স্বাধীনতার পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কতগুলো নীতি গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের সংবিধানে চার মূল নীতি যথা—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা সন্নি বিশিত করেন। তিনি বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা জাতীয়করণ করেন। এর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে দিলেন এবং রাষ্ট্রের লক্ষ্য কী সেগুলোকে সুনির্দিষ্ট করলেন। যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজে যখন বঙ্গবন্ধু সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন, তখন দেখা গেল দেশের ভেতরে একটা উগ্র মহল বিশেষ করে জাসদ, চীনাপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলো নাশকতার কাজে লিপ্ত হলো। বিভিন্ন জায়গায় হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগের মতো কর্মকাণ্ড শুরু হলো। সিরাজ সিকদারের বাহিনী, জাসদের বাহিনী, মাওলানা ভাসানীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা শুরু করেছিল। ’৭৪ সালে দেশে বন্যাজনিত কারণে ফসল কম উৎপাদন হলে দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধু আমেরিকার কাছ থেকে গম ক্রয় করেন। কিন্তু সে গমের জাহাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেয়ার কথা থাকলেও সেটি আর বাংলাদেশে আসেনি।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের স্ত্রী বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এমা রথচাইল্ড দুর্ভিক্ষের অর্থনীতি নামক একটি আর্টিকল লিখেছিলেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তৎকালীন সময়ে ওই গমের জাহাজটি সময়মতো বাংলাদেশে পৌঁছলে চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হতো না। কাজেই এটা মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য সরবরাহ বন্ধের কারণে এ দেশে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ঠিক ওই সময়ে সে পরিস্থিতিকে পুঁজি করে মওলানা ভাসানী, জাসদের রবসহ অনেকেই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা শুরু করে। তারা উগ্র স্লোগান দেয়ার পাশাপাশি দেশের মধ্যে অরাজকতা, অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করতে থাকে। এমনকি দেশের ভেতরে একটা পাকিস্তানি মডেলের রাষ্ট্র কায়েম করতে চেয়েছিল তারা। মুসলিম বাংলা কায়েমের নামে মওলানা ভাসানী সাম্প্রদায়িক স্লোগান দেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে খারাপ করার এ অপচেষ্টাকে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন।

’৭৪ সালের শেষদিকে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির নিরসন হয়। পরে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে আসতে থাকে। সে সময়ে বঙ্গবন্ধু মনে করলেন বাংলাদেশকে যদি দ্রুত উন্নয়নের দিকে নিতে হয়, তাহলে প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কাজেই তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিলেন। এর মধ্য দিয়ে সব রাজনৈতিক দল অর্থাৎ বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে তিনি শোষিতের গণতন্ত্রের তত্ত্ব হাজির করলেন। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলকে একটি প্লাটফর্মে নিয়ে সবাই মিলে দেশকে গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন। একটা জাতীয় দল গঠন করার কথা বললেন। বঙ্গবন্ধুর যে ব্যবস্থাটার কথা বলেছিলেন সেটি বিশেষ কোনো দলের না, সব দলের সমন্বয়ে। এর মধ্যে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সামরিক বাহিনীর লোক, সবাই এটার মধ্যে সমবেত হতে পারবেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ’৭৪ সালের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এ দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বা বাকশাল গঠনের কার্যক্রম শুরু করেন। বাকশালের অঙ্গ-সংগঠন হিসেবে কৃষক, ছাত্র, নারী, যুব, শ্রমিক—সবগুলোকে নিয়ে একদলীয় প্লাটফর্ম গড়ে তোলেন।

বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠনের ধারণা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন। তবে সেগুলোর ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই। বাস্তবে তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি যা ছিল, তখন সদ্য স্বাধীন অনেক দেশই এ ধরনের একদলীয় ব্যবস্থা এবং দ্রুত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে উত্তোরণের জন্য এ ধরনের পথ গ্রহণ করেছিল। বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল গঠন করেন তখন ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, নিকারাগুয়া, ঘানা, ইথিওপিয়া এক ধরনের বৈপ্লবিক রূপান্তরের জন্য পদক্ষেপ নিয়েছিল। তারা গতানুগতিক পুঁজিবাদী পথ পরিহার করে অপুঁজিবাদী পথে তাদের দেশকে অগ্রসর করার নীতি গ্রহণ করেছিল। বঙ্গবন্ধু তাদের দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন সেটা সরাসরি বলা যাবে না। সে সময়ের বিশ্ব পরিস্থিতি ও অন্যান্য দেশের যে অভিজ্ঞতা, সেখান থেকেই তিনি মনে করেছেন যে আমাদের দেশেও যদি পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে গতানুগতিক কমিউনিস্ট মার্কা সমাজতন্ত্র দিয়েও হবে না আবার পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়ও হবে না। এটা তার নিজস্ব উদ্ভাবন। তিনি নিজেই বলেছিলেন এটা বাংলাদেশের মাটি থেকে উদ্ভাবিত একটা সমাজব্যবস্থা, যার একদিকে বৈপ্লবিক গ্রাম পুনর্গঠনের কর্মসূচি, বাধ্যতামূলক সমবায়, অন্যদিকে শহরে শিল্প কারখানাগুলোকে উৎপাদনশীল করে তোলার ব্যবস্থা। তার ধারণা ছিল এভাবে করা সম্ভব এবং সন্ত্রাস, নৈরাজ্য বন্ধ করতে পারলে এ উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত সময়ের মধ্যেই হবে।

বাকশাল বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব উদ্ভাবন। ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আলজেরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ছিলেন হুয়ারি বুমেদিন। তখনকার দুনিয়ায় অনেক দেশে যেসব রাজনৈতিক দল স্বাধীনতা সংগ্রাম বা মুক্তির সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা দ্রুত সমাজতন্ত্র কায়েম করা বা দ্রুত দারিদ্র্য দূর করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিল। এসব দেশ মনে করেছে ব্যবস্থাটা পরিবর্তনের একটা পথ হতে পারে। ফলে বহুদলীয় গণতন্ত্র বাদ দিয়ে তারা একদলীয় শাসনের চিন্তাভাবনা করেছে। 

স্বাধীনতা উত্তরকালে দেশে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য কমে এসেছিল। সিরাজ সিকদার ধরা পড়লেন ও নিহত হলেন, জাসদের তৎপরতা অনেকখানি কমে গেল, মওলানা সাহেব ঘর থেকে বের হন না। হাজী দানেশ, আতাউর রহমান খান বাকশালে যোগদান করলেন। ফলে একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল যে ধরাটা অব্যাহত থাকলে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। যদিও পরে কী হতো সেটা আমরা জানি না। কারণ বঙ্গবন্ধু নিহত না হলে এবং দেশ যদি ওই ব্যবস্থায় এগোত তাহলে তখনই বলা যেত এটা ভালো নাকি মন্দ কোন ফল দিয়েছে! তবে লক্ষণ দেখা গিয়েছিল যে দেশ স্থিতিশীল উন্নয়নের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করা হলে এখন যে মধ্যম আয়ের দেশ সেটা আরো ২০-২৫ বছর আগেই পরিণত হতে পারত। কাজেই যারা বাংলাদেশ চায়নি, যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মানতে পারেনি, সেকুলার ডেমোক্রেসিকে মানেনি, বাঙালি পরিচয়কে মানেনি—সে পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ধারা ও তার অনুসারীরাই বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রের নায়ক। তারা বাংলাদেশকে ভাবাদর্শগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে মধ্যযুগে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। যদি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করাই তাদের একমাত্র মোটিভ হতো, তাহলে হত্যাকাণ্ডের পরে দেশকে সাংবিধানিক পথে নিতে পারত। কিন্তু সেটি তারা করেনি। তারা বাংলাদেশের মৌলিক যে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক চরিত্র, সেখানে আঘাত হানল।

বাকশাল নিয়ে আমার মূল্যায়নটা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু চেষ্টা করেছিলেন। তার ব্যক্তিগত ক্ষমতা কোনো বিষয় ছিল না। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি এবং জাতির পিতা, সে হিসাবে তার ক্ষমতার অভাব ছিল না। বঙ্গবন্ধু নিজের ক্ষমতার জন্য বাকশাল গঠন করেননি, এটা করেছিলেন দ্রুত বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য। আমার মতে, তার উদ্দেশ ছিল সৎ, সে উদ্দেশ্য সফল হয়েছে কি হয়নি সেটাও আমরা বলতে পারব না। কারণ সে সুযোগ তাকে দেয়া হয়নি। ওটা ছিল এক্সপেরিমেন্ট, কিন্তু সে এক্সপেরিমেন্টটা ফেলও করেনি, পাস করার সময় পায়নি। তাকে সময় দেয়া হয়নি।

নূহ-উল-আলম লেনিন: উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