যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর
সংস্থা সিআইএ
(সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স
এজেন্সি) ১৯৬৯-৭৭
সালের বেশকিছু
গোপন নথিপত্র
উন্মুক্ত করেছে।
এসব নথির
মধ্যে সে
সময় সিআইএর
তৈরি করা
‘পিডিবি’
(প্রেসিডেন্ট’স
ডেইলি ব্রিফ)
রয়েছে। এসব
পিডিবি মূলত
প্রতিদিন সারা
বিশ্বের কোথায়
কী হচ্ছে
তা নিয়ে
তত্কালীন মার্কিন
প্রেসিডেন্টদের জন্য
তৈরি করা
সারমর্ম ও
বিশ্লেষণ। এগুলো
বাংলাদেশের জন্যও
গুরুত্বপূর্ণ। কারণ
আমাদের মুক্তি
সংগ্রামের প্রেক্ষাপট
থেকে শুরু
করে দেশ
স্বাধীন হওয়ার
পরের প্রথম
ছয় বছর
সময়সীমার সঙ্গে
এগুলো মিলে
যায়।
১৯৭১ এবং
তার পরের
ঘটনাগুলো নিয়ে
সিআইএর মনোভাব
কী ছিল,
কীভাবে তা
তত্কালীন মার্কিন
প্রেসিডেন্টদের (প্রথমে
রিচার্ড নিক্সন,
পরে জেরাল্ড
ফোর্ড) সামনে
তুলে ধরা
হয়েছিল, সেসব
নিয়ে কিছুটা
ধারণা পাওয়া
যায় পিডিবিগুলো
থেকে।
১৯৬৯-৭৭
সাল—এই
আট বছরের
কয়েক হাজার
পিডিবিতে অনেকবারই
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
উঠে এসেছে।
তবে ২৫
মার্চের কালরাত
থেকে শুরু
করে ওই
মাসের শেষ
দিনগুলো সিআইএর
পিডিবিগুলোয় কীভাবে
উঠে এসেছিল,
সেটুকুতেই সীমাবদ্ধ
থাকবে এ
লেখা।
২৫ মার্চে
পাকিস্তানি মিলিটারির
ঢাকা শহরে
‘অপারেশন
সার্চলাইট’ নামক
তাণ্ডবলীলা শুরু
হওয়ার পর
২৬ মার্চের
পিডিবিতে নিম্নোক্ত
অংশটুকু পাওয়া
যায়।
‘আমেরিকার
কনসুলেট জেনারেল
জানিয়েছেন যে
ঢাকার সময়
মধ্যরাতে গুলি
ও বিস্ফোরণ
শুরু হয়
(রাত ২টা
বৃহস্পতিবার) এবং
কনসুলেট থেকে
সেনাবাহিনীর টহল
প্রদান ও
নির্দিষ্ট কয়েকজন
সেনাকে বেসামরিক
লোকদের লক্ষ্য
করে গুলি
ছুড়তে দেখা
যায়। কারফিউ
প্রদান করা
হয়েছে এবং
স্থানীয়দের নিয়ন্ত্রণাধীন
ঢাকা বেতার
সেনাবাহিনী দখল
নিয়ে নিয়েছে।
যদিও নিরীহ
জনসাধারণের ওপর
মিলিটারির গুলি
চালানোর কথা
সিআইএ প্রতিবেদনে
এসেছে। তবে
এ রাত
যে মানবজাতির
ইতিহাসের নৃশংসতম
রাতগুলোর একটি
ছিল, সেটার
আভাস তাতে
পাওয়া যায়
না। অবশ্য
যেহেতু এই
পিডিবি ‘অপারেশন
সার্চলাইট’ শুরু
হওয়ার একদিন
পর প্রেসিডেন্ট
নিক্সনের কাছে
পেশ করা
হয়, তাই
এটা ধরে
নেয়া যেতে
পারে যে
হয়তো সে
রাতের পূর্ণ
বিভীষিকা সম্পর্কে
তখনো সিআইএ
অবগত ছিল
না। তবে
এ ধারণা
যে একেবারেই
সত্য নয়,
তা পরের
দিনগুলোর পিডিবি
এবং সেই
সঙ্গে কিছু
সম্পূরক রেফারেন্স
ঘাঁটলেই স্পষ্ট
হয়ে ওঠে।
২৭ মার্চের পিডিবিতে পাকিস্তান-সংক্রান্ত অংশে বলা
হয়েছে—
ইউএস
কনসুলেট-জেনারেলের
রিপোর্টগুলো ইঙ্গিত
করে ঢাকা
এখন সেনাবাহিনীর
নিয়ন্ত্রণে এবং
অপেক্ষাকৃত শান্ত,
যদিও পুরান
ঢাকায় বিক্ষিপ্ত
গুলিবর্ষণের ঘটনা
ঘটেছে এবং
সারা রাত
ধরে আগুন
জ্বলেছে। সকাল
৭টা থেকে
বিকাল ৪টা
পর্যন্ত কারফিউ
তুলে নেয়া
হয়েছে। তবে
রাতে কারফিউ
বলবৎ আছে।
এটা ভাবতে
অবিশ্বাস্য লাগে
যে ‘অপারেশন
সার্চলাইট’-এর
দুদিন পরও
বাংলাদেশে অবস্থিত
মার্কিন কনসুলেট
জেনারেল থেকে
বলা হয়েছে,
পরিস্থিতি ‘তুলনামূলক
শান্ত’—একই
সঙ্গে এ
উদ্ধৃত অংশ
আরো বেশি
প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে
পড়ে যখন
বাংলাদেশে নিযুক্ত
তত্কালীন মার্কিন
কনসাল জেনারেল
আর্চার ব্লাডের
২৭ মার্চ
মার্কিন পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়কে পাঠানো
টেলিগ্রাম ক্রস-রেফারেন্স
করা হয়।
আর্চার ব্লাডের
টেলিগ্রাম থেকে—
১. ঢাকায়
এখানে আমার
পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনীর সন্ত্রাসের
রাজত্বের নীরব
ও আতঙ্কিত
সাক্ষী। প্রমাণ
পাওয়া যাচ্ছে
যে পাকিস্তানি
কর্তৃপক্ষের কাছে
আওয়ামী লীগ
সমর্থকদের তালিকা
রয়েছে, যাদের
তারা বাড়িতে
বাড়িতে গিয়ে
খুঁজে বের
করে পরিকল্পিতভাবে
গুলি করে
হত্যা করছে।
২. আওয়ামী
লীগের সমর্থকদের
ছাড়াও ছাত্রনেতা
ও বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষকদের চিহ্নিত
করে হত্যা
করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে
আমাদের কাছে
খবর রয়েছে
যে দর্শনের
বিভাগীয় প্রধান
ফজলুর রহমানসহ
একজন হিন্দু
ব্যক্তিকে এবং
ইতিহাস বিভাগের
প্রধান এম
আবেদিনকে হত্যা
করা হয়েছে।
গুঞ্জন রয়েছে
যে রাষ্ট্রবিজ্ঞান
বিভাগের শিক্ষক
রাজ্জাক সাহেবও
মারা গেছেন।
তালিকার মধ্যে
জাতীয় পরিষদের
ও প্রাদেশিক
পরিষদের সদস্যরাও
অন্তর্ভুক্ত।
৩. পাকিস্তান
সেনাবাহিনীর সমর্থন
ও সহযোগিতায়
অবাঙালি মুসলমানরা
পরিকল্পিতভাবে দরিদ্র
জনগোষ্ঠীর বাড়িতে
হামলা করছে
এবং বাঙালি
ও হিন্দুদের
হত্যা করছে।
স্বাভাবিকভাবে ধরে
নেয়া যেতে
পারে যে
২৬ ও
২৭ মার্চের
পিডিবিতে উল্লিখিত
কনসাল জেনারেল
ও আর্চার
ব্লাড একই
ব্যক্তি। ওই
দুটি পিডিবিতে
ঢাকা শহরের
বাস্তব চিত্র
যেভাবে হালকা
করে তুলে
ধরা হয়েছে,
তার সঙ্গে
আর্চার ব্লাডের
টেলিগ্রামের নির্মম
পরিস্থিতির সামঞ্জস্য
একেবারেই নেই।
আমরা এখন
জানি যে
বাস্তবে ঢাকার
চিত্র তখন
টেলিগ্রামে যেভাবে
ফুটে উঠেছে
সে রকমই
ছিল, পিডিবিতে
যেভাবে বলা
হয়েছে তেমন
নয়। একই
রকম হালকাভাবে
ঢাকা এবং
সমগ্র বাংলাদেশের
পরিস্থিতি নিয়ে
বিশ্লেষণ করা
হয়েছে এর
পরের দিনগুলোর
পিডিবিগুলোতেও। যদিও
