হাজার বছর ধরে আবহমান পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যগতভাবে বিকশিত ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাহাড়ি জাতিসত্তার ধর্মীয় ও সংস্কৃতি অঙ্গনের মহান উৎসব মারমাদের ‘সাংগ্রাইং’। সাধারণত বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রতি চৈত্র মাসের শেষক্ষণ ও বৈশাখ মাসের সূচনা তিথিতে এ উৎসবের আরোহণ। পুরনো বর্ষকে বিদায় ও নববর্ষকে উৎসব উদ্যাপনের মাধ্যমে বরণ করে নেয়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মারমাদের এ রীতি-নীতি-কৃষ্টি নেহাত শুধু আনন্দ-স্ফূর্তির জন্য আবেগের তাড়নায় প্রতিপালিত নয়; এটি আজ বহুমাত্রিকতায় পারস্পরিক মিল-মিলন-সহাবস্থানের একই যোগসূত্রে গাঁথা সার্বজনীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার উৎসবের আঙিনায় প্রতিপালিত হচ্ছে। এ উৎসবের বিকাশ ও বিস্তৃতির রহস্য হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মারমাদের সমবেত কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। বর্তমানকালে এটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনজাতির সম্প্রীতি-প্রশস্তি সম্প্রসারণ, মন-মানসিকতা-চেতনা উন্মেষের উর্বর ক্ষেত্রও বটে।

কালের বিবর্তনে হয়তোবা এ উৎসব প্রতিপালনের আঙ্গিকরূপ এখন পরিবর্তিত-বিবর্তিত। এটি এখন এগোচ্ছে বস্তুগত দ্বান্দ্বিক সংস্কৃতায়নে। আগামী প্রজন্মের কাছে একবিংশ শতাব্দীর সূচনায় এ উৎসবের মৌলিকত্ব কোনদিকে প্রবাহিত হবে, কোন মানদণ্ডে অনুরণিত হবে, একে অন্যের প্রীতি-সম্প্রীতি বজায় রাখা যাবে তো? না অপসংস্কৃতির ভিড়ে তলিয়ে যাবে প্রান্তিক সীমানায়? এসব অজস্র প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলছে চিন্তাশীল সমাজ ও সংস্কৃতি কর্মী, সৃজনশীল সাহিত্যসেবী সবাইকে। এ সাংস্কৃতিক মহামিলনের কাছে একবিংশ শতাব্দীর প্রত্যাশিত প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত—প্রত্যেকের নিজস্ব লোকসংস্কৃতির চর্চা থাকবে সার্বজনীন অংশীদার, যেটি বিশ্বজনীন মানবাধিকারের মূলনীতিসমূহের সঙ্গেও সমানভাবে প্রযোজ্য, অবিচ্ছেদ্য ও একীভূত।

লোকজ উৎসবের প্রতিরূপ এ উৎসব

প্রয়োজনের তাগিদ ছাড়াও মানুষের প্রাত্যহিক জীবন মাঝে মাঝে ব্যক্তিবৃত্তের বাইরে আবেগের আঙিনায় এসে দাঁড়ায়। এদিনটিই তার আনন্দ, এদিনেই তার উৎসব। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মারমা জনসমাজে প্রচলিত ও প্রতিপালিত নানা শাস্ত্রীয় সামাজিক-লৌকিক-পারিবারিক শত উৎসবের উৎসও কিন্তু এ লোক-উৎসব। এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা খোলা আকাশের নিচে, নদীর তীরে, পাহাড়ের পাদদেশে, বৃক্ষের নিচে, কখনো পাড়াগাঁয়ে, গ্রাম হতে গ্রামান্তরে ঘুরে ফিরে প্রদক্ষিণ করে, কখনোবা নাচে-গানে নিষ্ঠায় প্রার্থনার উৎসব পালন করে চলেছে প্রতিবছর, প্রতিনিয়ত।

