স্বাধীনতার আগে গাজীপুরের টঙ্গীতে গড়ে ওঠে অনেক ভারী শিল্প-কারখানা। সে সময় দেশের অন্যতম একটি শিল্প এলাকা হিসেবে টঙ্গীর পরিচিতি ছিল মানুষের মুখে মুখে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে এ শিল্প এলাকায় নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। তবে ভারী বা মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সে সময় এ শিল্প এলাকায় গার্মেন্ট বা তৈরি পোশাক কারখানা গড়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বৃহদাকারের টেক্সটাইল কারখানা গড়ে উঠলে এখানে তৈরি পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হতে থাকে। আশির দশকের শুরুতে টঙ্গীর পাগার এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় টঙ্গী বিসিক শিল্পনগরী। সরকারিভাবে প্লট দেয়া হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় আগ্রহী শিল্প মালিকদের। সে সময়ই এ শিল্পনগরীতে গড়ে ওঠে বেশকিছু পোশাক কারখানা। সে সময় দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানা ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক। টঙ্গী বিসিক শিল্পনগরীর পর পরই ১৯৮৫ সালে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে গড়ে ওঠে আরেকটি বিসিক শিল্পনগরী। সেখানেও গড়ে তোলা হয় বেশকিছু পোশাক কারখানা। এভাবেই আশির দশকের মাঝামাঝিতে এসে গাজীপুরে গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক তৈরি পোশাক কারখানা ।
গাজীপুরে পোশাক কারখানা গড়ে তোলার হিড়িক পড়ে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে শেষ সময় পর্যন্ত । এ সময়ের মধ্যে এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পোশাক কারখানা গড়ে ওঠে, যার ধারাবাহিকতা চলতে থাকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। যদিও এখনো কোনো কোনো এলাকায় নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠছে, তবে এর পরিমাণ খুব কম। বলা যায় ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গাজীপুরে গার্মেন্ট কারখানা গড়ে ওঠার সুবর্ণ সময় ছিল। এ খাতসংশ্লষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালের বন্যার ঘটনা গাজীপুরে পোশাক কারখানা গড়ে তোলার পেছনের অন্যতম কারণ। দেশের পোশাক কারখানা মূলত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক ছিল। কিছু কারখানা গড়ে উঠেছিল চট্টগ্রামে। কিন্তু ১৯৮৮ সালের বন্যায় যখন সারা দেশ তলিয়ে যায়, সে সময় রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এ জেলায় বন্যার তেমন কোনো ছোঁয়া লাগেনি। ভৌগোলিকভাবে এ জেলা টেকটিলা বা উঁচু মাটির হওয়ার কারণে সে সময়কার ভযাবহ বন্যা এ জেলার উঁচু ভূমি ডোবাতে পারেনি। পুরো জেলাটি ছিল সে সময় বন্যামুক্ত একটি অঞ্চল। বিষয়টি নজর কাড়ে পোশাক খাতসংশ্লিষ্টদের।
সে সময় গাজীপুর জেলা শহর ও উপজেলা সদরগুলো ছাড়া বেশির ভাগ জায়গা ছিল উঁচু কৃষিজমি। সারা বছরই অনেক জায়গা থাকত অনাবাদি। আম, কাঁঠাল, লিচুসহ কিছু ফলদ গাছ, কিছু এলাকায় বনভূমি ও একফসলি জমিতে সামান্য চাষাবাদ হলেও কৃষকরা তেমন সুফল পেতেন না এসব জমি থেকে। তাই জমির দামও ছিল খুব কম। আর এ সুযোগই লুফে নেন শিল্প মালিকরা। তারা টঙ্গীর বাইরে গাজীপুর সদর, শ্রীপুর, মাওনা, কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, কালিগঞ্জ এলাকায় জমি কিনতে থাকেন। যারা কৃষিজমি থেকে তেমন কোনো ফসল পেতেন না বা কোনো লাভ হতো না, তারা প্রচলিত দামের চেয়ে বেশি দাম পাওয়ায় শিল্প মালিকদের কাছে জমি বিক্রি করতে শুরু করেন।
বন্যামুক্ত উঁচু জমির সহজলভ্যতা, তুলনামূলক কম দামে একসঙ্গে অনেক জায়গা কেনার সুযোগ, ঢাকার সন্নিকটে অবস্থান, অনুকূল পরিবেশ, যানজটমুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সর্বোপরি সস্তা শ্রমিকের সহজপ্রাপ্যতার কারণে দেশের বড় বড় পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা গাজীপুরকে বেছে নেন কারখানা স্থাপনের উপযুক্ত স্থান হিসেবে। এভাবেই ক্রমে ক্রমে পুরো গাজীপুর জেলা হয়ে ওঠে তৈরি পোশাক শিল্পের একটি হাব। কৃষিনির্ভর একটি জেলা পরিণত হয় দেশের বৃহত্তম পোশাক শিল্পনগরীতে।
দেশে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সহসভাপতি ও গাজীপুর চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার সাদাত সরকার জানান, একসময় গাজীপুরের টঙ্গী শিল্প এলাকায় বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানা ছিল। এছাড়া জেলার অন্যান্য স্থানে তেমন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল না। কিন্তু নব্বইয়ের পর থেকে গাজীপুরে শিল্প-কারখানা বিশেষ করে পোশাক কারখানা প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়ে যায়। বন্যামুক্ত উঁচু জমি, সে সময় কম দামে জমির সহজপ্রাপ্যতা, সস্তা শ্রমিক ইত্যাদির কারণে শিল্প মালিকরা এ অঞ্চলে তাদের কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাছাড়া রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী জেলা হওয়ার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি বাড়তি সুযোগ ছিল। ১৯৮৮ সালের বন্যায় গাজীপুরের জমিতে পানি ওঠেনি, যা শিল্প মালিকদের এ অঞ্চলে শিল্প স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করে। বর্তমানে গাজীপুর গার্মেন্ট কারখানার জন্য সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত। একসময়ের ঐতিহাসিক ভাওয়াল পরগনা বর্তমানে দেশের বৃহত্তম গার্মেন্ট শিল্পনগরী।
গাজীপুর শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে গাজীপুরে ১ হাজার ২৩৮টি তৈরি পোশাক শিল্প-কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে নিট ও ওভেন ছাড়াও রয়েছে সোয়েটার কারখানা। আর এসব পোশাক কারখানায় কাজ করছেন ১৩ লাখ ৬১৪ শ্রমিক, যাদের বেশির ভাগই নারী। এ খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৪ আর পুরুষ ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৮৪০। শিল্প পুলিশ জানায়, এসব কারখানার বাইরে আরো অনেক ছোট ছোট পোশাক কারখানা গড়ে উঠেছে গাজীপুরে, যার সঠিক পরিসংখ্যান নেই ।
রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর থেকে টঙ্গী ব্রিজ পার হয়ে স্টেশন রোড থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে সামনে এগোলে রাস্তার দুই পাশে দেখা যাবে অসংখ্য পোশাক কারখানা। টঙ্গীর কলেজ গেট পার হলে হাতের ডানে এবং বামে যতদূর চোখ যাবে, শুধুই চোখে পড়বে বড় বড় অট্টালিকা। এসব অট্টালিকায় অবস্থিত পোশাক কারখানা থেকেই শ্রমিকদের দক্ষ হাতের নিপুণ কারিশমায় তৈরি হচ্ছে পৃথিবীর বিখ্যাত সব ব্র্যান্ডের পোশাক। টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা, সেখান থেকে ময়মনসিংহের ভালুকা পর্যন্ত এলাকা, আবার জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে পশ্চিমের দিকে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ পর্যন্ত, অন্যদিকে টঙ্গী পুবাইল, কালিগঞ্জ, গাজীপুর সদর, শ্রীপুর, মাওনাসহ গাজীপুরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দেশসেরা পোশাক কারখানা। এসব পোশাক কারখানা থেকেই দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করে শ্রমিকরা তৈরি করছেন বিশ্বখ্যাত নানা ব্র্যান্ডের কাপড়। এসব রফতানি হয়ে শোভা পায় ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন বড় বড় সুপারশপ বা মার্কেটে।
