কলোরাডোতে অবসর যাপনকালে গত মাসে (২০০৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর) যখন আর্চার কে ব্লাড মারা যান, তখন সেখানে শোক করার মতো ছিল তার পরিবার, কয়েকজন পুরনো বন্ধু এবং একটি জাতি। কিন্তু তার প্রতি শোকাহত জাতিটা তার নিজের নয়, এটি ছিল বাংলাদেশ।

অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক আর্চার কে ব্লাডের বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। গ্রিস থেকে জার্মানি, আফগানিস্তান হয়ে নয়াদিল্লির কর্মজীবনে তার অভাবনীয় অর্জন থাকতে পারে। কিন্তু রক্তাক্ত ১৯৭১-এ কনসাল জেনারেল হিসেবে (তত্কালীন) পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় তিনি নিজেকে খুঁজে পান। সেখানে ব্লাড গণহত্যার সূচনা প্রত্যক্ষ করেন, যা মিলিয়ন না হলেও শত-সহস্র জীবন কেড়ে নেয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যদিও প্রাথমিক প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল, তবু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাঙালি অধ্যুষিত পুলিশ ব্যারাকে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে। দলে দলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশজুড়ে অগ্নিকাণ্ড আর হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে।

ব্লাড তার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারকে সতর্ক করে দেয়া প্রথম তার বার্তায় যা ঘটেছে তার বর্ণনা দেন এবং একে ‘বাছাইকৃত গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেন। এতে তিনি হত্যা বন্ধে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খানকে চাপ প্রয়োগে তাদের প্রতি আহ্বান জানান।

২৮ মার্চ ১৯৭১ সালে পাঠানো তার তারবার্তা গত বছর প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে আর্চার কে ব্লাড লিখেছেন, ‘এখানে ঢাকায় আমরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসের রাজত্বের এক নীরব ও আতঙ্কিত সাক্ষী।’ সমস্যা হলো রিচার্ড নিক্সন এবং হেনরি কিসিঞ্জার উপমহাদেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকাতে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে তত্কালীন মার্কিন প্রশাসন ব্লাড তার রিপোর্টে কী বললেন তাতে কর্ণপাত করেনি।

পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত মার্কিন সরকারি কর্মকর্তাসহ যুক্তরাষ্ট্রের ২০ জন নাগরিকের সই করা আরেক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীরবতাকে ‘না বিস্তৃত পরিসরে নৈতিক স্বার্থকে সংজ্ঞায়িত করে আর না ছোট পরিসরে জাতীয় স্বার্থকে সংজ্ঞায়িত করে’ উল্লেখ করা হয়। তবে ওই তারবার্তায় তিনি সই করেননি। কিন্তু তিনি তাতে ফুটনোট হিসেবে আরো যুক্ত করেন, ‘আমি বিশ্বাস করি পূর্ব পাকিস্তানে চলমান লড়াইয়ের পরিণতি হলো বাঙালির বিজয় যার ধারাবাহিকতা হলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।’

তিনি সম্ভাব্য পরাজয়ের পরিণতিকে একতরফা সমর্থনের কঠোর নীতি অনুসরণ করার বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছিলেন।

রিচার্ড নিক্সন বাঙালিদের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানকে সহযোগিতার সুযোগ বেছে নেন। তিনি নিজ হাতে লেখেন, এ মুহূর্তে ইয়াহিয়া খানকে চেপে ধরবেন না। সুতরাং কেউই ইয়াহিয়া খানকে চাপ প্রয়োগ করেনি। ফলে হত্যা চলতে থাকে এবং ২ কোটি বাঙালি শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেন।

সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিপক্ষে রিপোর্ট করতে পাকিস্তানিরা কিছু বিদেশী সাংবাদিককে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নিয়ে যায়, যাতে প্রমাণ করা যায় বাঙালি হিন্দুরা অবাঙালি মুসলমানদের হত্যা করছে। ফলে সফর শেষে সাংবাদিকরা অন্য কোনো ঘটনা না জেনেই চুপ হয়ে যেত।

