সময়টা আশির দশকের মাঝামাঝি। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে ডলফিন চেয়ার কোচ বাসটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘপথ অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণের জন্য তুলনামূলকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা এ বাস বেছে নিতেন। ডলফিন চেয়ার কোচে চেপে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করায় এক ধরনের আভিজাত্য বোধ হতো। রাজধানী ঢাকার কলাবাগান এলাকায় যেখান থেকে ডলফিনের বাস ছাড়ত, সেটা তো অল্প সময়ে ডলফিনের গলি হিসেবেই খ্যাত হয়ে গেল। ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে তখন অন্য যেসব বাস যাতায়াত করত, সেগুলো অতটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। তাছাড়া যাত্রাপথও ছিল বহুলাংশে ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৯১ সালের প্রথম দিকে মেঘনা সেতু চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত ফেরি পারাপারেই বেশ সময় চলে যেত।
ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে বিলাসবহুল বাসযাত্রার বিস্তার ঘটতে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ১৯৯৩ সালে সোহাগ পরিবহন এ পথে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বিলাসবহুল বাস নামায়। অবশ্য এটাও জানা যায় যে এর এক যুগ আগে আরেনকো নামে আরেকটি কোম্পানি ঢাকার ইস্কাটন এলাকা থেকে এসি বাস চালু করেছিল চট্টগ্রামের পথে। তবে সেটি অল্প দিন পরই বন্ধ হয়ে যায়। সোহাগ পরিবহনের পাশাপাশি গ্রিন লাইনও এসি বাস নামায় এ পথে। কাছাকাছি সময়ে নন-এসি অথচ স্বাচ্ছন্দ্যময় বাস চালনায় এগিয়ে আসে সৌদিয়া, এস আলম, হানিফ এন্টারপ্রাইজ ও শ্যামলী। এসব বাস ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পথে যাতায়াত শুরু করে। এভাবে দূরপাল্লার যাত্রায় এসি, নন-এসি— দুই ধরনের বাসই যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য দেয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-রাজশাহীসহ বিভিন্ন রুটের যাত্রীরাও ধীরে ধীরে নতুন ধরনের বাসে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে শুরু করেন। ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হলে কার্যত টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সড়কপথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্থাপিত হয়। আর যোগাযোগ ব্যবস্থার এ অগ্রগতি বিলাসী বাসযাত্রার সুযোগ বাড়িয়ে দেয়।
এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের বাস আমদানি করেছে। কখনো খোলা অবস্থায় (সিকেডি) এনে দেশে সংযোজন করা হয়েছে, কখনো পূর্ণাঙ্গ বাস (সিবিইউ) আনা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ বাসগুলো বেশির ভাগই বাইরে থেকে বডি ফেব্রিকেশন করে আনা হয়। বাংলাদেশে আনা ইউরোপের নামকরা একাধিক কোম্পানির বাসের বডি ফেব্রিকেশন হয়েছে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে। পাশাপাশি দেশেও কিছু বডি ফেব্রিকেশন হচ্ছে। বাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘ওল্ড মেমোরিজ বাসেস ইন বিডি’ নামে একটি গ্রুপ আছে। এ গ্রুপের পাতায় বেশকিছু চিত্তাকর্ষক তথ্য ও ছবি পাওয়া যায়। সেখানে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে কোন প্রতিষ্ঠান কোন ধরনের বাস দেশে প্রথম নামায়। এটি মোটামুটি তথ্যনির্ভর। এতে দেখা যায় সোহাগ দেশে প্রথম সুইডেনের স্ক্যানিয়া বাস এনে (সিকেডি) পথে নামায়। এগুলো ছিল নন-এসি বাস। অন্যদিকে গ্রিন লাইন প্রথম স্লিপার বাস আনে। আবার গ্রিন লাইনই প্রথম এসি স্ক্যানিয়া পূর্ণাঙ্গ বাস দেশে আনে। জার্মানির এমএএন বাসও গ্রিন লাইনেরই আনা। এমএএন দ্বিতল এসি বাস তাদের বহরে সর্বশেষ সংযোজন। এসি ভলভোও প্রথম আনে এ কোম্পানি। তবে নন-এসি ভলভো প্রথম এনেছিল শাহজাদপুর পরিবহন। আর রাষ্ট্রীয় বিআরটিসি প্রথম ভলভো নন-এসি দ্বিতল বসে ঢাকার রাস্তায় নামিয়েছিল। বর্তমানে সোহাগ ও গ্রিন লাইনের এসি ভলভো বাস বেশ জনপ্রিয়। অন্যদিকে শ্যামলী পরিবহন দেশে প্রথম আরএম-২ আনে। এছাড়া ওরিয়েন্টাল প্রথম মার্সিডিজ বেঞ্জ এনেছিল। তবে ২০০৮ সালে সৌদিয়া-এস আলমের যৌথ উদ্যোগে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পথে নামানো মার্সিডিজ বেঞ্জ ব্যাপক সাড়া ফেলে। এছাড়া বিগত দুই দশকে নেপচুন, টি আর ট্রাভেলস, অগ্রদূত, দেশ ট্রাভেলস, নাবিল, খালেক পরিবহন, তুবা লাইন, বাগদাদ, ইউনিক, ইয়েলো লাইন, এসবি সুপার ডিলাক্স, লন্ডন এক্সপ্রেস, ন্যাশনাল ট্রাভেলস ইত্যাদি বাস কোম্পানি বাসযাত্রায় বৈচিত্র্য আনে ও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে।
এ বিলাসবহুল বাসের ব্যবসায় বিনিয়োগ ও লেনদেনের কোনো বিস্তারিত পরিসংখ্যান মেলে না। তবে এসব বাস কোম্পানির বিনিয়োগ ও ব্যবসার বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। যেমন— এস আলমের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বর্তমানে তাদের বিলাসবহুল কোচ সার্ভিসের বহরে হিনোসহ একাধিক বিশ্বখ্যাত কোম্পানিতে প্রস্তুতকৃত প্রায় ৩০০ বাস আছে। এখানে প্রায় এক হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক লেনদেন প্রায় ৮০ কোটি টাকা।
একইভাবে বাস ব্যবসার বিস্তারের কোনো তথ্যপূর্ণ ইতিবৃত্তও নেই। বাংলাদেশে অনেক কিছুর গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন খাতের ওপর কম-বেশি গবেষণা হচ্ছে। পরিবহন খাত নিয়েও গবেষণা হয়েছে। কিন্তু পরিবহন খাতের ইতিহাস খুব গুরুত্বসহকারে ও বিস্তারিতভাবে এখনো প্রণীত হয়নি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু তথ্য-উপাত্ত মেলে। তবে পরিবহন নিয়ে আগ্রহী কিছু ব্যক্তি চেষ্টা করছেন এসব ইতিহাস তুলে ধরার। যেমন: অনলাইনে ‘বাসেস অ্যান্ড কোচেস’ নামে একটি সাইট আছে, যেখানে বিলাসবহুল বাসযাত্রার অভিজ্ঞতা ও কিছু পরিবহন কোম্পানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস দেয়া হচ্ছে। আবার ফেসবুকে ‘বিডি বাস লাভার’ নামে আরেকটি গ্রুপ আছে, যেখানে কিছু তথ্য ও ছবি মেলে, যা কম চিত্তাকর্ষক নয়। শ্যামলী পরিবহনের কথাই ধরা যাক। স্বাধীনতার পর পাবনায় একটি স্কুটার দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল এর। তখন কেইবা ভেবেছিল যে চার দশক পরে গিয়ে শ্যামলী পরিবহন একটি বিশাল পরিবহন কোম্পানিতে দাঁড়াবে? ৭-৮ হাজার টাকার বিনিয়োগ বেড়ে ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে?
বিলাসী বাসের চালকরা তুলনামূলকভাবে সুপ্রশিক্ষিত ও দক্ষ। তাদেরকে যাত্রীদের বিষয়েও যথেষ্ট সংবেদনশীল থাকতে হয়। যাত্রীসেবা যেন ভালো হয়, এসব বাসের পরিচালকরা সেদিকে নজর দেন। যাত্রীসেবা নিয়ে প্রতিযোগিতাও আছে। কোনো কোনো দূরপাল্লার বিলাসবহুল বাসে এখন মাঝপথে যাত্রাবিরতিতে যাত্রীদের ভালো হোটেলে বুফেতে খাবার দেয়া হয়। আবার ঢাকা মহানগরের মধ্যে এসব বাস চলাচলের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ থাকায় বিভিন্ন কোম্পানি দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য শাটল সার্ভিস চালু করেছে।
স্বল্প দূরত্বে অবশ্য বিলাসবহুল বাস সেবার তেমন কোনো প্রসার ঘটেনি। দুই বছর ধরে রাজধানীতে গুলশাল এলাকায় ঢাকা চাকা নামে এসি মিনিবাস চালু হয়েছে। আর কয়েক মাস ধরে মতিঝিল-আবদুল্লাহপুর রুটে গ্রীন ঢাকা নামে এসি বাস চলছে। বিআরটিসির কিছু এসি বাসও ঢাকা মহানগরে চলছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে এসি বিআরটিসি চলেছিল কয়েক বছর। সেটি বন্ধ করে বেসরকারি শীতল পরিবহনের এসি বাস একচেটিয়া ব্যবসা করছে। ঢাকা-সোনারগাঁ রুটে বোরাক এসি বাস চলছে।
আসলে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় গণপরিবহন তথা বাসের ভূমিকা কোনোভাবেই গৌণ করে দেখার সুযোগ নেই। অনিবার্যভাবেই বিলাসবহুল বাসযাত্রার সঙ্গে দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতির একটা সহসম্পর্ক রয়েছে, যা ২০০০ সালের পর থেকে ভালোভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে। গড়পড়তায় ২০০০ সালে বাংলাদেশীদের মাথাপিছু আয় ছিল ৩০ হাজার টাকা, যা এখন ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পরিবহন ব্যবসায়ীরাও বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছেন ভালো মুনাফার প্রত্যাশায়। সোজা ভাষায়, চাহিদা অনুসারে জোগান বেড়েছে। শুধু কাজের প্রয়োজনে নয় বরং ছুটি কাটানো ও বেড়ানোর জন্য মানুষের যাতায়াত চাহিদা বাড়ায় বিলাসী বাসের চাহিদা বেড়েছে। বিদেশ থেকে আসা পর্যটকরাও এসব বাসে যাতায়াত করে বেশ আরাম পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব অনুসারে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সড়ক পরিবহন উপখাতের অবদান ৭ শতাংশ। স্থির বাজারমূল্যে যা কিনা প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার সমান। এর মধ্যে বাসের হিস্যা কতটুকু, তার কোনো হিসাব মেলে না, আর বিলাসী বাস তো দূরের কথা। তবে সড়ক পরিবহনের প্রায় ৬০ শতাংশ বাসভিত্তিক বলে ধরে নেয়া যায়। আবার অর্থনৈতিক শুমারি-২০১৩ (এখন পর্যন্ত এটাই সর্বশেষ) অনুসারে পরিবহন ও সংরক্ষণ খাতে ১৩ লাখ ছোট, মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে আর এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ সম্পৃক্ত রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুসারে, ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত (১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে) সারা দেশে নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজারের কিছু বেশি। আর মিনিবাসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজারের সামান্য ওপরে। তার মানে দেশে নিবন্ধিত বাস ও মিনিবাসের সংখ্যা ৮০ হাজারের বেশি। অনেক পুরনো বা ২৫ বছরের বেশি মেয়াদ পেরোনোয় এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই এখন আর সচল নেই বলে ধরা যায় যদিও বাংলাদেশের রাস্তায় ২০ বছরের বেশি লক্কর-ঝক্কর বাস-মিনিবাসের এখনো দেখা মেলে। তবে ২০১০ সালের পর থেকে নতুন নতুন বাস ও মিনিবাসের রাস্তায় নামার হার বেড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। যেমন— ২০১০ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮ হাজার। আর তার পরের আট বছরে (জানুয়ারি ২০১১- আগস্ট ২০১৮) নতুন নিবন্ধিত হয়েছে ১৭ হাজারের বেশি বাস। অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত বিস্তৃত হয়েছে আর মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন যত বেড়েছে, তার সঙ্গে চাহিদা বাড়ায় বাস তথা গণপরিবহনের সংখ্যাও বেড়েছে। আর এ ধারায় বিলাসবহুল বাসের সংখ্যাও ধীরে ধীরে বেড়েছে। যদিও কতগুলো বিলাসবহুল বাস এখন দূরপাল্লার বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি। এক অনুমিত হিসাবে, এখন অন্তত এক হাজার বিলাসবহুল এসি বাস চলাচল করছে।
তবে বিলাসী বাসযাত্রার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হলো, সড়ক ও মহাসড়কের কোনো কোনো জায়গায় অপ্রশস্ততা ও ভাঙাচোরা অবস্থা এবং যান চলাচলে অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা। যেহেতু ট্রাফিক আইন মেনে বাস চালানোয় একটা অনীহা সারা দেশেই পরিলক্ষিত হয়, সেহেতু এর প্রভাব গিয়ে পড়ে বিলাসী বাসের ওপরও। রাস্তায় লক্কড়-ঝক্কড় বাসের বেপরোয়া ছুটে চলা বিলাসী বাসের জন্য সমস্যা তৈরি করে, অযাচিত ঘষা-ধাক্কা লাগার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাছাড়া মহাসড়কে ছোট ও অযান্ত্রিক যানবাহনের চলাচলও আরেক সমস্যা।
তার পরও বিলাসী বাসযাত্রার বিস্তার ঘটছে, সামনে আরো ঘটবে। এ খাতে যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তাতে ভোক্তা তথা যাত্রীরা উপকৃত হচ্ছেন। আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ায় বাড়তি অর্থ ব্যয় করে তারা যাত্রাপথে বিলাস উপভোগ করতে কার্পণ্য করছেন না। এ প্রবণতা বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের একটি প্রতিফলনও বটে, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
লেখক: অর্থনৈতিক সাংবাদিক