প্রথমদিকে যেসব পোশাক কারখানা গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে রয়েছে গাজীপুরের বোর্ডবাজারে অবস্থিত ইস্ট ওয়েস্ট গার্মেন্টস, নাসা গার্মেন্টস, কোনাবাড়ীর ইসলাম গ্রুপ, বাসন এলাকার যমুনা গার্মেন্টস কারখানা, বেক্সিমকো, স্কয়ার, ভিয়েলাটেক্স প্রভৃতি। বর্তমানে দেশের শীর্ষ পোশাক কারখানাগুলোর সবই রয়েছে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায়। এসব কারখানার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কলম্বিয়া, মোহাম্মদী গ্রুপ, মণ্ডল গ্রুপ, তুসুকা, ডিবিএল গ্রুপ, ইপিলিয়ন, নোমান গ্রুপ, আমান গ্রুপ, সিলভার গ্রুপ, হা-মীম গ্রুপ, অনন্ত গার্মেন্টস, পলমল, এনভয় গ্রুপ, স্ট্যান্ডার্ড, ডার্ড, গিভেন্সি গ্রুপ, কেয়া, পারটেক্স গ্রুপ ইত্যাদি।
পোশাক কারখানাকে ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছে অনেক বড় বড় টেক্সটাইল, ডায়িং, স্পিনিং এমনকি অনেক কম্পোজিট কারখানা। এসবই গড়ে তুলেছেন এ খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা।
এ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পোশাক কারখানা থাকলেও ব্যতিক্রম রয়েছে একটি উপজেলা। কাপাসিয়া উপজেলায় কোনো পোশাক কারখানা গড়ে না উঠলেও সম্প্রতি একটি কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। গত বছর কাপাসিয়া উপজেলার আড়াল বাজার এলাকায় কারখানাটি গড়ে তোলা হয় মরিয়ম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে। তবে এখন আরো অনেক শিল্পপতি এখানে পোশাক কারখানা গড়ে তোলার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
পোশাক কারখানাকে ঘিরে গাজীপুরে আরো কিছু ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঝুট ও স্টক লটের ব্যবসা। প্রতিদিন পোশাক কারখানা থেকে যেসব ঝুট বের হয়, তা দিয়ে বর্তমানে রিসাইক্লিং করে তুলা, সুতা তৈরি করা হচ্ছে। অনেকে আবার রফতানিও করছেন। গাজীপুরের টঙ্গী ও কোনাবাড়ীতে ঝুটের বড় বড় গুদাম রয়েছে। অন্যদিকে বায়াররা যেসব শিপমেন্ট বাতিল করছেন, সেসব পোশাক কিনে নিয়ে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী স্টক লটের বিশাল বাণিজ্য গড়ে তুলেছেন। এসব পোশাকও মধ্যপ্রাচ্য, নেপাল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে ।
পোশাক কারখানাগুলোয় বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করেন। গাজীপুরের বাইরে থেকে এসেই মূলত এসব শ্রমিক কারখানাগুলোয় শ্রম দিচ্ছেন। বিশেষ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা এ জেলার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তাদের আবাসনের জন্য কারখানায় কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাদের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ভাড়া থাকতে হয়। এ সুযোগে এখানকার একশ্রেণীর জমির মালিক গড়ে তুলেছেন কম দামের আবাসন ব্যবস্থা। কলোনি কিংবা সস্তা আবাসনের পাশাপাশি এখানে বহুতল ফ্ল্যাট বাসাও গড়ে উঠেছে পোশাক কারখানাগুলোকে কেন্দ্র করে। এসব বাসা ভাড়া দিয়েও একশ্রেণীর বাসার মালিক বিপুল পরিমাণ টাকা উপার্জন করেন। এছাড়া পোশাক কারখানাকে কেন্দ্র করেই ছোট ছোট মুদি দোকান, শপিং মল, বড় বড় মার্কেট, বিপণিবিতান গড়ে তোলা হয়েছে। পোশাক কারখানার বিশাল কর্মযজ্ঞের পাশাপাশি স্থানীয় এসব ব্যবসা-বাণিজ্যও অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এ খাতের কর্মকাণ্ড নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান রাখার জন্য যেসব জিনিসকে গুরুত্ব দিতে হবে বলে এ খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তা হচ্ছে কোয়ালিটি পাওয়ার ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস। এছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা, যানজটমুক্ত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, ক্রেতাদেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কোন্নয়ন ইত্যাদি এ খাতের জন্য অত্যাবশ্যক।
লেখক: সাংবাদিক





