স্বাধীনতা উত্তরকালে যে কয়টি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনন্য অর্জন ঘটেছে, তার মধ্যে অন্যতম তৈরি পোশাক শিল্প খাত, যা আজ আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। খাতটি শুধু জাতীয় অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করেনি, একই সঙ্গে নিশ্চিত করেছে অগণিত মানুষের কর্মসংস্থান। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস এ শিল্পের জিডিপিতে অবদান ১১ শতাংশ।
পোশাক শিল্পের হাত ধরেই দেশের অর্থনীতিতে এসেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোয় প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সামনের সারিতে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৩০টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশকে ধরা হয়। এ সাফল্যের পেছনে, তথা আজকের এ বদলে যাওয়া বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে পোশাক শিল্প।
কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ পোশাক রফতানিতে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। আর ডেনিমে বাংলাদেশ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সব দেশকে পেছনে ফেলে প্রথম অবস্থানে। সরকারের সহযোগিতায় অতি শিগরিরই ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ শীর্ষস্থান অধিকার করবে বলে আমরা গভীরভাবে আশাবাদী।
গত ৫০ বছরে আমরা শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি মডেল অনুসরণ করেছি। এখন সময় এসেছে টেকসই উৎপাদনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য শিল্পে টেকসই প্রবৃদ্ধি অনুসরণ এবং একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল অর্জন করার—আগামী দিনে আমাদের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে, কারিগরি ও উদ্ভাবনী উৎকর্ষ এনে, শিল্প-শ্রমিক-সমাজ-পরিবেশের মধ্যে একটি সামগ্রিক ইকো-সিস্টেম এনে প্রবৃদ্ধির পরবর্তী মডেল নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের।
বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিজিএমইএ পোশাক শিল্পের টেকসই কৌশলগত রূপকল্প ২০৩০ প্রণয়ন করেছে। এ রূপকল্পের অভীষ্ট হচ্ছে মানুষ ও পরিবেশ অর্থাৎ এ সবুজ গ্রহকে বিপন্ন না করে শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করা, যা ইএসজির (এনভায়রনমেন্টাল সোশ্যাল গভর্ন্যান্স) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পোশাক শিল্পের কৌশলগত রূপকল্প ২০৩০-এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক:
২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন ৩০ শতাংশ হ্রাসকরণ: এ লক্ষ্য নিয়ে বিজিএমইএ ইউএনএফসিসিসির ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি চার্টার ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন"স্বাক্ষর করেছে। অঙ্গীকারটি বিজিএমইএর কৌশলগত টেকসই উন্নয়ন রূপকল্পে এক নম্বর পয়েন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আয়: আমরা এরই মধ্যে গত অর্থবছরে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানির মাইলফলক ছুঁয়েছি এবং আগামী দিনগুলোয় রফতানি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রয়াস নিচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার, সহযোগী ব্র্যান্ডগুলো এবং স্টেকহোল্ডারদের সহযোগিতায় ২০৩০ সালের মধ্যে রফতানি ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে সক্ষম হব।
সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানি: ২০৩০ সাল নাগাদ জ্বালানি ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপন্ন করা।
শিল্পের সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি: শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে আমরা এরই মধ্যে বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে পোশাক শিল্পের জন্য একটি উদ্ভাবন, দক্ষতা এবং পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র (সেন্টার অব ইনোভেশন, এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড ওএসএইচ) প্রতিষ্ঠা করেছি। আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে শিল্পের উৎপাদনশীলতা ৬০ শতাংশ বাড়াতে চাই।
