আরএমজি খাতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বিইউএফটি কেমন ভূমিকা রাখছে?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প খাতের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এ খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালে ঢাকার উত্তরায় একটি সুপরিসর ভবনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে বিআইএফটি নামে একটি ইনস্টিটিউট চালু হয় এবং এ প্রতিষ্ঠানে টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট সেক্টরের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়। তবে গার্মেন্টস সেক্টরে চাহিদার তুলনায় দক্ষ জনবল সরবরাহ নিশ্চিতকরণে ওই ইনস্টিটিউটে বরাদ্দকৃত সিটস্বল্পতার দরুণ এ সেক্টরে দক্ষ জনবলের ঘাটতি মেটাতে দারুণ বেগ পেতে হচ্ছিল। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের রফতানি বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল ঘাটতি পূরণ এবং বিদেশী বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগকে আরো এগিয়ে নেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মানের নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিইউএফটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা নিয়ে প্রস্তাবটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) কাছে বিধিবিধান মেনে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেয়া হয়। ফলে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি) নামে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০১২ সালের ১৪ মার্চ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে চাইলে দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদের বিকল্প নেই। দেশের গৌরব তৈরি পোশাক শিল্পের মানোন্নয়ন ও খাতটির বিদেশী জনবলের ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে এবং এ খাতের জন্য নিজ দেশের মানুষকে যুগোপযোগী কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে বিইউএফটিতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা এবং সার্টিফিকেট প্রোগ্রামগুলো চালু করা হয়েছে।
১. বিএসসি ইন অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (এএমটি)
২. বিএসসি ইন ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি
৩. বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং
৪. বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট
৫. বিএসসি ইন নিটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং
৬. বিএসসি ইন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং
৭. ব্যাচেলর অব অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট
৮. ব্যাচেলর অব আটর্স (বিএ) ইন ফ্যাশন স্টাডিজ
৯. বিএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং
১০. বিএসসি ইন এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স
১১. বিএ অনার্স ইন ইংলিশ
১২. বিবিএ
১৩. এমএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং
১৪. এমএসসি ইন ফ্যাশন ডিজাইন
১৫. এমবিএ ইন অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং
১৬. পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং সিস্টেম
১৭. পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন গার্মেন্টস বিজনেস ম্যানেজমেন্ট
১৮. পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট
১৯. পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং
২০. সার্টিফিকেট কোর্স ইন নিটওয়্যার মার্চেন্ডাইজিং
২১. সার্টিফিকেট কোর্স ইন সোয়েটার মার্চেন্ডাইজিং এবং
২২. সার্টিফিকেট কোর্স ইন ওভেন গামেন্টস মার্চেন্ডাইজিং
উল্লেখ্য, বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের বিষয়ে জনবল তৈরিতে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে গেলেও ইঞ্জিনিয়ারিং মার্চেন্ডাইজিং, ফ্যাশন ডিজাইন, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, প্রডাকশন ও কমপ্লায়েন্সসহ অনেক বিষয়ে এখনো দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া গ্র্যাজুয়েটরা এ ঘাটতি পূরণে কিছুটা ভূমিকা রাখছে এবং গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পের মানোন্নয়নে দেশের অর্থনীতির ভিতকে আরো মজবুত ও সুদৃঢ় করছে। বর্তমানে এখান থেকে পাস করা অনেক শিক্ষার্থী দেশী-বিদেশী গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, বায়িং হাউজ, ডিজাইন হাউজ, টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
তৈরি পোশাক শিল্পে নির্ধারিত রফতানি লক্ষ্যমাত্রায় পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিইউএফটিতে পোশাক শিল্পে কর্মরত মিড লেভেল ম্যানেজার/কর্মকর্তাদের বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে তিনটি প্রফেশনাল কোর্স চালু আছে। সেগুলো হলো: 1. PGD in Garments Business Management 2. PGD in Industrial Engineering & Manufacturing System 3. PGD in Supply Chain Management
এ কার্যক্রমগুলো রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং বর্তমানে উল্লিখিত তিনটি কোর্সে প্রতি বছর ১০৫ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করে। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি পোশাক শিল্পে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার উপযোগী উৎপাদন ও কর্মক্ষমতা সৃষ্টির প্রয়াস নেয়া হয়েছে এবং এর আওতাধীন কোর্সগুলো দেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল সেক্টরে প্রশিক্ষিত মিড লেভেল ম্যানেজমেন্টের জনবলের ঘাটতি মেটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আমি মনে করি, এ প্রশিক্ষণ চলমান থাকলে বিদেশী জনবলের ওপর এ সেক্টরের নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।
বিইউএফটিতে হাতেকলমে কাজ শেখার জন্য ল্যাব সুবিধা কেমন?
শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে শ্রেণীকক্ষ ও ল্যাবগুলোকে আধুনিক উপকরণ দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়েছে। বর্তমানে আধুনিক সরঞ্জাম সন্নিবেশিত ৭২টি শ্রেণীকক্ষ এবং ৫২টি ল্যাব রয়েছে। ল্যাবগুলো হচ্ছে: পদার্থ ল্যাব-৩, রসায়ন ল্যাব-৩, ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং ল্যাব-২, মেকানিক্যাল ল্যাব-১, ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ল্যাব-২, কম্পিউটার ল্যাব-২, কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন ল্যাব-২, প্যাটার্ন ল্যাব-৬, প্যাটার্ন ড্রেপিং-২, ইলাসট্রেশন ল্যাব-২, এসিটি ল্যাব-১, সারফেস অর্নামেন্টেশন ল্যাব-২, ফটোগ্রাফি ল্যাব-১, ডিজাইন স্টুডিও-২, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব-১, অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং ল্যাব-৬, স্পিনিং ল্যাব-১, ওয়েব নিটিং ম্যানুফ্যাকচারিং ল্যাব-১, ফ্যাব্রিক স্ট্রাকচার ডিজাইন ল্যাব-১, সার্কুলার নিটিং ল্যাব-১, সোয়েটার নিটিং ল্যাব-১, অ্যাডভান্স নিটিং ল্যাব-১, ডাইং ল্যাব-৩, টেক্সটাইল টেস্টিং ল্যাব-২ এবং অ্যাডভান্স রিসার্চ ল্যাব-১। এছাড়া একটি টেক্সটাইল মিউজিয়াম রয়েছে। এসব ব্যতীত প্রয়োজনীয় ও উন্নতমানের আরো বেশ কয়েকটি শ্রেণীকক্ষ এবং ল্যাবরেটরি স্থাপন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের ভিত্তিই হচ্ছে হাতেকলমে শিক্ষা, যা ল্যাবরেটরিগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। শ্রেণীকক্ষ ও ল্যাবগুলোয় সাজানো বিশেষ যন্ত্রপাতি দেখে এবং ইনস্ট্রাক্টরদের অধীনে সেগুলো নিয়ে কাজ করে হাতেকলমে শেখার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা। প্রজেক্ট ওয়ার্কের ড্রইং ডিজাইন ও ডিসপ্লের কাজগুলো ক্লাসরুমে এনে সাজিয়ে রাখতে হয়, যাতে শিক্ষকের উপস্থিতিতে সবাই সবার কাজ দেখার ও বিচার বিশ্লেষণের সুযোগ পায়। এভাবেই হাতে-কলমে শিখতে শিখতে ছাত্রছাত্রীরা প্রকৃত কর্মক্ষেত্রের জন্য তৈরি হয়ে যায়। এসবের পাশাপাশি বিইউএফটি প্রায় সব বিভাগের শিক্ষার্থীর জন্য দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক কারখানাগুলোয় ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট ও ইন্টার্নশিপ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বলা যায়, পুঁথিগত শিক্ষার চেয়ে হাতেকলমে শিক্ষার গুরুত্ব আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যের চাবিকাঠি।
আমাদের দেশে তরুণদের উচ্চশিক্ষা আর তাদের কর্মক্ষেত্রের মধ্যে প্রায়ই কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বিইউএফটি একটি বিশেষায়িত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আপনার শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছেন কি?
বিইউএফটি একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়, যা যোগ্য আরএমজি পেশাদারদের চাহিদা মেটাতে উপযুক্ত প্রোগ্রাম অফার করে। সে অনুযায়ী ক্রমবর্ধমান চাকরির বাজারের জন্য স্নাতকদের প্রস্তুত করছে। শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ছাত্র বিনিময় প্রোগ্রামের সুযোগ পায়। আরএমজি সেক্টরের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করানোর জন্য এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দ্বারা কারিগরি বিষয় ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত Seminar, Symposium, Workshop ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়। ইন্টার্নশিপ যাতে তার কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়, তেমন ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমকে IweB OBE (out come based educaton)-এর আলোকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। এর মূল লক্ষ্যই হচ্ছে শিক্ষা শেষে স্নাতকরা যেন যার যার বিশেষ বিষয়ে উপযুক্ত কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। বিইউএফটি স্নাতকদের পরিচয় করিয়ে দিতে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে Job Fair Reference to Industries-এর আয়োজন করা হয়ে থাকে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা শেষে স্নাতকরা যাতে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ পায় সেই লক্ষ্যে অনেকগুলো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিইউএফটির সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন পরিকল্পনার বিষয়ে উৎসাহিত করার জন্য নিয়মিত অনুপ্রেরণামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কর্মজীবনের জন্য স্নাতকদের প্রস্তুত করার জন্য এসবই চলমান উদ্যোগ। অনেক স্নাতক বর্তমানে পেশাগত জীবনে সফলতার সঙ্গে কাজ করছে এবং তাদের উদাহরণ বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। উল্লেখ্য, আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের নামকরা ব্র্যান্ড ও কোম্পানি যেমন ওয়ালমার্ট, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, এইচএনএম, লি অ্যান্ড ফাং, জারা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে বড় বড় পদে কাজ করছেন।
আরএমজি খাতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে বিদেশীরা কাজ করেন। দেশের তরুণরা সেসব পদে কাজের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন কি?
আমাদের তৈরি পোশাক খাতে অনেক বিদেশী নাগরিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছে। আমাদের দেশে যেভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে সেভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। দক্ষ জনবলের অনুপস্থিতিতে বিশেষ করে মার্চেন্ডাইজিং, ডিজাইন এবং মার্কেটিং, লিন ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রডাকশন প্ল্যানিং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, গার্মেন্টস কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সিস্টেম, ফ্যাব্রিক অপ্টিমাইজেশন ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং সে সঙ্গে অত্যাধুনিক মেশিন ও প্রযুক্তি ব্যবহারে কারখানার মালিকরা শূন্যস্থান পূরণে দেশের বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে। ফলে প্রচুর অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিইউএফটির সব শিক্ষা কার্যক্রম এসব ক্ষেত্রে দেশীয় তরুণকে প্রস্তুত করার লক্ষ্যে নিয়োজিত। উল্লেখ্য, বিইউএফটি ছাড়াও দেশের অন্যান্য বেশ কয়েকটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এ লক্ষ্যে তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় এবং এডিবির সহযোগিতায় এসইআইপি প্রকল্পের মাধ্যমে বিকেএমইএ নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামে কারখানাভিত্তিক আউটসোর্স প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মার্চেন্ডাইজিং, সিএসআর ও কমপ্লায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং এবং লিন ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রডাকশন প্ল্যানিং এবং সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, টেক্সটাইল টেস্টিং এবং ল্যাব ম্যানেজমেন্ট, ফায়ার সেফটি ম্যানেজমেন্ট এবং রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, মার্কেট অ্যানালাইসিস এবং এক্সপোর্ট প্রমোশন, কমার্শিয়াল অ্যাক্টিভিটিসের কৌশল, অপারেটর ট্রেনিং প্রোগ্রাম (নতুন প্রবেশকারী) এবং আপ-স্কিলিং ট্রেনিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, গার্মেন্টস কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সিস্টেম এবং ফ্যাব্রিক অপ্টিমাইজেশন এবং কাটিং টেকনোলজি ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া ইপিবির তত্ত্বাবধানে বিকেএমইএর ব্যবস্থাপনায় তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিক/কর্মচারীদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে BUFT Institute of Fashion and Technology নামে একটি ইনস্টিটিউট আছে। আমাদের নিজস্ব ডিজাইনে পোশাক রফতানির পরিমাণ কেমন? এক্ষেত্রে অগ্রগতি আনতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?
পোশাক শিল্পে প্রথম দিকে ক্রেতা ডিজাইনের স্যাম্পল সরবরাহ করত আর আমাদের ফ্যাক্টরিগুলোতে পোশাক তৈরি করে তা রফতানি করত। কিন্তু বর্তমানে এর পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের দেশে পোশাক শিল্পের ফ্যাশন ডিজাইনাররা প্রতিনিয়ত আমাদের আবহাওয়া, সংস্কৃতি ও রুচির সঙ্গে মানানসই নতুন পোশাক তৈরি করে চলেছেন। আবার বিদেশী ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিজাইনিং অনুযায়ী পোশাক তৈরির পাশাপাশি বিদেশীদেরও নিজস্ব ডিজাইন অফার করে। ক্যারিয়ার হিসেবে বাংলাদেশে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। ফ্যাশন ডিজাইনে বিইউএফটি গ্র্যাজুয়েটরা পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর নিজেদের উদ্ভাবিত ডিজাইন ক্রেতার থেকে অনুমোদন নিয়ে সেগুলো অনুযায়ী পোশাক তৈরি করে পণ্য রফতানি করে। আরেকটা ভালো দিক হলো এখন ছোট-বড় সব ফ্যাক্টরিতে আরঅ্যান্ডডি টিম আছে, যারা প্রতিনিয়ত প্রডাক্ট ডেভেলপ করে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করার পাশাপাশি অনেক ফ্যাশন ডিজাইনার পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। ফ্যাশন ডিজাইনাররা কঠোর পরিশ্রম করলে খুব সহজেই দেশের বড় বড় টেক্সটাইল শিল্প, পোশাক শিল্প, বায়িং হাউজ, বুটিক হাউজের পাশাপাশি বিদেশী পোশাকের ব্র্যান্ড হাউজে কাজ করার সুযোগ পান।
বিইউএফটি থ্রিডি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে থ্রিডি ডিজাইনের জন্য নিজস্ব থ্রিডি ডিজাইন ল্যাবসহ আধুনিক যন্ত্র-সরঞ্জাম এবং উপকরণ দিয়ে সন্নিবেশিত শ্রেণীকক্ষ ও ল্যাবের মাধ্যমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। এছাড়া বিইউএফটি শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশের বড় বড় এক্সপো বা ফ্যাশন মেলায় অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে ফ্যাশন সম্পর্কে ধারণা পায়, যা পরবর্তী সময়ে নতুন ফ্যাশন তৈরি করতে সহায়তা করে। দেশী ও বিদেশী বড় বড় শহরে ফ্যাশন শোতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে এবং ক্রেতাদের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ স্থাপন করা যায়।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটরা করপোরেট, ব্যাংক বা অন্য সেক্টরে যেতে যতটা আগ্রহী তেমনটা আরএমজি সেক্টরের ক্ষেত্রে নয়। দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী এ খাতের ক্ষেত্রে এমনটা কেন ঘটছে বলে আপনি মনে করেন?
প্রফেশনাল প্রোগ্রামে অধ্যয়ন করাই হলো একজন ছাত্রের জন্য রিয়েল টাইম ইনভেস্টমেন্ট। তাই শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত চাকরির জন্য বেশি ঘোরাঘুরি করতে হয় না। আরএমজি সেক্টরে যোগ্য স্নাতকদের উচ্চ চাহিদা বিবেচনা করে, অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের আরএমজি প্রোগ্রামে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন, তারা ডিগ্রি শেষ করার পরে সহজে পেশাদার জীবনে প্রবেশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক শিক্ষা, ল্যাব টাস্ক, বিভিন্ন ইভেন্ট, ফ্যাক্টরি ভিজিট, ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম ইত্যাদির মাধ্যমে পেশাদার জীবনের আভাস পাওয়ার সুযোগ পায়। কঠোর অধ্যয়নের পরে শিক্ষার্থীরা জীবনের জন্য অনুপ্রাণিত হয়। বলা যেতে পারে যে তার পরও এ বিশাল সেক্টরের জন্য স্নাতকের সংখ্যা যথেষ্ট নয় এবং তাদের অনেকে আবার বস্ত্র শিল্প-সংক্রান্ত পেশায় নিয়োজিত হতে চান না। তার পরও বলা যায়, আরএমজি সেক্টরে কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।
গুরুত্বপূর্ণ এ রফতানি খাতের জন্য সামনের দিনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।
তৈরি পোশাক খাত অল্প সময়ের মধ্যে একটি বিশাল শিল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা রফতানি আয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উৎস হিসেবে আমাদের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হলেও আরএমজি সেক্টরের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি দেখে বৃহৎ কর্মীবাহিনী এ শিল্পে নিজেদের সম্পৃক্ত করছে। এ শিল্পের প্রতিকূল প্রভাব বিভিন্ন দিক থেকে আসে। রফতানি খাতের জন্য পোশাক শিল্পের পণ্য বৈচিত্র্য আনার জন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দেশের টেক্সটাইল শিল্পকে আরো বিশেষায়িত কাপড়ের উৎপাদনে সক্ষম করার জন্য উদ্যোগ নেয়া জরুরি। নতুন যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের পাশাপাশি পোশাক উৎপাদনে সক্ষম আরো দক্ষ কর্মী বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। তৈরি পোশাক যাতে বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন ব্র্যান্ডের চাহিদা মেটাতে পারে তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ডিজাইন উভয় ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন। দেশের সাপ্লাই চেইন অবকাঠামো, বিশেষ করে লজিস্টিকস এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে উন্নতি করার প্রয়োজন। পোশাক শিল্পে বৈচিত্র্য ও উদ্ভাবনকে সমর্থন করে এমন নীতিগত পদক্ষেপের জন্যও আমাদের কাজ করতে হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ, কর ও ঋণের সুদসংক্রান্ত জটিলতা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পোশাক শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা বা সেসবে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সংকটকালে সব শিল্পের মতো পোশাক শিল্প খাতেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বাজার এবং পণ্য বৈচিত্র্যায়ণে মূলধনের জোগান ইত্যাদি অনেক রকম চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষায়িত আরএমজি শিল্প অঞ্চল তৈরির মাধ্যমে টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যথেষ্ট শক্তি ও উপযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনার মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে টেকসই এবং লাভজনক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টেকার উপযোগী সক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে এমন দক্ষ কর্মশক্তি তৈরির জন্য কারিগরি শিক্ষা সুবিধা স্থাপন করতে হবে।





