২০১৮ সালজুড়েই বর্তমান সময়ের সঙ্গে ১৯৩০-এর দশকের সাদৃশ্যের তুলনা আশঙ্কাজনকভাবে সর্বত্র আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাডেলিন অলব্রাইটের ‘ফ্যাসিজম: আ ওয়ার্নিং’ এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ টিমথি স্লাইডারের ‘অন টাইরানি’র মতো উৎসাহব্যঞ্জক বইগুলোর প্রকাশ বা বিস্তার বাড়ছে। নিশ্চিতভাবে উল্লিখিত বইগুলোয় বর্ণবাদ, সহিংসতা ও স্বৈরাচারী কৌশলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের গন্ধ বিরাজমান।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন ইহুদিবিরোধী প্রতিবাদ রাস্তায় প্রকাশ্যে করা হচ্ছে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, হিলারি ক্লিনটন ও বড় বিনিয়োগকারী জর্জ সরোসকে লক্ষ্য করে পাইপ বোমা হামলা চালানো হয়েছে। উপরন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্ররোচনায় অন্য আটজন বিখ্যাত ব্যক্তিকে হামলার জন্য বেছে নেয়া হয়েছে। এদিকে জার্মানিতে দেশটির অন্যতম রাজনৈতিক দল অলটারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড (এএফডি) মনে করে, দুই বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের ওয়েরমাখতের ( নািস জার্মানির একীভূত প্রতিরক্ষা বাহিনী) সার্ভিসের জন্য গর্বিত হওয়া উচিত। যুক্তরাজ্যে দক্ষিণপন্থী কট্টর রাজনৈতিক কর্মী স্টিফেন ইয়াক্সলে-লেনন (টমি রবিনসন নামে সমধিক পরিচিত) নিজেকে একজন ‘ইংলিশ’ মার্টায়ার হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি স্বনামধন্য এক সাপ্তাহিক সানডে নিউজপেপার টরি ব্রেক্সিটিয়ারদের সাক্ষাত্কার ছাপিয়েছে। তারা সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ‘কিলিং জোনে’ প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ এনেছে। কাজেই ব্যক্তি ধরে ধরে আঘাত-পাল্টা আঘাতের তালিকা নির্ণয়ের কাজ চলছে।

বিদ্রোহী লোকরঞ্জনবাদীরা কেবল সামনে এগোচ্ছে না; তারা ২০১৯ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত ইইউ পালার্মেন্টারি নির্বাচনে জয়ী হতে প্যান-ইউরোপিয়ান আন্দোলন সংঘটিতও করছে। এ প্রচেষ্টায় হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ও ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনির মতো নেতারাও রয়েছেন। একইভাবে ‘দ্য মুভমেন্ট’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে। যদিও এর প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক আমেরিকান আন্দোলনকারী স্টিভ ব্যানন। তবে এ সংগঠন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বেলজিয়ান রাজনীতিক মিশেল মদ্রিকাম্যান।

জাতীয়তাবাদী ও নব্য ফ্যাসিবাদী সার্কেলগুলোয় মিশ্র গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ফ্রান্সের দক্ষিণপন্থী জনরঞ্জনবাদী রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল র্যালির (আগে নাম ছিল ন্যাশনাল ফ্রন্ট) রাজনৈতিক সংগঠক জেরোম রিভিয়ের অভিযোগ করেছেন, একজন আমেরিকান হিসেবে ইউরোপিয়ান রাজনৈতিক দলে ব্যাননের কোনো স্থান নেই। অন্যরা বিশেষ করে ফ্লেমিশ জাতীয়তাবাদী ফ্লামস বেলাং সংশয় পোষণ করে বলেছেন, ব্যানন কেবল তার বন্ধুদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষ হয়ে ব্যাননের ‘ভাগ করো ও ইউরোপ শাসন করো’ প্রচেষ্টা ভালোভাবে কাজ করবে না, সেটি ইতিহাস পূর্বাভাস দেয় না। ইউরোপের ফ্যাসিবাদী আন্দোলন সমন্বয়ে কমিতাতি ডি’অ্যাজোওনে পার লে’ইউনিভার্সেলিটা ডি রোমা (সিএইউআর) ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মাত্র দুই বছরের মাথায় সংগঠনটি ভেঙে যায়। সিএইউআরের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল নািস ও ইতালির ফ্যাসিবাদীরা সংগঠনটি বয়কট করার মধ্য দিয়ে, যেটি তারা নিজেরাই সৃষ্টি করেছিল। বিশ্বের প্রধান ফ্যাসিস্ট হিসেবে একবার যখন মুসোলিনিকে ছাড়িয়ে গেছে, তখন ওই সংগঠনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন হিটলার। তার পরিবর্তে তিনি বরং নিজ সমর্থক ও অধস্তন শাসনকর্তা তৈরিতে মনোযোগী হয়েছিলেন। উপরন্তু তিনি হাঙ্গেরির অ্যাডমিরাল মিকলস হর্থি ও ফ্রান্সের মার্শাল ফিলিপ পেতার মতো পুরনো অভিজাতের সঙ্গে সখ্য বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।

আজকে ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদী বিক্ষোভ-বিদ্রোহ বিশ শতকের কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার তুলনায় বেশি উন্মাদনা ও অযথাযথ রাজনৈতিক ভাষ্যের বিস্তার ঘটাচ্ছে এবং অবশ্য অতীতে ‘কসমোপলিটিয়ানিজমের’ মতো ‘গ্লোবালিজম’ শব্দবন্ধটি অনেক জাতিগোষ্ঠী, বিশেষ করে ইহুদিদের জন্য নিত্য জপমালায় পরিণত হয়েছে।

আজকের ইউরোপ কেবল চারটি সাম্রাজ্য ধ্বংসকারী একটি বিপর্যয়কর বিশ্বযুদ্ধ থেকে আবির্ভূত হয়নি; উপরন্তু আজকের রাজনীতি যুদ্ধ শেষের সৈনিক ও ছাত্রদের সমন্বয়ে গঠিত আধা সামরিক সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বর্তমানে মুখোমুখি হওয়া বড় বিপদ ফ্যাসিবাদের প্রত্যক্ষ পুনরুত্থান নয়; বরং গতানুগতিক রক্ষণশীলতায় ধাবমান উগ্র জাতীয়তাবাদী বা লোকরঞ্জনবাদী দক্ষিণ পন্থার দিকে রাজনীতির বাঁকবদল। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে ফ্যাসিবাদের হুমকির চেয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে রক্ষণশীলতা বিস্তারের বিষয়ে আমাদের বেশি দৃষ্টি দেয়া দরকার। মূলত ওই সময়ে গতানুগতিক রক্ষণশীল দক্ষিণ পন্থা কর্তৃত্বপরায়ণ ও করপোরেট দ্বারা সংক্রমিত হয়, বাম পন্থা ঘৃণার শিকার হয় এবং বার্লিন, মাদ্রিদ ও ভিয়েনার মতো কসপোলিটান মেট্রোপলিসগুলো গড়ে ওঠে। ওই সময়ে কৃষি প্রাদেশিকতাবাদের সবুজ সমারোহে উল্লিখিত শহরগুলো ছিল আধুনিকতার রেড স্পট।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এক দশক আগে এরই মধ্যে ড্রেফিউজ অ্যাফেয়ার ব্যাপকতর ঘৃণার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেটি ৩০ বছরের পরও মবিলাইজ হবে। ফ্যাসিবাদের আবির্ভাবকালে বলশেভিজমেরও উত্থান ঘটেছিল। এটি ফ্যাসিস্টদের গ্রহণ না করা বা পছন্দ না করার জন্য গতানুগতিক বা ঐতিহ্য অনুগামী রক্ষণশীলদের জন্য যথেষ্ট কারণ ছিল। যদিও তাদের মধ্যেও (ফ্যাসিস্ট) বলশেভিকদের ব্যাপারে নাক সিটকানো ভাব ছিল। আজকে এ ধরনের মৈত্রী কেমন হতে পারে, সেটি বুঝতে হলে হাউজ অব লর্ডসে আমাদের ইউকে ইনডিপেনডেন্স পার্টির লর্ড পিয়ারসন কর্তৃক সম্প্রতি ইয়াক্সলে লেননকে লাঞ্চ করানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

