এটা সম্ভবত আমাদের কালের বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে যে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে কোনো দেশে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদলকে সে দেশে বছরের সবচেয়ে বড় বিচ্যুতি বলে ধরে নেয়া হয়। শরণার্থী, অভিবাসী ও ‘অন্য পক্ষের’ জুজু দেখিয়ে জনতুষ্টির জাতীয়তাবাদের (পপুলিস্ট ন্যাশনালিজম) যে প্রবণতা সারা বিশ্বে জোরালো হয়ে উঠেছে, তার বিপরীতে মালয়েশিয়ায় বিদায়ী বছরের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ছিল আশাব্যঞ্জক এক ব্যতিক্রম।

এ পরিবর্তনের মূলে কাজ করেছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়েশিয়ার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা। নির্বাচনকে ঘিরে গোটা বিশ্ব আর বিভিন্ন পণ্ডিত নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার আশা করলেও বাস্তবে বিপরীত চিত্রেরই প্রতিফলন ঘটেছে। আর আমরাও আমাদের সাধ্যমতো সতর্ক থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি, মালয়েশিয়ার ভোটাররা ব্যালট পেপারে কোন প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন।

প্রথমত, মালয়েশিয়ার জনগণ একটি জোটের শাসনের যবনিকা টানার পক্ষে ভোট দেয়, বরিসন ন্যাশনাল (বিএন), দলটি ইউনাইটেড মালায়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর থেকে বরাবরই মালয়েশিয়ার পরিবর্তনের মূলে কাজ করেছে বিএন। শাসনক্ষমতায় থেকেছে। নির্বাচনে জনগণের রায়ে বিএনের পতনের মাধ্যমে সম্প্রদায়িক জাতিভিত্তিক রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটে। তাছাড়া নিজেদের মতামত প্রকাশের মাধ্যমে ভোটাররাও একটি শাসন ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেন, যারা কিনা জনগণের সম্পদ ও সুযোগগুলোকে নিজেদের দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করার কাজে ব্যাস্ত ছিল।

পুরনো ব্যবস্থার অধীনে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি পর্যায়ে সরকার একটি সর্বব্যাপী ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। কিন্তু এর বিনিময়ে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তারা কেবল নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সমর্থন আশা করেছে, উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিগুলোকে ঘিরে অমনোযোগী থেকেছে কিংবা নিজেদের প্রার্থীদের যোগ্যতার বিষয়গুলোয় গুরুত্ব প্রদান করেনি। নির্বাচনী সামন্তবাদ মূলত ইউএমএনওর শাসনামলের দীর্ঘ দশক ধরে মালয়েশিয়ার পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছিল; ভোটাররাও বন্দি ছিলেন এ দলের রাজনৈতিক গুরুদের মুঠোয়।

২০১৮ সালের মে মাসের ‘চূর্ণ-বিচূর্ণ পরিস্থিতি’ ভয়াবহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটায়, যারা কিনা মালয়েশিয়ার শাসন ব্যবস্থার সর্বজনীন এক ব্যাধিতে রূপান্তর হয়েছিল। পরিসংখ্যানগুলো রীতিমতো বিস্ময়কর। রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ তহবিল ওয়ান মালয়েশিয়ান ডেভেলপমেন্ট বারহাদ (ওয়ানএমডিবি) থেকে কোটি কোটি ডলার আত্মসাতের দুর্নীতি এবং সরকার ও তার মন্ত্রীদের অপ্রতিরোধ্য ব্যয়ের অনুশীলন।

কোনো উন্নয়ন কর্মসূচির প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত ও ব্যাপকভাবে দুর্নীতির উদ্ধত প্রভাবগুলো ছড়িয়ে পড়ে। ধনীরা যখন ব্যাপক ও স্বেচ্ছাচারী ভঙ্গিতে নিজেদের প্রভাবিত করতে থাকে, তখন খানিকটা অবাক করার মতো বিষয় হলো, অধীন্যস্ত যে মানুষগুলো তাদের আদেশ পালনে নিয়োজিত থাকে, তারাও সে পরিস্থিতিতে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়া বা মানিয়ে নেয়ার জন্য প্রলুব্ধ হতে থাকে। মালয়েশিয়ার গোটা সমাজ আর জনমানুষের মনে এমন একটা ধারণা জমাট বাঁধছিল যে একমাত্র মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