এ উৎসবের উত্তরণ-উত্পত্তি ও উেসর পেছনে কিংবদন্তির এক পৌরাণিক কাহিনী feedback (প্রতিক্রিয়া) হিসেবে স্থানীয় মারমা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বয়োবৃদ্ধদের মুখে মুখে শোনা যায়। কাহিনীটির বর্ণনা এরূপ: পুরাকালে মর্ত্যলোকে কথিত শিবদেব আর পার্বতীর মাঝে মনোমালিন্য হলে পার্বতীর দেহরক্ষী গণেশের মুণ্ডু কেটে ফেলে শিবদেব। ফলে পার্বতী নিজেই কালীমূর্তির রূপধারণ করে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। এতে স্বর্গের দেবতারা শঙ্কিত হয়ে স্বর্গের রাজা ইন্দ্ররাজের সহায়তায় এক হাতির মাথা কেটে গণেশের গায়ে স্থাপন করে তাকে জীবিত করে তোলে। আর গণেশের আগের মুণ্ডু স্বর্গে নিয়ে গিয়ে সাতজন অপরূপা সুন্দরী দেবীর কোলে তুলে রাখা হয়। এই সাত দেবী পালাক্রমে এক কোল থেকে অন্য কোলে তুলে পাল্টানোর সময় গণেশের মুণ্ডু থেকে প্রচুর পরিমাণ পচা-গলা রক্তক্ষরণ হয়ে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে এসে পড়ে। ফলে আমাদের এ মাটির পৃথিবী অপবিত্র হয়। তাই প্রতি বছর বর্ষশেষ ও শুরুর মুহূর্তে স্বর্গের রাজা ইন্দ্ররাজ সদলবলে দেবদেবীদের নিয়ে মাটির পৃথিবীতে এসে মানবমানবীদের সঙ্গে মিলেমিশে ধোয়া-মোছা-সেবা-শুশ্রূষা-পরিচর্যার কাজে সহযোগিতা করে থাকে। এই দিনক্ষণে যেমন সবাই পরিশুদ্ধ-পবিত্র হয় ঠিক তেমনি স্বর্গলোকবাসী দেবদেবী এবং মর্ত্যবাসী মানবমানবীদের মধ্যেও মিলন ঘটে। তিন বা চার দিনব্যাপী বর্ষবরণ উৎসব শেষে ইন্দ্ররাজ সদলবলে মর্ত্য থেকে স্বর্গে ফিরে যান। অতএব, স্বর্গ থেকে মহাসমারোহে সদলবলে দেবদেবীদের মর্ত্যে আগমন এ আনন্দঘন মুহূর্তই হলো সার্বজনীন লোকজ উৎসবের প্রতিরূপ মারমাদের সাংগ্রাইং। আর এ উৎসব উদ্যাপনের মাধ্যমে মানবমানবীদের মধ্যে আসে পরিশুদ্ধতা, মহামিলন, শান্তি-সম্প্রীতি, প্রশস্তি ও ইচ্ছাপূরণের প্রায়োগিক আয়োজন।

সাধারণত উৎসবের এসব দিবসে একে অন্যের প্রতি বিগত দিনের ঘৃণা-মনোমালিন্যকে প্রাধান্য দেয়া হয় না। সমাজের সকল স্তরের লোকজনের মাঝে আসে একপ্রকার সমতার আবেদন। এটি বয়স্ক, জরাবৃদ্ধদের কাছে পরকালের চিন্তাভাবনাকে সম্প্রসারণ, আধ্যাত্মিক কর্ম-ধ্যান-ভাবনা-শীলে অধিস্থিত হয়ে মগ্ন থাকার দিবস; যুবক-যুবতীদের কাছে আনন্দের এবং প্রাণ খুলে কিছু বলা কিছু কুশল কর্মে মুখরিত থাকার দিবস; ছোট ছোট ছেলেমেয়ের কাছে স্বাধীনভাবে ঘুরাফেরা, খাওয়া-দাওয়া-সাজা-পরার কাজে ব্যতিব্যস্ততার দিবস। এসব মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ভালোবাসা, সমতা আর নতুন করে উজ্জীবিত হওয়ার ব্যঞ্জনাই এ উৎসবের দর্শন ও আদর্শ।

পরিবর্তন-বিবর্তনের যুগে টিকে যাওয়া এসব উৎসবের স্থিতিশীলতার পেছনে রয়েছে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ, সামাজিক চিন্তা-চেতনা-ধ্যানধারণা, আদর্শ জীবনযাপনের দর্শন, যা বিবর্তিত কালকে অতিক্রম করে বর্তমানকালে এসেও সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। আনন্দের খোরাক জোগাতে পেরেছে আচার-অনুষ্ঠান-উৎসবে। যদিওবা এসব দ্বারা মুখে মুখে শুনে কিংবা কালক্রমে পূর্বপুরুষদের আচার-আচরণ দেখে উত্তরাধিকার সূত্রেই চলে এসেছে। তবু এসব সাধারণ লোকের বিশ্বাসে-কর্মপ্রবাহে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

সম্প্রীতির ব্যঞ্জনায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অনুরণিত এ উৎসব

এর আগে এ প্রবন্ধের ভূমিকায় বলা হয়েছে—এ উৎসব পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মারমাদের বার্ষিক সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ও সার্বজনীন প্রতিপালিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ঐতিহ্যবাহী এক লোকজ উৎসব। এ উৎসবের মূলে রয়েছে তাদের মহান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাহাড়-পর্বত, নদী-ঝরনা, বন-জঙ্গল, জুমক্ষেত-খামার, অপ্রতিরোধ্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে ঘিরে। এ উৎসবের পর্বগুলো কেবল তাদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিচয় বহন করে না, তাদের পূর্বপুরুষদের নৃতাত্ত্বিক-সমাজতাত্ত্বিক পরিচয়সহ এ উপমহাদেশের সুপ্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসও বহন করে। তিন বা চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এ উৎসবের মধ্য দিয়ে অরণ্যবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মারমা সমাজে প্রচলিত সামাজিক আচার-আচরণ, ঐতিহ্যের রীতি-নীতি-কৃষ্টি, প্রথা-বিশ্বাস, ধ্যানধারণা-অনুশাসনের আঙ্গিক রূপরেখার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এ উৎসবকে ঘিরে মারমা সমাজ তাদের হারিয়ে যাওয়া পুরনো ইতিহাস-ঐতিহ্য-কীর্তি-কর্মকে খুঁজে ফেরে। এ উৎসবই নতুন চিন্তা-চেতনা নিয়ে মারমাদের সাংস্কৃতিক গৌরবকে আবারো নতুন করে গড়ে তোলার, সংরক্ষণ-সম্প্রসারণ-প্রতিপালন করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, উৎসাহ ও উদ্দীপনার জোগান দেয়।

নববর্ষ উৎসবকে উপলক্ষ করে মারমা বর্ষপঞ্জি ঘোষণাপত্র ‘সাংগ্রাইংজা’-এর মাধ্যমে নববর্ষের জলবায়ু-আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্ঘটনা, মহামারী, অর্থসম্পদ, কৃষি কর্মক্ষেত্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের পূর্বাভাস সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশ করা হয়। সতর্কতা অবলম্বন, নৈতিক চরিত্র সংশোধন, ব্যাধি-মহামারী-দুর্যোগ-দুর্ঘটনা হতে মুক্ত হওয়ার জন্য সমবেতভাবে প্রার্থনা করা হয়ে থাকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বৌদ্ধবিহার কেয়াং-এ। জলে-স্থলে-গগনে সন্তুষ্ট করা হয় বিভিন্ন অপশক্তি-আধ্যাত্মিক শক্তিকে পূজাপার্বণ করে। পাড়া-গ্রামে ‘রোয়াজা’-‘ফাইনিস’-‘কার্বারি’ পদবিধারী গ্রামীণ মোড়লরা কর্তৃক নির্ধারণ করা হয় কোথায় কখন হবে গ্রামে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভিযান, পূজা-পার্বণে যোগদানের আহ্বান, পঞ্চশীল-অষ্টশীল-উপোসথ গ্রহণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সমবেত মঙ্গল প্রার্থনা ও কুশল কর্মাদি সম্পাদন।

এ উৎসবকে উপলক্ষ করে দিবস কয়েক অবিরাম বেড়ে যায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিহারে আসা-যাওয়ার চাঞ্চল্য, পূজা-পার্বণের ব্যতিব্যস্ততা, বয়স্ক বৃদ্ধ-জরা অক্ষম ব্যক্তিদের সেবা-শুশ্রূষা ও পরিচর্যা, পরম পূজনীয় জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের ধুম। বয়স্ক আত্মীয়-স্বজন-আপনজনদের পরিচয় করিয়ে দেয় নবপ্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কিছু উপঢৌকন ও উপহারসামগ্রী দানের মাধ্যমে।

উৎসবমুখর দিনগুলোতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মারমাদের লোকজ গীত ‘সাইংগ্যাইক্’, ‘লুংদি’, ‘হাইংছোওয়া’ ইত্যাদি ‘বুং’-‘পাইট’-‘হ্নে’-‘পাইতালা’ বাদ্য বাজিয়ে সমাজকে সংশোধন, সংরক্ষণ ও সত্কর্মের জন্য উদ্বেলিত করার আহ্বান জানানো হয় যুবসমাজের মাঝে। সমাজের বিত্তবান সম্পদশালীরাও মানুষের হিতার্থে ও সুখের প্রত্যাশায় দানকর্ম-মহত্কর্ম সম্পাদনে উদ্যোগী হন। আবার অনেককে দেখা যায় পুকুর খনন, জলাধার ‘রিফুংজাং’ নির্মাণ, পান্থশালা-আশ্রয়স্থান ‘চেরাইক’ নির্মাণ, ফেরিঘাট-খেয়া পারাপারের ব্যবস্থা করে জনসাধারণের সেবা-শুশ্রূষা-পরিচর্যা করতে।

গ্রামের লোকেরাও এ উৎসব-অনুষ্ঠানের আগমনীবার্তার সঙ্গে সঙ্গে সমবেত হয়ে একত্রে রাস্তাঘাট সংস্কার, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান বিহার-পালিটোল, শ্মশানঘাট, ‘জেদি’-স্মৃতিস্তম্ভ, ‘সিঙ’-‘দেম্মারুং’ ইত্যাদি পরিচর্যা-সংস্কার কাজে লেগে যায়। গৃহকর্ত্রী মহিলাদের কাজে ধুম পড়ে যায় নিজ নিজ ঘরের আসবাবপত্র-বসতবাড়ি-পারিবারিক আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও একে অন্যের মাথার চুল ধুয়েমুছে দেয়ার। গ্রামে গ্রামে ‘জাইত’-‘পাংখুং’ ইত্যাদির পালাগান-গীতিনাট্যের আসর বসে কয়েক রাত অবধি। সূচনা ঘটে যুবক বনাম যুবতী, গৃহী-গৃহিণী বনাম কুমার-কুমারীদের মধ্যে হরেক খেলাধুলার প্রতিযোগিতা। যেমন নৌকাবাইচ, কুস্তি খেলা, গগনচুম্বী বাঁশে ওঠা, পাড়াগাঁয়ে চাঁদের আলোতে ‘তাছিদাইং’-‘গদুচেদাইং’-‘ক্যুংমুই কাদাইং’-‘দোহ্ কাজাদাইং’-ঘিলা খেলা ইত্যাদি। লোকজ খেলাধুলার আসরে মেতে ওঠে কিশোর-কিশোরীরাও। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে যুবক-যুবতীদের সমাগমে একে অন্যের গায়ে জল ছিটিয়ে আত্মিক বন্ধন রচনা করে মারমাদের ‘মৈত্তা রিলং পোয়েঃ’ মৈত্রী পানি বর্ষণ অনুষ্ঠানে। সারা রাত ধরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দল বেঁধে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায় ‘মুংথং পোয়েঃ’-তে। বিশেষ করে এ উৎসবের দিনে প্রতিটি পরিবারে বর্ণময় সুস্বাদু খাবার রান্না, পিঠে-পায়েস, ‘এরেখ্যোমুং’, নানা প্রজাতির বিন্নিধানের চাল, কাঁকন-ফলমূল দিয়ে রান্নাবান্নার ‘ছোয়াইং’ অতিথি ও পাড়া-প্রতিবেশী বয়স্ক ও ধর্মগুরু পুরোহিত-শ্রমণ-উপাসক-উপাসিকাদের আপ্যায়ন করে থাকে। কিশোর-কিশোরীরা আনন্দ-উল্লাসে বাজি ফুটানো, পানি ছিটানো, পাড়াগাঁয়ে সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে পূজার ফুল কুড়ানোর আনন্দে দিশেহারা হয়ে পড়ে। পাড়াগাঁয়ে তরুণ-তরুণীরা উৎসব শেষে একত্রে দল বেঁধে সেজেগুজে আতশবাজি ফুটাতে ফুটাতে রঙবেরঙের বিজয় পতাকা ‘তাংখোয়াইদাইং’, কল্পতরু, ‘তারাবৈ’ হাতে বাদ্যযন্ত্র সহকারে পাড়াগাঁয়ে শোভাযাত্রা করে বিহারে যায়, সমবেত প্রার্থনা করে, প্রদীপ জ্বালিয়ে আগামী দিনের সুখ-শান্তি-উন্নতি-সাফল্যের প্রত্যাশায় সম্পাদন করে কুশল কর্মাদি। এ উৎসবের দিনে কখনো কখনো মুক্তির প্রতীক হিসেবে প্রাণিকুলকে মুক্ত চারণক্ষেত্রে ছেড়ে দেয়ার রেওয়াজও রয়েছে। এর সফল সার্থক প্রয়োগ দেখা যায় প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থেকে কিংবা বাজার থেকে বিভিন্ন প্রাণী-পশু-পাখি কিনে মুক্ত চারণক্ষেত্রে ছেড়ে দেয়ার রীতিনীতি পরিপালনে।

একটা বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে সাদরে সম্ভাষণ জানানো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী-পাহাড়িদের এ সম্মিলিত ঐতিহ্যমুখী লোকজ-উৎসবের তাত্পর্য যেমন অর্থবহ তেমনি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্রমবিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের সামাজিক কাঠামো, ধ্যানধারণা-চিন্তা-চেতনা জীবনযাপনের ক্ষেত্রে স্বকীয় স্বাধীন চেতনাবোধ গড়ে উঠেছে এ উৎসব পরিপালনের মধ্য দিয়ে। এ উৎসব শান্তি-শৃঙ্খলা-সহনশীলতা-সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার এক অপূর্ব সাম্য-স্থিতিশীল পরিবেশ সৃজন করে রেখেছে পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাহাড়ি অধ্যুষিত জনপদে।

