নতুন উদ্ভাবন স্থিতাবস্থা দূরপূর্বক সভ্যতাকে প্রগতির দিকে চালিত করে এবং বাজার ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠায় প্রধান প্রতিযোগীদের (প্লেয়ার) বাধ্য করে। তবে তা যথাযথভাবে সামলানো না গেলে উদ্ভাবন বা নতুন প্রযুক্তি ধ্বংসাত্মকও হতে পারে। আর্থিক উদ্ভাবনও (ফিনটেক) এর ব্যতিক্রম নয়। ফিনটেক স্টার্টআপ ও সিলিকন ভ্যালির প্রধান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক উন্নয়নকৃত নতুন প্রযুক্তি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ব্যাংকিং-আর্থিক সেবা অধিক কার্যকর এবং মানুষের জন্য আরো সহজলভ্য করেছে। প্রকৃতপক্ষে নতুন প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তিগুলো পুরো আর্থিক খাতকে নতুন এক উত্তরণশীল পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। কাজেই কিছু গতানুগতিক বা ঐতিহ্যবাহী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও আলোকচিত্রে একসময়ের মার্কেট লিডার কোডাকের মতো একই পরিণতি ঘটতে দেখাটা আমাদের জন্য কোনো বিস্ময়ের ব্যাপার হবে না। সামনে এগোতে হলে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই নতুন পণ্য ও ব্যবসায়িক মডেলের জন্য উপযুক্ত সমান ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংহতি নাশের ঝুঁকিগুলো যাতে ধ্বংসাত্মক হতে না পারে, সেজন্য তা প্রশমনে ব্যবস্থা নিতে হবে।

গতানুগতিক বা ঐতিহ্যবাহী আইটি ব্যয় ও অভিযোজনমূলক ব্যবসায়িক মডেলের অনুপস্থিতিতে ফিনটেক স্টার্টআপগুলো এখন ক্লাউডভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি সেবাা থেকে সুফল পায়। বাজারে প্রবেশকারী সর্বসাম্প্রতিক প্রতিষ্ঠানটিও বিদ্যমান এবং তাদের পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে। মূলত এ কারণেই সেবা প্রদানের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি সম্ভব হয়েছে, যা পিয়ার টু পিয়ার লেন্ডিং, মোবাইল রেমিট্যান্স ও পেমেন্টের মতো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছে।

তবে স্টার্টআপগুলোও বড় টেক প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইটি বিশেষজ্ঞ, বৃহৎ গ্রাহক ভিত্তি, ডিটেইলড ডাটায় সহজ প্রবেশসহ যাদের নানা সুবিধা রয়েছে) দিক থেকে অত্যধিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে। একটি গ্রাহককেন্দ্রিক অ্যাপ্রোচের সঙ্গে উল্লিখিত সুবিধা সমন্বয়ে বড় টেক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ধরনের নতুন আর্থিক সেবা প্রদানে সমর্থ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, চীন প্রযুক্তি জায়ান্ট টেনসেন্ট তার তাত্ক্ষণিক মেসেজিং অ্যাপ উইচ্যাটে গ্রাহকবান্ধব পেমেন্ট অপশন সংযোজন করেছে। একইভাবে অ্যামাজনও তার অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবহারে করে ব্যবসায়ীদের ক্রেডিট লাইন অফার করেছে। এভাবে গতানুগতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক মুখোমুখি হওয়া কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক বা বিধিমূলক প্রতিবন্ধকতার চেয়ে কম প্রতিবন্ধকতায় বড় টেক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে।