পরিবর্তনের ভিত্তিমূল, যাই হোক না কেন, সেটি একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার চেয়ে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী বিষয় ছিল। মালয়েশিয়ার গণতান্ত্রিক ভাঙনের শুরু হয় ২০ বছর ধরে চলতে থাকে সংস্কার কর্মসূচির জেরে। ১৯৯৮ সালে আমাকে যখন সরকারি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে অযৌক্তিক অভিযোগের কারণে বন্দি করা হয়, মূলত তখন থেকে এটি প্রতিটি নির্বাচনের অংশ হয়ে যায়। সংস্কার কর্মসূচিগুলো ত্বরান্বিত করে জাস্টিস পার্টি (পিকেআর)। দলটি মূলত ধীরলয়ে রাজনৈতিক পটভূমির পরিবর্তনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে আমাদের বিরোধী জোট বেশির ভাগ ভোট পেলেও মালয়েশিয়ার ফাস্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট ভোটিং সিস্টেমের কারণে আসন বরাদ্দের বিষয়টি বিপর্যস্ত হয়নি।

এদিকে জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মালয়েশিয়ার দীর্ঘতম পরিচালক মাহাথির মোহাম্মদকে ৯২ বছর বয়সে প্রত্যাশিত অবসর জীবন থেকে বাইরে নিয়ে আসে। মাহাথির ও আমার অতীতের বৈরী সম্পর্ক নিয়ে গোপনের কিছু নেই। সুতরাং কারাগারে তিনি যখন আমাকে দেখতে আসেন এবং আমাদের বিরোধী জোটে যোগদানের বিষয়ে আলাপ করেন, তখন তা স্বভাবতই আমাদের দেশের জটিল পরিস্থিতির বিষয়টিকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে।&dquote;&dquote;

যখন দুটি বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জোট গঠনে তত্পর হয়, তার মতো বিপত্সংকুল পরিস্থিতি (অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি) দ্বিতীয়টি নেই বলেই মনে হয়। আর এ জোটবদ্ধতার জন্য প্রয়োজন প্রকৃত ক্ষমাশীলতা ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির চরম পরিবর্তন, যার ফলে দেশের তরে রাজনীতি ক্রমেই অগ্রসর হতে পারে। নির্বাচনে পাকাতান হারাপান জোট জয়ী হয় এবং ২০ বছরের প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ বৃহত্তম একক দলগুলোর একটি হিসেবে পিকেআরের অবির্ভাব ঘটে। আমাদের প্রাক-নির্বাচনী চুক্তি মোতাবেক মাহাথির মোহাম্মদ নতুন প্রধানমন্ত্রী হন।

নতুন জোট সরকার নিজেকে নতুন সংস্কার কর্মসূচিতে অঙ্গীকারবদ্ধ করেছে, যা মালয়েশিয়ায় পরিপক্ব, ন্যায্য, ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। শুধু দুর্নীতি দমনই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়, পাশাপাশি আমরা স্বাধীন বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, মুক্ত সংবাদমাধ্যম, সক্রিয় নাগরিক সমাজ সংগঠন প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী। একই সঙ্গে অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বাধীন নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত করা আমাদের নির্বাচনী এজেন্ডার মধ্যে রয়েছে, যার মাধ্যমে বিরোধীদের দেখিয়ে দেয়া যায় যে জনগণের সম্পত্তি ও সেবা প্রদানের একটি ন্যায়সঙ্গত বিধান রয়েছে।

গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে বিপদগ্রস্ত করেছিল প্রকৃত গুণতন্ত্রকে হঠিয়ে সাম্প্রদায়িকতার প্রসার, যা মালয়েশিয়ার সব নাগরিককেই প্রভাবিত করেছে। তাছাড়া ইচ্ছাকৃত ঔপনিবেশিক অবহেলার মাধ্যমে মালয় ও ভূমিপুত্র সম্প্রদায়কে উত্তরাধিকার সূত্রে যেভাবে সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীতে পরিণত করা হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে অতীতে বেশকিছু ইতিবাচক কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এবং ইউএমএনওর অধীনে বৈষম্য দূর করার কার্যক্রমগুলো সুবিধাবাদীদের অধিকার ও টেকসই ব্যবস্থায় পরিণত হয়, যা উদ্যোগ ও লক্ষ্যকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, এ ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ যেখানে মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখবে কিংবা উন্নয়নে সহযোগিতা করবে, সেখানে এগুলো দুর্নীতি ও প্রশান্তির প্রচ্ছন্ন ফাঁদ হিসেবে কাজ করেছে।

বর্তমান মালয়েশিয়া জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে সব দরিদ্র সম্প্রদায়ের সাহায্যে কাজ করবে। দরিদ্র গ্রামীণ মালয় সম্প্রদায়ের প্রয়োজনগুলোকে কোনোভাবেই পছন্দ কিংবা অপছন্দের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো সুযোগ নেই। দরিদ্রদের সক্ষম করে তোলা প্রয়োজন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ভেদে পার্থক্য তৈরি করাটা দরিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ন্যূনতম কোনো ভূমিকা পালন করবে না।

বহুত্ববাদই মালয়েশিয়ার শক্তি। বহুসংস্কৃতির এ সমাজ ব্যবস্থায় মুক্ত ও প্রকৃত প্রবৃত্তিগুলোকে পুনরুদ্ধারের জন্য এখনো অনেক কাজ করা বাকি। আমাদের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি ও ধারণার সমৃদ্ধি আর সৃজনশীল সম্ভাবনাগুলো ভাগাভাগি করার অর্জনগুলো নেহাত কম হবে না। সংস্কার ও সহযোগিতার মাধ্যমে মালয়েশিয়া আরো বেশি গতিশীল ও উৎপাদনশীল সমাজ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে শান্তির মডেল, গণতান্ত্রিক যুগপৎ অবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠবে; বর্তমান বিশ্বের জন্য যার ভীষণ প্রয়োজন। এ পর্যন্ত যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছি, তার প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গিগুলো বেশ স্পষ্ট। ২০১৮ সালের শুরুতে, আমি তখনো কারাবন্দি, আসন্ন নির্বাচনে আমি যেন কোনোভাবে অংশগ্রহণ করতে না পারি, তার জন্য তখনকার সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। তাই আমার জন্য ২০১৮ সালটি ভীষণ গুরুত্ববহ।

দেশের প্রয়োজনে জোটবদ্ধ সমঝোতায় পৌঁছার সিদ্ধান্তটি আমাদের দুর্দান্ত ও অপ্রত্যাশিত বিজয় এনে দিয়েছে। বিপরীতভাবে বিরোধীদের সম্ভাবনাগুলো উড়িয়ে নিয়ে গেছে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে আমি কারাবন্দি দশা থেকে মুক্তি পেয়ে রাজকীয় ক্ষমা পেয়েছি। কয়েক মাসের ব্যবধানে আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়লাভ করি, এটি ফের আমাকে সংসদে ফিরিয়ে আনে। বর্তমানে আমি সংস্কার কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন ও বাস্তব পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে কাজ করছি।

এটি যদি ব্যাহতও হয়, তাহলে ২০১৯ সাল ও এর পরবর্তী সময়ের দিকে তাকিয়ে আমি আশাবাদী থাকব।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

লেখক: মালয়েশিয়ার সংসদ সদস্য

পিকেআরের প্রেসিডেন্ট ও পাকাতান হারাপান জোটের নেতা

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস