বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় আয় বা জিডিপির প্রায় ৬৫ শতাংশ অবদান নগর খাতের। এক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকা মেগাসিটি বা মহানগর অঞ্চলের একক অবদান জিডিপির প্রায় ৩৬ শতাংশ।
স্বাধীনতা-উত্তর সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশে নগরায়ণ ক্ষেত্রে বড় রকমের পরিবর্তন ঘটেছে, পরিবর্তনটি এসেছে সংখ্যাগত ও গুণগত দুভাবেই। এ সময়ে গড়ে বার্ষিক নগর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ হারে। ১৯৭২ সালের শুরুতে বাংলাদেশের মোট নগরীয় জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৫ মিলিয়ন ও নগরায়ণ মাত্রা ছিল ৭ শতাংশ। ২০১১ সালের লোক গণনায় মোট নগরীয় জনসংখ্যা পাওয়া গেছে ৪২ মিলিয়ন ও নগরায়ণের মাত্রা প্রায় ২৮ শতাংশ। বর্তমানে (২০১৭) নগরায়ণ মাত্রা আনুমানিক ৩০ শতাংশ এবং মোট নগর জনসংখ্যা প্রায় ৫০ মিলিয়ন বা পাঁচ কোটি।
দীর্ঘ চার দশকের গড় প্রায় ৫ শতাংশ করে নগরীয় বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উন্নয়নশীল বিশ্বের বড় জনসংখ্যার খুব কম দেশেই দেখা গেছে। মোটাদাগে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নগরায়ণের বেশকিছু প্রবণতা উল্লেখ করা যায়: বিগত সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশে সংঘটিত দ্রুত নগরায়ণের প্রধান প্রক্রিয়া গ্রাম নগর অভিবাসন। গ্রামের তুলনায় শহরে অর্থনৈতিক, সামাজিক সুযোগ-সুবিধা বেশি বলেই প্রধানত এ রকমটি হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবেই এদেশে গ্রাম-শহর বৈষম্য গড়ে উঠেছে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে যেমন বৈষম্য, শহরের ভেতরেও তেমনি, বরং বলা উচিত এখানে আরো তীব্রতর মাত্রায় বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। শহরের ভেতরে এ বৈষম্য এলাকাভিত্তিক এবং জনগোষ্ঠীভিত্তিক। অভিবাসনকারীরা অধিকাংশই অত্যন্ত দরিদ্র। এ কারণে শহরে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃহৎই থাকছে।
অভিবাসনকারীদের প্রধান গন্তব্য বড় শহরগুলো, বিশেষত মহানগরগুলো, আরো বিশেষত ঢাকা, কারণ এখানেই অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বেশি। একই কারণে মহানগরগুলোতে দরিদ্রদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ঢাকা মহানগরীতে এদের সংখ্যা আরো বিশাল। বস্তি-বিস্তার প্রক্রিয়ার পেছনেও এ সংখ্যাবৃদ্ধি (অবশ্যই এর পেছনে অন্যান্য কারণও রয়েছে)। গ্রামের দরিদ্রদের বড় শহরমুখীনতার কারণে সেখানে দরিদ্রদের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
যে রকম দ্রুতহারে নগরায়ণ হচ্ছে বা নগরবিশেষের জনসংখ্যা বাড়ছে, সে হারে নগর এলাকার পারিসরিক বিস্তৃতি হতে পারছে না। যদিওবা কিছুটা হচ্ছে, তাও প্রধানত অপরিকল্পিতভাবে ও প্রয়োজনীয় সেবা সুবিধা ছাড়াই হয়তো হচ্ছে। প্রায় সর্বত্রই জনঘনত্ব বেড়ে গেছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নগরের প্রশাসনিক শক্তি-সামর্থ্য বাড়েনি। নগর পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন, সর্বক্ষেত্রেই পরিস্থিতি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ছে বলে মনে হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং পরিচালন দুর্বলতা এগুলো আবার চক্রাকার সম্পর্কযুক্ত। একটি দুর্বলতা অন্যটিকে প্রভাবিত করে। একটি আরেকটির যেমন কারণ, তেমনি ফলাফলও। এতে করে সমস্যা আরো জটিল হয়ে পড়েছে। এসব সমস্যার সমাধান করাটাই হবে আগামীতে বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরে কর্মসংস্থান সুযোগ বেশি, আয়ের পরিমাণও বেশি, তারপরও দেখা যায়, গার্মেন্টস শিল্পের মতো ফরমাল খাতে শ্রমিক নিযুক্তি সত্ত্বেও অধিকাংশ কর্মসংস্থান হচ্ছে নিম্ন আয়ের অনানুষ্ঠানিক খাতে বা ইনফরমাল সেক্টরে। নির্মাণ শ্রম, রিকশা, রিকশা-ভ্যান চালনা, ফুটপাতে রাস্তায় ফেরি করা বা হকার ব্যবসা এবং অন্যান্য নানা রকম ছোট ব্যবসাতেই শহরের অধিকাংশ মানুষ কর্মতত্পর। তাছাড়া গৃহকর্মী, গাড়ির ড্রাইভার, বসতবাড়িতে নিরাপত্তাকর্মী ইত্যাদি পেশায় নিযুক্ত। সামগ্রিকভাবে শ্রম নিযুক্তি বা আধা-নিযুক্তি হলেও তাদের আয় সীমিত। উৎপাদনশীলতা সীমিত। অথচ এসব নিম্ন উৎপাদনক্ষম কর্মে নিযুক্ত বিপুল জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন রকম সেবার ব্যবস্থা করতে হয় শহর কর্তৃপক্ষকে। এ কাজে তারা স্বভাবতই হিমশিম খেয়ে যায়।
পরিবহন সংকট, যানজট নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা। দুর্ঘটনাও এর সঙ্গে জড়িত। পরিবহন যেমন ব্যয়সাপেক্ষ, অনিরাপদ, তেমনি ব্যবস্থাপনার অদক্ষতার কারণে সময়ক্ষেপী। পর্যাপ্ত সড়ক ব্যবস্থা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ও অন্যান্য কারণে পরিবহন ব্যবস্থা দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষত ঢাকা মহানগরীর ক্ষেত্রে একথা বেশি প্রযোজ্য। দীর্ঘদিনের তত্পরতাহীনতা সমস্যাকে তীব্র থেকে তীব্র করে তোলে। ঢাকার যানজটের কথাই ধরা যাক, বিগত ১০ বছরে প্রতি বছর ঢাকা মহানগরে গড়ে বছরে প্রায় চার লাখ নতুন মানুষ বাইরে থেকে এসে বসবাস করছে। অর্থাৎ ১০ বছরে ৪০ লাখ মানুষ বেড়েছে। পরিমাণের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু গত ১০ বছরে ঢাকা মহানগর এলাকায় প্রয়োজনীয় নতুন সড়ক তৈরি হয়নি, ফলে যানজট বাড়বেই। বর্তমানে সরকার এ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা নিচ্ছে। বেশ কয়েকটি বড় আকারের ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছে, তাতে করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্থানীয়ভাবে কিছু সুরাহা হবে, কিন্তু সার্বিকভাবে তেমন সুফল পাওয়া যাবে না। তার জন্য প্রয়োজন আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা। কিছু ফ্লাইওভার অত্যন্ত আনাড়ি পরিকল্পনায় নির্মিত হচ্ছে, ফলে আর্থিক ক্ষতি ও জনদুর্ভোগে পড়ছে। মেট্রোরেল আসছে। বাস র্যাপিড ট্রানজিটেরর (বিআরটি) কাজ শুরু হয়েছে। তবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় কাজ সঠিকভাবে এগোচ্ছে না। রাজধানীতে সম্প্রতি সংঘটিত একটি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা পরবর্তী স্কুলশিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের যৌক্তিকতা উপলব্ধি করে সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করেছে। এতে পরিবহনে শৃঙ্খলা বাস্তবায়ন অনেকটা কার্যকর হতে পারে।
শহরাঞ্চলে আবাসন সংকট তীব্র। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত এবং দরিদ্রদের ক্ষেত্রে এ সংকট মারাত্মক পর্যায়ের। বস্তি এবং বাস্তুহারা কলোনি গড়ে ওঠা এ সংকটেরই ফল। বস্তির অধিবাসীরা বাধ্য হয়েই অমানবিক পরিবেশে জীবনযাপন করে। অন্যদিকে সরকার এদের জন্য উন্নততর জীবনের ব্যবস্থা করতে পারছে না। শহরাঞ্চলে বিদ্যমান ভূমি ও আবাসন-বিষয়ক বৈষম্য অনেকটাই এসব পরিণতির জন্য দায়ী। এক্ষেত্রে সরকারি চিন্তা-ভাবনার প্রাচীনতা সমস্যাকে আরো সংকটাপন্ন করে ফেলে। জাতীয় আবাসন নীতিমালা (২০১৬) অনুমোদিত হয়েছে কিন্তু এর সুপারিশমালার বাস্তবায়ন শুরুর তেমন কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না।
শহরে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা জ্বালানি ইত্যাদি সেবার অপ্রতুলতা রয়েছে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সেবা সরবরাহ তাল মেলাতে পারছে না বলে এসব সেবার অভাব আরো বাড়ছে, সংকটে পরিণত হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে শক্তিধরদের আইনের প্রতি অবজ্ঞা এবং সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর দুর্নীতি দুর্বলতা সমস্যাকে আরো তীব্র করে ফেলে। বর্তমান সরকারের শাসনামলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে, তবে চাহিদাও বেড়ে যাওয়ায় গ্রাহকসেবা সন্তোষজনক হতে পারছে না। তাছাড়া বিদ্যুতের মূল্যও প্রচুর বেড়ে গেছে। জ্বালানি মূল্যও বাড়ছে। বিগত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে একথা স্বীকার করতেই হয়।
বিনোদন ও অবসরযাপনের উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধার সমস্যা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। খোলা জায়গা, খেলার মাঠ, পার্ক, বিনোদনযোগ্য জলাশয়, লেক, পুকুর, নদী— এসবই অবৈধ দখলের শিকার হচ্ছে। প্রয়োজনীয় মাত্রার খোলা জায়গা থাকছে না। শহরের শিশুরা মারাত্মকভাবে প্রতিকূল পরিবেশে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নারী ও প্রবীণ নাগরিকরাও। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণও কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে নগরে সংস্কৃতি চর্চার আনুকূল্য বেড়েছে, জনগণের অংশগ্রহণও বেড়েছে।
সামগ্রিকভাবে নগরীয় পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। বাতাস দূষণ চরম আকারে পর্যবসিত হয়েছে। বিশেষত রাজধানী ঢাকায়। বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক বাতাস দূষণের শহর এখন ঢাকা। পানি দূষণও ভাবনার বিষয়। বৃক্ষনিধন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে নগরীয় পরিবেশ উন্নয়নে রাজধানীতে একটি যুগান্তকারী প্রকল্প সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে ২০১৫ সালের শুরুতে। হাতিরঝিল বহুমাত্রিক এ প্রকল্পটি এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন ও শহরের পূর্ব-পশ্চিম সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে বড় রকমের ভূমিকা রাখছে। প্রকল্পটি দৃষ্টিনন্দন হওয়ায় রীতিমতো বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এ ধরনের বহুমাত্রিক প্রকল্প এখন অন্যান্য নগর কর্তৃপক্ষ নিতে আগ্রহী হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, ফলে প্রতিদিন নানারকম অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, জনমনে নিরাপত্তার অভাব অনুভূত হচ্ছে। উল্লেখ্য, নগরায়ণে অপরাধপ্রবণতা, সহিংসতার প্রকোপ বৃদ্ধি শুধু বাংলাদেশের নগরের জন্য নয়, পৃথিবীর সব উন্নয়নশীল (এমনকি কোনো কোনো উন্নত) দেশের জন্যও প্রযোজ্য। সমস্যাটি নিয়ে উচ্চ সরকারি পর্যায়ে এবং নাগরিক পর্যায়েও সচেতনতা বাড়ছে।
