শীর্ষ প্রযুক্তি ফার্মগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবদক্ষতা ও বাজারশক্তির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে তীব্র বিতর্ক উসকে দিয়েছে, যখন ভবিষতে উদ্ভাবন ও সম্পদের বণ্টন নিয়ে বাজারের নতুন রূপ কী হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠছে। ওয়াইমিংয়ে অনুষ্ঠিত ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব কানসাস সিটি আয়োজিত বার্ষিক জ্যাকসন হোল ইকোনমিক পলিসি সিম্পোজিয়ামে এ বিষয়ে বেশ জ্ঞানগর্ভ ও উপকারী আলোচনা ও প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়েছে।
দক্ষতা ও প্রতিযোগিতার প্রতি সম্মান রেখে বলছি, এরই মধ্যে যথেষ্ট কারণ সামনে আসতে শুরু করেছে, যা উদ্বেগ তৈরি করছে। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন হাট্টিভিঞ্জার দেখিয়েছেন, বাজারে নতুন ফার্ম প্রবেশের হার দ্রুত কমছে, বিশেষ করে গত ১২ বছরে এবং ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের জে রিটার বার্ষিক ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিংসে একই ধরনের পতনের চিত্র দেখিয়েছিলেন।
এসব তথ্য বলছে, নতুন ফার্মগুলো বড় পাবলিক ফার্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করার বদলে ক্রমেই অধিগ্রহণ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। একই সময়ে উৎপাদনশীলতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাড়লেও বিভিন্ন খাত থেকে ফার্মের বেরিয়ে যাওয়ার হার অপেক্ষাকৃত কম। অন্যভাবে বললে দুর্বল উৎপাদনকারীদের বাজার থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে না, এটি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের সক্রিয়তার অভাবকে ফুটিয়ে তুলছে।
এদিকে বাজার কেন্দ্রীভূতকরণের পরিমাপকগুলো, যেমন চার সর্ববৃহৎ ফার্ম কর্তৃক শেয়ার বিক্রি, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প খাত প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেছে, যদিও এটা এখনো পরিষ্কার নয়, এর চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে। ইউরোপেও এ ধরনের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটছে কিনা, তা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু মাত্রায় কঠোরভাবে অ্যান্টি-ট্রাস্ট নীতিগুলো মানা হয়। যদি এমন না হয়ে থাকে, তাহলে অ্যান্টি-ট্রাস্ট নীতিগুলো এ বিষয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে পারে।
একইভাবে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে করপোরেট মুনাফা উচ্চতর; আবার এটাও পরিষ্কার নয়, এর মানে কী। কেউ কেউ এটিকে দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাতে একচেটিয়াত্ব বৃদ্ধির লক্ষণ হিসেবে। অন্যরা দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সুপারস্টার ফার্মগুলোর আরো বেশি উদ্ভাবনী হয়ে ওঠা এবং উচ্চতর উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের লক্ষণ হিসেবে। কিন্তু এটা যদি হয়েও থাকে, তবুও বিশ্বজুড়ে সার্বিক উৎপাদনশীলতা নিম্নগতির বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। যদি উদ্ভাবন এত উচ্চই হয়ে থাকে, তাহলে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি এত নিম্ন কেন?
কেন্দ্রীভূত ব্যাহতকরণ
এ প্রশ্নে যাওয়ার আগে আমরা দেখে নিই, এ বিষয়ে আমরা কী জানি। সাম্প্রতিক গবেষণা নির্দেশ করছে, ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভূতকরণ বাজারশক্তির প্রতিফলন নয়, বরং বাজার শেয়ারের সিংহভাগ আরো ভালোভাবে পরিচালিত, আরো বেশি উদ্ভাবনী ফার্মগুলোর (যে ফার্মগুলো সবচেয়ে ভালো কর্মশক্তিকে আকর্ষণ করে) দিকে চলে যাওয়ায় এটি ঘটছে। কয়েকটি সুপারস্টার ফার্মের হাতে ভালো কর্মশক্তি সমবেত হওয়ার দরুন যে সবচেয়ে বেশি দক্ষ, সে ‘সুপার দক্ষ’ হয়ে উঠছে।
এটি একটি ভালো বিষয় মনে হয়েছে ততদূর পর্যন্ত যতদূর এটা বলে যে ফার্মগুলো আরো বেশি দক্ষ হওয়ার মাধ্যমে বাজার শেয়ার দখলে নিচ্ছে, অন্য ফার্মের কাজ ছিনতাই করার মাধ্যমে নয়, যখন অ্যান্টি-ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষগুলো হাত-পা গুটিয়ে বসে রয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করতে পারে, কেন্দ্রীভূতকরণ বা একচেটিয়াত্ব উচ্চতর মূল্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে এটি যে ঘটছে, তার সপক্ষে তেমন কোনো প্রমাণ নেই। অবশ্যই গ্রাহকদের ওপর নির্ভর না করেই ফার্মগুলো নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে, যার ফলে উত্তাপহীন মূল্য উদ্বেগের একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
আরেকটি বিষয় দেখা যাচ্ছে তা হলো, ‘অস্পৃশ্য’ সম্পদ যেমন সফটওয়্যার ও মেধাসম্পত্তির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ফলে নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকোলাস ক্রাউজেট ও জনিস সি. ইবারলি বলছেন, এ প্রবণতা বাজার কেন্দ্রীভূতকরণকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ওপর যারা শিল্প খাতের মধ্যে স্বতন্ত্র, তারা দেখিয়ে দিচ্ছে উচ্চতর কেন্দ্রীভূতকরণ কিছু খাতের ক্রমবর্ধমান উৎপাদনশীলতার সঙ্গে জড়িত, যখন কিছুর হাতে বাজারশক্তি বাড়ছে। গ্রাহককেন্দ্রিক শিল্প খাত (যেখানে নিকোলাস ক্রাউজেট ও জনিস সি. ইবারলি দেখতে পেয়েছেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ছে) নিয়ে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের আলবার্তো এফ ক্যাভালো বলছেন, নিম্ন মূল্যের কারণে ভোক্তারা লাভবান হচ্ছেন। বৃহত্তরভাবে চিন্তা করলে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না, ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভূতকরণ ভোক্তাদের ক্ষতি করে।
এখনো হেলথ কেয়ার খাত সতর্কবার্তা দিচ্ছে। এটিও কিন্তু গভীরভাবে কেন্দ্রীভূত বা নিবিষ্ট, কিন্তু প্রভাবশালী ফার্মগুলো ভোক্তাদের চাপে রাখতে চায় এবং এর সবই উচ্চমাত্রার উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারছে না। তাহলে প্রশ্ন হলো, অন্য খাতের আজকের উচ্চ উৎপাদনশীল সুপারস্টাররাও কি একই পথ অনুসরণ করে অবশেষে পতন দেখবে। সর্বোপরি যখন সুপরিচিত বাজার নেতা যেমন ফেসবুক ও গুগল বিনামূল্যে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা নিয়ে হাজির হচ্ছে (যেটি অবশ্যই ভোক্তাদের সুবিধা দিচ্ছে), কিন্তু তাদের বিজনেস মডেল নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
যেমন একজনকে অবশ্যই দেখতে হবে ব্যক্তিগত তথ্য দেয়ার বিনিময়ে যেসব সেবা দেয়া হচ্ছে, সেটা ন্যায্য বাণিজ্য কিনা। আবার দেখতে হবে, এসব কোম্পানি সেবার জন্য কাদের কাছ থেকে চার্জ নেয় এবং ব্যয়গুলো (যেমন বিজ্ঞাপন, যেটি আপনাকে দেখতে বাধ্য করা হয়) ভোক্তাদের ওপর এসে পড়ে কিনা।
বর্তমান ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞাপন দেখা ও ব্যক্তিগত তথ্য দেয়ার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা বিনামূল্যে সেবা পেয়ে থাকে, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন প্লাটফর্মকে অর্থ দেয়, এসব গ্রাহক বা ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছার জন্য এবং প্লাটফর্মগুলো নিজেদের উদ্ভাবনী সেবা দেয়ার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ গ্রাহকের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। এ ব্যবস্থাপনা টিকবে কিনা, তা দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে। আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে আরেকটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেটি হলো দীর্ঘমেয়াদি এমন ব্যবস্থাপনা এসব বাজারের গতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে কিনা।
এফএএএনজি আউট
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রধান শিল্প খাতের কাঠামো কি বিনিয়োগ, গবেষণা ও উন্নয়নকে অথবা সুপারস্টার ফার্মের উদ্ভাবনের আরো প্রসারণকে শ্লথ করে দিচ্ছে? বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ বলবেন, উদ্ভাবন মূলত এগিয়ে চলে প্রতিযোগিতার হাত ধরে, শিল্প ও অন্যান্য খাতে। আবার ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতার হুমকি সামনে রেখেও উদ্ভাবন জোর পায়। তাই যদি কেউ আজকের উদ্ভাবনের ওপর বাজার কেন্দ্রীভূতকরণের প্রভাব নিয়ে চিন্তিত নাও হন, তবুুও তাকে অবশ্যই চিন্তা করতে হবে, এটি ভবিষ্যতের গতিশীলতার জন্য কোনো হুমকি তৈরি করছে কিনা।
বাজারে নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ হার কমে যাওয়া এবং নতুন ফার্মগুলোর মধ্যে অধিগ্রহণ হওয়ার প্রতি বাড়তে থাকা আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আগের তুলনায় এখন বেশি করে এ ধরনের অধিগ্রহণ পদ্ধতি প্রভাবশালী ফার্মগুলো প্রাথমিকভাবে ব্যবহার করছে নতুন পণ্য তৈরি বন্ধ করে দেয়া বা অঙ্গীভূত করার জন্য, যেগুলো আগামী দিনে তাদের জন্য প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প খাতে যে এটি ঘটছে, তার প্রচুর প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু আমরা আরো জানি, এফএএএনজি (ফেসবুক, অ্যামাজন, অ্যাপল, নেটফ্লিক্স ও গুগল) এ ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করবে, যদি প্রয়োজন পড়ে।
প্রতিযোগিতা হ্রাস করার পাশাপাশি এ অনুশীলন ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট (ভিসি) কর্তৃক অর্থায়নকেও নিরুৎসাহিত করছে, যারা এখন প্রধান টেক ফার্মগুলোর প্রধান পণ্য দিয়ে ঘেরা ‘কিল জোন’ নিয়ে আলোচনা করছে। ভিসিরা যেকোনো পণ্যে বিনিয়োগ করতে ইতস্তত বোধ করেন, যেটি এ ‘কিল জোনে’ পড়ে যাবে। কারণ সেখানে প্রবৃদ্ধির কোনো প্রত্যাশা নেই। একমাত্র পথ হলো অধিগ্রহণ।
প্রভাবশালী প্লেয়ারদের আরেকটি বড় সুবিধা হলো গ্রাহকদের কাছে দ্রুত পৌঁছে যাওয়ার একচেটিয়া সক্ষমতা বা উদ্দেশ্যসাধনে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত ডাটার ব্যবহার। ১০ লাখ ক্রেডিট কার্ড অফার বিশ্লেষণ করে এক গবেষণায় এমআইটির হং রু ও অ্যান্তোইনিতে স্কোয়ার দেখিয়েছে, কোম্পানিগুলো হয়তো গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে গ্রাহকদের চরিত্র বিশ্লেষণ করে তাদের কাছ থেকে ঋণের অর্থ তোলার চেষ্টা করছে। আজকের বাজার নেতাদের আরেকটি অবধারিত সুবিধা হলো নেটওয়ার্ক ক্ষমতা ব্যবহার করে ‘লক-ইন’ পরিস্থিতি সৃষ্টি, যেটির প্রবণতা হলো জয়ী সবকিছু নিয়ে যাবে।
এ ধরনের ভোগদখলকৃত সুবিধার আলোকে সাম্প্রতিক অতীতে যে ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা গিয়েছে, যখন ফার্মগুলো অর্থনীতির প্রধান খাতগুলোর বাজার শেয়ার দখলের জন্য কুস্তি লড়ছিল, তা এখন আর আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এ ধরনের উদ্বেগের বিষয়টি অ্যাডাম স্মিথ ২৫০ বছর আগেই তুলে ধরেছিলেন। যেহেতু ফার্মের মোট সংখ্যা কমছে, তখন গোপন কাজের বা জোট গঠনের বৃহত্তর ঝুঁকি বাড়ছে।
সম্ভবত সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো প্রযুক্তির বিস্তারের গতি হ্রাস। সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য নির্দেশ করছে, সুপারস্টার ফার্মগুলো থেকে নতুন আইডিয়া অর্থনীতির বাকি অংশে ছড়িয়ে পড়ছে না। যখন কিছু ফার্ম শক্তিশালী উৎপাদন প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে এবং শিল্প খাতের মধ্যে উৎপাদনশীলতার বিচ্ছুরণ ঘটছে, তখন আমরা সার্বিকভাবে উৎপাদনলশীলতার নিম্নতর প্রবৃদ্ধিও দেখতে পাচ্ছি। নিম্ন উৎপাদনশীলতার পেছনে বেশকিছু সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি (আইপি) নিরাপত্তা থেকে শুরু করে ফার্মগুলোর মধ্যকার শ্রম বিনিময়ের সীমাবদ্ধতা পর্যন্ত। কিন্তু যে কারণই থাকুক না কেন, এটা পরিষ্কার যে বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতা নিয়ে আমাদের আরো বেশি চিন্তিত হওয়া উচিত।
দা লুম্পেন মেজরিটি
সর্বশেষ চিন্তার বিষয় হলো বৈষম্য। অতি সরলীকরণের ঝুঁকি থাকলেও আমরা একটি পয়েন্টে পৌঁছেছি, যেখানে সর্বোচ্চ উপার্জনকারীর বেশির ভাগই অল্প কিছু ফার্মে নিয়োজিত রয়েছে, যখন বাকি বড় অংশ এ ধরনের আয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অন্যভাবে বললে বিষয়টা এমন নয় যে প্রতিটি ফার্মের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা বিশাল অংকের মজুরি পান। তবে শুধু অল্প কিছু সুপারস্টার ফার্মের শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিরা পেয়ে থাকেন। এখন প্রশ্ন হলো, এটি আমাদের ভালো অনুভূতি দেয় কিনা।
অবশ্যই, কোনো পরিস্থিতিই খুব বেশি আকর্ষণীয় বা গ্রহণযোগ্য নয়। যত বেশি করে সবচেয়ে দক্ষ ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট কিছু সুপারস্টার ফার্মে জড়ো হচ্ছেন, তত বেশি করে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিরা অবাক হচ্ছেন, কেন ‘এলিটরা’ সবকিছু পেয়ে থাকে। এটা কদাচিতভাবে ন্যায্য যে ফার্ম, খাত ও অঞ্চলের মধ্যে বিস্তৃতভাবে বিতরণ হওয়ার বদলে মুনাফার বড় অংশ শীর্ষে থাকা ফার্মগুলোর হাতে জড়ো হচ্ছে।
যারা পিছিয়ে থাকছে, তাদের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালান বি ক্রুগার সতর্ক করে দিয়েছেন, স্মিথের তুলে ধরা সমস্যার একটি রূপভেদ, যথা শ্রমবাজারে অল্প কিছু ফার্মের মধ্যকার জোট, ক্রমবর্ধমান হারে লক্ষণীয় হয়ে উঠছে। কিছু নির্দিষ্ট বাজারে অন্তত আমরা হয়তো মনোপলিজের বদলে (একক বিক্রেতা) মনোপসনিজের (একক বায়ার) উত্থান দেখতে পাচ্ছি। শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে একটি কোম্পানি, যেটির অবস্থান মনোপসনি বা যেটি পরোক্ষভাবে অন্য ফার্মের সঙ্গে আঁতাত করেছে, সেটি খাতজুড়ে মজুরি কমানোর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ক্রুগার সন্দেহ করছে, যখন মনোপসনি শক্তি ‘সম্ভবত শ্রমবাজারে সবসময় ছিল, যেসব শক্তি যা প্রথাগতভাবে এর মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে সাম্প্রতিক দশকে সেগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।’ একই সময় ইউনিয়ন সদস্য সংখ্যা কমেছে, শ্রমিকের দরদামের শক্তি হ্রাস করে, এমন কাজ করার— নন-কম্পিট ক্লজ থেকে তৃতীয় পক্ষের শ্রমিক নিয়োগ— প্রতি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে।
কী করা যেতে পারে?
বাজার কেন্দ্রীভূতকরণ, উদ্ভাবন ও আয়ের বিতরণ সংক্রান্ত তথ্যগুলো জরিপ করে আমাদের এখন এসব প্রবণতার জন্য নীতিনির্ধারণের দিকে ঝোঁকা উচিত। সুপারস্টার ফার্মগুলোর আজকের আচরণ আগামী দিনে নিজেদের শিল্প খাতের প্রতিযোগিতায় কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। রাজনীতিবিদ ও রেগুলেটরদের দেখা উচিত, আইপি ও তথ্যসম্পদ প্রতিযোগিতার কণ্ঠরোধ করার কাজে কিংবা খাতজুড়ে নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা এবং প্রথাগত অ্যান্টি-ট্রাস্ট যে সুযোগ তৈরি করে, তার বাইরে গিয়ে নতুন কৌশল গ্রহণের দিকে নীতিনির্ধারকদের নজর দেয়া উচিত।
যেমন কেউ পরামর্শ দেয়, ব্যক্তিদের অবশ্যই নিজেদের তথ্যের ওপর অধিকার থাকা উচিত। কারণ ফার্মগুলো বিক্রেতা হওয়ার বদলে তথ্যের ক্রেতা হয়ে উঠবে। কোনো প্লাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত না থাকার কারণে ব্যক্তিরা প্রতিযোগী ফার্মের কাছে নিজেদের ডেটা বিতরণ করতে পারবে। প্লাটফর্মগুলোর মধ্যে আরো বেশি ‘ইনটেরোপিরাবিলিটি’ প্রতিষ্ঠার জন্য নীতিনির্ধারকদের চাপ দেয়া শুরু করা উচিত, যেটি যেকোনো বিশেষ কাঠামোয় কতজন ব্যবহারকারী সংযুক্ত থাকতে পারবে, তা সীমিত করে দেবে।
শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকরা বেশকিছু পথে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। যেমন ‘নন-কম্পিট’ চুক্তির, যেটি অবধারিতভাবে বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে (এখানে শ্রমবাজার), বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ট্রাস্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। একইভাবে পেশাগত লাইসেন্স ব্যবস্থার (বিউটিশিয়ান বা প্লামবারদের ক্ষেত্রে), যাদের সংরক্ষণবাদের দিকে বেশি নজর, তারা এটিকে ব্যবহার করে থাকে, শক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। যারা এরই মধ্যে প্রদানকৃত লাইসেন্স পেয়েছে, তারাই কেন লাইসেন্সের আইন ঠিক করবে? পেশাগত লাইসেন্সের বিষয়টি ঠিক করার জন্য একটি আরো নিরপেক্ষ কমিটি থাকা উচিত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের অগ্রহণযোগ্য কাজ
অর্থনীতির চলমান কাঠামোগত পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ভয়, কর্মের মানের পতন ও সুপারস্টার ফার্মগুলোর তৈরি করা সমস্যা মানুষের হাতে হাজারো কারণ তুলে দিয়েছে অসুখী হওয়ার জন্য। নিম্নবেকারত্ব সত্ত্বেও অনেক শ্রমিক সুখী নন। তারা নন-সুপারস্টার ফার্মে আটকে রয়েছেন, যেখানে শ্রমিকদের কাছ থেকে এলিট ও তাদের নীতি এজেন্ডার বিরুদ্ধে মহামন্দা-পরবর্তী অসন্তোষ প্রকাশ পেতে দেখা যায়।
সব এলিটের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পদক্ষেপ নিয়েছেন। বেশির ভাগ ব্যাংকার ডক্টরেট করেছেন এবং তারা এমন ভাষায় কথা বলেন, সেটা আর কেউ বুঝতে পারে না। এ বিশুদ্ধ ‘কোনো জায়গার নাগরিক নয়’ ব্যাংকাররা দূরবর্তী ব্যাসেলে সময় সময় বন্ধ দরজার পেছনে বৈঠকে বসেন, যেখানে তারা বৈশ্বিক আর্থিক অবস্থা ও মুদ্রানীতির পদ্ধতিগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। তারা যেটা নিয়ে আলোচনা করেন না, অনেকে যেটা বিশ্বাস করে, সেটি হলো মেইন স্ট্রিট। এটি শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ে আলোচনায় ঠাঁই পায়।
এটি যথেষ্ট বাজে, যখন গড় নাগরিকরা মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের মধ্যকার জটিল ভারসাম্য খুব কমই বুঝতে পারে। এটি আরো খারাপ হয়, যখন ওয়াল স্ট্রিট বেইলআউট নিয়ে মানুষের অভিযোগ ওঠে এবং ধারণা জন্মে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা স্থানীয় পরিস্থিতি সামাল দেয়ার বদলে বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশি চিন্তিত। এ ধরনের চিন্তা করা পরিষ্কারভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের কাজ; কিন্তু যারা আলোচনায় থাকেন না, তাদের মধ্যে এ সন্দেহ বাড়ছে যে ব্যাংকাররা ঠিকভাবে কাজ করছেন না। সেন্ট্রাল ব্যাংকিং যথেষ্ট কঠিন কাজ। আপনাকে আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে যখন রাজনীতিবিদরা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করেন, তখন এটি আরো কঠিন হয়ে ওঠে। আজকের অবিশ্বাস ও উপহাসের পরিবেশ তৈরি করছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের কারো ঈর্ষা করা উচিত হবে না। কেননা অর্থনীতিতে যে বৃহত্তর কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে, তারা নিজেরাই সেখানকার পণ্য।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা কি পারবেন একই সময়ে নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং ছড়িয়ে পড়া প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে? এটিই হবে ২০১৯ সাল ও তার পরবর্তী সময়ের মুখ্য প্রশ্ন।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
লেখক: সাবেক গভর্নর, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া
ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো বুথ স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক
ভাষান্তর: সাঈদ সরকার