“মেইড ইন বাংলাদেশ” ট্যাগ: ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি দেশে “মেইড ইন বাংলাদেশ” ট্যাগসংবলিত পোশাক পণ্য রফতানি করে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পদচিহ্ন ছড়িয়ে দেয়া। এরই মধ্যে পোশাক শিল্পে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
শতভাগ সুশাসন: সুশাসন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা যায় না। তাই আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে শিল্পে ১০০ ভাগ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
শতভাগ এসডিজি স্টেকহোল্ডার অংশীদারত্ব নির্ধারণ: আমরা একা পথ চলতে চাই না; একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য দেশ-বিদেশে সব সহযোগীর সঙ্গে অংশীদারত্বমূলক এবং দৃঢ় কাজের সম্পর্ক গড়তে চাই।
২০৩০ সালের মধ্যে রফতানি ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যে শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে এরই মধ্যে সরকারের সহায়তায় পণ্য বহুমুখীকরণ, বাজার বহুমুখীকরণ, ফাইবার বহুমুখীকরণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন, ইনোভেশন ও টেকনোলজি আপগ্রেডেশন এবং কস্ট-কম্পিটিটিভ হওয়ার মাধ্যমে ভ্যালু চেইনে এগিয়ে থাকার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
পণ্য বহুমুখীকরণ
২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালে আমাদের ১০টি পণ্য ছিল কটন টি-শার্ট, পুরুষ/ছেলেদের কটন ওভেন ট্রাউজার, মহিলা/মেয়েদের কটন ওভেন ট্রাউজার, কটন জার্সি এবং পুলোভার, এমএমএফ জার্সি ও পুলোভার, পুরুষ/ছেলেদের কটন ওভেন শার্ট, মহিলা/মেয়েদের কটন নিটেড ট্রাউজার, পুরুষ/ছেলেদের সিনথেটিক ওভেন ট্রাউজার, পুরুষ/ছেলেদের কটন নিটেড শার্ট এবং পুরুষ/ছেলেদের কটন নিটেড ট্রাউজার।
বৈশ্বিক বাজারে গুণগত মানসম্পন্ন স্পোর্টসওয়্যার, আউটারওয়্যার এ পণ্যগুলোর বিশাল চাহিদা রয়েছে এবং সে বাজারে আমাদের উপস্থিতি নিতান্তই নগণ্য। হাই-ফ্যাশনে সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হাই-এন্ড ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা যেতে পারে।
বাংলাদেশ যেহেতু এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হওয়ার পথে, তাই বৈশ্বিক নিয়মে কিছু পরিবর্তন আসবে। ২০২৬-এর পর ‘ডাবল ট্রান্সফরমেশন রুলস অব অরিজিন’ মেনে চলতে হলে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। টেক্সটাইল খাতের মধ্যে বিনিয়োগের জন্য অনাবিষ্কৃত ও অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত হচ্ছে ম্যান-মেইড ফাইবারভিত্তিক ইয়ার্ন এবং ফ্যাব্রিকস, যেমন পলিয়েস্টার, ভিসকস, স্প্যানডেক্স, মেলাঞ্জ প্রভৃতি। বিশ্ববাজারে কটন বস্ত্রের শেয়ার এবং পোশাকের ব্যবহার মাত্র ২৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের রফতানীকৃত তৈরি পোশাকের ৭৫ শতাংশ কটন পণ্যগুলোয় কেন্দ্রীভূত। সাম্প্রতিককালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের বড় ক্রেতা ইউরোপ ও আমেরিকার বাজার ধরার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। সংগতভাবেই উদ্যোক্তারা এ ক্ষেত্রের প্রতি তাদের মনোযোগ বাড়িয়েছেন। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বা ব্যতিক্রমী পোশাক তৈরিতে সদস্যদের প্রতিনিয়ত উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।
আমরা তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাত—যেমন সিরামিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, পাট, আইটি ইত্যাদির দিকে যেমন আমাদের মনোযোগ বাড়ানোর কথা বলছি। তবে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের মধ্যেও বহুমুখীকরণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সুতা, কাপড়, হোম টেক্সটাইল এবং বিশেষায়িত টেক্সটাইল ও ক্যাপের রফতানির পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়গুলোয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে, যা নিঃসন্দেহে আমাদের পণ্য বহুমুখীকরণ সম্ভাবনার বিষয়টি প্রমাণ করে।
