বর্তমান বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে শনাক্ত করতে ‘সারভিল্যান্স ক্যাপিটালিজম’, ‘ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম’, ‘ওয়ার ক্যাপিটালিজম’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হচ্ছে। যদিও পুঁজিবাদের সঙ্গে নজরদারি, পরিবেশ বিপর্যয় এবং সন্ত্রাস-যুদ্ধ অবিচ্ছেদ্য, তবুও বর্তমান সময়ে পুঁজিবাদের গতিমুখ সুনির্দিষ্টকরণের জন্য এসব নামকরণের যথেষ্ট যৌক্তিকতা আছে। এগুলো বৈশ্বিক প্রবণতা হলেও বিভিন্ন দেশে শাসক শ্রেণীর গঠনের পার্থক্যের সঙ্গে এর মাত্রাভেদ আছে। বর্তমান প্রবন্ধে বাংলাদেশে এর বিকাশের ধরন নিয়ে সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা হয়েছে।

গত সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছে সব ক্ষেত্রে। গত দুই দশকে এর বিকাশমাত্রা দ্রুততর হয়েছে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ এখন অনেক বেশি বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে অঙ্গীভূত, বিশ্বায়িত; অনেক বেশি বাজারিকৃত। পুঁজির আধিপত্য অর্থাৎ মুনাফা ও বাজারকে লক্ষ্য করে উৎপাদনসহ নানা অর্থনৈতিক তত্পরতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এ ধারায় গত কয় দশকে জাতীয় আয়, খাদ্য-মত্স্য-সবজিসহ কৃষি উৎপাদন এবং গার্মেন্টসসহ শিল্প উৎপাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। নগরায়ণ, জৌলুস, যোগাযোগ বেড়েছে। পাশাপাশি দারিদ্র্য, বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতার ক্ষরণ চলছেই; সম্পদের কেন্দ্রীভবন, দখল, লুণ্ঠন, চোরাই টাকার দাপট শুধু অর্থনীতি নয়, রাজনীতি সমাজকেও শৃঙ্খলিত করে রেখেছে। গত কয় দশকে পরিবর্তন ঘটেছে বহু রকম, সম্ভাবনা নৈরাজ্য সংকট সবকিছুই এর মধ্যে পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশে সত্তরের দশকের শুরুতে প্রকাশিত একটি বইয়ের কথা টানা হয়, নাম— বাংলাদেশ: এ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট। এর লেখক ছিলেন ১৯৭২-৭৪ সালে ঢাকার বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি জাস্ট ফাল্যান্ড এবং একই সময়ে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জেআর পারকিনসন। এ গ্রন্থে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ নিয়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের দর্শন অনুযায়ী তারা পুঁজিবাদ বিকাশের সম্ভাবনাই বিচার করেছিলেন। তাদের বক্তব্যে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের এমনই অবস্থা যে, যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়, তাহলে বিশ্বের কোথাও উন্নয়ন কোনো সমস্যা হবে না।

কিন্তু এ রকম হতাশা জনগণের মধ্যে প্রধান ছিল না। মুক্তিযুদ্ধকালে ও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে হতাশার বদলে ছিল বিপুল প্রত্যাশা। এ প্রত্যাশার প্রতিফলন আছে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে। বস্তুত প্রথম থেকেই প্রত্যাশার বিপরীতে রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়। এই বৈপরীত্য নিয়ে সে সময়ের অন্য আরো কিছু বই আছে, যেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তত্কালীন পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান নূরুল ইসলাম এবং সদস্য রেহমান সোবহান ও আনিসুর রহমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বই।

যদি আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্লেষণ করি, যদি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনা করি, যদি স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রে যে তিনটি লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল সেই সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা-বর্তমান উন্নয়ন ধারায় কতটা অর্জিত হয়েছে তার বিচার করি তাহলে উচ্ছ্বাসের বদলে উন্নয়নের গতিধারা নিয়েই প্রশ্ন আসবে। যদি ধনিক শ্রেণীর আয়তন ও জিডিপি বৃদ্ধির পাশাপাশি কত নদী বিনাশ হলো, কত বন উজাড় হলো, বাতাস কত দূষিত হলো, মানুষের জীবন কত বিপন্ন হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা ও বৈষম্য কতটা বাড়ল, শ্রেণী-লিঙ্গীয়-ধর্মীয়-জাতিগত বৈষম্য নিপীড়ন কী দাঁড়াল তার হিসাব করি, তাহলে উন্নয়নের সংজ্ঞা পাল্টাতে হবে।

জিডিপি ও মাথাপিছু আয়: পরিমাপের সীমাবদ্ধতা

নানা প্রশ্ন থাকলেও উন্নয়ন পরিমাপে জিডিপি হিসাবই এখন পর্যন্ত প্রাধান্যে। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার এখন বার্ষিক ৭ শতাংশের বেশি এবং মাথাপিছু আয় এখন বার্ষিক ১ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। গত ১০ বছরের গড় হিসাবে বিশ্বের সবচাইতে উচ্চহারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটেছে নাওরু, ইথিওপিয়া, তুর্কমেনিস্তান, কাতার, চীন ও উজবেকিস্তানে। এক দশকের গড় হিসাবে দ্রুত প্রবৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০। তবে ২০১৭ সালের প্রবৃদ্ধি হার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, সমান ও কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি হার অর্জনকারী অন্য দেশগুলো হলো— ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, ভারত, কম্বোডিয়া, তানজানিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, আইভরি কোস্ট ও সেনেগাল।

একটি দেশে জিডিপি বেশি হলেও যে টেকসই উন্নয়ন দুর্বল হতে পারে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেলেও যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন হতে পারে— এ বিষয় স্পষ্ট করে অনেক গবেষণামূলক কাজ হয়েছে নানা দেশে। অমর্ত্য সেন এ বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নতুন প্রস্তাবনা হাজির করেছেন। মাহবুবুল হকের সঙ্গে ‘মানব উন্নয়ন সূচক’ ধারণা প্রবর্তন করেছেন, যার ভিত্তিতে জাতিসংঘ এখন নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। জোসেফ স্টিগলিজসহ মূলধারার বহু অর্থনীতিবিদ অর্থনীতি পরিমাপের পদ্ধতি হিসেবে জিডিপি ব্যবহারের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

প্রকৃতপক্ষে জিডিপি দিয়ে একটি দেশের আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যিক উৎপাদন, বিতরণ, পরিষেবার বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, কারণ যেকোনো লেনদেন ও বাণিজ্যিক তত্পরতা বৃদ্ধিতেই জিডিপি বাড়ে। কিন্তু এর জন্য সামাজিক ও পরিবেশগত কোনো ক্ষতি হলে তা হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। সে কারণে এর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা যায় না, সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি তাতে ধরা পড়ে না, অর্থনীতির গুণগত অগ্রগতিও বোঝা যায় না।

যেমন চোরাই অর্থনীতির তত্পরতাতেও জিডিপি বাড়ে, কিন্তু সমাজের বড় একটা অংশের জীবন-জীবিকা তাতে বিপদগ্রস্ত হয়। নদী-নালা, খাল-বিল, বন দখল ও ধ্বংসের মাধ্যমেও জিডিপি বাড়তে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে না, বরং অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও তার কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বড় দেখায়, জিডিপির অংক বাড়ে। এসব তত্পরতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পায় না, বরং জীবনমান বিপর্যস্ত হয়। শিক্ষা ও চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ এর ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জিডিপি বাড়ায়, কিন্তু তাতে বেশির ভাগ মানুষের বঞ্চনা বাড়ে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে গৃহীত বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, আর্থিক খাত থেকে অভাবনীয় মাত্রায় লুণ্ঠন ও পাচারও জিডিপি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এর সবকিছুই আমরা বাংলাদেশে দেখছি।

তাছাড়া যে সমাজে বৈষম্য বেশি, সেখানে মাথাপিছু আয়ের হিসাব বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। বর্তমান মাথাপিছু আয় হিসেবে আমাদের দেশে চার সদস্যের পরিবারের বার্ষিক গড় আয় হয় প্রায় ৭ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ মাসে প্রায় ৪৭ হাজার টাকা। তার মানে বাংলাদেশের সব নাগরিক শিশু-বৃদ্ধ-নারী-পুরুষ সবারই মাথাপিছু আয় মাসে এখন প্রায় ১২ হাজার টাকা! অথচ পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ জন মানুষের মাসিক আয় এর এক-তৃতীয়াংশের কম।

ধনিক শ্রেণী গঠন

সর্বশেষ আন্তর্জাতিক রিপোর্টে (ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮) ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থান লাভ করেছে, অর্থাৎ বিশ্বে ধনিক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। ধনী ব্যক্তি বলতে ৩ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার মালিকদের বোঝানো হয়েছে।

বাংলাদেশে পুঁজিবাদ বিকাশ প্রক্রিয়ায় এই ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এই গঠনের প্রথম পর্বে ছিল লাইসেন্স, পারমিট, চোরাচালানি, মজুদদারি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানার সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে এর সঙ্গে যোগ হয় ব্যাংকঋণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা লাভ। ব্যাংকঋণের সুবিধা বাড়ে, ঋণখেলাপিও বৃদ্ধি পায়। আশির দশকের শুরুতেই ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ঋণখেলাপিদেরই নতুন ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের মালিক হিসেবে দেখা যেতে থাকে।

বস্তুত বাংলাদেশে আশির দশক ছিল নব্য ধনিক শ্রেণীর ভিত্তি সংহত করার জন্য খুবই সুবর্ণ সময়। একদিকে তখন বড় দুর্নীতিবাজ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তির নেতৃত্বে স্বৈরাচারী শাসন, অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’র অধীনে সংস্কার কর্মসূচিতে ব্যক্তি-গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তরের নীতিমালার চাপ নব্য ধনিকদের জন্য খুবই অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও থিংকট্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারার মূল পথপ্রদর্শক ছিল বরাবরই। বর্তমান বাংলাদেশেও তাদের মতাদর্শই উন্নয়ন পথ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করছে। (আমার বেশ কয়েকটি বইতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ আছে। কয়টির নাম এখানে উল্লেখ করছি— কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ; বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিমুখ; বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র; আতঙ্কের সমাজ সন্ত্রাসের অর্থনীতি; উন্নয়ন বৈপরীত্য; পুঁজির অন্তর্গত প্রবণতা; ঈশ্বর, পুঁজি ও মানুষ।)

দুর্নীতি-লুণ্ঠন-ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের যে ভিত্তি তখন নির্মিত হয় তা দিনে দিনে আরো শক্ত হয়েছে। কেননা সে সময় বিন্যস্ত শাসন-দুর্নীতির পথেই পরবর্তী সরকারগুলোও অগ্রসর হয়েছে। তাই একদিকে দুর্নীতির শত হাত-পা বিস্তার এবং অন্যদিকে সম্পদ ও ক্ষমতায় কেন্দ্রীভবন দুটোই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। গত এক দশকে আমরা প্রবেশ করেছি পুঁজি সংবর্ধনের তৃতীয় পর্বে, যখন ব্যাংকঋণের মধ্যে সম্পদ লুণ্ঠন সীমিত নেই। আকাঙ্ক্ষা এবং সুযোগ দুটোই এখন অনেক বেশি। শুধু ব্যাংক বা শেয়ারবাজার নয়, সর্বজনের (পাবলিক) সব সম্পদই এখন এই শ্রেণীর লক্ষ্যবস্তু।

পুঁজি সঞ্চয়নের বিভিন্ন পর্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমর্থন বা অংশগ্রহণ বরাবরই ছিল নির্ধারক। মন্ত্রী, আমলাদের সহযোগিতা বা অংশীদারিত্ব ব্যবস্থারও তাই বিকাশ ঘটেছে নানাভাবে। লুম্পেন কোটিপতিদের সঙ্গে সঙ্গে লুম্পেন রাজনীতিবিদ ও লুম্পেন আমলার বিকাশ ঘটেছে; যারা বৃহৎ কমিশন, বড় আকারের ঘুষের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করে নতুন শ্রেণীতে উত্তরণ লাভ করছেন। আমলাতন্ত্র বস্তুত দেশী-বিদেশী করপোরেট গোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হস্ত। এর সঙ্গে যুক্ত আরেক গোষ্ঠীর কথা বলা দরকার, এরা লুম্পেন বিশেষজ্ঞ/কনসালট্যান্ট, যারা এসব কাজে বৈধতা দিতে নিজের বিশেষজ্ঞ পরিচয় বিক্রি করে, ধ্বংসের প্রকল্পকে উপকারী প্রকল্প বলে ঘোষণা দেয়, এর বদলে নিজেরাও দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হয়।

মুনাফার পাহাড়: প্রাণ প্রকৃতির বিপর্যয়

পুঁজি সংবর্ধনের বিদ্যমান ধারায় বাংলাদেশে প্রাণ প্রকৃতির অভূতপূর্ব বিপর্যয় হয়েছে। সামাজিক পরিবেশগত ফলাফল এবং জনস্বার্থ বিবেচনা না করে চটজলদি মুনাফার লক্ষ্যে সব অপতত্পরতা পরিচালনা বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শনে যৌক্তিক। অতীতে নদী-নালা, খাল-বিল নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে শত হাজার কোটি টাকার ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প করা হয়েছে, এখন দেখছি এর ফল— স্থায়ী জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন এবং পরিবেশ বিপর্যয়। দ্রুত মুনাফার লক্ষ্যে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ওষুধ, কৃত্রিম রঙ ব্যবহারের ফলে পানিদূষণ এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর বিষ প্রভাব পড়েছে মত্স্য, বৃক্ষ, তরুলতাসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর। উৎপাদন বেড়েছে কিন্তু নিরাপদ পানি ও খাদ্য বড় ঝুঁকির মধ্যে পতিত।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে জিডিপি যে বহুগুণ বেড়েছে তার হিসাব আমাদের কাছে আছে, কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশের প্রাণ নদীমালার কতটা জীবনহানি ও জীবনক্ষয় হয়েছে, সে ক্ষতির কোনো পরিসংখ্যানগত হিসাব আমাদের কাছে নেই। বাংলাদেশের নদীগুলো যেভাবে খুন হচ্ছে, কারণ হিসেবে ভাগ করলে এর পেছনে তিনটি উৎস শনাক্ত করা যায়। এগুলো হলো— প্রথমত. ভারতের অন্যায় একতরফা আগ্রাসী তত্পরতা। দ্বিতীয়ত. বাংলাদেশের নদীবিদ্বেষী উন্নয়ন কৌশল এবং তৃতীয়ত. দেশের নদী দখলদারদের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনসহ রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসাজশ।

নদীর মরণদশা হলে ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর লাভ। দুর্বল হয়ে গেলে নদী ক্রমাগত জমিতে রূপান্তরিত হয়। তখন তা দখল করা সহজ। নদী বাঁচলে তার মূল্য/টাকার অংকে পরিমাপ করা যায় না, কিন্তু মরলে তার থেকে উঠে আসা জমির দাম শত/হাজার কোটি টাকা হয়ে যায়। সেজন্যই নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন ধারা বহাল রাখতেই ক্ষমতাবানরা আগ্রহী।

সাধারণভাবে একটি দেশের প্রতিবেশগত ভারসাম্যের জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ ভূমি বনে আচ্ছাদিত থাকা দরকার বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই অনুপাত ৭ থেকে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ ফরেস্ট্রি মাস্টার প্ল্যানে বলা হয়েছে, ‘সমতলের শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ প্রাকৃতিক শালবন এবং পার্বত্যাঞ্চলের শতকরা মাত্র ১১ ভাগ বন এখনো টিকে আছে আর সেগুলোর অবস্থাও খুবই খারাপ।’ গত তিন দশকে একদিকে পাহাড় ও সমতলের বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক বনায়নের লক্ষ্যে বিদেশী ঋণের টাকায় এমন সব আমদানি করা গাছ লাগানো হয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে বেমানান এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিকর। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল প্রধানত বনাঞ্চল, সেখানে নিরাপত্তার নামে বনবিনাশ এবং পাহাড় দখল প্রক্রিয়া চলছে কয়েক দশক ধরে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতা, বনবিনাশ ও সামরিকীকরণের উৎসও একটি বিদেশী ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

‘উন্নয়ন’ নামে পুঁজি সংবর্ধনের উন্মাদনার সর্বশেষ শিকার সুন্দরবন, যাকে বলা যায় বাংলাদেশের সর্বশেষ প্রাকৃতিক বন। সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান অতুলনীয়, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচতে কোটি কোটি মানুষের অবলম্বন এই বন। তার ওপরই সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করতে উদ্যত হয়েছে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রকল্প।

প্রবৃদ্ধির আরেক পিঠ: দারিদ্র্য, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা

সরকারি জরিপ ও সংজ্ঞা অনুযায়ী আয় দারিদ্র্য রেখার নিচে যত সংখ্যক মানুষ ছিল তাদের সংখ্যা ২০০৫-এ ৪০ শতাংশ থেকে কমে ২০১০-এ ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৬ সালের জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, এই হার ২৪ দশমিক ৩। এক গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে, দারিদ্র্যসীমার জন্য সরকার যে ন্যূনতম দ্রব্যসামগ্রী নির্দেশ করে বর্তমান বাজার দামে হিসাব করলে সরকারি দারিদ্র্যসীমার আয়ের সঙ্গে তার তাত্পর্যপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়। তাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের হার অনেক বৃদ্ধি পায়।

বিশ্বব্যাংকের যে মানদণ্ড ব্যবহার করে দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়, তা মানদণ্ড হিসেবে খুবই দুর্বল, খণ্ডিত এবং সামান্য পরিবর্তন করলেই দারিদ্র্যরেখার নিচের মানুষের অনুপাত তাত্পর্যপূর্ণভাবে বেড়ে যায়। বাংলাদেশের ওপর বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুসারে, যদি আমরা দৈনিক মাথাপিছু আয় ১ দশমিক ৯ ডলারকে দারিদ্র্যরেখা বলে ধরি তাহলে দারিদ্র্যে থাকা মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় শতকরা ৩১ দশমিক ৫ ভাগ। কিন্তু দৈনিক মাথাপিছু আয়কে বাড়িয়ে ১ দশমিক ২৫ ডলার করলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় শতকরা ৪৩ দশমিক ৩-এ, আর ২ ডলারের ভিত্তিতে করলেই এটা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় শতকরা ৭৫ দশমিক ৮ ভাগে। নিজেদের করা দারিদ্র্যরেখা পরিমাপের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিলেও এই মাপকাঠির ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনবিষয়ক তত্পরতা, বিশেষত ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও কর্মসূচি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। কিন্তু সাফল্যের তুলনামূলক অবস্থানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সরকারি নথিতেও স্বীকার করা হয়েছে যে, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্যরেখার নিচে বাস করা মানুষদের অনুপাতে বাংলাদেশ এখনো শীর্ষস্থানে। যখন সরকারি দারিদ্র্যরেখার নিচে বাংলাদেশে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ, তখন প্রতিবেশী দেশগুলোর অনুপাত নিম্নরূপ— ভারতে ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ, নেপালে ২৫ দশমিক ২, ভুটানে ২৩ দশমিক ২, পাকিস্তানে ২২ দশমিক ৩ আর শ্রীলংকায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ক্ষুদ্রঋণ আর এনজিওদের ‘ব্র্যান্ড’ বলে খ্যাত দেশ অন্যদের থেকে দারিদ্র্য বিমোচনে কেন এত পিছিয়ে আছে তার কোনো ব্যাখ্যা মূলধারার অর্থশাস্ত্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে না!

বস্তুত বাংলাদেশের জিডিপি এবং মাথাপিছু আয়ের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় অবদান হচ্ছে প্রবাসী আয়ের। এছাড়া আছে গার্মেন্টস ও কৃষি। অথচ এই তিন ক্ষেত্রে যুক্ত শ্রমজীবী মানুষের আয় এবং জীবনের নিরাপত্তা দুটিই ঝুঁকিপূর্ণ, অনিশ্চিত। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে তাদের অবদান মুখ্য হলেও এতে তাদের অংশ ক্রমেই কমছে। এই সময়কালে বৈষম্য বৃদ্ধির চিত্র থেকে এটি স্পষ্ট হয়। সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ ও সর্বোচ্চ আয়ের ৫ শতাংশের আয়ের অনুপাত ২০১০ সালে ছিল— ১:৩২, ২০১৬ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১:১২১। বৈষম্য বেড়েছে প্রায় চার গুণ। এই হিসাবে চোরাই টাকা ধরা হয়নি, সেগুলো যোগ করলে প্রকৃত বৈষম্য আরো অনেক বেশি হবে।

একই সঙ্গে দেশে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ক্রমাগত নিম্নমুখী। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অকালে মানুষ মরছে অহরহ— ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দুর্ঘটনা, ক্রসফায়ার, গুম, ডাকাতি, নির্মাণকাজ করতে গিয়ে, ম্যানহোলে পড়ে, বস্তি বা কারখানা আগুনে। মরছে যৌন নির্যাতনে, ধর্ষণে, যৌতুকের চাপে। দেশে উন্নয়নের নামে মুনাফা উন্মাদনা ও প্রশাসনিক বৈকল্যের বড় দৃষ্টান্ত অবিরাম সড়ক দুর্ঘটনা। সর্বশেষ ঈদুল আজহার ছুটিকালে ১৩ দিনে সড়কে নিহত হয়েছে ২৬৫, জখম ৯৭০ জন। ২০১৮ সালের প্রথম ছয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কমপক্ষে ২ হাজার ৪৭১ জন। কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে শ্রমিক নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১৬ সালেই প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ৩৮২ জন কর্মরত শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে কারখানায় নিহত হয়েছেন ১৩৬ জন, নির্মাণকাজ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন ১২৫ জন। অসুস্থ বা জখম অগণিত। এসব হতাহতের কোনো প্রতিকার নেই, কোনো ক্ষতিপূরণও নেই। ২০১৭ সালে ৩ হাজার ৫০০-এরও বেশি প্রবাসী শ্রমিক অকাল মৃত্যুবরণ করেছেন। এর মধ্যে শতকরা ৪৪ ভাগ কর্মস্থলে দুর্ঘটনা। প্রবাসে ধারাবাহিকভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারী শ্রমিকরা। দেশে-বিদেশে কর্মপরিবেশের কারণে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কোনো হিসাব কেউ করেনি।

বিভিন্ন ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পে ব্যয়বৃদ্ধি অনিয়ন্ত্রিত হলেও শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ বিশ্বে নিচের সারিতে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে, জিডিপি অনুপাতে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের আনুপাতিক হারে ব্যয় কম। ফলে সর্বজন প্রতিষ্ঠানের বিকাশ সংকটগ্রস্ত, লক্ষ শিক্ষকের জীবনও বিপর্যস্ত। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতও এখন কিছু লোকের খুব দ্রুত টাকার মালিক হওয়ার জায়গা। চিকিৎসা খাতের অবস্থাও তাই। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে তাই একদিকে জৌলুস বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষের ওপর বোঝাও বাড়ছে।

সম্পদ কেন্দ্রীভবনের প্রক্রিয়ায় অপরাধ, আটক বাণিজ্য, গুম, ক্রসফায়ার এনকাউন্টার নামে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। সাম্প্রদায়িক হামলার সংখ্যাও বেড়েছে। ২০০৪ সাল থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ২৩৯ জন।

প্রাণ প্রকৃতি বিনাশ করে এত যে জিডিপির প্রবৃদ্ধি, চোরাই কোটিপতিদের এত যে জৌলুস তার একটা বড় যুক্তি কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কিন্তু খুব যুক্তিসঙ্গত কারণেই এই প্রবৃদ্ধি সুস্থ মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তো নয়ই, অতি সাধারণ কাজের সুযোগও চাহিদা অনুযায়ী বৃদ্ধি করতে পারছে না। কাজের সন্ধানে তাই তরুণদের অসহায়ত্ব আর অস্থিরতা বাড়ছেই। সম্প্রতি কোটা সংস্কারের আন্দোলন ব্যাপক আকার নিয়েছিল কাজের খোঁজে তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই।

প্রবাসে বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি নারী-পুরুষ কাজ করেন। তার পরও দেশে কাজের পরিমাণগত ও গুণগত অবস্থা ভালো নয়। কৃষি খাতের অনুপাত কমেছে, কর্মসংস্থানেও। কিন্তু শিল্প-কারখানা খাতের অনুপাতের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে পরিসেবা খাত। সেখানে স্থায়ী নিরাপদ কাজের সুযোগ খুবই কম। তাই অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজ, স্বকর্মসংস্থানেই বেশির ভাগ মানুষের নির্ভরতা। সরকারি সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৮১ লাখ, এর মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মে নিয়োজিত ৮৭ শতাংশ। মাত্র ১৩ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত। স্বনিয়োজিত মানুষের সংখ্যাই ২ কোটি ৩৬ লাখ। এসব ক্ষেত্রে কাজের কোনো স্থিরতা নেই, আয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম, নিরাপত্তাও কম।

মুখোশ ও মুখ

যখন ‘উন্নয়ন’-এর বিলবোর্ড আর প্রচারণায় ভেসে যাচ্ছে দেশ, তখন আন্তর্জাতিক জরিপ জানিয়েছে, ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ বিশ্বের দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম। শুধু বায়ুদূষণ নয়, পানিদূষণ, দুর্ঘটনা, আশ্রয়হীন মানুষ, যানজট, যৌন নিপীড়ন, নিরাপত্তাহীনতা সব দিক থেকেই রাজধানী ঢাকা বিশ্বের নিকৃষ্ট শহরগুলোর সঙ্গে এখন পাল্লা দিচ্ছে। নাগরিক সুবিধা বা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনেক দূরে থাকলেও জমির দামের দিক দিয়ে ঢাকা মহানগরী পাল্লা দিচ্ছে লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টোর সঙ্গে। ঢাকার কোনো কোনো অঞ্চলের জমির দাম গত তিন দশকে বিশেষত গত এক দশকে যে হারে বেড়েছে, তা ওইসব শহরেও ঘটেনি। এর পেছনে আছে দেশে বিশেষ করে ঢাকায় চোরাই টাকার দ্রুত বৃদ্ধি ও কেন্দ্রীভবন। জমির দামের এই বৃদ্ধি জমি দখলের উন্মাদনা বৃদ্ধি করেছে বহুগুণ।

বাংলাদেশে পুঁজিবাদ বিকাশে একদিকে প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ বিপর্যয়ের, অন্যদিকে নজরদারি ব্যবস্থার অভূতপূর্ব বিস্তার ঘটেছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার প্রান্তস্থ একটি দেশে পুঁজিবাদ বিকাশের এই পর্বে সব ক্ষেত্রে বাজার সম্পর্কের বিস্তার ঘটেছে অভূতপূর্ব হারে। ঘুষ, কমিশন, নিয়োগ বাণিজ্য, আটক বাণিজ্য সবই বর্ধনশীল, প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়া খুব শক্তিশালী। বিচার, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা নির্বাসিত। দখল, লুণ্ঠন অবারিত। একদিকে নগ্ন মুনাফা আগ্রাসন, অন্যদিকে নাগরিকদের ওপর ডিজিটাল নজরদারি সম্প্রসারণ, গোয়েন্দা সংস্থার খবরদারি, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার একচেটিয়াতন্ত্র, মিডিয়া-আদালত নিয়ন্ত্রণ এবং হাতমুচড়ানো স্বাধীনতা, বিভিন্ন বাহিনীর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা সবই বর্তমান পুঁজিবাদ বিকাশের মডেলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়