আর্থিক বাজার-সংশ্লিষ্ট সব ধরনের প্রতিষ্ঠান গ্রাহক মিথস্ক্রিয়া থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রণমূলক কমপ্লায়েন্স সব কাজে আজকাল অব্যাহতভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ব্লকচেইন ডিস্ট্রিবিউটেড-লেজার টেকনোলজি ব্যবস্থায় ব্যবহূত বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টো অ্যাসেট বিপুল উত্তাপ-উদ্দীপনা) তৈরি করেছে। বাণিজ্য অর্থায়ন ও রেমিট্যান্স পাঠানোর মতো প্রায়োগিক কর্মকাণ্ডের প্রতিশ্রুতি ব্লকচেইন দিলেও পেমেন্ট বা অন্য কাজে মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক ব্যাপকভাবে তা গ্রহণে আরো সময় লাগবে। এখন বড় বিপদ হলো, জুতসই বিকল্প প্রদান ছাড়া বৃহত্তর কল্যাণ নিশ্চিতকারী ব্যবসায়িক মডেলগুলোর জন্য ফিনটেক উদ্বেগ-হতাশার কারণ হতে পারে। সিলিকন ভ্যালির দিক থেকে মুখোমুখি হওয়া বর্ধিষ্ণু প্রতিযোগিতার প্রতিক্রিয়ায় সংকুচিত বাজার অংশ ধরে রাখার জন্য গতানুগতিক ব্যাংকগুলো অধিক ঝুঁকি নিতে পারে। সেক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করে ব্যবসায়িক মডেল সংস্কার কিংবা অপরিচিত বা দ্রুত বিবর্তনশীল প্রযুক্তি গ্রহণের ফলে তাদের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া দুর্বল হতে পারে এবং এমনটি হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য লোকসান সৃষ্টির সেটি অন্যতম উৎস হবে বৈকি।

অধিকন্তু আর্থিক সেবাগুলো কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরো কেন্দ্রীভূত হতে পারে। এ অবস্থা সৃষ্টি হলে তা টেক ব্যবসা চালাতে উচ্চব্যয়, বিপুল গ্রাহক থাকা বড় কোম্পানিগুলোর কাছে নেটওয়ার্ক কার্যকারিতা সীমাবদ্ধ এবং বিদ্যমান পেমেন্ট সলিউশনে অনাগ্রহের কারণ হবে।

খোদ প্রযুক্তিও আর্থিক ব্যবস্থার সমস্যার অন্যতম বড় অনুঘটক হবে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হার্ড বিহেভিয়ার উসকে দিতে পারে, এমনভাবে প্রয়োগ হলে এআই ও মেশিন লার্নিং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কারণ হবে। উপরন্তু এসব প্রযুক্তি ব্ল্যাকবক্স প্রকৃতির হওয়ায় খারাপ কিছু ঘটলে সেগুলোয় মানব হস্তক্ষেপ করা অধিকতর কঠিন হবে।&dquote;&dquote;

মোটা দাগে বললে দ্রুত বিবর্তিত নতুন প্রযুক্তি নিম্নদক্ষ কর্মীদের অভিযোজনে খুব কমই সময় দেয় এবং চূড়ান্তভাবে তাদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চাকরিচ্যুতও হতে পারে। ভোক্তা হিসেবে ব্যক্তি হয়তো সুফল পেতে পারে, কিন্তু কর্মী হিসেবে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ দুই প্রভাব সমাজের বিভিন্ন অংশে ভিন্নতর হবে। বড় কথা, এটি আমাদের একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক অসমতার দিকে চালিত করবে। ক্রিপ্টো-অ্যাসেটের সুফল দেখতে পাওয়া এখনো বেশ কঠিন। অর্থের মৌলিক গুণাবলির ঘাটতিতে এসব অ্যাসেট অস্থিতিশীল মূল্যমান ধারণ ও অধিক কারসাজি (ম্যানুপুলেশন) প্রবণ এবং এগুলো অতিমাত্রায় জ্বালানি-নিবিড়। এসব সম্পদের অস্পষ্টতা ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা সম্পর্কিত ইস্যুগুলো সামনে আনে এবং কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের দ্বার উন্মুক্ত করে। অধিকন্তু গতানুগতিক আর্থিক ব্যবস্থায় অনেক বছরের ধারাবাহিকতায় অর্জিত আস্থার ওপর ক্রিপ্টো-অ্যাসেটগুলো অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি করছে। এভাবে ক্রিপ্টো-অ্যাসেটের ফলে সৃষ্ট আস্থাহীনতা বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার আস্থা নিঃশেষ করবে।

