গত চার-পাঁচ বছরে সারা বিশ্বে যে ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল, সেটি হচ্ছে ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রি। খুব স্বাভাবিক কারণেই এ আগ্রহ। যুক্তরাষ্ট্রের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ইতিহাসে প্রথম কোম্পানি হিসেবে ট্রিলিয়ন ডলার ‘ভ্যালুয়েশন’ অতিক্রম করেছে। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসকে পেছনে ফেলে পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। এদিকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ‘ভ্যালুয়েশন’ নিয়ে আমেরিকার বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কোম্পানি হচ্ছে আরেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান চীনের আলিবাবা। গত তিন বছরে ভারত, চীন আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে নতুন প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো সবচেয়ে বেশি গতিতে ‘ভ্যালুয়েশন’ বৃদ্ধি করেছে এবং যেগুলোয় বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি টাকা বিনিয়োগ করেছেন, তার প্রায় প্রতিটিই ই-কমার্স (ভারতে Flipkart, সিঙ্গাপুরে shopee, চীনে pindudumn অনেকে)
আমাদের দেশে ই-কমার্সের হাল-হকিকত
একথা না মেনে উপায় নেই যে, আমাদের দেশের ই-কমার্স আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে ও দেশে বর্তমানে ই-কমার্সের মার্কেট আকার বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ও গড়ে প্রতিদিন ৩০ হাজার কাস্টমার অনলাইনে প্রডাক্ট অর্ডার করে। বছর হিসাবে, ১৩-১৫ লাখ ব্যক্তি একবার হলেও অনলাইনে অর্ডার করে। ভারতে অনলাইন গ্রাহকের এ সংখ্যা ১০ কোটি। যেখানে ভারতে জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অনলাইন শপিংয়ে অভ্যস্ত, সেখানে আমাদের দেশে এখনো জনসংখ্যার ১ শতাংশের কম অনলাইন শপিং করে। সংখ্যাটা আসলেই অনেক কম। আরো যেই ব্যাপারটা উল্লেখযোগ্য সেটি হচ্ছে, দেশে প্রতিদিন যত জন অর্ডার করেন তার ৫০ শতাংশের বেশি করে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকে, যার পুরোটাই ইনফরমাল বা অপ্রাতিষ্ঠানিক। বেশির ভাগ ফেসবুককেন্দ্রিক বিক্রেতার কোনো ঠিকানা নেই, এজন্য গ্রাহক প্রতারিত হওয়ার ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে ও অর্ডারের ৪০-৪৫ শতাংশ হয় একশর কিছু বেশি চালু থাকা রেজিস্টার্ড ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান হতে। এগুলোর অফিস, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, রিটার্ন পলিসি আছে এবং যেকোনো ধরনের গ্রাহক সমস্যার সমাধানের জন্য এরা আইনগতভাবে বাধ্য থাকে। ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রি যত আগাতে থাকে, গ্রাহকরাও ধীরে ধীরে সচেতন হতে থাকে এবং তখন ইনফরমাল থেকে ফরমাল মাধ্যমেই বেশি কেনাবেচা হয়। আমাদের দেশেও শিগগিরই সে রকম হবে, এটি আশা করা যায়।
প্রতি বছর ই-কমার্স মার্কেট দেশে কি গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার কোনো ফরমাল স্টাডি বা সার্ভে না থাকলেও ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে যা বোঝা যায়, তা হচ্ছে গত দুই বছরে গড়ে ৭০-৮০ শতাংশ হারে এ মার্কেট বাড়ছে। আশপাশের দেশগুলোয় ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির প্রথম দিকে ২০০-৩০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল (এখন যদিও একটি পর্যায়ের পরে কিছুটা কমে এসেছে)। বাংলাদেশেও ২০০-৩০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব। যে কারণে এখনো এ প্রবৃদ্ধি কম, তা হচ্ছে এখনো দেশে ই-কমার্স খুব বেশি শহরভিত্তিক হয়ে আছে, বলতে গেলে ঢাকা শহরভিত্তিক। বর্তমানে ৭০ শতাংশের বেশি কেনাকাটা হয় ঢাকা (৫০ শতাংশের বেশি), চিটাগং ও সিলেট— এই তিন শহরে। ভারত বা চীনে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি অনলাইন কেনাকাটা হয় মূল শহরের বাইরে। এ ঘটনা একেবারেই অস্বাভাবিক নয়; কেননা বড় শহরগুলোয় লোকজন হাতের কাছেই অনেক শপিং মল বা দোকান পাচ্ছে, যেটি ছোট শহর বা গ্রামের লোকেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পায় না। তাই দেখা যায় যে মূল শহরের বাইরের লোকেরাই অনলাইন কেনাকাটায় বেশি আগ্রহী থাকে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের ই-কমার্সের একটি বড় বাধা ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেট শহরের বাইরে পণ্য পরিবহন /ডেলিভারি খরচ অনেক বেশি। বর্তমানে ২০০ টাকার একটি প্রডাক্ট উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছাতে ডেলিভারি চার্জ লাগে ১০০ টাকা বা এর বেশি। এই ডেলিভারি চার্জ ক্রেতার ওপরই পরে। এজন্য অনেক ক্ষেত্রেই শুধু উচ্চ ডেলিভারি চার্জের জন্য ক্রেতারা অনলাইনে অর্ডার করার ক্ষেত্রে অনাগ্রহী হয়ে পরেন। খুব ভালো একটা সমাধান হতে পারত দেশের সব পোস্ট অফিসকে যদি ই-কমার্স ডেলিভারির জন্য ব্যবহার করা যেত। এ বিষয়ে কিছু কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু চলছে অনেক ধীরগতিতে।
প্রত্যন্ত জায়গাগুলোয় ই-কমার্স ছড়িয়ে পড়ার আরো একটি বড় বাধা হচ্ছে ইন্টারনেটের খরচ। দেশের এখন সব জায়গায় ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে সত্য, কিন্তু ঢাকার বাইরে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় ইন্টারনেটের দাম (৩এ বা ৪এ) এখনো অনেক বেশি। ভারত বা চীনে, গত তিন-চার বছরে ই-কমার্সের যে বিরাট অগ্রগতি হয়েছে, তার দুটি বড় কারণ হচ্ছে, এই দুই দেশে ইন্টারনেটের দাম অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে এবং ডেলিভারি চার্জ দেশের যেকোনো জায়গায় অনেক কম।
গ্র্যাজুয়েট কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা
ই-কমার্স সেক্টর এমন একটি সার্ভিস সেক্টর, যা কর্মসংস্থানের জন্য বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন ধরনের লোকের কাজের সুযোগ হচ্ছে এখানে। সফটওয়্যার প্রকৌশলী, গ্রাফিক ডিজাইনার, কনটেন্ট রাইটার, ফটোগ্রাফার, মার্কেটিং/সেলস, হিসাবরক্ষণ, সাপ্লাই চেইন— সব ধরনের লোক একটি ই-কমার্স কোম্পানিতে লাগে। একটি ই-কমার্স কোম্পানি নিজে প্রত্যক্ষভাবে যত লোক নিয়োগ করে, তার থেকেও বেশি লোকের কাজের সুযোগ করে এ কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল অন্য নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানে। প্রডাক্ট সাপ্লাইয়ার/ম্যানুফ্যাকচারার, ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট প্রসেসিং কোম্পানি, ডিজিটাল অ্যাডভারডিসিমেন্ট কোম্পানি— এসব নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে ই-কমার্স ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে। বর্তমানে এ সেক্টরে প্রায় এক লাখ লোক ফুল-টাইম কাজ করছে। এর ৭০ ভাগের বেশি ন্যূনতম গ্র্যাজুয়েট। দেশের অন্য যেকোনো ইন্ডাস্ট্রির তুলনায় গ্র্যাজুয়েট কর্মসংস্থানের হার এ সেক্টরে নিঃসন্দেহে বেশি। দেশে এখন প্রতি বছর দুই-তিন লাখ গ্র্যাজুয়েট তৈরি হয়, যাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৫০ শতাংশের বেশি। এটি বর্তমানে একটি জাতীয় সমস্যা। ই-কমার্স সেক্টর দ্রুত বিকাশ লাভ করলে কিছুটা হলেও গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের সমস্যার সমাধান হতে পারে।
কে হবে ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির চালিকা শক্তি? বিদেশী কোম্পানি নাকি দেশীয় উদ্যোক্তা শক্তি
সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিতর্ক উঠেছে বিদেশী ই-কমার্স কোম্পানিগুলোর দেশে অবাধ ব্যবসা করার সুযোগ প্রদান নিয়ে। গত জুলাইয়ে সরকার ‘ডিজিটাল কমার্স’ নীতিমালা প্রণয়ন করে। এ পলিসির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বিদেশী কোম্পানিগুলোর ই-কমার্স ব্যবসা করতে হলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে করতে হবে (দেশীয় মালিকানা থাকতে হবে ন্যূনতম ৫১ শতাংশ)। দেশীয় উদ্যোক্তারা এ ব্যাপারে সমর্থন দেন। যদিও প্রশ্ন উঠেছে, এ সিদ্ধান্ত দেশে বিদেশী বিনিয়োগ সম্পর্কে যে উদার নীতি বিদ্যমান আছে, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা।
আসলে ব্যাপারটিকে সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা দরকার। প্রথমত. ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির স্বরূপটিই এমন যে, এক্ষেত্রে ‘মার্কেট মনোপলি’ হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে। যদি কোনো বিনিয়োগকারী মার্কেট তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে, তাহলে খুব সহজেই একচেটিয়াভাবে বাজার দখল করতে পারবে। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে এ ঘটনাই ঘটেছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যেমন ঘটেছে, তেমনি আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয়ও মার্কেট মনোপলি তৈরির ঘটনা ঘটেছে। ভারতে দেখা গেছে, অ্যামাজন আর ফ্লিপকার্ট (যা সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ালমার্ট কিনে নিয়েছে)— এ দুই কোম্পানি দেদার টাকা ঢেলে মার্কেট দখল করে ছোট ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কেট থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব বড় বিদেশী কোম্পানি যা করে, তা হচ্ছে কাস্টমারদের প্রডাক্ট ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রচুর ভর্তুকি। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই ঝুঁকি আছে এবং এই ঝুঁকিটা বিদেশী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ক্ষেত্রেই বেশি প্রযোজ্য (যেমন আলিবাবা, অ্যামাজন) কেননা মার্কেট মনোপলি তৈরির মতো টাকা ঢালার আর্থিক ক্ষমতা তাদেরই থাকে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, অন্য ইন্ডাস্ট্রিতে যেভাবে বিদেশী বিনিয়োগ আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, ই-কমার্সে সেটি ব্যতিক্রম কেন হবে? মার্কেট মনোপলির ব্যাপারটি ছাড়াও আরো কিছু কারণ আছে, যা আমাদের সার্বিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে আমাদের মার্কেটে বিদেশী ই-কমার্স কোম্পানিগুলোর অবাধ প্রবেশাধিকার। প্রথমত. বিদেশী ই-কমার্স কোম্পানিগুলো বিদেশী ব্র্যান্ড বা প্রডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। সাধারণত, বিদেশী ই-কমার্স জায়ান্ট কোম্পানি প্রথমে দেশীয় ব্র্যান্ড বা প্রস্তুতকারকদের প্রডাক্ট বাজারজাত করা দিয়ে তাদের ব্যবসা শুরু করে। কিন্তু যখন এই ই-কমার্স কোম্পানির ক্রেতাদের সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়, তখন দেখা যায় যে বিদেশী ব্র্যান্ড ও বিদেশী আমদানি করা প্রডাক্ট অনলাইনে বাজারজাত করা হয়ে যায় তাদের প্রধান ব্যবসা। ক্রেতারাও যেহেতু বিদেশী প্রডাক্ট খুব সহজে অর্ডার করতে পারে, এই ই-কমার্স প্লাটফর্মগুলোয়, তারাও ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ে বিদেশী প্রডাক্ট ক্রয়ে। একটি উদাহরণ দিলেই সহজে বোঝা যাবে, ২০১৭ সালের প্রথম দিকে চীনের আলিবাবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান Lazada.com কিনে নেয়। দ্রুতই দেখা গেল যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া আর থাইল্যান্ডের ক্রেতাদের কাছে Lazada.com-এর মাধ্যমে চীনের বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও প্রডাক্ট কোম্পানিগুলো তাদের প্রডাক্ট খুব সহজেই বিক্রি করতে পারছে। স্বভাবতই এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে এসব দেশের স্থানীয় ব্র্যান্ড আর ক্ষুদ্র পণ্য প্রস্তুতকারকদের ওপর। আলিবাবার নেটওয়ার্ক যত বিস্তার লাভ করছে, ততই এই স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যবসা হারাচ্ছে এবং ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। এসব দেশে স্থানীয় বাজার দখল করে ফেলছে এখন চীনের ব্যবসায়ীরা! আলিবাবার মতো বিদেশী ই-কমার্স জায়ান্টদের এ দেশে ব্যবসা একদিকে যেমন স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা ধ্বংসের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, অন্যদিকে অতিরিক্ত আমদানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ ফেলতে পারে।
দেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে— দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি লাভ-ক্ষতির নিরিখে কৌশলগত অবস্থান নিরূপণ করা এবং একই সঙ্গে লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার পরিবেশ তৈরিতে সঠিক নীতি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, বিডিজবস ও আজকের ডিল
পরিচালক, বেসিস