বাজার বহুমুখীকরণ
বিজিএমইএ অ্যাপারেল ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে নতুন নতুন বাজার তৈরি ও আমাদের মূল বাজারগুলোয় কীভাবে রফতানি আরো বাড়ানো যেতে পারে, সে লক্ষ্যে কাজ করছে। গত দশকে বাজার সম্প্রসারণে আমাদের সফলতাও অনেক। যেখানে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারগুলোয় আমাদের তৈরি পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৪৮ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ৮ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে নতুন কয়েকটি বাজারের ওপর ভর করে দেশের প্রধান রফতানি পণ্য পোশাক খাত থেকে আয় আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মতো অপ্রচলিত বাজারে এই প্রথম ১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। জাপানে রফতানি গত বছর ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, এবার তা দেড় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
উদ্ভাবন, দক্ষতা এবং পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র (সেন্টার অব ইনোভেশন, এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড ওএসএইচ) প্রতিষ্ঠা এবং প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তনের সঙ্গে পোশাক শিল্প এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছে, যে শিল্পের প্রচলিত নিয়মগুলো খাটছে না, প্রায়ই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। শিল্পকে আরো এগিয়ে নেয়ার জন্য পণ্যেও ডিজাইন পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া, লিড টাইম কমানো, সর্বশেষ প্রযুক্তি গ্রহণ করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং কারখানাগুলোকে আরো টেকসই করার কোনো বিকল্প নেই। এ প্রচেষ্টাগুলো শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় জ্ঞানার্জনের জন্য আমরা উত্তরায় বিজিএমইএর প্রধান কার্যালয়ে নতুন সেন্টার ফর ইনোভেশন, এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ কেন্দ্রের লক্ষ্য পোশাক শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং করার মাধ্যমে দক্ষতার উন্নয়ন, পোশাক শিল্পের টেকসই রূপকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো।
কেন্দ্রটি পোশাক কারখানাগুলোকে অটোমেশন, থ্রিডি ডিজাইনিং, উদ্ভাবন, সর্বোত্তম শিল্প প্রকৌশল প্রক্রিয়াগুলো গ্রহণ এবং অনুশীলন, ডিজিটাল ম্যানুফ্যাকচারিং বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জন এবং মডিউলার প্রক্রিয়াগুলো অনুপ্রাণিত করার জন্যও কাজ করবে।
টেকনোলজি আপগ্রেডেশন
বিশ্ব বাণিজ্যপটে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। বাংলাদেশসহ প্রতিটি দেশ, সরকার ও সমাজ নতুন প্রযুক্তির অপ্রতিরোধ্য গতির কারণে নাটকীয় পরিবর্তনের সম্মুখীন হচ্ছে। এ প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান এবং এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ আমাদের সবার সামনে আসছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে এরই মধ্যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে প্রবেশ করেছে, আধুনিক স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচলিত উৎপাদন এবং শিল্প ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণের প্রক্রিয়া চলমান। প্রতিটি কারখানাই এখন অটোমেশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে পোশাক শিল্পে এ পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে পাঁচ-ছয় বছর আগে এবং এ প্রবণতা দিনে দিনে বাড়ছে।
পোশাক শিল্প নিরাপদ কর্মপরিবেশের রোল মডেলের তকমা পেয়েছে। তবে আমরা শুধু নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টির মধ্যেই আবদ্ধ থাকিনি। বরং সামাজিক ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন ও শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যাপক অগ্রগতিসহ অনেক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে একটি ট্রান্সপারেন্ট অর্থাৎ পরিচ্ছন্ন শিল্প গঠনে সক্ষম হয়েছি। বিশেষ করে গত দশকে নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি, সবুজ শিল্পায়ন, শ্রমিকের কল্যাণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিপুল অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এ অর্জনে উদ্যোক্তা, শ্রমিক ভাইবোন, সরকার, ব্র্যান্ড/ক্রেতা, উন্নয়ন সহযোগী ও সংশ্লিষ্ট অংশীদার সবারই অবদান রয়েছে।
সবুজ শিল্পায়ন
বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ২০০টি সবুজ কারখানার আবাসস্থল—সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি এবং শিল্পের সব অংশীজন আনন্দে আপ্লুত হয়েছি, গর্বে অভিভূত হয়েছি। এত বিপুলসংখ্যক সবুজ কারখানার উপস্থিতি বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশ্বে তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক পরিবেশবান্ধব কারখানার মুকুট এখন বাংলাদেশের। তার মানে সবুজ পোশাক উৎপাদন এবং পরিবেশগত সাসটেইনেবিলিটির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়।
আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্ব ও গৌরবের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ বিশ্বে সবুজ শিল্পায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। শুধু সর্বোচ্চসংখ্যক লিড প্রত্যয়িত পোশাক কারখানাই নয়, বিশ্বের সেরা পরিবেশবান্ধব শীর্ষস্থানীয় ১০০টি সবুজ কারখানার মধ্যে অর্ধেকরই অবস্থান বাংলাদেশে। বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি লিড গ্রিন কারখানার মধ্যে ১৩টি বাংলাদেশে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাংলাদেশ সবুজ শিল্পায়নের পথে তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। ২০২৩ সালে এখন পর্যন্ত ১৮টি কারখানা লিড প্রত্যয়িত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৩টি প্লাটিনাম ও পাঁচটি গোল্ড-রেটেড।
বিশ্বের বেশকিছু প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব স্থাপনার সনদ দিয়ে থাকে। তাদের মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি)। প্রতিষ্ঠানটি ‘লিড’ নামে পরিবেশবান্ধব স্থাপনার সনদ দেয়। লিড রেটিং সিস্টেম হচ্ছে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি কার্যকরী পন্থা, যা স্থাপনার পরিবেশগত মানের মূল্যায়ন এবং সেগুলোর টেকসইতা (সাসটেইনেবিলিটি) পরিমাপের কাজে ব্যবহার করা হয়। পরিবেশবান্ধব স্থাপনার জন্য শিল্পের মান হিসেবে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত এবং বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশে ব্যবহার হয়।
লিড রেটিং সিস্টেমটি ১১০ পয়েন্টের স্কেলের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। লিড সার্টিফিকেশনের চারটি স্তর রয়েছে। পয়েন্ট ৮০-এর ওপরে হলে ‘লিড প্লাটিনাম’, ৬০-৭৯ হলে ‘লিড গোল্ড’ ৫০-৫৯ হলে ‘লিড সিলভার’ ও পয়েন্ট ৪০-৪৯ হলে ‘লিড সার্টিফায়েড’ সনদ মেলে।
বাংলাদেশের ২০০টি গ্রিন পোশাক কারখানার মধ্যে ৭৩টি প্লাটিনাম ক্যাটাগরিতে, ১১৩টি গোল্ড ক্যাটাগরিতে এবং ১০টি সিলভার ক্যাটাগরিতে, আর চারটি ‘লিড সার্টিফায়েড’ হিসেবে প্রত্যয়িত হয়েছে। আরো প্রায় ৫০০টি বাংলাদেশী কারখানা লিড সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এপিক গ্রুপ ও এনভয় লিগ্যাসি অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগ, ‘গ্রিন টেক্সটাইল লিমিটেড ইউনিট ৪’ নামক একটি বাংলাদেশী পোশাক কারখানা ১১০ এর মধ্যে ১০৪ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্বের সেরা পরিবেশবান্ধব কারখানার তকমা অর্জন করেছে।
উল্লেখ্য, যে গত বছরের জুনে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ফ্যাশন সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডেনমার্কের ক্রাউন প্রিন্সেস ম্যারি তার ভাষণে টেকসই ও সবুজ শিল্পায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, যা শুধু পোশাক শিল্প নয়, নিঃসন্দেহে আমাদের সবার জন্যই অত্যন্ত সম্মানের।
সার্কুলারিটি
