যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বহুমুখী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। শুধু এক কোটি শরণার্থীর দেশে ফেরায় সাহায্য করা, তাদের অন্য-বস্ত্র-বাসস্থান নিশ্চিত করাই যেকোনো সরকারের পক্ষে একটি বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় শূন্য কোষাগার নিয়ে এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করাটা এক রকম অসম্ভবই ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সে কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে তৎকালীন সরকার। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সবার আগে যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্বাসন করা হয়। ৩০০ রেল এবং ৩০০-এর বেশি রাস্তার ব্রিজ, কালভার্ট পুনর্নির্মাণ অথবা মেরামত করে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সচল করা হয়। কৃষককে বীজ, সার, সেচ ব্যবস্থা সরবরাহ করে দ্রুত খাদ্য উৎপাদনে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সহজ কাজ ছিল না। ১৯৭২ সালের বাজেটে মাত্র ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল পুনর্বাসন কাজে। অতীব জরুরি কাজগুলো গুছিয়ে নিয়ে সরকার দেশ পুনর্গঠনে মনোযোগ দেয়। প্রাথমিকভাবে দ্রুত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে চালুর ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দুই বছরের মধ্যে অন্তত ১৯৬৯-৭০’র মোট উৎপাদনের ৬০ শতাংশ অর্জন করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। এর মধ্যে সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন মেরামত, সাবস্টেশন মেরামত বা পুনর্গঠন করার কাজও চালিয়ে যেতে হয়। ঈশ্বরদী, উলন ও খিলগাঁও সাবস্টেশন মুক্তিবাহিনী যুদ্ধের অংশ হিসেবে ধ্বংস করে। অনেক সাবস্টেশন ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র পাকবাহিনী আত্মসমর্পণের আগে ক্ষতিগ্রস্ত করে যায়। দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধিরগঞ্জ, ভেড়ামারা, রূপগঞ্জ, দিনাজপুর ও মেহেরপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র মেরামত করে চালু করা হয়। ১৯৭২ সালে মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫০০ মে. ও. কিন্তু মাত্র ২০০ মে. ও. কার্যকরী ক্ষমতা ছিল।

বঙ্গবন্ধু দেশের উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ/জ্বালানির অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। ২৬ মার্চ ১৯৭২ সালেই তিনি ২৭ নম্বর প্রেসিডেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) স্থাপন করেন। দেশের পানিসম্পদ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পৃথক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিবেচনা করে তিনি তৎকালীন ওয়াপদাকে (WAPDA) দুটি বোর্ডে ভাগ করে দেন। ১৯৭২ সালের ১ মে প্রেসিডেন্ট অর্ডার ৫৯-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (ইচউই) তার যাত্রা করে। একই সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডও চালু হয়। সে সময়ে দেশের উন্নয়নে সরকারি সংস্থার ভূমিকা ও নেতৃত্বদানের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করার জন্য দ্রুত এ সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়।

তিনি শুধু কাঠামোগত পরিবর্তনই আনেননি। দেশের জ্বালানি সম্পদ আরোহণ, উৎপাদন, বিতরণের নীতিমালা তৈরি করে কীভাবে বিপুল পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ আনা যায় তার সম্বন্ধেও ভেবেছিলেন। ১৯৭৪ সালে পেট্রোলিয়াম অ্যাক্ট এ ভাবনা চিন্তারই ফসল। আমরা সবাই জানি, ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আরবের দেশগুলো তেল উৎপাদনে অবরোধ সৃষ্টি করে এবং ২ ডলার ব্যারেলের তেলের মূল্য ১২ ডলারে গিয়ে ঠেকে। বাংলাদেশের অর্থনীতি তখন সম্পূর্ণ তেলের ওপর নির্ভরশীল। এ মূল্যবৃদ্ধিতে দেশের আমদানি খরচের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শুধু তেল আমদানিতে চলে যেতে শুরু করে। এ রকম পটভূমিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৯৭৪ সালে পেট্রোলিয়াম অ্যাক্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরে তেল অনুসন্ধানে আমন্ত্রণ জানানোটা সাহসী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের পরিচায়ক। তিনি তখনই বুঝতে পেরেছিলেন তেল-গ্যাস-বিদ্যুতে বেসরকারি বিনিয়োগ লাগবেই। বঙ্গবন্ধু দূরদর্শী ছিলেন এবং দেশের স্বার্থে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও সাহসের অধিকারী ছিলেন। তিনি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সঠিকভাবে অনুধাবন করেছিলেন এবং তার সাশ্রয়ী সংস্থার জন্য ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৪-এর পেট্রোলিয়াম অ্যাক্টের আওতায় এ্যাশল্যান্ড, আরকো (ARCO), বিওডিসি (জাপান), ইউনিয়ন অয়েল, কানাডিয়ান সুপিরিয়র অয়েল ও ইনা নাপটাপ্লিন নামের ছয়টি কোম্পানিকে বঙ্গোপসগারে মূলত তেল অনুসন্ধানের জন্য অনুমতি দেয়া হয়। এ কোম্পানিগুলো প্রায় ৩২ হাজার কিমি গ্র্যাভিটি, ম্যাগনেটিক ও সাইসমিক সার্ভে করে এবং সাগরে মোট সাতটি কূপ খনন করে। ইউনিয়ন অয়েল ১৯৭৭ সালে কুতুবদিয়া গ্যাস খনি আবিষ্কার করে। ১৯৭৮ সালে এ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ ত্যাগ করে। যুদ্ধ-পরবর্তী গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বঙ্গবন্ধু রাশিয়া সরকারেরও সাহায্য নেয়।

বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জ্বালানি সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। পাকিস্থান শেল কোম্পানি ১৯৬৭-৬৯ সালে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। স্বাধীনতাযুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা এবং চাহিদার ঘাটতি থাকাতে শেল কোম্পানি তাদের মালিকাধীন ৫১ শতাংশ গ্যাস বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিক্রির প্রস্তাব করে। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে সে সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি সম্পূর্ণ তেল নির্ভরশীল এবং গ্যাসের কোনো বাণিজ্যিক ব্যবহার নেই বললেই চলে। একই সময় বাংলাদেশ তেল আমদানিতে প্রচুর বৈদেকি মুদ্রা ব্যয় করছে। শেল কোম্পানির গ্যাসক্ষেত্র বিক্রির প্রস্তাবটা এমন কিছু লোভনীয় ছিল না এবং টাকার মূল্যে তাদের চাহিদাটা সে সময়ের তুলনায় একেবারে কম ছিল না, যদিও তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে কিছুটা ছাড় দিয়েছিল। এ রকম পটভূমিতে ৯ আগস্ট ১৯৭৫, তার মৃত্যুর মাত্র ছয়দিন আগে, বঙ্গবন্ধু শেল কোম্পানির কাছ থেকে ৪ মিলিয়ন পাউন্ডে বাংলাদেশের পাঁচটি প্রধান গ্যাসক্ষেত্রের সম্পূর্ণ মালিকানা কিনে নেন। পাঁচটি ক্ষেত্র হলো তিতাস, হবিগঞ্জ, রশিদপুর, কৈলাসটিলা ও বাখরাবাদ। দ্বিতীয় পর্যায়ের পিএসসির মাধ্যমে উৎপাদনের আগ পর্যন্ত (২০০৭) বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ গ্যাস এ পাঁচ ক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত হতো। যখন গ্যাসের কোনো বাণিজ্যিক ব্যবহার নেই বললেই চলে, তখন এ গ্যাস ক্ষেত্রগুলো কেনার পেছনে শুধু যে ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবহারের ধরন সম্বন্ধে দূরদর্শিতা ছিল তা নয়, দেশের সম্পদ দেশের মালিকানায় ফিরিয়ে নেয়াটাও একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। আশির দশকের মাঝামাঝি যখন বাংলাদেশ তেল থেকে গ্যাসের ব্যবহারে সরে আসে, তখন থেকেই অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি শুরু। এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ যা কিছু অর্জন করেছে তার পেছনে একক প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে গ্যাস সর্বোচ্চ ভূমিকা রেখেছে। বঙ্গবন্ধুর ক্রয়কৃত সে পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র এখনো অর্থনীতির চালনায় ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতার ফলাফল আজকে জাতি ভোগ করছে।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে, বর্তমানে আমরা জ্বালানি ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন হলেও প্রায় একই মাত্রার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছি। দেশ ক্রমেই আমদানীকৃত জ্বালানি নির্ভর হয়ে উঠছে, যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দেশে প্রমাণিত গ্যাসভাণ্ডার দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে সব ধরনের দেশীয় জ্বালানির অনুসন্ধান এবং যতটুকু সম্ভব জ্বালানি আত্মনির্ভরতা তৈরির জন্য বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা, চেতনা ও দূরদর্শিতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা নিশ্চয়ই সঠিক পথে এগিয়ে যাব।

 

ম. তামিম: উপদেষ্টা, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার 

অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়