বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সমন্বিত জ্বালানি সংস্থাগুলোর একটি শেভরন, যা জ্বালানি শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত। জ্বালানির সহজলভ্যতা মানুষের অগ্রগতিকে ধাবিত এবং আধুনিক সমাজের সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে জীবনকে উন্নত করতে সহায়তা করে। এ কারণেই শেভরন ক্রমাগত নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী এবং সর্বদা পরিষ্কার জ্বালানি সরবরাহের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম উৎপাদক প্রতিষ্ঠান শেভরন। এটি তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে গ্যাস উৎপাদন করে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করছে। যেটি শেভরন বাংলাদেশ ব্লক টুয়েলভ লিমিটেড ও শেভরন বাংলাদেশ ব্লক থার্টিন অ্যান্ড ফরটিন লিমিটেডের মাধ্যমে মোট দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের ৫৫ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে।
কনডেনসেট প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে প্রস্তুতকৃত এক ধরনের তরল হাইড্রোকার্বন। শেভরন এ দেশীয় কনডেনসেটের প্রায় ৮৫ শতাংশ উৎপাদন করে। শেভরন বাংলাদেশ তার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা চিত্র অর্জন করেছে। প্রায় ৯৫ শতাংশ বাংলাদেশী নাগরিকদের নিয়ে গঠিত একটি কর্মিবাহিনী দিয়ে সংস্থাটি কার্যক্রম পরিচালনা করে।
বিভিন্ন সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে শেভরন বাংলাদেশ তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সেই সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দীর্ঘস্থায়ী সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বও গড়ে তোলার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগাতে শেভরন বাংলাদেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি তার সব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা এবং কাজের উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ, যা তার মূল মানদণ্ডগুলোর একটি।
সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ করতে মূল ভূমিকা পালন করে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, যা মানুষের অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটায়। শেভরন বাংলাদেশ তার কার্যক্রমে যে প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে তা কেবল সাশ্রয়ীই নয় বরং এটি বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো থেকে অতিরিক্ত সম্পদ পুনরুদ্ধার করতেও সহায়তা করে।
শেভরন বাংলাদেশে যে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কনডেনসেট উত্তোলন করে, তা দেশের জাতীয় তেল কোম্পানি বাংলাদেশ অয়েল, গ্যাস অ্যান্ড মিনারেল করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) কাছে বিক্রি করে। বিবিয়ানা, জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার এ তিন গ্যাসক্ষেত্র বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পেট্রোবাংলার মধ্যে প্রডাকশন শেয়ারিং কনট্র্যাক্টে গ্যাস উৎপাদন করে। এছাড়া পিএসসির অধীনে রয়েছে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবলে মুচাই কম্প্রেসার স্টেশন। যেটি উত্তর-দক্ষিণ গ্যাস পাইপলাইনের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ২০১২ সালে উদ্বোধন করা হয়েছিল।
শেভরনের ব্যবহূত প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশকে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ জ্বালানি বিশ্বজুড়ে মানুষের অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এসবই শেভরনকে নেতৃত্বের স্থানে নিয়ে গিয়েছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী জ্বালানিও আরো বেশি উপযোগী ও কম কার্বন নিঃসরণ করবে। এখন তার চাহিদা প্রবল, ভবিষ্যতে সেটা আরো বাড়বে। পাশাপাশি এ প্রযুক্তি শেভরন বাংলাদেশকে সাশ্রয়যোগ্য নতুন তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলো খুঁজে পেতে এবং বাণিজ্যিকীকরণ করতে সহায়তা করে এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো থেকে আরো সম্পদ পুনরুদ্ধার করতেও সহায়তা করে।
শেভরনের বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক কার্যক্রমের একটি প্রধান মানদণ্ড হলো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা। বাংলাদেশে শেভরন ২০০৬ সাল থেকে সামাজিক বিনিয়োগ কর্মসূচির স্পন্সর করে আসছে। সংস্থাটি সম্প্রদায় উন্নয়ন উদ্যোগগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেয়। শেভরন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগ করে, যা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। শেভরনের সঙ্গে দেশের নেতৃস্থানীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোর অংশীদারত্ব রয়েছে। এসব প্রকল্পের বেশির ভাগই শেভরন সম্পন্ন করে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে বহু বছরব্যাপী একটি প্রকল্প হলো শেভরনস বাংলাদেশ পার্টনারশিপ ইনিশিয়েটিভ (বিপিআই)। ব্যবসা ও কর্মদক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এটি নেতৃস্থানীয় উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে।
জীবিকা প্রকল্প: এমনই একটি প্রকল্প হলো জীবিকা। শেভরন ও ব্র্যাক যৌথভাবেই প্রকল্প পরিচালনা করে। সিলেটে শেভরন পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র এলাকায় দরিদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষি পরিবারের উন্নয়নে একত্রে কাজ করছে। এ প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১১০টি গ্রাম উন্নয়ন সংস্থাকে (ভিডিও) সফলভাবে পরিবর্তন করে। খুব সামান্য মূলধন দিয়ে শুরু করলেও এখন প্রতিটি ভিডিও এর গড় পরিচালন মূলধন ৬ লাখ টাকা। ২০১৫ সাল থেকে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০ হাজার মানুষ উপকৃত হয়েছে। সফলতার সঙ্গে প্রথম ধাপ শেষ করার পর ২০১৯ সালে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ গ্রহণ করা হয়। ২০২২ সালের মধ্যে জীবিকা সমবায়ের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব অর্জনে সহায়তা করাই ছিল সেটার উদ্দেশ্য।
উত্তরণ প্রকল্প: সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় ১ হাজার ৪০০ জন সদস্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে তিন বছরের এ দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৬ সালের আগস্টে শুরু হয়। স্কিল ফর ইমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইআইপি) একক অংশীদারত্ব ছিল উত্তরণ। যার অর্থায়ন করে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার। এটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রথম ধাপে ১ হাজার ৪০০ জনকে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও কনস্ট্রাকশনের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং স্থানীয় কোম্পানিতে ৯০০ জন চাকরি পেয়েছে। সফলভাবে প্রথম ধাপ শেষ করার পর উত্তরণের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় ২০১৯ সালে। এ পর্যন্ত প্রকল্পটি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ও ঢাকার প্রায় দুই হাজার যুবককে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে সিলেটে একটি স্থায়ী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। প্রকল্প মেয়াদের বাইরের যুবকদের প্রশিক্ষণের সুবিধা দিতে এটি স্থাপন করা হয়েছে। দক্ষতার মানোন্নয়ন, কারিকুলাম ফর প্যাকেজিং ও ফিনিশিং অপারেশনের (পিএফও) জন্য উত্তরণ প্রথমবারের মতো উদ্যোগ নিয়েছে, যা জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে।
উদ্যোক্তা প্রকল্প: পণ্য, পরিষেবা, প্রযুক্তি ও তথ্যে প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে উন্নত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেভরন ক্যাচমেন্ট অঞ্চলে পরিবারের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নে উদ্যোক্তা প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়।
প্রকল্পটি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ১ হাজার ১০০ জন মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ব্যবসার জন্য তহবিল পেতে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে এ প্রকল্প।
শিক্ষা
‘কোয়ালিটি এডুকেশন সাপোর্ট ইনিশিয়েটিভ’র আওতায় শেভরন বাংলাদেশে প্রতি বছর ৮০০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করছে। শেভরন চালিত গ্যাস প্ল্যান্টগুলোর আশপাশে অবস্থিত স্কুলগুলোয় শিক্ষার জন্য আসবাবপত্র, খেলাধুলার জিনিসপত্র ও শেখার উপকরণ সরবরাহ করে।
শেভরন ও সেভ দ্য চিলড্রেনের সমন্বয়ে শিখন প্রকল্পের অধীনে পড়ালেখার বাইরে থাকা ১ হাজার ৮০০ শিশু ও ৪৬টি গ্রামের ড্রপ আউট শিক্ষার্থীদের জন্য তিন বছরের অনানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষা প্রদান করছে। শিখন মডেলের ধারাবাহিকতায় পাঁচ-সাত বছর বয়সী শিশুদের ৬০টি প্রাথমিক শিক্ষা (ইপিই) কেন্দ্র বা এক ঘরের স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক উপাদান সরবরাহ করছে। তাদের এ শিক্ষা ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় এটি রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। শিখন প্রকল্পে এরই মধ্যে অংশগ্রহণকারী শিশুদের ১ হাজার ৮০০ জন অভিভাবক, ৬০ জন ইপিই কেন্দ্রের শিক্ষক ও ৬৬০ জন সম্প্রদায়ের সদস্যকে নিযুক্ত করেছে। শিখন প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়।
২০১৯ সালে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ শুরু করে শেভরন। এ ধারাবাহিকতায় গ্রীষ্মে শেভরন দ্বারা পরিচালিত স্কুলের অধীনে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ের ওপর পাঁচ সপ্তাহের প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য দেশের ৬১ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে বেছে নেয়। এ কর্মশালায় শিক্ষার্থীদের আরো অধ্যয়ন ও কর্মজীবনে দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কভিড-১৯-এর বিধিনিষেধের দুই বছর পর ২০২২ সালে প্রোগ্রামটি আবার শুরু হয়েছে এবং বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন সামার স্কুলের অধীনে আরেকটি রাউন্ড পরিচালনা করছে। যেখানে শেভরন গণিত, বিজ্ঞান ও কম্পিউটার কোডিং প্রোগ্রামগুলোয় স্পন্সর করেছে। এ বছর সামার স্কুলের লক্ষ্য বিজ্ঞানের পাশাপাশি মানবিক বিষয়ে মেয়েদের মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার জন্য উন্মুক্ত করা। এ স্কুল শিক্ষার্থীদের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করে।
স্বাস্থ্যসেবা
শেভরন বাংলাদেশ বিবিয়ানা গ্যাস প্ল্যান্টের কাছাকাছি করিমপুর ও স্বস্তিপুরে দুটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। এ দুটি ক্লিনিক প্রতি বছর আনুমানিক ৬০ হাজার স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছে সাশ্রীয় মূল্যে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেয়। এছাড়া শেভরন বাংলাদেশ ২০০৬ সাল থেকে বৃহত্তর সিলেট জনগোষ্ঠীর জন্য পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে পানীয় জল, স্যানিটারি ল্যাট্রিন ও টিউবওয়েল বিতরণ।