নতুন উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকিগুলো সমাধানে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক ও তত্ত্বাবধায়কদের যেমন সৃষ্টিশীল হতে হবে, তেমনি নতুন প্রতিযোগীদেরও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা ও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে এক কাতারে আনতে ইনোভেশন কেন্দ্র সৃষ্টির বিষয়টিও তাদের বিবেচনা করা উচিত। একটি নিরাপদ পরিবেশে উদ্ভাবকরা যাতে নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন, সে ধরনের বিধিমূলক ব্যবস্থা নেয়াও জরুরি। উল্লিখিত প্রতিটি পদক্ষেপই নীতিনির্ধারকদের পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকতে সাহায্য করবে।

নিয়ন্ত্রণমূলক স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিরোধে নীতিপ্রণেতাদের ‘একই ঝুঁকি, একই নীতি’ সূত্র অনুসরণ করা উচিত। একই ধরনের গ্রাহক গোষ্ঠী ও একই ধরনের আর্থিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই সমরূপ নীতি পরিপালন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট নীতির ভিত্তি যেখানেই হোক না কেন। স্পষ্ট বিধিমূলক সীমানা নির্ণয় যেহেতু অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি কমায়, সেহেতু উদ্ভাবকদের অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ানোর পরিস্থিতি থেকে রক্ষায় নীতিগত পরিধির ভেদরেখা নিশ্চিত করা দরকার। এদিকে সাধারণ নীতি বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষগুলোর করণীয়ও ঢের। আলোচ্য কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এক্সপোজার তদারক করতে হবে, যাতে নিয়ন্ত্রণ শর্তের বাইরে কোম্পানি ও উৎপাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। তবে কাজটির জন্য প্রয়োজন হবে জ্ঞানের নতুন উৎস ও পর্যাপ্ত তথ্যের।

ক্রিপ্টো বিশ্বে ‘একই ঝুঁকি, একই নীতি’ মানে হলো ‘ইনিশিয়াল কয়েন অফারিংয়ের’ মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ার অফারিংয়ের ক্ষেত্রেও একই মান ও সুবিবেচনা বজায় রাখা। একইভাবে তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কোনো অন্যায্য সুবিধা নেয়া উচিত নয়। বিদ্যমান তথ্য গোপনীয়তাসংক্রান্ত বিধিগুলোয় অনৈতিক ব্যবহারের অনেক ত্রুটি রয়ে গেছে। এগুলো সংস্কার বা দূর করা দরকার। এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জেনারেল ডাটা প্রটেকশন রেগুলেশন একটি সঠিক নির্দেশনার পদক্ষেপ। নীতিনির্ধারকদের যে প্রশ্নটি মনে রাখতে হবে সেটি হলো, আর্থিক সেবা নিশ্চিতের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কতটুকু বাদ দেয়া উচিত।

যেহেতু উদ্ভাবনের কোনো সীমানা নেই, সেহেতু দেশে দেশে অবশ্যই ‘একই ঝুঁকি, একই নীতি’ অনুসরণ করতে হবে। সাধারণ, আইনি, কর, হিসাব ও টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় আবশ্যক। ব্যবহারকারী ও কর্মীদের মধ্যে উদ্ভাবনের প্রভাব অবশ্যই সরকারগুলোকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং সেই মোতাবেক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রবর্তন করতে হবে, যাতে পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে মানুষ প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। আর্থিক উদ্ভাবন ও নতুন প্রযুক্তির সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। উভয় বিষয়ের নিরিখে এখন যথাযথ নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

লেখক: ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটলমেন্টসের জেনারেল ম্যানেজার ও ব্যাংক অব মেক্সিকোর সাবেক গভর্নর

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির