অধিকাংশ মানুষকে বিস্মিত, হতবাক করে বাংলাদেশ সরকার এককালীন জ্বালানি তেল (পেট্রল, ডিজেল, অক্টেন, কেরোসিনের) মূল্য গড়ে ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা বলে মনে না করার যুক্তি নেই. প্রচণ্ড দাবদাহ চলছে দেশজুড়ে, নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশছোঁয়া। এরই মাঝে জ্বালানি সংকটের অজুহাত তুলে বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে দেশজুড়ে। ঢাকা মহানগরীতে লোডশেডিং মোটামুটি সহনীয় হলেও ঢাকার বাইরে অনেক অঞ্চলে লোডশেডিং তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এরই মাঝে বিশাল মাত্রায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে বিশাল বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। গ্যাস, সার মূল্যবৃদ্ধি, পানি, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি হবে যেকোনো সময়। হয়তো গ্যাসের দাম আবারো বাড়বে অচিরেই। এতসব মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাতে পিষ্ট মদ্ধবিত্ত, নিম্নবিত্তের জীবনে অভিশাপ হয়ে আসছে। জানি-মানি বিশ্ব পরিস্থিতির বিবেচনায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি অপরিহার্য ছিল। সরকার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল হলে এককালীন বিশাল মূল্যবৃদ্ধি না করে ধাপে ধাপে সহনীয় মাত্রায় মূল্য বৃদ্ধি করতে পারত ইউক্রেন যুদ্ধ সূচনার সময় থেকে। তাহলে জনজীবনে মূল্যবৃদ্ধি মানিয়ে যেত।
সবাই জানে, করোনার সময়ে স্থবির হয়ে থাকা পৃথিবীতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ধস নেমেছিল। কয়লা, তেল, গ্যাস সবকিছু বিকোচ্ছিল নামমাত্র মূল্যে। বাংলাদেশের জ্বালানি সংরক্ষণের ক্ষমতা সীমিত। অধিকাংশ নীতিমালায় ভবিষ্যৎ ক্রয়, প্রাইস হেজিং করার সক্ষমতা না থাকায় বাংলাদেশ অবিশ্বাস্য কম জ্বালানি মূল্যের সুযোগ নিতে পারেনি। একশ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ গোষ্ঠীর প্রভাবে সেপ্টেম্বর ২০২১-এ সরকার স্পট মার্কেট থেকে ১০ ডলার এমএমবিটিইউ মূল্যে এলএনজি কেনেনি, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে আগুন লাগে। বাংলাদেশকে কয়েকটি কার্গো ২৮-৩০ ডলার এমএমবিটিইউ কিনতে হয়। সরকারপ্রধান একপর্যায়ে এসে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি না কেনার সিদ্ধান্ত দিলে গ্যাস সরবরাহ সংকট তীব্রতার হয়। এরই মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে সব ধরনের জ্বালানির দাম আকাশ ছুঁয়ে যায়।
বাংলাদেশ দীর্য সময় নিজস্ব জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নিভরশীল ছিল। কিন্তু ২০০০-২২ সময়ে যুক্তিহীন কারণে বাংলাদেশ নিজস্ব গ্যাস সম্পদ সম্প্রসারণে যথাযথ উদ্যোগ নেয়নি। বিকল্প জ্বালানি কয়লা উত্তোলন বিষয়েও নিস্পৃহ থাকে। অন্যদিকে আমদানি জ্বালানিনির্ভর কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ আমদানীকৃত তরল জ্বালানিভিত্তিক (ফার্নেস অয়েল, ডিজেল) ভাড়ায় আনা কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। ২০২২ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪০ শতাংশের অধিক জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। অধিকাংশ প্লান্টের সঙ্গে আবার ক্যাপাসিটি চার্জ মেটানোর চুক্তি থাকায় সরকার পড়ে উভয়সংকটে। এমতাবস্থায় সরকারপ্রধান জ্বালানি-বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতার কথা বলামাত্রই আমলা নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ প্রশাসন চটজলদি কিছু গণবিরোধী সিদ্ধান্তসহ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। দেশব্যাপী ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা আসে। পরিকল্পনামাফিক দৈনিক ১-২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বলা হয়, শিল্প-কারখানাগুলোর স্বার্থেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত। দুনিয়ার অধিকাংশ দেশের মতো বাংলাদেশেও বহু আগে সন্ধ্যায় বাণিজ্যবিতান বন্ধের সিদ্ধান্ত সঠিক। কিন্তু জ্বালানি সংকট (গ্যাস সংকটের সময়) কোনো কিছুর বাছবিচার না করে আমলারা কেন সব ডিজেল প্লান্ট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল? দেশের কিছু কিছু অঞ্চল যেমন রাজশাহী, রংপুর বিভাগ একান্তই তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। আর আছে বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। সেখানেও কয়লা সরবরাহ মাঝে মাঝে বিঘ্নিত হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা যায় না। তাই আমলাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হলে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ৫-৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হতে থাকে। সরকারের ঘোষণায় উপাসনালয়ে গরমের সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতার কথা বলা হলেও অভিজাত নাইট ক্লাবগুলোয় যথেচ্ছ ব্যবহার জনমনে খবর সৃষ্টি করে।
এমনই যখন পরিস্থিতি তখন সবাইকে বিস্মিত করে এককালীন জ্বালানি তেলের গড় ৫১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি দেশব্যাপী অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানি না জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য দুর্যোগ বয়ে আনবে কিনা। আবারো বলছি, মূল্যবৃদ্ধি অপরিহার্য ছিল, কিন্তু কোনোমতেই সেটি ৫১ শতাংশ করা সমীচীন হয়নি। এরই মধ্যে ডমিনো ইফেক্ট হিসাবে যানবাহনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। বাড়বে নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা। কৃষি, শিল্প সব ক্ষেত্রেই সরকারের জন্য চতুর্মুখী সংকট সৃষ্টি করবে। এমনিতেই সারের দাম বেড়েছে, এর মধ্যে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি সেচ মৌসুমে কৃষিক্ষেত্রে যাতে সংকট সৃষ্টি না করে তার জন্য কৃষককে সরাসরি প্রণোদনা দিতে হবে। এমনিতেই লোডশেডিংয়ের সময় অজস্র ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার প্রকৃতপক্ষে ডিজেলের চাহিদা বাড়িয়েছে। একেই হয়তো বলে পেনি ওয়াইজ পাউন্ড ফুলিশ।
সবাই প্রশ্ন করছে, সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব কেন ধরে রেখেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন অ্যাক্টের ২২ ধারা অনুযায়ী সব ধরনের জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব কমিশন করার কথা। কমিশন থেকে প্রবিধানমালা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে ১২ বছর আগে পাঠানো হলেও অনুমোদন হয়নি। কমিশন একই ধরনের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশের পর এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করছে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা গৃহীত হলে স্বচ্ছতা আসবে। এটি করা অপরিহার্য। জ্বালানি তেল কেনার ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ আছে।
সবকিছু মিলিয়ে বলব, সরকারপ্রধান প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সীমিত আয়ের সৎ চাকরিজীবীদের কথা বিবেচনা করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা করলে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।