২৮ মার্চের
পিডিবিতে আর্চার
ব্লাডের বরাত
দিয়ে বলা
হয়েছে—
তিনি
রিপোর্ট করেছেন
যে শহরের
ওপর সামরিক
ক্র্যাকডাউনটি দ্রুত,
কার্যকরভাবে এবং
প্রায়ই নির্মম
বর্বরতার সঙ্গে
সম্পন্ন হয়েছিল।
এর সঙ্গে
পরের কয়েকদিনের
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে
আসা প্রতিবেদনগুলো
একটু একপেশে
মনে হবে।
সেটাও সিআইএর
মূল্যায়নে উঠে
এসেছে—
২৬ মার্চ
ঢাকা থেকে
বেশ কয়েকজন
সাংবাদিককে বন্দুকের
মুখে জোরপূর্বক
ঢাকা ছাড়তে
বাধ্য করা
হয়। ফলে
কয়েকদিনের জন্য
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে
এ খবরগুলোকে
গুরুত্ব দিয়ে
প্রকাশ করা
হতে পারে।
শুধু যে
সিআইএর মূল্যায়ন
খোদ মার্কিন
কনসাল জেনারেলের
প্রেরিত টেলিগ্রাম
আমলে নিচ্ছে
না তা-ই
নয়, একই
সঙ্গে গণমাধ্যমের
প্রতিবেদনগুলোতেও গুরুত্ব
দিতে বারণ
করা হচ্ছে।
সিআইএর এ
মনোভাব মার্চের
বাকি পিডিবিগুলোর
মধ্যেও বিদ্যমান।
পূর্ব পাকিস্তানিরা
দাবি করছে
যে ঢাকায়
একটি বড়
যুদ্ধ সংঘটিত
হচ্ছে, যদিও
এর ভিত্তি
দুর্বল। পাকিস্তানি
সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ
নিয়ন্ত্রণে শহরটি
তুলনামূলকভাবে শান্ত
রয়েছে। তবে
অন্যান্য স্থানে
যেমন দক্ষিণ
চট্টগ্রাম বন্দরে
যুদ্ধ হচ্ছে,
উভয় পক্ষ
থেকে এ
খবর নিশ্চিত
করা হয়েছে।
যদিও দুই
পক্ষের হিসাবের
ব্যাপক ভিন্নতা
বিদ্যমান।
১৯৭১ সালের
২৫ থেকে
৩১ মার্চ—এই
এক সপ্তাহের
পিডিবিগুলো থেকে
এটুকু পরিষ্কার
যে সিআইএর
বিশ্লেষণে বাংলাদেশে
শুরু হওয়া
গণহত্যা যথাসম্ভব
ছোট করে
দেখানোর একটা
প্রবণতা ছিল;
সেটা ঢাকায়
অবস্থিত আর্চার
ব্লাডের প্রেরিত
বিবরণ উপেক্ষা
করে হলেও।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন
নিক্সন প্রশাসন
যে পাকিস্তানের
অন্যতম সমর্থক
ছিল, এটা
অবশ্য নতুন
তথ্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও
সোভিয়েত ইউনিয়নের
মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধে
যেকোনো মূল্যে
নিজেদের দিকে
পাল্লা ভারী
করার উদ্দেশ্যে
নিক্সন ও
তার পররাষ্ট্রবিষয়ক
উপদেষ্টা হেনরি
কিসিঞ্জার তখন
চীনের সঙ্গে
কূটনৈতিক সম্পর্ক
স্থাপন করার
চেষ্টা করছিলেন।
সে লক্ষ্যে
ইয়াহিয়া খানকে
ব্যবহার করার
ছক কষেছিলেন
কিসিঞ্জার। কারণ
পাকিস্তান ছিল
চীনের খুব
কাছের মিত্র।
চীনের সঙ্গে
কূটনৈতিক সম্পর্ক
স্থাপন করার
এ পরিকল্পনা
পাছে ভেস্তে
যায়—এ
আশঙ্কা পাকিস্তানকে
বাংলাদেশের বিষয়ে
জোরালো সমর্থন
দেয়ার মূল
কারণগুলোর একটি।
একই সঙ্গে
কিসিঞ্জার ছিলেন
মার্কিন কূটনীতিতে
‘রিয়ালপলিটিক’
মতবাদের অন্যতম
প্রবর্তক। এর
ভিত্তি হলো
পররাষ্ট্রনীতিতে কঠোরভাবে
বাস্তবধর্মী নীতিমালা
প্রয়োগ করা,
সেখানে নৈতিক
বা মানবিক
অবস্থানের কোনো
স্থান নেই।
তাই আর্চার
ব্লাডের বার্তাগুলো
যথাসম্ভব হালকা
করে (বা
একেবারেই উপেক্ষা
করে) নিক্সনের
কাছে পেশ
করা হতো।
কিসিঞ্জারের রিয়ালপলিটিকের
তোপের মুখে
ব্লাড ও
তার অধীনস্থ
কর্মকর্তাদের আর্জি
কলকে পায়নি
তত্কালীন মার্কিন
প্রেসিডেন্ট নিক্সনসহ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ও হোয়াইট
হাউজের বাঘা
বাঘা কর্মকর্তার
কাছে।
গ্যারি ব্যাসের
‘দ্য
ব্লাড টেলিগ্রাম:
নিক্সন, কিসিঞ্জার
অ্যান্ড আ
ফরগটেন জেনোসাইড’
বইয়ে বলা
হয়েছে—
কিন্তু
ব্লাড, কিটিং
এবং হসকিনসনের
উদ্বিগ্নতায় অনেকটা
পানি ঢেলে
দেন নিক্সন।
কিসিঞ্জার যখন
পূর্ব পাকিস্তানের
নির্মম হত্যাকাণ্ডের
কথা তুলে
ধরেন, নিক্সন
তখন এর
বিরুদ্ধে কিছু
বলতে রাজি
হননি, ‘আমি
এ ঘটনার
প্রশংসা করে
কোনো বিবৃতি
প্রকাশ করবো
না তবে
আমরা ঘটনাটির
নিন্দাও করতে
যাচ্ছি না।’
স্যামুয়েল হসকিনসন,
কিসিঞ্জারের সহকর্মীরা
জানান যে,
হোয়াইট হাউসে
ব্লাডের টেলিগ্রামগুলোকে
খুব একটা
গুরুত্বের সঙ্গে
গণ্য করা
হয়নি যদিও
ঢাকায় অবস্থানরত
সিআইএ প্রধান
উক্ত ভয়াবহ
পরিস্থিতিতে ব্লাডের
শান্ত আচরণের
প্রশংসা করেছিলেন
এবং ফরেস
সার্ভিসে কর্মরত
হসকিনসনের বন্ধুরা
ব্লাডের প্রতি
সম্মান জানিয়েছিলেন।
হসকিনসন বলেন,
আমরা হেনরি
এবং হাইগের
দৃষ্টি আকর্ষণ
করব। তবে
মনে হয়
না নীতিগতভাবে
বিষয়টি খুব
একটা সাড়া
পেয়েছিল। তবে
তিনি ব্লাড
সম্পর্কে উল্লেখ
করেছেন যে,
তাকে নরম
স্বভাবের বলে
গণ্য করা
হতো। হয়তো
তিনি বাঙালি
ও তাদের
নেতাদের নিয়ে
একটু বেশি
বিমোহিত ছিলেন।
এ বিষয়ে
একটু বেশি
সহূদয়বান।
তিনি আরো
বলেন, ব্লাড
বাঙালিদের দুর্দশা
নিয়ে উদ্বিগ্ন
ছিলেন, যা
তারা খুব
একটা বিশ্বাস
করেনি। মানবাধিকারের
বিষয়টি সত্যিই
খুব একটা
আমলে নেয়া
হয়নি... আপনি
খুব বেশি
গভীরে যাবেন
না এবং
বিষয়গুলো নিয়ে
ঢাকঢোল পেটাবেন
না। এখানে
আমেরিকার স্বার্থ
বিদ্যমান। এটাই
হচ্ছে মোদ্দাকথা।
তিনি বলেন,
আমি মনে
করি ব্লাড
সম্পূর্ণ সঠিক
ছিলেন। কিন্তু
তার বিশ্বাসযোগ্যতা
ছিল না।
তাছাড়া ইসলামাবাদ
থেকে যা
বলা হতো
সবসময় তা
বিশ্বাস করার
প্রবণতা ছিল
বেশি। অথচ
ঢাকায় ব্লাডের
হূদয় থেকে
রক্তরক্ষণ হচ্ছে।
এই বিনীত
ও নরম
মনের আর্চার
ব্লাডই বিবেকের
তাড়নায় শেষ
পর্যন্ত ৬
এপ্রিল ওয়াশিংটনে
পাঠিয়েছিলেন এক
প্রতিবাদসূচক টেলিগ্রাম।
পরবর্তীকালে ‘ব্লাড
টেলিগ্রাম’ নামে
বিখ্যাত এ
টেলিগ্রামকে মার্কিন
ফরেন সার্ভিসের
সবচেয়ে শক্ত
ভাষার প্রতিবাদ
হিসেবে গণ্য
করা হয়।
ব্লাড ও
তার অধীনস্থ
২০ জন
কর্মকর্তার স্বাক্ষরকৃত
এ টেলিগ্রামের
চুম্বক অংশ—
আমরা দৃঢ়
প্রত্যয়ের সঙ্গে
জানাচ্ছি যে
পূর্ব পাকিস্তানের
সাম্প্রতিক ঘটনাবলির
পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র
যে নীতি
অনুসরণ করে
চলেছে তা
বৃহত্তর অর্থে
আমাদের নৈতিক
স্বার্থ এবং
ক্ষুদ্রতর অর্থে
আমাদের জাতীয়
স্বার্থও রক্ষা
করছে না।
ঢাকায় আমেরিকান
কনসুলেট জেনারেলের
অনেক কর্মকর্তাই
মনে করেন,
এ নীতির
মৌলিক দিকগুলোর
কড়া প্রতিবাদ
জানানো তাদের
কর্তব্য। আমাদের
সরকার গণতন্ত্রের
ওপর দমননীতি
চালানোর নিন্দা
জানাতে ব্যর্থ
হয়েছে। আমাদের
সরকার পাশবিকতারও
নিন্দা জানাতে
ব্যর্থ হয়েছে।
আমাদের সরকার
তার নিজের
নাগরিকদের জীবন
রক্ষায় দৃঢ়
কার্যকর ব্যবস্থা
নিতে ব্যর্থ
হয়েছে। একই
সঙ্গে পশ্চিম
পাকিস্তানিদের প্রাধান্যপূর্ণ
সরকারকে যেমন
তোষণ করে
চলেছে, তেমনি
তাদের বিরুদ্ধে
যৌক্তিকভাবেই আন্তর্জাতিক
মহলে যে
সমালোচনার ঢেউ
উঠেছে তা
লঘু করারও
চেষ্টা করে
যাচ্ছে। আমাদের
সরকার যা
করছে তাতে
অনেকের কাছেই
মনে হতে
পারে, যুক্তরাষ্ট্র
নৈতিকভাবে দেউলিয়া
হয়ে পড়েছে।
পরিহাসের বিষয়
হচ্ছে, এমন
এক সময়
এসব করা
হচ্ছে যখন,
সোভিয়েত ইউনিয়নও
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার
কাছে বার্তা
পাঠিয়ে গণতন্ত্রের
সপক্ষে বক্তব্য
রেখেছে এবং
গণতান্ত্রিক উপায়ে
নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ
দলের নেতাদের
(ঘটনাক্রমে যারা
পাশ্চাত্যপন্থী) গ্রেফতারের
নিন্দা জানিয়েছে
এবং দমন-পীড়ন
বন্ধের আহ্বান
জানিয়েছে। অথচ
আমরা আওয়ামী
সংঘাত একটি
সার্বভৌম দেশের
অভ্যন্তরীণ বিষয়,
এ অজুহাতে
এমনকি নৈতিকভাবেও
কোনো রকম
হস্তক্ষেপ করা
থেকে বিরত
রয়েছি, যদিও
দুর্ভাগ্যজনক হলেও
সত্য, এ
সংঘাত সম্পর্কে
অতি ব্যবহারে
ধার হারানো
‘গণহত্যা’
অভিধাটিই প্রযোজ্য।
সাধারণ আমেরিকানরা
একে ধিক্কার
দিচ্ছে। আমরা
পেশাদার সরকারি
কর্মী হিসেবে
আমাদের বর্তমান
নীতির সঙ্গে
ভিন্নমত প্রকাশ
করছি এবং
ঐকান্তিকভাবে আশা
করছি, এ
দেশে আমাদের
সত্যিকারের এবং
দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ
কী তা
নির্ধারণ করা
হবে এবং
মুক্ত বিশ্বের
নৈতিক নেতৃত্বের
যে মর্যাদা
আমাদের ছিল
তা পুনরুদ্ধারে
আমাদের নীতি
পুনর্নির্ধারণ করা
হবে।
বাংলাদেশের এই
অকৃত্রিম বন্ধু
আর্চার ব্লাডকে
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির
বিপক্ষে গিয়ে
প্রতিবাদ করার
‘ধৃষ্টতা’
দেখানোর জন্য
পেশাগতভাবে পস্তাতে
হয়। ক্ষুব্ধ
নিক্সন এ
টেলিগ্রাম পাঠানোর
কিছুদিনের মধ্যেই
ব্লাডকে ঢাকা
থেকে প্রত্যাহার
করে নেন।
তবে ব্লাডের
এ নিয়ে
কোনো আক্ষেপ
ছিল না।
১৯৮২ সালে
‘ওয়াশিংটন
পোস্ট’কে
দেয়া সাক্ষাত্কারে
তিনি বলেন—
‘আমাকে
আমার ভিন্নমতের
জন্য মূল্য
দিতে হয়েছে।
কিন্তু এছাড়া
আমার আর
কোনো উপায়
ছিল না।
কারণ সত্য
ও মিথ্যার
মধ্যে পার্থক্যগুলো
ভীষণ স্পষ্ট
ছিল।’
সিআইএর সদ্য
উন্মুক্ত পিডিবিগুলো
থেকে হয়তো
একেবারে নতুন
কিছু আমরা
পাচ্ছি না।
কিন্তু মার্চের
পিডিবিগুলো পড়ে
এবং এর
সঙ্গে আর্চার
ব্লাডের টেলিগ্রামগুলো
এবং দ্য
ব্লাড টেলিগ্রাম
বইটি থেকে
পাকিস্তানি মিলিটারি
এবং তাদের
দেশীয় দোসরদের
চালানো গণহত্যার
ব্যাপারে কীভাবে
নিক্সন সরকার
ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ
বুজে রেখেছিল
(বলা যেতে
পারে বৈধতা
দিয়েছিল) এবং
একই সঙ্গে
বিষয়টা যথাসম্ভব
হালকাভাবে নিয়ে
নিজেদের সান্ত্বনা
দিতে চেয়েছিল,
সেটাই আরেকবার
উঠে এসেছে।
কিসিঞ্জার ও
নিক্সনের একটা
ধারণা ছিল
(পাকিস্তানিদের কাছ
থেকে পাওয়া)
যে বাঙালিরা
অনেক নরম
একটা জাতি,
কয়েক দিনের
মিলিটারি অ্যাকশনেই
সব প্রতিবাদ
বন্ধ হয়ে
যাবে এবং
ইয়াহিয়া খান
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে
নিয়ে আসবেন।
কিন্তু কিসিঞ্জার
বলেছিলেন, ঢাকা
শান্ত থাকলেও
চট্টগ্রামে ভয়াবহ
যুদ্ধ হয়,
তিনি এটা
ভেবে বিস্ময়
প্রকাশ করেছিলেন
যে শহরগুলো
পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ
থাকলে গ্রামীণ
বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা
সত্যিই প্রতিরোধ
করত। তিনি
জানতে চেয়েছিলেন,
শেষ পর্যন্ত
ইয়াহিয়ার ক্র্যাকডাউন
সফল হবে
কিনা: ‘৩০
হাজার পাকিস্তানি
সেনা কি
সাড়ে সাত
কোটি বাঙালির
বিরুদ্ধে কিছু
করতে সক্ষম?’
একজন জেনারেল
সতর্ক করে
বলেছিলেন, ‘এতে
খুবই রক্তাক্ত
পরিস্থিতি তৈরি
হতে পারে।’
তবে একজন
সিআইএ কর্মকর্তা
মতামত দিয়েছিলেন
যে বাঙালিরা
যোদ্ধা নয়।
তাই গণহত্যা
হলে হোক,
কিছুদিন পর
সব স্বাভাবিক
হয়ে যাবে!
কিন্তু এই
‘মেছুয়া
বাঙাল’ যে
নয় মাস
সংগ্রাম করে
৩০ লাখ
শহীদ, চার
লাখ বীরাঙ্গনার
আত্মত্যাগের বিনিময়ে
হলেও নিজেদের
স্বাধীনতা ছিনিয়ে
আনবে, সেটা
মুক্তিযুদ্ধের ঊষালগ্নে
ছিল তাদের
কল্পনাতীত।
ইয়ামেন এম হক: প্রকৌশলী, ইউএস আর্মি করপোরেশনস অব ইঞ্জিনিয়ারস, পোর্টল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র