বর্তমান সময়ের মূল সমস্যা: নগর সু-পরিচালন ও নগর নেতৃত্ব
উপরোল্লিখিত সমস্যা এবং অন্যান্য বিভিন্ন সমস্যার মূল সমস্যা হিসেবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি সামগ্রিকভাবে নগর পরিচালনের (আরবান গভর্ন্যান্স) সমস্যাটিকে। নগর পরিচালনের প্রধান দায়িত্ব সরকার এবং স্থানীয় পৌর সরকারের ওপরই হয়তো বর্তায়। কিন্তু পাশাপাশি আরো যেসব অংশগ্রহণকারী বা ‘স্টেকহোল্ডার’ রয়েছে, তাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব মোটেও কম নয়। এসব ‘স্টেকহোল্ডার’-এর মধ্যে রয়েছে আনুষ্ঠানিক ব্যক্তি খাত (ফরমাল প্রাইভেট সেক্টর), বেসরকারি সেবামূলক খাত বা এনজিও এবং ব্যাপকভাবে পরিচিত ‘সিভিল সোসাইটি’ বা নাগরিক সমাজ। সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে না এমন সব রাজনৈতিক দলকেও ‘নাগরিক সমাজের’ অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তবে নাগরিক সমাজ বলতে আমরা এখানে মূলত নানারকম পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, পরিবেশবাদী, কর্মজীবী ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বুঝব। এদের অনেকেই আবার অসংগঠিত।
নগর উন্নয়ন ও পরিচালন সম্পর্কিত সরকারি ও আধা-সরকারি সংস্থাগুলো এবং সিটি করপোরেশন ও পৌর সংস্থার ব্যর্থতা এবং মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি বা দলগুলোর লক্ষ্যহীনতা ও নাগরিক সমস্যা সম্পর্কে অস্বচ্ছ ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ নাগরিকদের বিভ্রান্ত করছে, তাদের অবস্থার অবনতি ঘটাচ্ছে, তীব্র হতাশার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু আমাদের দেশের শহরেই যে এমনটি হচ্ছে তা নয়, অনেক দেশের শহরেই এমনটি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিকল্পধারা বা শক্তি হিসেবে নাগরিক উদ্যোগকে শক্তিশালী করার চিন্তাভাবনা চলছে। অনেকটা এগোচ্ছেও কোনো কোনো শহরে। একবিংশ শতাব্দীর নগর উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মূলত এ নতুন ধারার নগর পরিচালন বা প্রশাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার চ্যালেঞ্জ। নগরবিশেষের সু-পরিচালনে অবশ্য নগর বা পৌর কর্তৃপক্ষকেই উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব নগরে এ রকম কর্তৃপক্ষীয় উদ্যোগের অভাব আছে, সেখানে নাগরিক সমাজকে এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কথা উল্লেখযোগ্য। অবশ্যই উল্লেখ্য, নগর পরিচালনে নগর-পরিষদের নেতৃত্ব-গুণ জরুরি।
আগামীর চিন্তা: সামগ্রিকভাবে দেশের জন্য অবশ্যই একটি জাতীয় নগরায়ণ নীতিমালা থাকা বাঞ্ছনীয়। এ রকম একটি নীতিমালা এরই মধ্যে রচিত হয়েছে, তবে ২০১৩ সালে চূড়ান্ত হওয়া সত্ত্বেও এখনো অনুমোদিত হচ্ছে না। এ ধরনের নীতিমালা দেশের ভবিষ্যৎ নগরায়ণের প্রবণতা চিহ্নিত করতে এবং তাকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করতে সাহায্য করবে। বলাবাহুল্য, এ নীতিমালায় আশা করা অবাস্তব হবে না যে, বর্তমানের নগরীয় জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার সীমিত করতে হবে এবং এজন্য প্রয়োজন হবে ক্ষমতা এবং বিনিয়োগের সুযোগের ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ। শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনায় বিনিয়োগ নয়, আরো বিস্তৃত পরিসরে বিনিয়োগ সুযোগ বাড়াতে হবে। গ্রাম, মাঝারি শহরে ও ছোট শহরে সুযোগ-সুবিধার সম্ভাবনা বাড়াতে হবে। এজন্য বর্তমানের পরিবহন ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার আরো উন্নয়ন প্রয়োজন হবে।