পোশাক শিল্পের রূপকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি আমরা সার্কুলার ফ্যাশন বা সার্কুলারিটি নিয়েও কাজ করছি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে সার্কুলার ফ্যাশন মডেল প্রচারের জন্য এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। বিজিএমইএ দেশে সার্কুলার ফ্যাশন অনুশীলনকে সহায়তা করার জন্য একটি "সার্কুলার ফ্যাশন পার্টনারশিপ" প্রকল্প চালু করেছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো স্টেকহোল্ডাররা যাতে পারস্পরিকভাবে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং সর্বোত্তম অনুশীলনগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারে, সেজন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরি করা এবং সার্কুলার ব্যবসায়িক মডেলের প্রসার ঘটানো। এ মডেলের মাধ্যমে আমাদের দেশে পোশাক ও বস্ত্রখাতের বর্জ্যগুলোকে রিসাইকেল করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব। আরেকটি উদ্যোগ হলো সুইচ টু সার্কুলার ইকোনমি" প্রকল্প, যা জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউনিডো) এবং বাংলাদেশ সরকার দ্বারা সমর্থিত। প্রকল্পটির লক্ষ্য হচ্ছে, পোশাক কারখানায় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সার্কুলার ফ্যাশনসহ পোশাক খাতে টেকসই অনুশীলনের প্রচার করা। বেসরকারি খাতের বেশকিছু প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশে সার্কুলার ফ্যাশন অনুশীলনের প্রচার করছে।
মন্দার সময় ক্রেতারা আরো সাশ্রয়ী মূল্যে বিকল্পগুলো খুঁজছেন। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের অবশ্যই উৎপাদন পরিচালনা সুবিন্যস্তকরণ, বর্জ্য হ্রাসকরণ এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে আরো ভালোভাবে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে ব্যয় দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
রেসপন্সিবল বিজনেস হাব
আজকের দিনে ফ্যাশন বিশ্বের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাসটেইনেবল বিজনেস এনভায়রনমেন্ট। নতুন নতুন ডিউ ডিলিজেন্স গাইডলাইন আসছে। বিজিএমইএ জিআইজেডের সহযোগিতায় পোশাক খাতে মানবাধিকার, পরিবেশগত ডিউ ডিলিজেন্স (এইচআরইডিডি) শক্তিশালী করতে রেসপন্সিবল বিজনেস হাব চালু করেছে। এইচআরইডিডি একটি তথ্য কেন্দ্র হিসেবে আমাদের কারখানাগুলোকে মানবাধিকার এবং পরিবেশগত ডিউ ডিলিজেন্সের বাধ্যবাধকতা, চাহিদা ও মান বিষয়ে সর্বাধুনিক জ্ঞান ও নির্দেশনা প্রদান করবে। এটি পোশাক শিল্পে ডিউ ডিলিজেন্স ও সাসটেইনেবিলিটি বিষয়ে নতুন প্রবিধানগুলো গ্রহণ এবং মেনে চলার জন্য কারখানাগুলোর সক্ষমতা জোরদারকরণে সহায়তা করবে।
ওপরের কাজগুলো উদ্যোক্তারা নিজ উদ্যোগে করেছেন। তবে আমরা এখানেই থেমে যেতে চাই না। শিল্পের জন্য আরো কাজ করতে হবে।
যেসব ক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে হবে
কভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন আমরা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের গুরুত্ব এবং আমাদের শিল্পে এর প্রভাব দেখেছি। আমাদের অবশ্যই সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব প্রদান করতে হবে, যাতে সময়মতো অর্ডার সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা মেটানো যায়। এর মধ্যে লজিস্টিক উন্নয়ন, লিড টাইম কমানো এবং ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি উৎপাদন খরচ কমাতে, গুণগত মান উন্নত করতে, সাপ্লাই চেইনের দক্ষতা বাড়াতে, উদ্ভাবনের প্রচার এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। আপস্ট্রিম সাপ্লাই চেইনকে একীভূত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ আমদানীকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। এটি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যগুলোর প্রতিযোগী সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের একটি স্থিতিস্থাপক এবং টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।
মন্দার সময় ক্রেতারা আরো সাশ্রয়ী মূল্যে বিকল্পগুলো খুঁজছেন। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য পোশাক প্রস্তুতকারকদের অবশ্যই উৎপাদন পরিচালনা সুবিন্যস্তকরণ, বর্জ্য হ্রাসকরণ এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে আরো ভালোভাবে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে ব্যয় দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে এবং বাণিজ্য বাধা কমিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তার বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করতে হবে, যা বৈশ্বিক বাজারে তার পোশাক পণ্যের চাহিদা বাড়াতে এবং সহজে বাজারে অনুপ্রবেশে সহায়তা করতে পারে। যদিও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ উৎপাদন স্থান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অনেক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার পরও ক্রেতাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য আমাদের আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী ভোক্তারা ফ্যাশন শিল্পের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আরো সচেতন হয়ে উঠছেন এবং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পোশাকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা রয়েছে। জৈব কটন, পুনর্ব্যবহৃত (রিসাইকল্ড) উপকরণ ব্যবহার করে, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি টেকসই ফ্যাশন চেইন তৈরি করে ভোক্তাদের এ প্রবণতাকে পুঁজি করে আমরা সুবিধা পেতে পারি। আমাদের টেক্সটাইল ও পোশাক খাত থেকে বছরে পাঁচ লাখ টনের মতো ঝুট তৈরি হয়, যা রিসাইকেল করে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব, যা প্রকারান্তরে দেশজ প্রবৃদ্ধি আনবে। এ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রিসাইকেল শিল্পের সঙ্গে সংশিষ্ট সব প্রক্রিয়া, পণ্য ও সেবাকে শুল্ক ও ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা যেতে পারে।
সাসটেইনেবিলিটির মূলমন্ত্র হলো কেউ পিছিয়ে থাকেবে না, সবাই একসঙ্গে বেড়ে উঠবে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো কঠোর পরিশ্রম করা সত্ত্বেও বিভিন্ন বিধিবিধানের কারণে প্রচলিত ফাইন্যান্সিং স্কিমগুলো গ্রহণ করতে পারে না। এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে সহজে অর্থায়নের নিয়মিত স্কিমগুলো গ্রহণ করতে পারে এবং সাসটেইনেবিলিটি চর্চাগুলো গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখতে সমর্থ হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। একটি শক্তিশালী অর্থায়ন ব্যবস্থা পোশাক উদ্যোক্তাদের চাহিদা, কাঁচামালের দাম এবং মুদ্রা বিনিময় হারের ওঠানামার সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকিগুলো মোকাবেলা করতে সক্ষম করতে পারে। এটি ব্যবসায় স্থিতিশীলতা প্রদান করে এবং দীর্ঘমেয়াদে আরো কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
শিল্পের জন্য অব্যাহত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহের কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে রফতানি ত্বরান্বিত করার জন্য আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়াগুলো সহজীকরণ, বিশেষ করে কাস্টমস, বন্দর ও বন্ডসংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো আরো সহজ করা জরুরি।
সবশেষে বলতে হয়, দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী নীতিসহায়তা এবং নীতিসহায়তার স্থিতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই। যেসব নীতিসহায়তা এরই মধ্যে শিল্পের জন্য সহায়ক বলে প্রমাণিত, সেগুলোর ব্যাপারে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সমর্থন প্রদান জরুরি। তারা এ সংকটময় সময়ে আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশের শক্তিশালী উপস্থিতির জন্য কয়েক বছরের জন্য স্থিতিশীল রাজস্ব নীতি, আরো প্রণোদনামূলক স্কিম, রফতানির কাঁচামাল শুল্কমুক্ত বা কম করা, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে আর্থিক সহায়তা প্রদান প্রভৃতির কথা ভাবতে পারে।





