮ সালের অক্টোবরে ইন্দোনেশিয়া বালিতে আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ অ্যানুয়াল মিটিংস, যেখানে উপস্থিত হয়েছিল ১৮৯ দেশের আর্থিক ও মুদ্রা কর্তৃপক্ষ বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করার জন্য। সেখানে সবাই একমত হয়েছিল, বহুমুখিতার উদ্দীপনা অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
বালিতে দেয়া ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডোর ভাষণ এ অনুভূতিটিই তুলে ধরে, যখন তিনি জোর দেন সংঘাতের বদলে সহযোগিতার ওপর। যখন বৈশ্বিক শক্তিগুলো একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে, তখন ক্রমেই বেড়ে ওঠা হুমকিগুলো দেখতে ব্যর্থ হচ্ছে, যেগুলো আমাদের সবার ওপরই প্রভাব ফেলবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠা অর্থহীন, কেননা এটি ডুবতে বসেছে।
এমন একটি সময়ে যখন আমরা বাড়তে থাকা বৈশ্বিক হুমকির সম্মুখীন হচ্ছি, তখন উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যকার পারম্পরিক সম্পর্ক কয়েক দশকের তুলনায় আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে এবং এটি আরো বেশকিছু নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটাচ্ছে। যেমনটা জোকো উইডোডো পর্যবেক্ষণ করেছেন, আজকের বড় শক্তির সংগ্রাম অনেকটা এইচবিওর জনপ্রিয় সিরিয়াল ‘গেম অব থ্রোনসের’ কাহিনীর মতো। শত্রুতায় নিমজ্জিত হয়ে প্রতিটি ‘গ্রেট হাউজ’ উত্তর থেকে যে অস্তিত্বর প্রতি হুমকি আসতে পারে, সে ব্যাপারে অমনোযোগী। আমরা বাস্তব পৃথিবীতে অবশ্যই এ ধরনের ভুল করতে পারি না।
১৯৯৭-৯৮ সময়ে এশীয় আর্থিক সংকট ও ২০০৮ সালের মন্দা থেকে অনেক কিছু শিখেছে ইন্দোনেশিয়া। এর মধ্যে অন্যতম হলো, আমাদের অবশ্যই সবসময় সংস্কার ও বৈশ্বিক সহযোগিতার দিকে নজর রাখতে হবে। এজন্য গত দুই দশকে ইন্দোনেশিয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটিয়েছে নিজেদের অর্থনীতির সহনশীলতা শক্তিশালী করার জন্য এবং অর্থনীতি যেন আরো বিবেচনাপূর্বকভাবে পরিচালনা করা যায় তা নিশ্চিতে। এর ফলাফল হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির বিস্তৃত ছবিটি এখনো বেশ উজ্জ্বল, এমনকি যখন বৈশ্বিক পর্যায়ে কালো মেঘ জড়ো হচ্ছে।
বৈশ্বিক অস্থিরতা একটি লম্বা সময় পর্যন্ত থাকবে। এ সম্ভাবনা সামনে রেখে ইন্দোনেশিয়ার সরকার নিজেদের নীতি শক্তিশালীকরণ করবে, যার মধ্যে অন্যতম দৃষ্টি থাকবে অন্য কর্তৃপক্ষের (স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের) সঙ্গে সহযোগিতা। একই সময় অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী ভিত তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাব, যার কারণে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে এবং আমাদের সমাজের দরিদ্রতম ও সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী নিরাপত্তা পাবে। যখন বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আরো গভীর হয়ে উঠছে, তখন আমাদের অবশ্যই দৃষ্টি দিতে হবে সবার জন্য কল্যাণ হয়, এমন পদক্ষেপের দিকে এবং এক জোট হয়ে এটি বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
লেখক: ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ’স ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান
ভাষান্তর: সাঈদ সরকার






