২০১৮ সালকে আমদানি শুল্ক ফিরিয়ে আনার বছর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অক্টোবরে প্রায় ১২ হাজার পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে, যা মোট আমদানির প্রায় ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। মার্কিন পণ্য আমদানির অন্যতম অংশীদাররাও প্রায় ২ হাজার ৮৭ পণ্যের ওপর ট্যারিফ যুক্ত করেছে, যা মার্কিন রফতানির প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এভাবে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হতে পারে, এমনকি সম্পূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।
অবশ্যই এবারই প্রথম মার্কিন প্রশাসন তাদের বাণিজ্যনীতিকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছে। ১৯৭১ সালে নিক্সন প্রশাসন সব আমদানিযোগ্য পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেছিল চলতি হিসাবের ঘাটতি মেটাতে। এরপর নিকট অতীতে রিগ্যান প্রশাসন বিশেষত জাপানের পণ্যের ওপর নন-ট্যারিফ সুবিধা বাতিল করে।
অথচ পূর্ব ও বর্তমানের এ সিদ্ধান্তের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য আছে। পূর্ববর্তী সব সিদ্ধান্তের সময় মার্কিন বাণিজ্যের চিত্রপটে একটা বাজে সময়ের ছাপ ছিল, কিন্তু এবার এমনটা নয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত মনে হয়েছে, বিশ্বায়ন অপ্রতিরোধ্য ও অপরিবর্তনীয়। উদারপন্থী বৈশ্বিক বাণিজ্য অবস্থান ও বাণিজ্যনীতি নিয়ে কথা হলে সবসময় সেখানে একটা সাম্য ছিল। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো মার্কিন প্রশাসন তখনই তাদের বাণিজ্যনীতিতে নিজেদের শিল্প ও পণ্যকে রক্ষা করতে এ সিদ্ধান্ত নিল, যখন তাদের বেকারত্ব গত ৫০ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন, শেয়ারবাজার সূচক ঊর্ধ্বমুখী এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের ওপর।
ওয়াশিং মেশিন ও সোলার প্যানেলের মতো পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা স্পষ্টত নিজেদের শিল্পকে রক্ষা করার একটি পদক্ষেপ, যারা প্রতিযোগিতায় ভালো করতে পারছে না। শিগগিরই স্টিলের ওপর ২৫ ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে মার্কিন প্রশাসন এবং নাফটাও (নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট) সংশোধন করা হবে। এই এক ধাক্কায় চীন মার্কিন বাজারে কঠোর প্রতিযোগিতায় পড়েছে। মার্কিন প্রশাসন মূলত মেধাসম্পদ রক্ষা, স্থানীয় শিল্পকে ভর্তুকি দেয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছে।
দুটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে মূলত সাম্প্রতিক মার্কিন বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রথমত, রফতানিযোগ্য পণ্য রক্ষা এবং সেখানে কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে যে হতাশা রয়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা সমাধান করতে পারেনি। দ্বিতীয় কারণটাই মূলত মার্কিন নীতিনির্ধারকদের উদ্বুদ্ধ করেছে এমন নীতি গ্রহণ করতে, যা কিনা অনেক বেশি ভয়ানক আগের যেকোনো নীতি সংস্কারের চেয়ে।
যদিও বাণিজ্যনীতির মাধ্যমে স্থানীয় শিল্প রক্ষার বিষয়টা খুব বেশি নতুন নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা সবসময় তার সমর্থন হারিয়ে ফেলে। বেশির ভাগ নীতিনির্ধারক এখন সামাজিক সুরক্ষা নীতি ও স্থানীয় নীতি, বিশেষ করে প্রশিক্ষিত কর্মশক্তি ও স্থানান্তরিত কর্মসংস্থান, যা একই সঙ্গে কম খরচে শ্রমিক জোগান দেয় এবং তা অনেক বেশি ইতিবাচক প্রভাব রাখে বাণিজ্যে। এই একটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নাফটা চুক্তি সামান্য কিছু পরিবর্ধন করে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
প্রকৃত সমস্যাটি আসলে বর্তমান ট্রেডিং সিস্টেমের বিভিন্ন ত্রুটির। কার্যত আমরা তখনই এটা বলতে পারি এবং একমাত্র তখনই তা দৃশ্যমান যে বাণিজ্য আসলে উদার। তাহলে আমাদের শুধু শুল্ককে বিচার করতে হবে, কিন্তু ‘বিহাইন্ড দ্য বর্ডার’কে আমাদের অবজ্ঞা করতে হবে, যা সহজে অনুমেয় নয়। এর মধ্যে আছে নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতা, যা দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগে বড় বাধা স্থানীয় শিল্পে ভর্তুকি ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া, যা ট্রেড ইন সার্ভিসে বাধা তৈরি করে; প্রাইভেসি, যা ই-কমার্সকে বিকশিত হতে দেয় না; বৈদেশিক মালিকানায় নিষেধাজ্ঞা, যা বৈদেশিক বিনিয়োগে বাধা দেয় প্রভৃতি যৌথ মালিকানা নীতিতে মেধাসম্পদ রক্ষা করা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে আমরা যথেষ্ট সম্ভাবনা দেখি, যা অনেক সময় দেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু শুধু নীতিগত কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয়।
