ঢাকায় তখন পাঁচশর মতো মার্কিন নাগরিক বসবাস করে। শহরটা ক্রমেই এ আমেরিকানদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। ‘পাকিস্তানি সেনাদের বিদেশীবিরোধী কার্যক্রম’ দেখে সচকিত ব্লাড তড়িঘড়ি তাদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিলেন। পরে তিনি পররাষ্ট্র দপ্তরকে বলেন, ‘পাকিস্তানি সৈন্যরা তখন হত্যা আর লুটপাট করে, গুলি করতে মুখিয়ে আছে সবাই। তাদের হাতে এখনো কোনো আমেরিকান নিহত বা আহত হয়নি, এ এক বিস্ময়।’ নিজের পরিবার নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন ব্লাড। মেগ ব্লাডও মোটেই নিরাপদ বোধ করছিলেন না তাদের সরকারি বাসভবনে। তিনি স্মরণ করেন, ‘আমাদের বাসার ভেতরেও গুলি এসে লাগত।’

আমেরিকানদের নিরাপদে তেহরান অথবা ব্যাংককে চলে যাওয়ার জন্য পিআইএর একটা দৈনিক ফ্লাইটের ব্যবস্থা রেখেছিল পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। ইয়াহিয়া পরে বিষয়টা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন নিক্সনকে। এর মধ্য দিয়ে তিনি সম্ভবত বোঝাতে চাইছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রও তার কাছে ঋণী। আর জোসেফ ফারল্যান্ড, ইসলামাবাদে মার্কিন রাষ্ট্রদূত, ব্লাডকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তার যে লোকেরা ঢাকা ছাড়ছে, তারা গণমাধ্যমের কাছে মুখ বন্ধ রাখবে, এটা যেন তিনি নিশ্চিত করেন।

ঢাকা ছেড়ে যারা যাচ্ছিলেন, সেই আমেরিকানরা সামরিক অভিযানের কারণে রীতিমতো আতঙ্কিত ছিলেন। তাদের অনেকে হারিয়েছিলেন তাদের বাঙালি বন্ধুদের। ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তটি তাদের কাছে হয়ে উঠেছিল চরম বিষাদময়। প্রতিদিন পিআইএর তিন থেকে দশটা ফ্লাইট পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পাহারায় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় আসত। বেসামরিক পোশাক পরা সেনারা সেগুলো থেকে নেমে এসে মার্চ করে চলে যেত পাশের হ্যাঙ্গারে। সেখানে কাপড় বদলে তারা সেনা উর্দি গায়ে চাপাত। আর আমেরিকানরা সেনাদের বিমান থেকে নেমে আসার দৃশ্য দেখার পর গিয়ে উঠে বসত সেই একই বিমানে। তাদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, পাকিস্তান বাহিনীর লোকবল বাড়ানোর খরচের একটা অংশ তাদের বহন করতে হচ্ছে। ব্লাড বার্তা পাঠালেন, ‘অনেক আমেরিকানেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারা গেছে অথবা নিখোঁজ রয়েছে কিংবা পালিয়ে আছে। এ অবস্থায় এমনকি সামান্যতম আত্মমর্যাদা যাদের আছে তাদের পক্ষেও পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে যাওয়া কঠিন।’

বেদনা ভারাক্রান্ত হূদয়ে যারা ঢাকা ছেড়েছিলেন তাদের একজন মেগ ব্লাড। সঙ্গে তাদের ছোট্ট ছেলেটা। দিনের শেষ পিআইএ ফ্লাইটে প্রথমে করাচি, সেখান থেকে তেহরান যান তারা। ‘সে ছিল জীবনের এক অদ্ভুত সময়’—নীরব ক্ষোভের সঙ্গে স্মরণ করেন মেগ। ‘আর্চ সিদ্ধান্ত নিল পুরো আমেরিকান কমিউনিটিকেই চলে যেতে হবে এবং সবাই মেনেও নিল, হত্যাকাণ্ডের জন্য যারা দায়ী তাদেরই সহায়তা নিতে হবে...বিমানগুলো আসছিল পোশাক পরা মানুষে ঠেসে, ছোট ছোট সেনাদলের মতো তারা বিমান থেকে নেমে মার্চ করে চলে যাওয়ার পর একটি বিমানকে বানিয়ে ফেলা হলো আমাদের উদ্ধারকারী বিমান।’

একা পড়ে রইলেন ব্লাড তার সব আর্তনাদ শূন্যে ভাসিয়ে দেয়ার জন্য। ‘ওয়াশিংটনের নীরবতা ছিল বধির করে দেয়ার মতো’—পরে স্মরণ করেন তিনি। ‘পাকিস্তান দাবি করছিল, ভারতের মদদপুষ্ট “দুষ্কৃতকারী” দমনে সাধারণ পুলিশি তত্পরতার চেয়ে বেশি কিছু করা হচ্ছে না। আমাদের মনে হচ্ছিল, আমাদের পাঠানো রিপোর্টের চেয়ে পাকিস্তানি এ বক্তব্যকেই বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করছিল ওয়াশিংটন।’

ব্লাড সবসময়ই চাইতেন পাকিস্তান এক থাকুক, কিন্তু এ নৃশংসতা তার সে চাওয়াকে গলা টিপে মেরেছে। চরম ঘৃণার সঙ্গে তিনি বার্তা পাঠালেন, ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে, হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কথিত অপরাধী যেমন আছে তেমনি আছে বহু নিরপরাধ মানুষও। আর এসবই করা হচ্ছে দেশের অখণ্ডতা অক্ষুণ্ন রাখার নামে।’ যে মধ্যপন্থী বাঙালিরা পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে থাকতে চাইছিল, তারা এখন ধিকৃত হতে লাগল এই ‘অবিরাম উন্মত্ত সন্ত্রাসের’ কারণে, যে সন্ত্রাস ‘জনগণকে আজ ভীতসন্ত্রস্ত করলেও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আগামীকালের চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’ পশ্চিম পাকিস্তানের কবলমুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য বাঙালিরা গেরিলা যুদ্ধের পথ বেছে নিতে যাচ্ছে। তিনি লেখেন, সেনাবাহিনী দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে: ‘জাতির সম্ভ্রম ও আত্মশক্তি রক্ষ করাই পাকিস্তানের অস্তিত্বের মূলে তীব্রতম কুঠারাঘাত হেনেছে।’

অনেক পাকিস্তানিও দুঃখ ভারাক্রান্ত হূদয়ে একই মত প্রকাশ করেন। ইয়াহিয়ার মন্ত্রীদেরই একজন স্বচক্ষে ধ্বংসযজ্ঞের নমুনা দেখতে পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন। পরে তিনি লেখেন, ‘আমি ঢাকায় যা দেখেছি, আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা সেটা। যেখানে গিয়েছি সেখানেই শুনেছি এক কাহিনী: একজন ছেলে হারিয়েছে, অন্যজন স্বামী, বহু গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।’ কোনো ফল হবে না জেনেও তিনি ‘সেনাবাহিনীর নৃশংসতা’র বিষয়ে কথা বলতে ইয়াহিয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিছুদিন পর পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজি। তিনি পরবর্তী সময়ে খোলাখুলিই লেখেন ‘বেসামরিক মানুষ হত্যা ও পোড়া মাটি নীতি’ অবলম্বনের বিষয়ে। যে নগ্ন বর্বরতা প্রদর্শন করা হয় তা চেঙ্গিস খানের নৃশংসতা বা জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের বর্বরতাকেও হার মানায় বলে ধিক্কার জানান তিনি।

যুদ্ধের পর গঠিত পাকিস্তানের এক গোপন বিচার বিভাগীয় কমিশন মন্তব্য করেন, অনেক পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাই অভিযোগ করেছে, কোনো রকম হুমকি না থাকলেও ‘অতিমাত্রায় শক্তি প্রয়োগ’ করা হয়। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের মতো চরম উচ্ছৃঙ্খল আচরণেরও অভিযোগ করে তারা। জেনারেল নিয়াজিও ‘নির্বিচারে শক্তি প্রয়োগের’ কথা স্বীকার করেন, যে কারণে ‘সামরিক কমান্ডারদের “চেঙ্গিজ খান” বা “পূর্ব পাকিস্তানের কসাই”—এ ধরনের নামে পরিচিত হতে হয়েছে।’ এ বিচার বিভাগীয় কমিশন সেনাবাহিনীকে নিষ্ঠুরতায় উসকানি দেয়ার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের দায়ী করার পাশাপাশি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিহিংসামূলক হামলা, বাঙালিদের ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা, এলাকার পর এলাকা বিরান করে দেয়ার সময় শত শত নিরীহ মানুষকে হত্যা করার মতো বিষয়গুলো মেনে নিতে পারেনি, তাদের বক্তব্যও রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করেন। পাকিস্তানি এক ব্রিগেডিয়ারের ভাষ্য: এক জেনারেল তার সেনাদের জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কতগুলো বাঙালিকে হত্যা করেছ তুমি?’

ব্লাড তার রিপোর্ট পাঠানোর হার দ্বিগুণ বাড়ালেন। একের পর এক ওয়াশিংটনে পাঠাতে লাগলেন আতঙ্ককর সব কাহিনী, যদিও নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে সব সমান ছিল না। তিনি লিখলেন, বাঙালিদের নির্জীব-নিষ্ক্রিয় করে দেয়ার জন্য একটা ‘ত্রাসের পরিবেশ’ সৃষ্টি করা হয়েছে। ঢাকা ও তার আশপাশে তখনো গুলি চলছিল এবং প্রতিদিন সদ্য হত্যা করা মরদেহ সরিয়ে নেয়া হচ্ছিল ট্রাক বোঝাই করে। ব্লাড জানতে পারলেন, যে অল্পসংখ্যক পূর্ব পাকিস্তানি কর্মকর্তা-কর্মচারী সাহস করে কাজে যোগ দিতে এসেছিল, তারা ‘পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বর্বরতায় এতটাই হতভম্ব হয়ে হয়ে যায় যে ধিক্কার জানানোর ভাষাও তারা হারিয়ে ফেলে।’ কাউকে কাউকে ফুঁপিয়ে কাঁদতেও দেখেন তিনি। পুরান ঢাকার কয়েকজন আমেরিকান পাদ্রি ব্লাডকে জানান, ব্যারিকেড দেয়া দূরে থাক, কোনো রকম উসকানিই কেউ দেয় না, তবু পাকিস্তানি সেনারা বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে, পরে আতঙ্কিত মানুষ যখন ঘর থেকে বের হয়ে আসে তখন তাদের গুলি করে মারে। পাদ্রিদের মনে হচ্ছিল, বিশেষ করে হিন্দুদের টার্গেট করা হচ্ছে। অন্য বাঙালিরা জানায়, এক বস্তিতে ‘সেনারা হিন্দুদের তাড়া করে’ ছয়জনকে গুলি করে মারে। সেনারা বাঙালি পুলিশ সদস্যদের বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন বলে মনে করত। এ কারণে দেখা বা পরিচয় পাওয়ামাত্র তাদের হত্যা করা হতো। এক পুলিশ সদস্য মার্কিন কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন।’

প্রথমবার যখন ঢাকায় আসেন, সে সময় আর্চার ব্লাডের পরিবারের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছিল যে কিশোর শহুদুল হকের, সে তখন ২১ বছরের যুবক, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। ক্যাম্পাসে বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এর মধ্যে একবার অল্প সময়ের জন্য গ্রেফতারও হয়েছে সে। আগে কখনো মেশিনগানের গুলির আওয়াজ শোনেনি। ২৫ মার্চ রাতে যখন সম্পূর্ণ অপরিচিত সেই ঠা-ঠা-ঠা-ঠা আওয়াজ কানে এল আর রাতের আকাশ চিরে বুলেটের ছুটে যাওয়া এবং পুড়তে থাকা বাড়িঘরের আগুনের লাল আভা চোখে পড়ল, বিস্ময়ে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল সে। দুদিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শিউরে ওঠে মৃতদেহ, রক্ত আর বীভৎসতা দেখে। সেনা অভিযান যখন চলমান তখনো মাঝে মধ্যে সন্ধ্যার দিকে ব্লাডের কাছে আসত শহুদুল হক। তার পরিবারের যেসব সদস্য ভারতে পালিয়ে গিয়েছে অথবা বিদ্রোহে যোগ দিয়েছে, শোনাত তাদের মর্মস্পর্শী কাহিনি। কনসাল তাকে জানান, তিনি ও তার কর্মকর্তারা চেষ্টা করছেন এখানে যা ঘটছে তা যুক্তরাষ্ট্রের মানুষকে জানানোর। ‘যা চাইছিলেন তা পাচ্ছেন না, এজন্য তার যে হতাশা তা আমি অনুভব করতে পারতাম’—শহুদুল হকের মনে পড়ে। ‘তবে তিনি ছিলেন আগাগোড়া কূটনীতিক, কখনো বিস্তারিত কিছু বলতেন না।’

ব্লাডের লোকেরা রাতের বেলা বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির শব্দ পেতেন। তারবার্তা পাঠালেন ব্লাড: ‘ঢাকায় সামরিক বাহিনীর উন্মত্ত সন্ত্রাস চলছে।’ লিখলেন, বিশেষ জাতিগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে এবং এতে তার গণহত্যার অভিযোগ আরো জোরদার হয়: ‘হিন্দুরা যে সেনাদের নৃশংসতার বিশেষ লক্ষ্যবস্তু তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’ হিন্দু বসতি আছে এমন সব এলাকায়ই আগুন দেয়া বা গুলি চালানোর ঘটনা ঘটছে বেশি। রাজনৈতিক কর্মীদের যে দু-চারজন এখনো নিজের এলাকায় আছেন, তাদের খুঁজে খুঁজে বের করে ধরছে সেনারা।’ নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে ব্লাড লিখলেন, ‘নৃশংসতার কাহিনী কেবল বাড়ছে। ট্রাক ভরে বাঙালি বন্দিদের পাকিস্তানি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ব্লাডের এক লোক একটু পরে শুনতে পান একের পর এক গুলির আওয়াজ; আধা ঘণ্টায় ১৮০ পর্যন্ত গোনেন তিনি।’

ঢাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে, সেনা কর্তৃপক্ষের এমন সন্ত্রস্ত দাবি সত্ত্বেও শহরটা তখন একটা ভুতুড়ে শহর, যেখানকার তিন-চতুর্থাংশ মানুষই পালিয়ে গেছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী ঢাকায় সেনাবাহিনীর পুড়িয়ে দেয়া বিভিন্ন এলাকা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেয়া অনেক শহর দেখেছেন, কিন্তু এখানকার ধ্বংসলীলা তার কাছে মনে হয় অনেক বেশি ব্যাপক। আমেরিকানরা দেখেছেন, পাকিস্তানি সেনারা একটা বাঙালি গ্রামে ঢুকে বোমা মেরে কুঁড়েঘর ধ্বংস করার পর সেখানকার মানুষদের এক জায়গায় জড়ো করছে, তারপর তাদের মধ্য থেকে ধরে নিয়ে গেল জনা বারোকে। ঢাকার শহরতলি এলাকাগুলোয় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়। দেখে ব্লাড ধারণা করেন, শত শত রাউন্ড উচ্চক্ষমতার বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয় সেই ধ্বংসকাণ্ডে। ঢাকায় আরেক মার্কিন কর্মকর্তা তারবার্তা পাঠান, প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছে দুটি গ্রামের খড়ের চালাওয়ালা কুঁড়েঘরগুলো পাকিস্তান সেনারা ট্যাংক, বাজুকা ও মেশিনগানের গোলা মেরে ধ্বংস করে দিচ্ছে (গুজব ছিল, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পালিয়ে যাওয়া সদস্যরা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে)।

হিন্দুদের কীভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করে কনসুলেট। ব্লাডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একান্তে বলেন, ‘বেছে বেছে হিন্দু প্রফেসরদের আলাদা করে হত্যা করার, হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার প্রমাণ আছে। পুরান ঢাকায় আমেরিকার ২৪টি ব্লকের আয়তনের বিরাট এলাকা, মন্দির ঘিরে গড়ে ওঠা গ্রাম এবং ২৬ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু ছাত্রাবাস আগুন দিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়, যাতে নিহত হয় অন্তত ২৫ জন।’ পাকিস্তানি সেনাদের মনোযোগ যদিও আওয়ামী লীগ কর্মীদের দিকেই বেশি ছিল, কিন্তু ‘ত্রাসের রাজত্বের আসল চাপটা পড়ছিল হিন্দুদের ওপর।’

ঢাকার বাইরেও পরিস্থিতি একই রকম ভয়ানক মনে হচ্ছিল। ব্লাডের এক কর্মকর্তা কাছের এক শহরে গিয়ে দেখতে পান, সেখানকার সবকিছু পুরোপুরি বিধ্বস্ত। ব্লাড জানতে পারেন, পাকিস্তানি সেনারা ঢাকার বাইরে এক শহরে ব্যাপক বোমা হামলা চলিয়েছে। নাপাম বোমা ব্যবহার করা হয় সেই হামলায়। কাছের এক গ্রামেও প্রতিশোধমূলক হামলা চালায় সেনারা। হত্যাকাণ্ড শুরুর সপ্তাহখানেক পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ ব্লাডের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিমানে করে বিধ্বস্ত চট্টগ্রামে নিয়ে যায়। শহরের অনেক জায়গায় আগুন দেয়া হয়েছিল, পুড়িয়ে দেয়া হয় অনেক আবাসিক এলাকা। কূটনীতিকদের পরিদর্শনের সময় পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র সংবরণ করে থাকলেও সেখানকার মার্কিন নাগরিকরা তার আগেই ‘পাকিস্তানি সেনাদের ঠান্ডা মাথায় নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ হত্যার অসংখ্য ঘটনার’ প্রত্যক্ষদর্শী হন। চট্টগ্রামের আমেরিকানরা জানান, কনসুলেটের কর্মকর্তারা আসার আগে বেসামরিক মানুষদের মরদেহ সরিয়ে ফেলার জন্য বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়।

তথ্য সংগ্রহের জন্য এ রকম সফরে যাওয়া অনেক সময়ই বিপজ্জনক ব্যাপার ছিল। কারণ এমন সফরে আমেরিকানদের মর্টারের গোলার সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে হয়েছে, শুনতে হয়েছে গুলির আওয়াজ। দুঃসাহসী তরুণ উন্নয়ন কর্মকর্তা ডিসেই মায়ার্স বলেন, আমার সাদা গাড়িতে করে চট্টগ্রামের এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম একদিন। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর লোকদের কাছে গিয়ে বললাম, ‘লোকমুখে শুনলাম তোমাদের লোকেরা মেয়েদের ধর্ষণ করছে। আমি জানি সুশৃঙ্খল একটা বাহিনীর সদস্য হিসেবে তোমরা চাইবে না এ খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের হাতে যাক।’ আমরা ভাবতাম আমাদের কূটনৈতিক দায়মুক্তি আছে। তাই সে সময় অমন বলাটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়নি।

মায়ার্স দেশে তার বন্ধুদের কাছে বিষাদময় এক চিঠিতে লেখেন, পল্লী এলাকায় চরম দারিদ্র্যপীড়িত একটা ছোট্ট হিন্দু গ্রামে কী ভয়ানক দৃশ্য দেখেছিলেন তিনি। সেনাবাহিনী ‘সাধারণ মানুষদের বাড়িঘর থেকে ধরে এনে সার বেঁধে দাঁড় করাচ্ছিল, তারপর পুরো সারি ধরে মেরে ফেলে গুলি করে। সেদিন সেখানে প্রায় ৬০০ লোককে হত্যা করা হয়।’ আশপাশের গ্রামগুলোর লোকজন সেই গুলির শব্দ শুনে পালিয়ে গিয়েছিল। ধানকল পুড়িয়ে কয়লা বানিয়ে দেয়া হয়েছিল, ধানকে ছাই। হাতে গোনা যে কয়জন গ্রামবাসী ফিরে এসেছিল, কাঁদতে কাঁদতে তারা বর্ণনা করছিল তাদের দুর্দশার কথা। লম্বা, রোগা এক বাঙালি পুরুষ মায়ার্সকে তার পোড়া বাড়িতে নিয়ে যায়। মায়ার্স দেখতে পান, ‘একটা ঘরের ভেতর ছাই হয়ে যাওয়া ধানের স্তূপ আর কয়লা হয়ে যাওয়া চৌকি পড়ে আছে। এমন কোনো কিছুই সেখানে নেই যা থেকে বোঝা যায় তার তিন ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী সেখানে ছিল, সেখানেই মারা গেছে। আরেক বৃদ্ধ লোক, পান খাওয়া দাঁত, শ্লেষ্মা চকচকে চোখ (গ্লুকোমা নাকি অশ্রু?); ফোঁপাতে ফোঁপাতে বর্ণনা করল তার পরিবার হারানোর কথা।’ আহতদের কয়েকজন অনেক কষ্টে, নৌকায় ২ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে এক খ্রিস্টান গ্রামে চলে যেতে পেরেছিল। শান বাঁধানো মেঝেতে তাদের শুইয়ে রাখা হয়। ‘বেশির ভাগেরই হাতে বা বাহুতে গুলি লেগেছিল। গ্যাংগ্রিন হয়ে যাওয়া এক নারী চলে যায় সেখান থেকে। পেটে গুলি লাগা এক লোক মারা গেল। ১১ বছরের এক মেয়ের কানের পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে কপালের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। চুপচাপ শুয়ে আছে সে, নিজের হাতের দিকে চোখ। একেবারে নীরব সে, তবে অলৌকিকভাবে জীবিত।’

সার্বিকভাবে নিহতের সংখ্যা কত দাঁড়িয়েছিল তার সঠিক হিসাব করা কঠিন। ব্লাড লেখেন, ‘যতদূর বোঝা যায়, পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর মূল লক্ষ্যই ছিল শক্ত আঘাত হেনে জনগণের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা।’ চট্টগ্রাম ও অন্যান্য জায়গায় কত লোক মারা গিয়েছিল, এ ব্যাপারে ব্লাডের কোনো সঠিক ধারণা না থাকলেও তার হিসাবমতে শুধু ঢাকায় এক সপ্তাহেরও কম সময়ে অন্তত ছয় হাজার লোককে হত্যা করা হয়।

হোয়াইট হাউজে কিসিঞ্জারের সহকারীরা ব্লাডের পাঠানো রিপোর্ট পড়ে শিউরে উঠছিলেন। উইনস্টন লর্ড ছিলেন কিসিঞ্জারের বিশেষ সহকারী। ব্লাডের কিছু তারবার্তা পড়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘এ তো ভয়াবহ বর্বরতা!’ তবে ব্লাড সম্পর্কে স্যামুয়েল হসকিনসন বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কী, রিপোর্টিংয়ের কাজটা সে খুবই ভালো করে করেছে। ওয়াশিংটনের ক্ষমতাধররা যা শুনতে চাইত না তা-ই সে ওয়াশিংটনের ক্ষমতাধরদের উদ্দেশে বলে চলেছিল।’ হসকিনসনও তা-ই করছিলেন, এবং প্রতিদিনই বলার মাত্রা বাড়াচ্ছিলেন। সন্ত্রাসের পরিমাণে খুবই মর্মাহত হচ্ছিলেন তিনি। এর আগে এমন কিছু নিয়ে তাকে কাজ করতে হয়নি। হসকিনসন ছিলেন কিসিঞ্জারের পুরোপুরি অনুগত এবং তাকে খুশি করতে সদা ব্যাগ্র। তবু তার সতর্কবার্তাগুলো জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কাছে বারবার উপেক্ষিত থাকায় তার খুব হতাশ লাগত। হসকিনসন স্মরণ করেন, ‘ওগুলো সেখানে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ যে পড়ছে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।’ কিসিঞ্জারের ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলেকজান্ডার হেইগের কাছে তিনি অনুযোগ করলেন, কেউ তার কথায় গুরুত্ব দিচ্ছে না। ‘পুরনো বন্ধু আল হেইগ আমাকে সাবধান হওয়ার পরামর্শ দিল। সে চাইছিল না এমন কিছু করি, যাতে তিনি (কিসিঞ্জার) রেগে যেতে পারেন’—হসকিনসন বলেন। ‘এ কারণেই বিষয়টা পেয়ে বসল আমাকে (মানে ঢাকা কনসুলেট থেকে যেসব রিপোর্ট আসছিল সেগুলো।’ ব্যাপারটা খুবই দুর্বোধ্য মনে হচ্ছিল তার কাছে, ‘আমি সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না তারা কেন পশ্চিম পাকিস্তানের দিকে অতটা ঝুঁকেছিলেন।’ বাঙালি জাতীয়তাবাদের গভীরতা কতটা তা জানা ছিল হসকিনসনের। এর গড়ে ওঠার সময়ের এক বিয়োগান্তক ঘটনার সাক্ষী তিনি নিজে। উপমহাদেশ সম্পর্কে তার বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের ওপর ভরসা করে তিনি কিসিঞ্জারকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, সেখানে একটা বিপ্লব দানা বেঁধে উঠছে। কিন্তু লাভ হয়নি। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কেন কিসিঞ্জার বুঝতে পারছেন না? কেন তিনি সেখানকার বাস্তবতা অনুযায়ী নীতি সমন্বয় করছেন না? আমরা বুঝতে পারি না, আমরা যা বুঝতে পারছি তারা কেন তা বুঝতে পারছেন না।’

হোয়াইট হাউজের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হ্যারল্ড সন্ডার্স, হসকিনসনের আবেগটাকে কিসিঞ্জারের মধ্যে সঞ্চারিত করার আশায় তাকে নিয়ে কিসিঞ্জারের কাছে গেলেন এবং অনেক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আবেদন জানালেন যেন তাদের নীতি পুনর্বিবেচনা করা হয়। পাকিস্তান সামরিক পন্থায় দ্রুত পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারবে (নিক্সন ও কিসিঞ্জারের এ আশা যে পূরণ হওয়ার নয় তা বোঝানোর জন্য তারা ব্লাডের তারবার্তা থেকে উদ্ধৃতি দেন: ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল নৃশংসতম সামরিক সন্ত্রাস চালিয়ে দ্রুত বাঙালিদের বশে নিয়ে আসা। তাদের এ পরিকল্পনা সফল হয়নি।’ কিসিঞ্জারের কর্মকর্তারা বিলক্ষণ জানতেন, তাদের ক্ষমতাধর ওপরওয়ালা কী চান। তাই তারা কখনো খোলাখুলি তার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের সাহস পেত না। ব্লাড ও কিটিংয়ের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে হোয়াইট হাউজের দুই কর্মকর্তা রক্তপাতের মাত্রা সীমিত পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগের পরামর্শ দিলেন। বললেন, পাকিস্তান মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। চাপ দেয়ার জন্য এ সুবিধা ব্যবহার করা যেতে পারে। যত যা-ই হোক, মনে হচ্ছে দেশটা ভেঙেই যাবে। অথচ খামোখা নিক্সন প্রশাসনকে ‘দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিজয়ী দলের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দমনে যারা সামরিক সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সমর্থন দেয়ার বদনাম ঘাড়ে নিতে হবে।’ তারা প্রশ্ন করেন, ‘রাষ্ট্রদূত কিটিং যেমন বলেছেন, “নীতিনিষ্ঠ থাকাটাই সর্বোত্তম রাজনীতি” (এটা কি সেই সময় নয়?’ কিসিঞ্জার তাদের কথা আমলেই নিলেন না)।’

ব্লাডের পাঠানো গোপন তারবার্তাগুলো শুধু প্রশাসনের ভেতরের লোকজন পড়লেও হয়তো নিক্সন ও কিসিঞ্জার যথেষ্ট ক্রুদ্ধ হতেন। কিন্তু কেবল সরকারি লোকজনের বাইরে কারো হাতে যেন না পড়ে, সেজন্যে পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও ব্লাডের ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ শিরোনামের বার্তাটি কয়েক দিনের মধ্যেই গণমাধ্যমের হাতে চলে গেল। শুধু তা-ই নয়, কেউ একজন ব্লাডের পাঠানো কয়েকটা বার্তা ডেমোক্র্যাটদলীয় সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির হাতেও পৌঁছে দিল। ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী কেনেডিকে রীতিমতো ঘৃণা করতেন নিক্সন। ওই তারবার্তাগুলোর ভিত্তিতে কেনেডি সঙ্গে সঙ্গে আবেগপূর্ণ এক ভাষণে (পূর্ব পাকিস্তানে) মার্কিন অস্ত্র ব্যবহারের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার জন্য নিক্সন প্রশাসনকে তাগিদ দিলেন।

গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়ার মতো লোক ছিলেন না ব্লাড। ফাঁসের কথা শুনে খুবই বিরক্ত হলেন তিনি। কিন্তু পাকিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড সন্দেহ করতেন, নিউইয়র্ক টাইমসের সিডনি শ্যানবার্গকে গোপন তথ্য জোগান দেন ব্লাড; যদিও শ্যানবার্গ প্রবলভাবে অস্বীকার করেন এ অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, ব্লাডের সঙ্গে তার কখনো দেখাই হয়নি।

বস্তুত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে কারো পক্ষেই এ ফাঁসকর্ম করা সম্ভব ছিল। অথবা ঢাকা কনসুলেটের কারো দ্বারা বা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মার্কিন দূতাবাসগুলো থেকেও তা হয়ে থাকতে পারত। কিসিঞ্জারের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হলো যে অপরাধীটা আর কেউ নয়, দিল্লিতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত, ঘোট পাকানোর ওস্তাদ কেনেথ কিটিং। কয়েকদিন পর কিসিঞ্জার নিক্সনকে বললেন, কিটিং নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে ‘ব্লাডের তারবার্তার বিষয়বস্তু ফাঁস করে দিয়েছেন।’ (শ্যানবার্গ এ অভিযোগও অস্বীকার করেন)। প্রধান উন্নয়ন কর্মকর্তা এরিক গ্রিফেলের মতে, ফাঁসের জন্য দায়ী ঢাকা কনসুলেটেরই কেউ, যদিও কে তা বলতে অস্বীকার করেন তিনি। গ্রিফেল বলেন, এজন্য ফাঁসকারীকে কেবল তারবার্তা পাঠানোর কক্ষে যেতে হবে এবং একটা অনুলিপি তৈরি করে তা মেইলে পাঠিয়ে দিতে হবে।

ডিসেই মায়ার্স ছিলেন নিক্সনের ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওস নীতির তীব্র সমালোচক। তারও অভিমত, ঢাকা কনসুলেটের যে কারো পক্ষেই তা ফাঁস করা সম্ভব ছিল। তিনি স্মরণ করেন, ‘আমরা সবাই চাইছিলাম কথাগুলো বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাক।’ তিনি ওইসব তারবার্তা ফাঁস করেননি, এমন দাবি করার পাশাপাশি মায়ার্স বলেন, তিনি চাইছিলেন জরুরি ভিত্তিতে ওই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হোক। তার আশা ছিল, এতে হয়তো পাকিস্তান সেনাবাহিনী থামতে বাধ্য হবে। হিন্দু গ্রামবাসীর দুর্ভোগ-দুর্দশার বর্ণনা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বন্ধুদের কাছে দীর্ঘ এক পত্র লেখেন তিনি। তাতে অনুরোধ করেন, গোপনে যেন চিঠিটা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে দেখানো হয়। কেনেডি ও অন্যান্য প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট সিনেটর ও খোদ নিক্সনের কাছে চিঠি লেখার ভিত্তি হিসেবে ওটা ব্যবহার করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি। মায়ার্স অবশ্য বন্ধুদের সতর্কও করেন, নাম-পরিচয় ও সূত্র উল্লেখ করে কোনো কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশের অর্থ হবে আমাকে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু আমি এখনই ফিরতে চাই না।’ (সংক্ষেপিত)

 

কৃতজ্ঞতা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)