ওই সফরে আমিও ছিলাম। সফর শেষে আমি নিজেকে মরণাপন্ন অসুস্থ বলে ঘোষণা দিলাম এবং চলে যেতে অস্বীকার করেছিলাম। যখন আমি হোটেল ত্যাগ করি তখন অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। তাই রাস্তায় কারো সাক্ষাত্কার নেয়া ছিল মারাত্মক বিপজ্জনক। কিন্তু মার্কিন কনস্যুলেটে তারা আমাকে অনুসরণ করতে পারেনি।

সেখানে আমি আর্চার কে ব্লাডের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি আমাকে বলেন, ওয়াশিংটনের প্রশাসন আমাকে চুপ করিয়ে দিয়েছে কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক অব্যাহত হত্যাকাণ্ড বিষয়ে আমার ধারণা একেবারে সঠিক।

ব্লাড বলেন, তিনি কথা বলতে পারছেন না। কিন্তু দূতাবাসে কর্মরতদের মধ্যে অনেক বাঙালি রয়েছে। তিনি একটি হলের মধ্যে একটি অফিস দেখিয়ে দিলেন এবং বললেন, এটি আপনার। যতদিন প্রয়োজন এটি আপনি ব্যবহার করুন। দূতাবাসে কর্মরতদের মধ্যে যারা আপনাকে তাদের গল্প বলতে চায় তারা সেখানে দেখা করতে আসবে। দিনের বেশির ভাগ সময় ধরে আমি নারী ও পুরুষদের গল্প শুনেছি যারা কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, কীভাবে তাদের বাবা-মা, ভাই-বোন এমনকি শিশুরাও ঢাকায়, চট্টগ্রামে, নারায়ণগঞ্জে এবং চা বাগানে মারা গেছেন। যখন আমার বিমান ঢাকা ত্যাগ করে, আমি একটি সিসা বের করতে শুরু করতে লাগলাম, আমার এখনো মনে আছে : ‘ভয়, আগুন এবং তরবারিই একমাত্র বিষয়, যা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাখতে পারে...’

এরপর আর কখনো আর্চার কে ব্লাডের সঙ্গে দেখা হয়নি। কিন্তু তারচেয়ে ন্যায়পরায়ণ ও সাহসী কোনো কূটনীতিকের সঙ্গেও আর সাক্ষাৎ হয়নি।

ওই ঘটনার কিছুদিন পরই তাকে ওয়াশিংটনে ডাকা হয়। নিক্সন যতদিন হোয়াইট হাউজে ছিলেন তাকে ডগহাউজেই রাখা হয়েছিল। ১৯৭১ সালে আমেরিকান ফরেন সার্ভিসের সহকর্মীরা আর্চার কে ব্লাডকে উদ্যোগ, সততা, বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস এবং সৃজনশীল ভিন্নমতের জন্য খ্রিস্টান এ হার্টার পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করেন।

তার মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য খবরের শিরোনাম হয়েছিল, যে জাতির অভ্যুদয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ব্লাড। বাঙালিদের একটি প্রতিনিধি দল কলোরাডোর ফোর্ট কলিন্সে তার স্মৃতিসৌধে উপস্থিত ছিলেন। তার স্ত্রী মার্গারেট বাংলাদেশ থেকে মেইল পেয়ে অভিভূত হয়েছিলেন। আর্চার ব্লাড চরম দুর্যোগের মধ্যেও একটি নতুন জাতির জন্মের খবর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নায়ক হিসেবেও স্মরণ করা উচিত।

 

জোসেফ গ্যালওয়ে: নাইট রিডার নিউজপেপারের জ্যেষ্ঠ সামরিক প্রতিনিধি

ভাষান্তর: নাজমুস সাকিব