রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। গ্রাহকদের কাছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। দেশের জ্বালানি খাতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় গ্রাহকদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কীভাবে সম্ভব হবে বলে আপনি মনে করছেন?

বাংলাদেশ জ্বালানির ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। প্রতি বছরই ৮০-৯০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এলপিজি বাংলাদেশে জনপ্রিয় একটি কুকিং ফুয়েল। প্রতি বছর আমরা দেড় মিলিয়ন টন এলপিজি আমদানি করি। ফলে আমদানির ওপর নির্ভর করেই আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থাটা সাজাতে হচ্ছে। বর্তমান সরকারের অন্যতম সফলতা হচ্ছে শতভাগ বিদ্যুতায়ন। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে মূল কাঁচামাল হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রতিদিন তিন হাজার এমএমসিএফডি গ্যাসের প্রয়োজন। কিন্তু আমরা উৎপাদন করতে পারি ২ হাজার ৫০০ এমএমসিএফডি গ্যাস। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ৫০০ এমএমসিএফডির একটা ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার এলএনজি আমদানি শুরু করেছে। যা জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হচ্ছে। বিশ্ব বাজারে যুদ্ধের কারণে স্পট বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প মূল্যে কিনতে বর্তমানে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে।

এ কারণে বর্তমানে দেশব্যাপী লোডশেডিং করতে হচ্ছে। যুুদ্ধের প্রভাব কুকিং ফুয়েলের ওপরও পড়েছে। গত বছরের একই সময়ে তুলনায় ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত এলপিজির মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এ কারণে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়াতে হয়েছে। দাম বাড়ানোর কারণে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। বর্তমানে যা চাহিদা তার চেয়ে এলপিজি খাতের সক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বেশি। ফলে আমরা কুকিং ফুয়েলের পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্পের জন্যও জ্বালানি সরবরাহ করতে সক্ষম। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছুটা হলেও বাড়তি গ্যাস দেয়া সম্ভব হবে।

ক্ষুদ্র শিল্পে আপনাদের পক্ষে কীভাবে জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে?

ছোট আকারের বিস্কুট ও তৈরি পোশাক কারখানায় আমরা এলপিজি সরবরাহ করতে পারব। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কারখানায় স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি তৈরি করে কিংবা সিলিন্ডারের মাধ্যমে এলপিজি সরবরাহ করা সম্ভব। মোটরসাইকেল শিল্পে রঙ শুকানোর কাজে এলপিজির দরকার হয়। সেখানে আমরা এলপিজি সরবরাহ করছি। তৈরি পোশাক ও খাদ্য শিল্পেও আমরা জ্বালানি সরবরাহ করছি। বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন হয়। ফলে ক্ষুদ্র শিল্পে আমরা এলপিজি সরবরাহ করলে এখাতে সরকারের গ্যাস সাশ্রয় হবে, যা বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

আপনারা কি চুক্তিভিত্তিক নাকি স্পট মার্কেট থেকে এলপিজি আমদানি করে থাকেন। বর্তমানে আপনাদের সক্ষমতা কতটুকু?

আমরা স্পট ও চুক্তিভিত্তিক দুভাবেই এলপিজি সংগ্রহ করি। আমরা যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি করি তার ৯০ শতাংশই চুক্তিভিত্তিক। বর্তমানে আমাদের পর্যাপ্ত স্টোরেজ ক্যাপাসিটি রয়েছে। এক মাসের মতো এলপিজি আমরা মজুদ রাখতে পারি। ফলে এক মাস আমি আমদানি না করলেও বাজারে এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি হবে না।

বর্তমানে দেশের এলপিজি শিল্পের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাই?

বর্তমানে ২৫টির ও বেশি এলপিজি কোম্পানি রয়েছে এবং চাহিদার তুলনায় প্রায় সবারই সরবরাহের সক্ষমতা বেশি। বাংলাদেশের বাজারের সাইজ অনুযায়ী এতগুলো অপারেটর দরকার ছিলো না। একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে এর ফলে প্রাইস ওয়ার হচ্ছে।

বর্তমানে বছরে আনুমানিক ১৫ লাখ টন এলপিজি-র চাহিদা রয়েছে যা সিলিন্ডার মূল্য বিবেচনা করে ২৫ হাজার কোটি টাকার মতন হতে পারে।

আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর মাত্র ৩ বছরের মধ্যেই সকলের আস্থা অর্জন করে নিতে সক্ষম হয়েছে ফ্রেশ এলপি গ্যাস। সম্প্রতি রিটেইল সেলস-এর ভিত্তিতে দেশের এলপি গ্যাস ব্র্যান্ড-গুলোর মধ্যে অন্যতম শীর্ষে চলে এসেছে ফ্রেশ এলপি গ্যাস।

এলপিজি খাতের ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি কেমন?

পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এলপিজি ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সময় এলপিজি ব্যবসায় প্রায় শতভাগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মূলত আবাসিক পর্যায়ে নতুন করে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের কারণে এত বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এছাড়া সে সময় বেসরকারি খাতের বটলিং উদ্যোক্তারাও এগিয়ে এসেছিলেন। এরপর থেকে এ খাতে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ কমে গেছে। বর্তমানে এ খাতে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের এলপিজির বাজার ১৫ লাখ টন থেকে দ্বিগুণ বেড়ে ৩০ লাখ টনে উন্নীত হবে বলে আশা করছি।

বিভিন্ন সময়ে এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে গ্রাহকের নিরাপত্তার দিকটি কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?

বিভিন্ন কারণেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এলপিজি একটি নিরাপদ গ্যাস। আমরা সিলিন্ডারের নিরাপত্তার দিকে যথেষ্ট নজর রাখি। একটি এলপিজি সিলিন্ডারের মেয়াদকাল ২০ বছর। আমরা প্রতি ১০ বছর পর এটি পুনঃপরীক্ষা করি। যদি এতে কোনো ত্রুটি পাওয়া যায় তাহলে সেটি নষ্ট করে ফেলি। সিলিন্ডার রিফিলিংয়ের জন্য যখন আমাদের কাছে আসে, তখন স্বয়ংক্রিম সিস্টেমের মাধ্যমে সেটার চেকিং করা হয়ে যায়। বাসা-বাড়িতে এলপিজি দুর্ঘটনার পেছনে কারণ হলো সঠিক নিয়ম মেনে ব্যবহার না করা। নিয়ম হচ্ছে চুলা থেকে ন্যূনতম তিন ফুট দূরে সিলিন্ডার রাখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এটি মানা হয় না। আবার কখনো চুলার নব খুলে রাখা হয় কিংবা রেগুলেটার চালু থাকে। এসব বিধিনিষেধ প্রতিটি সিলিন্ডারের গায়ে ব্যবহার নির্দেশিকার মধ্যে দেয়া থাকে। মাঝে মাঝে আমরা সতর্কতামূলক প্রচার প্রচারণা করে থাকি। বিভিন্ন জায়গায় সেফটি ক্যাম্পেইনও করা হয়। বাংলাদেশে এলপিজি নিরাপত্তা নিশ্চিতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে তা পার্শ্ববর্তী আর কোনো দেশ করেনি।

আপনাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাই?

এক বছর ধরেই ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ফলে এ মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য কীভাবে লোকসান কমানো যায়। অন্তত পরিচালন খাতে ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। তা না হলে বিনিয়োগকারীরা এ খাতের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। পাশাপাশি বাজারে অবস্থান ধরা রাখা ও গ্রাহকদের সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও আমাদের লক্ষ্য।

এলপিজি খাতের উন্নয়নে সরকারের কাছে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

আমাদের একটি প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, আমরা বড় জাহাজে করে এলপিজি আনতে পারি না। এক্ষেত্রে যদি কয়েকটি কোম্পানি কনসোর্টিয়ামের ভিত্তিতে আমদানি করতে পারে তাহলে ব্যয় সাশ্রয় হয়। কিংবা সরকার যদি আমদানি করে আমাদের দেয় তাহলেও ব্যয় কমে যায়। তখন আমরাও সাশ্রয়ী মূল্যে গ্রাহকদের এলপিজি দিবে পারব। এছাড়া বর্তমানে আমাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের করারোপ করা আছে। এগুলো প্রত্যাহার করে যদি একটি নির্দিষ্ট ট্যারিফের আওতায় নিয়ে আসা যায়, তাহলে দেশের এলপিজি আরো এগিয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।

 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান রাহাত