আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের গ্যাস খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোয় আমদানীকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোয় জোর দেয়া হয়েছে বেশি। এর বিপরীতে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তোলন বাড়ানোর ওপর বিনিয়োগ হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের গ্যাস খাতের উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। এ অর্থ দিয়ে গ্যাসের অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্যাসকূপ খনন ও এ খাতের জরিপসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার কথা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস খাতের চলমান সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ অর্থ দিয়ে যথাযথভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বাবদ কার্যকর বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে তা স্থানীয় সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতাও কমিয়ে আনবে। একই সঙ্গে গ্যাস খাতে ভর্তুকির চাপও অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে। 

দীর্ঘদিন ভর্তুকি বাড়িয়েও সাশ্রয়ী মূল্যে গ্রাহককে গ্যাস সরবরাহ করতে পারেনি বিগত সরকার। বরং বছরের পর বছর গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। আবার ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের অস্থিরতাসহ বহিঃপ্রভাবকের কারণে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে দেশের গ্যাস খাতের সরবরাহ পরিস্থিতি। এর প্রভাব পড়েছে গৃহস্থালি, শিল্প, পরিবহনসহ জ্বালানিনির্ভর সব খাতে। গত দেড় দশকে দেশে স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমে ব্যাপক মাত্রায় স্থবিরতা দেখা গেছে। জ্বালানি খাতের অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে এলএনজি আমদানি ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়। 

দেশে এখন গ্যাসের মোট সরবরাহের ৭৫ শতাংশ আসছে স্থানীয় উৎস থেকে, যার বার্ষিক পরিমাণ ৭৫০-৮০০ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। এ গ্যাসের অর্থমূল্য ৭-৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বাকি ২৫ শতাংশ (২০০-২৫০ বিসিএফ) আসছে আমদানির মাধ্যমে, যার পেছনে ব্যয় হচ্ছে কমপক্ষে ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা। আমদানির এ ব্যয় যুক্ত হয়ে গ্যাসের দাম বেড়ে যাচ্ছে কয়েক গুণ। ভর্তুকির মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় কিছুটা সমন্বয় করা গেলেও লোকসান গুনতে হচ্ছে পেট্রোবাংলাকে।

সংস্থাটি একসময় মুনাফায় ছিল। কিন্তু তা লোকসানি হয়ে পড়ে এলএনজি আমদানি শুরুর পর। দেশে জ্বালানি পণ্যটি আমদানি শুরু হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে পেট্রোবাংলা ২৩০ কোটি টাকা লোকসান করে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেড় হাজার কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ হাজার কোটি টাকার ওপর লোকসান করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

দেশে গ্যাস খাতে অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিনিয়োগ না হওয়ার বড় নিদর্শন হিসেবে খাতটিতে বরাদ্দ কম রাখার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিগত পাঁচ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫—এ পাঁচ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয় ৭ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। বরং জাতীয় বাজেটে যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল সংশোধিত বাজেটে কোনো কোনো অর্থবছর তা কমেও গেছে। এই পাঁচ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ১২১ কোটি টাকা।

দেশে ২০১৪ ও ২০১৫ সালের পর থেকে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস পেতে থাকে। গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধিতে ২০১৭ সালে মহাপরিকল্পনায় (গ্যাস সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান-২০১৭) প্রণয়ন করা হয়। ডেনমার্কের প্রকৌশল ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান র‍্যাম্বলকে দিয়ে সে সময় এটি করা হয়েছিল। মধ্যমেয়াদি এক প্রক্ষেপণে সংস্থাটি জানিয়েছিল, ২০২১ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর বাংলাদেশের চাহিদা পূরণে গ্যাস আমদানিতে ব্যয় করতে হবে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এ বিষয়ে র‍্যাম্বলের সুপারিশ ছিল, আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানির বিনিয়োগের অপেক্ষায় না থেকে এ অর্থ স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস অনুসন্ধান-উন্নয়নে কাজে লাগানো হলে এখান থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় সুফল পাওয়া যাবে। র‍্যাম্বলের ওই সুপারিশ সাত বছর পেরিয়ে গেলেও কাজে লাগানো যায়নি। বরং গ্যাসের সমস্যা সমাধানে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানির পথে হেঁটেছে জ্বালানি বিভাগ। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে শুরু হয় এলএনজি আমদানি।

দেশের জাতীয় গ্রিডে এলএনজির অবদান ২০-২৫ শতাংশ। বাকি ৭৫ শতাংশ জোগান দেয় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাস। অথচ এ গ্যাস আমদানি করতে গিয়ে পেট্রোবাংলার এলএনজি কিনতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ফেলেছে। এখন পর্যন্ত প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, পেট্রোবাংলা ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার ওপর এলএনজি আমদানি করেছে। এর মধ্যে শুধু ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত চার অর্থবছরে পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানি করেছে ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

২০২২ পঞ্জিকাবর্ষের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামে ব্যাপক উল্লম্ফন দেখা দেয়। সে সময় বাড়তি দাম ও ডলার সংকটের কারণে ছয় মাসের জন্য এলএনজি আমদানি বন্ধ রাখা হয়। এরপর তৎকালীন সরকার স্থানীয় পর্যায়ে ভূমি ও গভীর সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে, যা এখনো প্রক্রিয়াধীন। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস অনুসন্ধানে পেট্রোবাংলার চলমান ৪৮ কূপ খনন প্রকল্প এখন চলমান রয়েছে। তবে এর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ সেভাবে বাড়েনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে দীর্ঘ সময় ধরে অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল। এখন বাপেক্স গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ করলেও স্থানীয় গ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন গ্যাস কূপ খননে বিদেশী কোম্পানিকে যুক্ত করা হয়েছে। এসব কাজ বাপেক্সকে দিয়ে করালে যে ব্যয় হতো, এখন করতে হচ্ছে তার দুই-তিন গুণ বেশি দিয়ে। 

দেশে গ্যাসের চাহিদা এখন দৈনিক ৩৮০-৪০০ কোটি ঘনফুটের মতো। আর জাতীয় গ্রিডে এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৬০ কোটি ঘনফুট। গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বর্তমানে ৪৮টি কূপ খনন কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যা শেষ হবে আগামী বছর নাগাদ। স্থানীয় গ্যাসকূপ খননের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি সরবরাহের জন্য এনার্জি, কাতার ও ওমানের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করা হয়েছে। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে গ্যাস খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল আমদানিনির্ভরতাকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় বিনিয়োগের কথা বলা হলেও বরাদ্দের দিক থেকে আশাব্যঞ্জক কিছু দেখা যায়নি। গত এক দশকে স্থানীয় গ্যাস খাতে যে বিনিয়োগ হয়েছে, তাতে বড় কোনো গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি। এলএনজি বাদ দিলে জাতীয় গ্রিডে কতটুকু গ্যাসের জোগান বেড়েছে সেটি সরবরাহ চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। বরং গ্যাস আমদানি করতে গিয়ে সরকারকে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ) অর্থে হাত দিতে হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে দফায় দফায়। এসব করেও গ্যাসের জোগান বাড়ানো যায়নি। বরং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের পরিবর্তে ব্যবস্থাপনার সংকট তৈরি হয়েছে, ঝুঁকিতে পড়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা।’