একবিংশ শতাব্দীর প্রত্যাশায় প্রতিপাদ্য এ উৎসব

মানুষের সমাজ, মূল্যবোধ, পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা পরিবর্তনশীল। এ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন উৎসবের আচার-আচরণ, আনুষ্ঠানিকতাও পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত হচ্ছে। তবে এটি অবশ্যই অনুসরণীয় যে, কোনো লোকজ উৎসবের মৌলিক চিন্তা-চেতনা মূল ভাবাবেগের আদর্শ-রীতি-নীতি-কৃষ্টি-কলাকৌশল যেন কোনোভাবেই পরিবর্তন না ঘটে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাহাড়িদের এ উৎসবের মূল আবেদন হলো—এ মাটির মানুষের মহাধমনিতে সমৃদ্ধির প্রেরণায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে জীবন স্পন্দনে নববর্ষের সূচনালগ্নকে বরণ করে নেয়া। যুগ-যন্ত্রণাবিদ্ধ আধুনিক সমাজের প্রচলিত অনভিপ্রেত ব্যবস্থাপনা, অতীতের অবাঞ্ছিত দুর্নীতি, তোষণ-শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট বিভ্রান্ত সমাজ ব্যবস্থাকে কালিমামুক্ত করে নতুন এক প্রগতিশীল সমাজ জীবনযাপনের প্রত্যয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগান দেয়া। অতীতের সব দুঃখ-যন্ত্রণা, হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনা, হিংসা-ক্ষোভ, দ্বেষ-শত্রুতা, অভাব-অভিযোগ, উঁচু-নিচু শ্রেণীবৈষম্যের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মনের পবিত্রতায় আত্মশুদ্ধির সঙ্গে সামাজিক ভাঙন রোধ এবং পরস্পরের মৈত্রী-সম্প্রীতি-ঐক্য বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার চেতনায় জাগরিত করা। যাতে এটি চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে একটা উন্নতমানের জাতিসত্তা গঠনে ও বিকাশে new dimenssion (নতুন মাত্রা) নতুন গতি পায়।

যেকোনো জাতিসত্তার নিজস্ব লোকজ উৎসবই আদি, অকৃত্রিম ও সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের পরিচায়ক। এটি সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধাপগুলো স্মৃতিতে স্মরণ করিয়ে দেয়, কোনো এক বিশেষ সময়ে বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষের চিন্তা-চেতনা প্রবাহে ধ্যানধারণায় বশীভূত হয়ে এর উত্পত্তি হলেও পরিবর্তিত সময়ে অন্য কোনো mainstream মূল স্রোতধারার জাতিগোষ্ঠীর কাজে অপ্রয়োজনীয়, অযোগ্য, অপসংস্কৃতি ও কুসংস্কার মনে হতে পারে। কিন্তু মূল স্রোতধারার জাতিগোষ্ঠী একে অবশ্যই মর্যাদা দেবে এটি সবার প্রত্যাশা। শেকড় যদি সতেজ, সবল ও সুস্থ না থাকে তা হলে মহীরুহে পরিণত হতে পারে না। তাই এসব লুপ্তপ্রায় লোকজ উপাদান-উপকরণগুলোকে সার্বজনীনভাবে আরো চর্চা, পরিপালন ও অনুশীলনের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা। মূল স্রোতধারার জাতিগোষ্ঠী যেন এসবে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তার হাত সম্প্রসারিত করতে পারে। এ কৃষ্টি অতি প্রাচীনকালে সৃষ্ট ও অরণ্যচারী পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মারমা জাতিগোষ্ঠীদের দ্বারা লালিত-পালিত-চর্চিত হয়ে বর্তমানকালেও এটি পরিণত রূপধারণ করে আছে। মাটির সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষের প্রাণের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মারমাদের লোকসংস্কৃতিতে লোক আঙ্গিকে এরূপ সম্মিলিত প্রয়াসে আরো পরিণত, আরো উন্নত রূপই হতে পারে চরম ও পরম গৌরবের নিজ নিজ মহিমায় মহিমান্বিত। এখানে আরো পরিণত, আরো উন্নত রূপ বলতে লোকপর্যায় থেকে আধুনিকায়ন নয়। যা ছিল বা আছে তাকে নিয়ম-শৃঙ্খলায় বিষয়বস্তু-কর্মকাণ্ড উপস্থাপনে এমন মাত্রায় নিয়ে আনা, যাতে লোকভাব বা আঙ্গিক ঠিক থাকবে—কোনোভাবেই নতুন বা আধুনিকায়নে নয়। যেটি প্রতিটি মানুষের মনে অতীতকে জাগ্রত করে সভ্যতার আলোকে মনকে উত্কর্ষসাধন ও বহুমাত্রিক সংস্কৃতির পরিমণ্ডলকে বিকশিত করা।

এখানে আমার অনুভবে-ভাবানুপমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাহাড়িদের এ লোক উৎসবকে আরো পরিণত, আরো উন্নত করার মানসে কিছু অনুসরণীয় কর্মপদক্ষেপ ও প্রস্তাব উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। আমি আশাবাদী আজকের কর্মশালার মাধ্যমে উপস্থিত বিজ্ঞ আলোচক-সমালোচক-সঞ্চালক, তথ্য প্রবাহকদের সহায়ক পরামর্শ, সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও বস্তুনিষ্ঠ যথোপযুক্ত বাস্তবিক দিকনির্দেশনা আগামী দিনগুলোতে এ উৎসবের গতিপ্রকৃতিকে আরো বেগবান করবে, কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী রিসোর্স পারসনমণ্ডলীর প্রতিও তথ্যসমৃদ্ধ উপদেশ-মতামত পেশ করার জন্য সাদর আহ্বান জানাচ্ছি।

আজকের দ্রুতগতির জীবনধারা এবং ভোগবাদী জীবনদর্শন লোক-উৎসব পরিপালনের ক্ষেত্রে বিবিধ বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। আধুনিক বিলাস-ব্যসনপূর্ণ জীবনের পিছু ছুটতে গিয়ে আজকের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমাজ অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ছে। আর অর্থনৈতিক সচ্ছলতার মুখ দেখতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ছে জটিল জীবনযন্ত্রণার মধ্যে। ফলে আজকের দিনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড উৎসব পরিচালনার ক্ষেত্রে যে দৈন্যদশা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা থেকে নিস্তার পেতে হলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে। একে অন্যের ভাবের আদান-প্রদান ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে মিশ্র ও সমন্বিত রূপ প্রকাশ-বিকাশ ঘটাতে হবে। সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নিয়ে একই কাতারে এসে পরমানন্দের মোহনায় সম্মিলনী ক্ষেত্র assimilation stage তৈরি করার চিন্তাভাবনা করতে হবে। প্রয়োজন একই চিন্তা-চেতনায় বহুমাত্রিক কৃষ্টি আচার-অনুষ্ঠানে পরিণত করা। এ ব্যাপারে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রণী ও পথদিশারি ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পদক্ষেপ ও গণতথ্যপ্রবাহে মিডিয়া সংস্থাগুলোকে এসব অনুষ্ঠান বিস্তৃত গুরুত্ব সহকারে পরিবেশন করতে হবে। বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া এসব ঐতিহ্যমুখী উৎসব-অনুষ্ঠানকে আজকের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ছেলেমেয়েদের সামনে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরতে হবে। সমাজের সচেতন অংশকেও এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ ও কার্যকর ভূমিকায় এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সংস্কৃতির গতিধারা চরম সংকটের মুখোমুখি হবে এবং বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হবে।

অতএব আগামী দিনের সাংগ্রাইং-বিজু-বৈসু উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য হতে পারে, ‘একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে স্বকীয় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সাংগ্রাইং-বিজু-বৈসু হোক সম্প্রীতির হাতিয়ার।’ পরিশেষে, আগামী দিনগুলোতে প্রতি বছর বর্ষবরণ উৎসবের মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমাজও সম্মিলিতভাবে এ প্রার্থনাই যেন করে—অনাগত দিনগুলো মঙ্গলময় হোক, কাজের ব্যতিব্যস্ততার মাঝে আড়ালে থাক কষ্ট-দুঃখ-গ্লানি, এদেশের মাটি সরস হোক, ফুলে-ফলে ভরে উঠুক শস্যক্ষেত, পরিমিত বৃষ্টি-জল-হাওয়া বর্ষিত হোক ও প্রবাহিত হোক এদেশের মাটিতে। এদেশে বসবাসকারী সব জনগোষ্ঠী, সকল প্রাণিকুল সম-অধিকারে বেঁচে থাকুক। সাধু - সাধু - সাধু।

 

মং ক্য শোয়ে নু নেভি: উপমহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক