দেখতে দেখতে একটা স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের অর্ধশত বয়স হতে চলল। গত প্রায় সাড়ে চার দশকে আমাদের অনেক চাওয়া অনেক পাওয়ার হিসাবে গরমিল থাকলেও পাওয়াটা খুব কম হয়নি। সেই ১৯৭২ সালে আমরা ছিলাম সাড়ে সাত কোটি। গত ৪৫ বছরে ১৭ কোটির মাথা ছুঁই ছুঁই। ১৯৭২ সালে তাজউদ্দীন আহমদ বার্ষিক জাতীয় বাজেট দিয়েছিলেন ৭৮৬ কোটি টাকার। আর এ বছরের (২০১৮-১৯) জাতীয় বাজেট দিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত— ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৪৬ বছরে বৃদ্ধি প্রায় ছয় হাজার গুণ। ইতিহাসগত অর্থনৈতিক উপাত্ত পাওয়া দুষ্কর। তার পরেও ৩৪-৩৫ বছরের উপাত্ত থেকে বোঝা যায় বাংলাদেশ বিগত সময়ে অর্থনীতি ও মানবিক প্যারামিটারে এগিয়ে গেছে বহুদূর।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৬০ সালে এ ভূখণ্ডের জিডিপির পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৭ সালে এসে তা ২৫০ বিলিয়ন ডলার ছুঁই ছুঁই করছে। মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৫০ ডলারে। বেড়েছে গড় আয়ু, শিক্ষার হার, আমদানি ও রফতানির পরিমাণ। কিন্তু আমাদের পর্যটনের কী হাল, আমরা কি তা খতিয়ে দেখেছি? আগেই বলেছি, ঐতিহাসিক ডাটা ও পরিসংখ্যান পাওয়া অনেকটাই দুষ্কর। তার পরেও থলে ঘেঁটে যা পেয়েছি তা দিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে।
১৯৭২ সালের ঘটনা। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল যেমন নাজুক, তেমনি পরাশক্তিদের কারসাজিতে দুর্ভিক্ষ অবস্থা বিরাজ করা, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনঃস্থাপন করা, রাজনীতির অচলাবস্থা ইত্যাদি নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সরকার ছিল বড়ই বিব্রত। ভাবতেও অবাক লাগে, এত অস্থিতিশীলতার মধ্যেও কীভাবে বঙ্গবন্ধুর মাথায় আসতে পারে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পর্যটনের ভবিষ্যৎ গুরুত্ব কতখানি। সেই ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্টের ১৪৩ নম্বর আদেশবলে সর্বপ্রথম পর্যটনকে স্বীকৃতি দিয়ে, এর গুরুত্ব বুঝতে পেরে ‘বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন অর্ডার ১৯৭২’ জারি করা হয় ২৭ নভেম্বর। একজন সত্যিকার নেতার দূরদর্শিতার ঠাহরে অবাকই হতে হয়।
সদ্য গঠিত পর্যটন করপোরেশনকে কোন মন্ত্রণালয়ের সমীপে রাখা হবে— এ নিয়ে প্রথম থেকেই ছিল দ্বন্দ্ব্ব। ঐতিহাসিক তথ্য থেকে দেখা যায়, প্রথম দিকে পর্যটন করপোরেশনকে রাখা হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এরপর ১৯৭৫-এ মিনিস্ট্রি অব এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম সৃষ্টি করে পর্যটন করপোরেশনকে আনা হয় এর অধীনে। কিছুদিন পর এ মন্ত্রণালয়কে উগলিয়ে এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম ডিভিশন সৃষ্টি করে একে রাখা হলো মিনিস্ট্রি অব কমিউনিকেশনের হাওলায়। এভাবে দিন যেতে যেতে আমরা একসময় দেখি পর্যটন করপোরেশনকে আনা হলো ডিফেন্স মিনিস্ট্রির অধীনে। বন্ধুত্ব ও শান্তির প্রতীক পর্যটনকে কেন ডিফেন্সের অধীনে আনা হলো, তা এখনো রহস্যাবৃত। বিমান বাংলাদেশও সে সময়ে ছিল এ মন্ত্রণালয়ের অধীনেই। অবশেষে গঙ্গার জল অনেক ঘোলা করে সৃষ্টি হলো সিভিল এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম মন্ত্রণালয়। এখন পর্যন্ত পর্যটন করপোরেশনকে এ মন্ত্রণালয়ই দেখভাল করছে। যদিও হিমালয়সম সমস্যায় জর্জরিত বিমানের দাপটে এ মন্ত্রণালয়েও পর্যটনের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। হয়তো ভবিষ্যতে পর্যটনকে আমরা দেখব সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। যদিও এটাই বেশি সমর্থনযোগ্য।
ঐতিহাসিক ডাটার ঝুলিতে হাতড়িয়ে পর্যটনের অনেক পুরনো কিছু তথ্য পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের আগের বছর ১৯৭০ সালে আমাদের এ ভূখণ্ডে ৮ হাজার ২০০ বিদেশী পর্যটক এসেছিল। ১৯৭২-এ এর সংখ্যা দাঁড়ায় ভারতীয় পর্যটকসহ ৩৪ হাজার ৫৮০। আর ভারতীয় পর্যটক ছাড়া মোট বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা ওই সালে ছিল ৮ হাজার ৬৩৭। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ফি বছর মোটামুটি ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার পর্যটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এক লাখের ওপর পর্যটক এল ১৯৮৪ সালে, যার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩ হাজারের মতো। ১৯৯০ পর্যন্ত সর্বাধিক সংখ্যক পর্যটক এসেছিল শুধু ১৯৮৫ সালে। তখন আমাদের দেশে আসা পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার বা প্রায় দেড় লাখের মতো।
এখন কী অবস্থা? না, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প খুব বেশি এগোতে পারেনি। দীর্ঘদিন পর্যটন নিয়ে কোনো কথাবার্তা শোনা যায় না। শুধু একটাই বড় ঘটনা ঘটেছিল বাংলাদেশের পর্যটন আঙিনায়, আর তা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেই। পর্যটন শিল্পে ভবিষ্যতে প্রচুর দক্ষ জনবলের প্রয়োজন পড়বে— এ দূরদর্শিতায় ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হলো দেশের সর্বপ্রথম পর্যটন ও হসপিটালিটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এনএইচটিটিআই)। দীর্ঘদিন পর্যটন নিয়ে আর কিছু ঘটেনি। এরপর ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সরকার পর্যটনকে একটি শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিল সর্বপ্রথম, সঙ্গে কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ঘোষণাও এল। প্রায় ১৮ বছর পরে পর্যটন হঠাৎ করেই গুরুত্ব পেতে শুরু করল নীতিনির্ধারকদের কাছে। ২০১০ সালে সৃষ্টি করা হয় ট্যুরিজম বোর্ডের। পর্যটনের নীতিনির্ধারণ, প্রমোশন, ব্র্যান্ডিং ও পর্যটন বিষয়ে সরকারি লেভেলে স্টেকহোল্ডার হিসেবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের জন্ম হলেও বিভিন্ন কারণে বোর্ড আজ দিগ্ভ্রান্ত। ২০১০ সালে দেয়া হয় নতুন এক পর্যটন নীতিমালা। নতুন বলা হলেও সেই নতুন বোতলে পুরনো মদ, অর্থাৎ ১৯৯২ সালের নীতিগুলোই এদিক-ওদিক করে পুনঃস্থাপন। তার পরেও ২০১০ সালের নীতিমালায় দু-চারটে নতুন ও কালোপযোগী বিধি-প্রবিধির সন্নিবেশন হয়েছে। যাহোক, এরপর ২০১৪ সালে প্রণীত হয় বাংলাদেশ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাক্ট। যদিও এ ধরনের একটি আইন করা হয় এরশাদের আমলে, সম্ভবত ১৯৮২ সালে। সেটি রহিত করে নতুন আইনের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন সৃষ্টির আইডিয়া নিয়ে প্রণীত হলো এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন আদেশ। এ আদেশের আওতায় কক্সবাজার পেনিনসুলায় তিনটি স্বতন্ত্র ট্যুরিস্ট এলাকা সৃষ্টির কাজ চলছে।
এবার আসি পর্যটকের আগমন ও বহির্গমন প্রসঙ্গে। ইনবাউন্ড পর্যটকের ঐতিহাসিক উপাত্তের কথা বলেছি। ১৯৭২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সময়ে সবচেয়ে বেশি পর্যটক এসেছিল ১৯৮৫-তে, দেড় লাখের কাছাকাছি। মানডি ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০০৮ সালে আমাদের দেশে সর্বাধিকসংখ্যক পর্যটক (৪,৬৭,০০০) এসেছিল। আবার তা কমতে কমতে ২০১৪ সালে এসে দাঁড়াল মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজারে এবং ২০১৫ সালে তার সংখ্যা হলো ১ লাখ ৪৫ হাজার। অর্থাৎ আমরা ফিরে গেলাম ৩০ বছর আগে ১৯৮৫ সালে, যখন আমাদের দেশে পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার। কিন্তু কেন এত ওঠানামা? কারণ নিশ্চয়ই আছে। আমরা কি আজ পর্যন্ত এ কারণগুলো চিহ্নিত করার জন্য কোনো গবেষণা করেছি? সোজাসাপ্টা উত্তর হলো, ‘না’। ব্যর্থতার কারণ না জানলে সফলতার ভিত্তিভূমি রচনা করব কেমন করে? আমাদের আমলা সাহেবরা শুধু যাওয়া-আসা করেন বিটিবি আর বিপিসির অঙ্গনে। গবেষণার বিষয়ে তাদের আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। পাশের দেশ ভারতে ট্যুরিজম মন্ত্রণালয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে এক সমৃদ্ধ রিসার্চ সেল। যেখানে স্থায়ীভাবে গবেষণা করে চলেছেন একদল নিবেদিত গবেষক। তাই ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ে আমলাদের যাওয়া-আসা চললেও গবেষণার ধারাবাহিকতা থাকে অক্ষুণ্ন। এতে যে-ই আসুক না কেন, তার পক্ষে সহজেই বুঝে ওঠা সম্ভব হয়— ‘কোথায় আছি আর কী করতে হবে।’
এবার দেখা যাক ট্যুরিজম খাত থেকে আমাদের আয় ও ব্যয়ের কী অবস্থা। ট্যুরিজম আয় বলতে বোঝানো হয়েছে, ইনবাউন্ড ট্যুরিস্টদের কাছ থেকে আমরা কত আয় করেছি, আর ব্যয় বলতে বোঝানো হয়েছে, আমাদের দেশের মানুষ যারা বাইরে বেড়াতে গেছে অর্থাৎ আউট বাউন্ড ট্যুরিস্টরা কত খরচ করেছে। অনেক পুরনো তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে ইনবাউন্ড পর্যটন থেকে আমাদের আয় হয়েছিল মাত্র ১৪ লাখ মার্কিন ডলার। এ অংক ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে ১৯৮৪ সালে দাঁড়াল ২ কোটি ৫৭ লাখ ৩০ হাজার বা আড়াই কোটি মার্কিন ডলারের উপর। ১৯৮৫-তে এর পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের উপর। ট্যুরিস্ট আগমনের হিসাবে দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে মোট ট্যুরিস্টের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজারের উপর। পক্ষান্তরে ১৯৮৪ সালে এর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার। তাহলে ১৯৮৪ সালে ট্যুরিস্টের সংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও এত বেশি ডলার কী কারণে আয় হলো? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ আছে। আমরা কি কখনো এ কারণগুলো খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিয়েছি? সোজাসাপ্টা উত্তর হলো, না। অর্থাৎ গবেষণা আমাদের মজ্জায় গ্রথিত নেই। এ গবেষণা না করার কারণে আজ আমাদের পর্যটনের এ বেহাল। একইভাবে ১৯৯০-এ ১ লাখ ১৫ হাজার পর্যটক আসার পরেও আমাদের আয় হয়েছিল ১৯৮৪ সালের অংকের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ প্রায় ৮৪ লাখ মার্কিন ডলার। হিসাবের এত ওঠানামা কেন? এর উত্তরও আমাদের জানা নেই।
গত ২০ বছরের হিসাবে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে পর্যটন থেকে আমাদের আয় হয়েছিল ২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। ২০ বছরের মাথায় ২০১৫ সালে তা এসে দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারে। আমাদের মোট রফতানির কত অংশ এ অংক? মাত্র শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ। এ অংক আমাদের দেশ থেকে চামড়া রফতানি আয়ের অংকের সমান। অথচ ২০১৭ সালে আমাদের মোট রফতানির প্রায় ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ এসেছিল সব প্রকার গার্মেন্ট রফতানি থেকে। তাই অতি উৎসাহী হয়ে কথায় কথায় আমরা যখন বলি, আমাদের ট্যুরিজম একসময় গার্মেন্ট রফতানিকেও ছাড়িয়ে যাবে তখন মনে হয়, আমরা কি বোকার স্বর্গে বাস করি?
আমদানি ও রফতানির আয়ের ব্যালান্স শিট থাকে। আমাদের ট্যুরিজমের ব্যালান্স শিট কেমন? সোজা কথায় ইনবাউন্ড আর আউটবাউন্ড ট্যুরিজমের মোট আয় ও ব্যয়ের হিসাবের ফারাকই ট্যুরিজমের ব্যালান্স শিট। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে অনেকখানি। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে অনেক। ঘরকুনো বাঙালির ঘর থেকে বের হওয়ার মানসিকতা বেড়েছে প্রচণ্ড গতিতে। ফলে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ক্ষেত্রে এসেছে বিপ্লব। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ এখন হাঁচি-কাশির মতো হরহামেশাই বিদেশ ভ্রমণে যায়। চার বছর আগেও ভারতে সবচেয়ে বেশি ট্যুরিস্ট আসত আমেরিকা থেকে। তার পরের অবস্থান ছিল ব্রিটিশদের, আর বাংলাদেশীর অবস্থান ছিল তৃতীয় স্থানে। দু-তিন বছরের মাথায় এখন ভারতে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশীরা। ১৫ লাখের ওপর বাংলাদেশী বর্তমানে ভারত ভ্রমণ করে। স্রেফ আনন্দ-ফুর্তি, কেনাকাটা, চিকিৎসা আর নয়নাভিরাম প্রকৃতি দেখতে প্রতি বছর আমরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেখে আসছি ভারতের কোষাগারে। একইভাবে এখন আমরা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মিসর, নেপাল, ভুটান ইত্যাদি দেশে তুবড়ি মেরে দলবেঁধে ঘুরে আসি। আসবই না বা কেন? দেশের ভেতর সরকার আমাকে এমন কী সুযোগ-সুবিধা দিতে পারছে, যে কারণে আমরা বিদেশ না গিয়ে দেশেই ঘুরে বেড়াব? কক্সবাজার যেতে আসতেই সময় লাগে ৩৬ ঘণ্টা। এ ৩৬ ঘণ্টায় পাশের এক দেশই দেখে আসা যায়। যা-ই হোক, আমাদের পর্যটন ব্যালান্স শিটের দিকে তাকালে হতভম্ব না হয়ে পারা যায় না। মানডি ইনডেক্সের হিসাবে দেখা যায়, গত ২০ বছরে (১৯৯৫ থেকে ২০১৫) আমাদের প্রাপ্তি ছিল মাত্র ১ দমমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, বিপক্ষে আমরা দিয়েছি ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু ২০১৩ সালেই খরচ করে এসেছি ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এখানেও আমরা হিসাবের গরমিল দেখতে পাই। ২০১২ সালে মোট ২২ লাখ ৭৩ হাজার পর্যটক এ দেশ থেকে বিদেশ গিয়েছিল। আর তারা খরচ করেছিল প্রায় ৮৯ কোটি ডলার। অথচ ২০১৩ সালে বিদেশ গিয়েছিল ১৪ লাখ ৬০ হাজার, আর তারা খরচ করে এল প্রায় ১৩১ কোটি ডলার! কেন এত বেশি? এর উত্তরও আমাদের জানা নেই। শুধু ‘জানা নেই, জানা নেই’-এর বোকার স্বর্গে বাস করছি আমরা। বলতে পারি, গত চার দশকে বাংলাদেশের পর্যটন এক চরম হতাশার আবর্তে জড়িয়ে আছে। বিচ্ছিন্ন কিছু কার্যক্রম যে হচ্ছে না তা নয়। তবে উদ্দেশ্যবিহীন নৌকার মতো ঘূর্ণায়মান হচ্ছি ‘নেই পরিকল্পনা, নেই লক্ষ্যের’ আবর্তে।
যা-ই হোক, আমরা এর পরেও অনেক আশাবাদী। ২০৫০ সালের দিকে যখন পৃথিবীর মোট পর্যটকের অর্ধেকই গ্লোবের এ অংশে অর্থাৎ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বেড়াতে আসবে, তার একটা বড় অংশ আমাদের দেশে আসবে বলেই বিশ্বাস করি। তবে এজন্য আমাদের তৈরি হতে হবে এখন থেকেই। কীভাবে তৈরি হব আমরা? এক, দুই, তিন বলে কোনো প্রেসক্রিপশন না দিয়ে আমি শুধু একটা কথাই বলব, আমাদের তৈরি হওয়ার সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম হলো গবেষণা করা। গবেষণা, গবেষণা আর গবেষণা— এটিই একমাত্র প্রেসক্রিপশন।
লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