ঢাকা এরই মধ্যে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর শহরে পরিণত হয়েছে। বিভিন্নমুখী পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও এক দশকের মধ্যে এর ওপর জনসংখ্যার চাপ খুব কমানো যাবে না। তবে অন্তত তারপর থেকে যেন চাপ কমে, সেজন্য এখনই ঢাকার আশপাশের এলাকায় বেশকিছু নতুন শহর বা উপশহর গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। এ কাজটি প্রাইভেট সেক্টরেও হতে পারে, তবে তাতে সরকারি নীতিমালার যথাযোগ্য প্রয়োগ থাকতে হবে। নগরগুলোয় অভ্যন্তরীণ সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রয়োজন হবে। রাজধানীর জন্য যে একটি নগর মহাপরিকল্পনা রচিত হচ্ছে, সেটির অনুমোদন ও বাস্তবায়ন দ্রুতগতিতে সম্পাদন করতে হবে। এক্ষেত্রে নাগরিকদের সাহায্য-সহযোগিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ উদ্যোগটি রাজউক তথা সরকারকেই নিতে হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে নগরায়ণ ও নগর উন্নয়ন চিন্তায় সরকার ও নাগরিক সম্প্রদায়, সবার যৌথ প্রচেষ্টা অপরিহার্য। নগর উন্নয়ন ও প্রশাসনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন সরকারি ও আধাসরকারি সংস্থাগুলো তাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে যেন পালন করেন, সে ব্যাপারেও এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করার ভূমিকাটিও নাগরিক সমাজ পালন করতে পারে। অন্যদিকে নাগরিকদেরও বেশকিছু দায়িত্ব আছে, যা তাদের পালন করা উচিত। ঢাকার বাইরেও প্রত্যেকটি বড়, মাঝারি ও ছোট শহর যাতে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যায়, সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় ব্যবস্থাই সুনিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশ একটি নগরায়িত দেশে পরিণত হবে, এ রকম মনে করা অস্বাভাবিক নয়। তবে সে নগরায়ণ হবে হাজার হাজার শহরকে কেন্দ্র করে। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর পর বাংলাদেশের গ্রাম আর শহরের মধ্যে অনেক ধরনের পার্থক্যই আর এখানকার মতো থাকবে না। কৃষির চেয়ে অকৃষি কর্মকাণ্ডই হবে প্রধান। তথাকথিত গ্রামে বসেই মানুষ শহুরে কাজকর্ম করবে, শহরের সাংস্কৃতিক জীবনের অনেক স্বাদ পাবে। অন্যদিকে শহরগুলোতেও গ্রামীণ বৈশিষ্ট্য প্রবিষ্ট হবে। গ্রাম-শহর এ মিশ্র চরিত্র, এক নতুন মিশ্র সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে। অবশ্য সবার আগে এখনই যে জিনিসটির দরকার, তা হলো বিশৃঙ্খলা আর নৈরাজ্য পরিস্থিতিকে শক্ত হাতে প্রতিহত এবং উৎপাদনশীল নগর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত করা। এজন্যও নগর সু-পরিচালন প্রয়োজন। মূল লক্ষ্য হতে হবে সুন্দর, সুদক্ষ ও মানবিক শহর প্রতিষ্ঠা এবং সমগ্র দেশে ভারসাম্যপূর্ণ নগরায়ণ বাস্তবায়ন করা।
লেখক: অধ্যাপক, নগর বিশেষজ্ঞ ও সভাপতি
নগর গবেষণা কেন্দ্র (সিইউএস), ঢাকা