এ বিষয়গুলো আসলে সমাধান করার কথা ছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বহুপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে। বাস্তবে তারা তা পারেনি, বরং তারা অ্যাডহক পদ্ধতিতে কাজ করেছে। তা আদতে অনেক ধীরগতির ও ব্যুরোক্রেটিক, যার মাধ্যমে সমস্যার মূলে পৌঁছা সম্ভব হয়নি।
মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে আমরা এ বাণিজ্যনীতির প্রভাব দেখতে পারব। সেক্ষেত্রে এ শুল্কযুদ্ধের খুব সামান্য প্রভাব আমরা দেখতে পারব মার্কিনিদের মধ্যে, যা চীনে একটু বেশি ফেলবে। পুরোদমে যখন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হবে, অর্থাৎ ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে সব চীনা পণ্যে, মার্কিন মুলুকে যার প্রভাব সামান্য এবং চীনে সেটা একটু বেশি হবে, কিন্তু তা ভয়াবহ হবে না কখনই।
তবে বড় ধাক্কাটা আমরা বুঝব, যখন বিনিয়োগ কমতে থাকবে এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। ফলে বিনিয়োগ পরিবেশে একটা পরিস্থিতি তৈরি হবে, যা খুবই সংবেদনশীল এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন। একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। গবেষণা বলছে, একটা স্থানীয় দলের জয় বা হারের ওপর নির্ভর করতে পারে বিনিয়োগ। সেখানে এখনকার অবস্থার কথা ভাবা যাক, যেখানে কী পরিমাণ অনিশ্চয়তা তৈরি হবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে, যা বলা বাহুল্য। অথচ এ প্রক্রিয়া বিনিয়োগবান্ধব হতে পারত অনেক বেশি।
উপরন্তু এ যুদ্ধে আসলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ছোট ছোট অর্থনীতি, কিন্তু বড় অর্তনীতি, যেমন— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীনের কিছুই হবে না। এই ছোট অর্থনীতির দেশগুলো দারিদ্র্য নিরসনের একমাত্র পথ হিসেবে এ বাণিজ্যনীতিকেই প্রাধান্য দেয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মেমো অনুযায়ী তারা স্থানীয় বাজারে লবি করছে, সমুদ্র বাণিজ্যে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছে এবং অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করছে। বহুপক্ষীয় বাণিজ্য কি তাহলে ধ্বংস হবে, রক্ষণশীল স্বার্থ কি তাদের জন্য কিছু সুবিধা দেবে?
বর্তমান পরিস্থিতির একটা আশাব্যাঞ্জক দিক হতে পারে, তা অনেক দেশকে আলোচনার টেবিলে একত্র করবে এবং তা অবশ্যই আরো শক্তিশালী বহুপক্ষীয় বাণিজ্যনীতি গঠনে সাহায্য করবে। এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে ঢেলে সাজাবে, যা উদার বাণিজ্যনীতি গঠন করবে সেবা খাত ও ই-কমার্স খাতকে আরো শক্তিশালী করতে, মেধাসম্পদ রক্ষায় আইন থাকবে সুস্পষ্ট, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের জন্য একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকবে।
আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি ১৯৮০ সালের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে। তত্কালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বাণিজ্যযুদ্ধে জয়ী হয়েছিল আসলে উভয় পক্ষই এবং আদতে পুরো বিশ্ব। তারা আজকে মুক্ত বাণিজ্যের তিন দশকে এসেও তাদের দাপট বজায় রেখেছে। সেক্ষেত্রে বলা যেতেই পারে, আমাদের সামনে এমন এক শক্তিশালী বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে সন্দেহ নেই।
অথবা না। যারা এখনো এ বিষয়ে সন্দিহান, তাদের জন্য বোধকরি একটা উদ্বেগজনক বছর আসতে যাচ্ছে। তাদের সারা বছর দাঁত দিয়ে নখ কেটেই সময় চলে যাবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
লেখক: বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ
ইয়েল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক
ভাষান্তর: মুহাম্মাদ হাসান রাহিফ