রক্ষণশীলতাবাদ ও ফ্যাসিবাদ আন্তঃপরিবর্তনশীল ধারণা। ১৯৩৪ সালে পর্তুগিজ একনায়ক অ্যান্তোনিও সালাসার যখন ন্যাশনাল সিন্ডিকালিস্ট সংগঠন নিষিদ্ধ করেছিলেন, তখন তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বা প্রভেদ উল্লেখ করেছিলেন। বিশেষ করে ওই সংগঠনের বিরুদ্ধে তিনি তরুণদের উচ্চাভিলাষ, তথাকথিত ডাইরেক্ট অ্যাকশনের মাধ্যমে শক্তি পূজার প্রাধান্য, সামাজিক জীবনের ওপর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার শ্রেষ্ঠতা নীতি এবং একজন একক নেতার পেছনে বিপুল মানুষ সমাবেশের প্রবণতা সম্পর্কিত অভিযোগ এনেছিলেন। সর্বোপরি ধ্রুপদী রক্ষণশীলরা রাস্তায় গণআন্দোলন নয়, গণবিচ্ছিন্নতা ও কর্তৃপক্ষ ঐতিহ্যের বশ্যতার পক্ষপাতী। রক্ষণশীলদের ওপর বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টি রাখা মহান চিন্তাবিদ এরিক ফোগেলিন কি সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে নতুন করে জন্ম নিয়েছেন? রক্ষণশীলদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সেটি দেখা যাচ্ছে। তারা এখন ‘মবোক্রেসি’কে স্বাগত জানাচ্ছে, যেমনটা আন্তঃযুদ্ধকালীন জার্মান অভিজাতদের ক্ষেত্রে তিনি করেছিলেন। বিশেষভাবে তিনি এএফডির বিয়াট্রিক্স ফন স্টর্চ, টরি ব্রেক্সিটিয়ার জ্যাকব-রিস মগ ও উচ্চ অভিজাতশ্রেণীর অন্য সদস্য কর্তৃক চরমভাবে ঘৃণিত হবেন, যারা সাধারণ মানুষের জন্য নিজেদের জননায়ক হিসেবে দাবি করেন। একইভাবে ফোগেলিনের সমসাময়িক কার্ল ক্রাউসও দক্ষিণপন্থী সংবাদমাধ্যম কর্তৃক অনেক বেশি ভাষিক হেনস্তার শিকার হয়েছে, যেসব সংবাদমাধ্যম এখন সিভিল সার্ভেন্ট ও বিচারকদের মানুষের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করে। উল্লিখিত প্রবণতাগুলো লোকরঞ্জনবাদী দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক অনাচারেরই প্রকাশ।

উদারবাদী গণতন্ত্র আজ অস্তিত্বের হুমকিতে। যদি রাজনৈতিক পেন্ডুলাম ‘পরিচয়ের’ দিকে দোলে আসে, শিগগিরই এটি ‘অর্থনীতির’ দিকে ফিরে আসবে, যেহেতু আমরা এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পূর্ণ প্রভাবের সূচনা অনুভব করছি। ভবিষ্যতের কাজ ও মজুরি সম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্নগুলো এখন সামনে আসছে। অধিকন্তু প্রাদেশিক বিষয়ে অজ্ঞ স্বনিয়োজিত উচ্চশ্রেণীর অধীনে কাজ করতে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী ক্রমেই বিরক্ত। সেটি কাজে লাগিয়ে শেষোক্ত শ্রেণীকে যে কেউ সহজেই সমবেত করতে পারে। গত অক্টোবের অনুষ্ঠিত ইইউপন্থী ব্যাপকতর গণবিক্ষোভ ও জার্মানিতে গ্রিনসদের সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যগুলো এরই ইঙ্গিত দেয়।

উদারবাদীদের জন্য ফ্যাসিবাদ ও অত্যাচার-নির্যাতন সম্পর্কে স্নায়ুবিক উত্তেজনা পরিহার এবং আমাদের রাজনীতি দখলকারী প্রতারক ও কথাজীবীদের মুখোশ উন্মোচনের এখনই সময়। সুতরাং আমাদের নিত্যকার আলাপ হওয়া উচিত আধুনিক রক্ষণশীলতাবাদের পুরোপুরি ধ্বংস, সামাজিক গণতন্ত্রের সংকট, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রত্যুষকাল ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্পর্কে। এমনটি হলে রক্ষণশীলতা ও কর্তৃত্ববাদ রুখে বিশ্বে একটি উদারবাদী ও মানবিক পরিবেশ বিনির্মাণ কঠিন হবে না।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

লেখক: ইতিহাসবিদ ও ব্রিটিশ গ্রন্থকার

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির