সড়ক ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। উন্নত বিশ্বের উন্নয়ন দর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল অনুন্নত বিশ্বকে সড়ক নির্মাণে সহায়তা করা। কিন্তু দাতা দেশগুলো সময়ের আবর্তনে ধীরে ধীরে সেই দর্শন থেকে সরে এসে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলের (এমডিজি) দিকে ধাবিত হলো, যেগুলো মূলত বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে অনুন্নত বিশ্বের একটি বড় অংশকে সড়ক নির্মাণের গুরু ব্যয় নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে হয়।

পরবর্তীকালে এ সড়ক নির্মাণ ব্যয়ে উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে বেশ বড় রকমের পার্থক্য দেখা যায়। এর মধ্যে পরিবেশগত পার্থক্য একটি বড় নিয়ামক হিসেবে দাঁড়ায়। বিভিন্ন দেশের জল-হাওয়া বিভিন্ন রকম। সেখানকার ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের মিল কম। এছাড়া নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য দেশ-মহাদেশ ভেদে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এ কারণে সড়ক নির্মাণ ব্যয়ে পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক।

সাম্প্রতিক কালের হিসাবে, ইউরোপ মহাদেশে সড়ক নির্মাণে খরচ হয় প্রতি কিলোমিটারে ২৯ কোটি টাকা, চীনে ১৩ কোটি ও ভারতে ১০ কোটি। আর এদিকে অবিশ্বাস্যভাবে বাংলাদেশে গড়ে লাগে ৫৯ কোটি টাকা, যা ভারতের ছয় গুণ। এর মধ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেন নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫ কোটি টাকা। ফলে মহাসড়ক নির্মাণে সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এ রকম বিশ্ব রেকর্ড গড়ে আমরা কী ধরনের সড়ক তৈরি করছি? বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অবকাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এশিয়ার মধ্যে নিম্নতম। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সড়ক অবকাঠামো সূচকে ১০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ২ দশমিক ৯, ভারতের ৩ দশমিক ৮, চীনের ৪ দশমিক ৬, পাকিস্তানের ৩ দশমিক ৮ ও শ্রীলংকার স্কোর ৫ দশমিক ১। ২০১৪ সালে প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্টের কারিগরি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোর মধ্যে আদর্শ মানের সড়ক মাত্র ১ শতাংশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ আরো কিছু সড়ক নির্মাণের পর এ শোচনীয় অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। তার পরও ভালো সড়ক শতকরা ১ ভাগ থেকে আর কত দূর উন্নতি ঘটাবে?

তাহলে মোদ্দা কথা কি দাঁড়াল? একদিকে সড়কের সার্বিক অবস্থায় আমরা পৃথিবীতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে। আবার সেই খারাপ সড়ক ব্যবস্থা আমরা তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণ করছি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি খরচে। সত্যি সেলুকাস, কি বিচিত্র এই বাংলাদেশ! বাংলাদেশে সুশাসনের অভাব প্রকট, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটির মাত্রা যে এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, সেটি এ সড়ক নির্মাণে সীমাহীন দুর্নীতি থেকেই ফুটে ওঠে।

এখন দেখা যাক, এই যে অন্যান্য দেশের তুলনায় বিপুল পরিমাণ বেশি অর্থ ব্যয় করে বিশ্বের নিম্ন সারির সড়ক ব্যবস্থা তৈরি করার দুর্লভ কৃতিত্বের পেছনে মূল কারণগুলো কী কী?

অবশ্যম্ভাবীভাবে দুর্নীতি একটি বড় কারণ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপ অনুযায়ী, সরকারি কাজের চুক্তি এবং অবকাঠামো নির্মাণে সবচেয়ে বেশি ঘুষের আদান-প্রদান হয়ে থাকে প্রকল্প কর্মকর্তা আর ঠিকাদারি কোম্পানিদের মধ্যে। যেসব দেশ দুর্নীতিপরায়ণ, সেসব দেশে এ ধরনের প্রকল্পে প্রতি ইউনিটে খরচ শতকরা ৭ ভাগ বেশি হয়।

বিশ্বব্যাংকের আরেক জরিপে পাওয়া যায়, শতকরা ৫০ ভাগের উপরে ঠিকাদারি কোম্পানি যারা নিলামে অংশগ্রহণের কাগজপত্র পায়, তারা নিলামে অংশগ্রহণ করে না। এ নিলামে অংশগ্রহণ না করার একটা বড় কারণ সাধারণত কৌশলগত। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে একটা সিন্ডিকেট করে সিদ্ধান্ত নেয় কে অংশগ্রহণ করবে, কে করবে না। এতে প্রতিযোগিতামূলক নিলাম, যেই প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রকল্পের খরচ কম হওয়ার কথা, সেটির আর সুযোগ থাকে না।

শুধু তা-ই নয়, যে কোম্পানি নিলামে জেতে, সেগুলো কাগজপত্র ভালো করে হিসাব করা হয় না। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অলিখিত চুক্তি থাকে। এ ধরনের দুর্নীতির ফলে এসব প্রকল্পের খরচ ৮ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। শুধু তাই নয় গড়ে এ ধরনের কাজগুলো সম্পন্ন হতে ৩০ শতাংশের বেশি সময় লাগে মূল সময় থেকে।

এছাড়া বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় উঠে এসেছে আরো কী কী কারণে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে থাকে। প্রথমত. যখন জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তখন অধিগ্রহণকৃত জমির মূল্য অনেক বেশি দেখানো হয়। কিন্তু সেই তুলনায় জমির মালিককে অনেক কম দাম দেয়া হয়। টেন্ডার আর নিলামে নিয়ে দুর্নীতির কথা আগেই বলা হয়েছে। এছাড়া পত্রপত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে কী প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি হয়? যত বেশি টাকার প্রকল্প, তত বেশি কমিশন পেয়ে থাকেন প্রকল্পের প্রকৌশলী এবং অন্য কর্মকর্তারা। ঠিকাদাররা অর্থ ভাগ করে নেন প্রকৌশলীদের সঙ্গে।

এরপরে বিরাট যে দুর্নীতিটি হয়, সেটি হলো নির্মাণ সামগ্রী কেনাবেচায়। নির্মাণ সামগ্রীর দাম অতিরিক্ত দেখিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়। এক্ষেত্রে ব্যয়ের ওপর নজরদারি, স্বচ্ছতা রক্ষা এবং জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে প্রকল্প কর্মকর্তাদের একটি বড় ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু যাদের নজরদারি করার কথা, তারাই যখন দুর্নীতির অংশ হয়ে যান, তখন এ ব্যয় লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

এরপরে যেটা ঘটে, তা হলো যেকোনো প্রকল্পই সময় মতো শেষ হয় না। কাজ না করে সময়ক্ষেপণ করা হয়। কারণ সময় গেলেই বিভিন্ন অজুহাতে নতুন করে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। বলতে গেলে সড়ক নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি প্রকল্পেই এ ঘটনা ঘটে। এখানে শুধু দু-তিনটে খবর যেগুলো প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বহুবার এসেছে, সেগুলোর কথা উল্লেখ করব।

আমাদের এ খোদ ঢাকায় হয়েছে ১১ কিমি লম্বা মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রকল্প। ২০০৫ সালে যখন এ প্রকল্পের ব্যয় হিসাব করা হয়, তখন ধরা হয়েছিল ৬৭০ কোটি টাকা। কয়েক দফা ধরে প্রকল্পের সময় বৃদ্ধির পর আট বছর পর প্রকল্প যখন শেষ হয়, তখন খরচ বেড়ে দাঁড়ায় তিন গুণেরও বেশি ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকায়। এতে এ ফ্লাইওভার নির্মাণে শেষ পর্যন্ত কিলোমিটারপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ১৮৬ কোটি টাকা। ভারতে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণে কিলোমিটারে ১০০ কোটির কম লাগে। আর পাকিস্তানে ৭০ কোটির কম। এমনকি মালয়েশিয়া ও চীন ১০০ কোটির কম খরচে চার লেনের ফ্লাইওভার বানায়।

সওজ অধিদপ্তরের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্প। ২০০৬ সালে অনুমোদনের পর ২০১২ সালের মধ্যে মহাসড়কের ১৯২ কিলোমিটার দুই লেন থেকে চার লেন করার কথা ছিল। পরামর্শক নিয়োগ, মালপত্র আমদানি, স্থাপনা অপসারণে দেরি— এসব অজুহাতে প্রকল্পের মেয়াদ নয় বছরে ছয় দফা বাড়ানো হয়। এতে ব্যয় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৭৯৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

ঢাকায় নির্মিত গত বছর চালু হয় মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি সমীক্ষা করে এ ফ্লাইওভারের নকশা করে। ২০১১ সালে একনেকে নির্মাণ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। শেষ হওয়ার কথা ২০১৪ সালে। প্রথম ধাপে প্রকল্পের খরচ ছিল ৩৪৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে এ খরচ নির্ধারণ করা হয় ৭৭২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। শেষমেশ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৮ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা। এক বছরের জায়গায় দীর্ঘ চার বছর পর নির্মাণকাজ শেষ হয়।

বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক গবেষণায় উঠে এসেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সড়ক নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ দুর্নীতির করাল গ্রাসে নিমজ্জিত। আর উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি খুব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশের সড়ক নির্মাণ ব্যবস্থাপনা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় আরো বেশি শোচনীয়। যেই দেশে সুশাসনের সামগ্রিক অভাব, সেই দেশে যে সেক্টরে হাজার কোটি টাকার খেলা চলে, সেখানে ক্ষমতাবান অর্থলোভী শ্রেণী ভিড় জমায়, লুটের বখরা নেয়। ফলে দুর্নীতির সীমা-পরিসীমা থাকে না।

জনগণের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টার্জিত টাকার এই রকম অপব্যবহার এবং দুর্নীতি আমাদেরকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। একই সঙ্গে আমরা জানি, বিপুল এ অর্থ অপচয়ের ফলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যেমন— শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে অর্থ বিনিয়োগের পথ রুদ্ধ হচ্ছে। সড়ক ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি, মূল ধমনিগুলোর একটি। এ সড়ক নির্মাণ এবং ব্যবস্থাপনায় ভয়ঙ্কর অনিয়ম অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের পথ রুদ্ধ করছে। অর্থনীতিকে প্রায় পঙ্গু করে ফেলা এ ভয়ঙ্কর দুর্নীতির করাল থাবা থেকে দ্রুত মুক্তি না পেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এ রকম স্থবিরই হয়ে থাকবে।

 

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক