যারা গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছেন, তাদের পক্ষেও ১৯৯৭ সালের আগে এ দেশে টেলিযোগাযোগ খাতের চিত্রটা কেমন ছিল তা কল্পনা করা কিছুটা কষ্টসাধ্য হবে। সে সময়ের ১২ কোটি মানুষের দেশে তিন-চার লাখ ল্যান্ডফোন, সেটাও আবার শহরাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ, এই ছিল টেলিযোগাযোগ খাত। সংযোগ পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা, বিল নিয়ে জটিলতা, লাইনম্যানের বিড়ম্বনা— এসবই ছিল টেলিফোন নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা। প্রবাসী বাংলাদেশীর হঠাৎ ফোন কল এলে গভীর রাতে দৌড়ে পাশের বাড়িতে যাওয়া ছিল খুব স্বাভাবিক। আবার অনেক প্রবাসী ক্যাসেটের ফিতায় কথা রেকর্ড করে লোক মারফত দেশে পাঠাতেন। আত্মীয়-স্বজনরা তা শুনে আবার নিজেদের কথা রেকর্ড করে ফেরত পাঠাতেন বিদেশে। অতিসীমিত কাভারেজ আর উচ্চমূল্যের সেবা নিয়ে একটি মাত্র মোবাইল ফোন কোম্পানি থাকলেও দেশে তার উপস্থিতি সার্বিক পরিস্থিতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
এখনকার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের কাছে যোগাযোগের এ মাধ্যমগুলো গল্প মনে হতে পারে। আর এখন যারা স্কুলপড়ুয়া তাদের কাছে হয়তো মনে হবে অবিশ্বাস্য কল্পকাহিনী।
এমন একটি পরিস্থিতিতে সরকার টেলিযোগাযোগ সেবা বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যার ফলে ১৯৯৭ সালে তিনটি বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানি— গ্রামীণফোন, একটেল (বর্তমানে রবি) ও সেবা (বর্তমানে বাংলালিংক) যাত্রা শুরু করে ডিজিটাল জিএসএম সেবা নিয়ে। এর মাধ্যমে শুধু টেলিযোগাযোগ খাতেই নয়, জনমানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে শুরু হয় এক ব্যাপক পরিবর্তন।
১৯৯৭ সালে বড় আকারে শুরু হলেও বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের সূচনা ১৯৯০ সালে। হাচিসন বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড নামের এক কোম্পানি দেশে প্রথম মোবাইল সেবা চালু করে প্রথম প্রজন্মের প্রযুক্তি নিয়ে। বাংলাদেশ ছিল উপমহাদেশের দ্বিতীয় দেশ মোবাইল সেবা শুরুর হিসেবে, প্রথম ছিল শ্রীলংকা ১৯৮৯ সালে। বিভিন্ন আইনগত জটিলতায় এটি পরবর্তী সময়ে প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেডের কাছে বিক্রি হয়ে যায়, যাকে এখন সবাই সিটিসেল নামে চেনে।
প্রথম দিকে দুর্বল অবকাঠামোর কারণে জিএসএম মোবাইল ফোনের বিস্তার ছিল কিছুটা ধীর। তখনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির জন্ম হয়নি। সরকারি মালিকানাধীন অপারেটর বিটিটিবি (বর্তমানে বিটিসিএল) ছিল একদিকে অপারেটর ও অন্যদিকে রেগুলেটর। ল্যান্ড লাইনের সঙ্গে ইন্টারকানেকশনের অভাবে ব্যবহারকারীরা তাদের নতুন মোবাইল ফোনের কার্যকারিতা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এ প্রতিবন্ধকতা এড়াতে অপারেটররা মোবাইল টু মোবাইল নামে এক ইনোভেটিভ সার্ভিস চালু করে। আর এর পথ ধরে ১৯৯৯ সালে প্রিপেইড সেবা চালু হওয়ার পরই এদেশের মোবাইল ফোন খাত দ্রুত বিস্তার লাভ করতে শুরু করে।
২০০০ সালের আগে দেশের উন্নয়নের বাধাগুলো নিয়ে যত গবেষণা, আলোচনা হয়েছে, সেখানে প্রথম দিকেই থাকত টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর অনুপস্থিতির কথা । কিন্তু সেই অবস্থান থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি, যার প্রধান কৃতিত্ব মোবাইল অপারেটরদের। টেলিফোন এখন শুধু সহজলভ্যই নয়, সুলভও। বর্তমানে এদেশে ১৫ কোটিরও বেশি সক্রিয় সিম আছে এবং দ্বৈত সিম ব্যবহারের বিষয়টি আমলে নিলেও দেশের প্রায় ৬০ ভাগ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন আছে। ১৯৯৭ সালের চার লাখ ল্যান্ডফোন থেকে আমরা কতদূর এসেছি, সেটা এখানেই বোঝা যাচ্ছে।
আর যদি বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে টেলিযোগাযোগ খাত জাতীয় অর্থনীতির অন্য সব খাতেরই দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে অবদান রাখছে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি। মোবাইল আসার আগে বাংলাদেশের আমের প্রধান উৎস রাজশাহীর আমবাগানগুলো তাদের সব আম ঢাকার আড়তদারদের কাছে বিক্রি করত এবং তারপর ঢাকা থেকে সেই আম চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য স্থানে যেত। এতে সময় আর পরিবহন ব্যয় লাগত বেশি আর আম নষ্টও হতো অনেক। কিন্তু ফোন আসার পর বাগান মালিকদের সঙ্গে বরিশাল, খুলনা বা চট্টগ্রামের আড়তদারের যোগাযোগ স্থাপিত হলো আর সরাসরি রাজশাহী থেকে সেসব জায়গায় আম যেতে শুরু করল।
এভাবেই টেলিযোগাযোগ দেশের অর্থনীতির এক বড় চালিকাশক্তি হয় উঠেছে। মোবাইল অপারেটরগুলো গত প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে আছে। আয়কর, আমদানি-শুল্ক, তরঙ্গ, মূল্যসংযোজন কর ইত্যাদি খাত মিলিয়ে মোবাইল অপারেটররা তাদের আয়ের ৫০ শতাংশ (কোনো কোনো বছর তার চেয়েও বেশি) সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। তাছাড়া বিগত এক দশক ধরে মোবাইল খাত সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে, গড়ে মোট বিনিয়োগের ২৬ শতাংশ এসেছে এ খাতে। ২০১৫ সালের এক হিসাবে জিডিপিতে টেলিযোগাযোগ খাতের অবদান ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ, আর্থিক মূল্যে প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপিতে মোবাইল ফোন শিল্পের অবদান গড়ে ৩ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে এর দ্বিগুণ।
আমরা জানি, কর্মসংস্থান অর্থনৈতিক গতিশীলতায় একটি বড় ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রেও মোবাইল খাতের একটা ভালো ভূমিকা আছে। এ খাতটি শুধু কর্মসংস্থান নয়, বরং নতুন নতুন অনেক ব্যবসা ও পেশা তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, এ শিল্পের আগে রিচার্জ বিক্রেতা ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এজেন্ট নামের কোনো পেশা ছিল না; কিংবা হ্যান্ডসেট ও মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসা ছিল অজানা। এখন এমনকি রিকশাভ্যান থেকে পর্যন্ত মোবাইল চার্জার কিংবা ইউএসবি কেবল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে অনেকেই। জিএসএমএর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৫ সালে মোবাইল ফোন শিল্প ৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। আমার মতে, এটা বেশ রক্ষণশীলভাবে হিসাব করা হয়েছে। তাছাড়া গত চার বছরে সংখ্যাটি আরো বেড়েছে। আমার হিসাবে বর্তমানে কর্মসংস্থানের এ সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্যামসাংসহ বিশ্বের প্রথম সারির হ্যান্ডসেট নির্মাতারা তাদের কিছু সেট বাংলাদেশেই উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য, মোবাইল হ্যান্ডসেটের ওপর আমদানি শুল্ক বাংলাদেশে অনেক বেশি, প্রায় ৩২ শতাংশ, যা এ মুহূর্তে স্মার্টফোন ব্যাবহার বৃদ্ধির পথে এক বড় অন্তরায়।
মোবাইল ফোন বিভিন্নভাবে গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছে। এর মধ্যে আছে গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের জন্য স্বাস্থ্য উপদেশ, জরুরি অবস্থায় মোবাইল ফোনে চিকিৎসা, মায়েদের ফোন নম্বরে সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তির টাকা পৌঁছানো ইত্যাদি। আজ শহরে যে নারী শ্রমিক তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করে, সে কিন্তু গ্রামে তার পরিবারের সঙ্গে সুলভে ও সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ রাখতে পারছে মোবাইলের মাধ্যমে। মোবাইল সেবার কারণে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বেড়েছে ও সহজতর হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গ্রামীণফোনের ‘পল্লী ফোন’ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। শুরুর বছরগুলোতে এ কর্মসূচির অধীনে কয়েক হাজার গ্রামের নারী মোবাইল ফোনকে একটি আয়ের উৎস হিসেবে নিয়ে নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছিল, যা ছিল নারীর ক্ষমতায়নের একটি মডেল।
কর্মসংস্থানের খোঁজে ও নানা কারণে প্রায় এক কোটি মানুষ এখন বিদেশে বসবাস করছে। দেশের ভেতরেও কাজের জন্য নিজের এলাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা আরো বেশি। তারা দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়ির বাইরে থাকলেও সুলভ মোবাইল কল আর ইন্টারনেটের কারণে তারা তাদের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে পারছে। চিঠি লিখে উত্তরের জন্য এক বা দুই মাস অপেক্ষা করা এখন শুধু কল্পনারই ব্যাপার। আজ যে শ্রমিকটিকে আবুধাবিতে থাকতে হচ্ছে জীবিকার তাগিদে, সে কিন্তু দেশে তার মায়ের বা স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ‘ইমো’ ভিডিও কলের মাধ্যমে। সে তাত্ক্ষণিকভাবে জানছে তার মায়ের শরীরটা কেমন বা স্ত্রী কী রান্না করেছে! এই যে ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট, এই যে দূরে থেকেও কাছে থাকার সুযোগ, মোবাইল ফোনের এ এক মস্ত অবদান।
মোবাইল ফোন শিল্পে পরিবর্তনের কথা বলতে দেশে ইন্টারনেটের দ্রুত বিস্তারের কথা বলতে হয়। দেশব্যাপী ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো না থাকায় বাংলাদেশে প্রথম থেকেই ইন্টারনেটের বিস্তার ছিল মোবাইল ফোননির্ভর। এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে। বর্তমানে দেশের নয় কোটি ইন্টারনেট গ্রাহকের ৯৫ শতাংশই মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। দেশে থ্রিজি ও ফোরজি প্রযুক্তি চালু হওয়ায় গ্রাহকরা দ্রুতগতির ইন্টারনেটের স্বাদও পাচ্ছেন। মোবাইল ফোনে দ্রুতগতির ইন্টারনেট চলে আসায় অনেক নতুন নতুন সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক বছর দেশীয় অ্যাপ তৈরিতে গতি এসেছে। দেশে বর্তমানে ৫ হাজার অ্যাপ ডেভেলপার কাজ করছেন এবং তাদের ৩ হাজার ৫০০-এরও বেশি অ্যাপ ‘গুগল প্লে-স্টোর’-এ স্থান করে নিয়েছে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ৪২০ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক অ্যাপ মার্কেটের ১ শতাংশ দখলের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে।
ইন্টারনেট কমার্স বা ই-কমার্সও এখন বেশ বিস্তার লাভ করছে, আর তাতেও মোবাইল ফোনের ভূমিকা বেশি। ই-ক্যাবের হিসাবে দেশে ১০ হাজারেরও বেশি ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এসব ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ই-কমার্সও গতি পাচ্ছে। বিশ্বখ্যাত চীনা ই-কমার্স আলিবাবা এরই মধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে আর আগামী দুই বছরের মধ্যে অ্যামাজনও চলে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মোবাইল ইন্টারনেটের কারণে ডিজিটাল কনটেন্ট সৃষ্টির বিষয়টি নতুন একটি শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, বিনোদন ইত্যাদি খাতে নতুন নতুন সেবা এবং কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে, যা জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে। এ প্রসঙ্গে টেলিনর গ্রুপের টনিক স্বাস্থ্য সেবার কথা উল্লেখ করা যায়, যা গ্রাহকদের স্বাস্থ্য উপদেশ ছাড়াও বিভিন্ন হাসপাতালে ডিসকাউন্টে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে। মাত্র দুই বছরেই এর গ্রাহক চার মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। কৃষকদের মধ্যে আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ও প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে মোবাইল ফোনের ব্যবহার শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন থেকেই।
বাংলাদেশে শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় একটি অসমতা বিরাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। এ ব্যবধান পূরণে এগিয়ে এসেছে মোবাইল ফোন প্রযুক্তি। মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থার সহায়তায় ইন্টারনেট, শিক্ষা প্রদান ও গ্রহণের নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের উপায় তৈরি করে দিয়েছে। এর ফলে কর্মক্ষমতা এবং ফলাফলেও উন্নতি এসেছে। রবির ‘টেন মিনিট স্কুল’ এমনই একটি উদ্যোগ, যার ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায় শিক্ষা উপকরণ তুলে ধরা হচ্ছে। এছাড়াও, বিশ্বখ্যাত খান একাডেমির বিপুল পরিমাণ শিক্ষা উপাদান গ্রামীণফোনের সাহায্যে স্থানীয়করণ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোবাইল অপারেটররা ডিজিটাল বিনোদনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত পাইরেসিতে আক্রান্ত স্থানীয় মিডিয়া জগৎ নতুন করে জেগে উঠেছে। গ্রামীণফোনের ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপ্লিকেশন বায়োস্কোপ-এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় সরাসরি টিভি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। আর এর ক্লাউড প্রযুক্তির সাহায্যে তারা যে অনুষ্ঠানগুলো দেখতে পারেননি, সেগুলোও দেখতে পারেন। অন্য অপারেটররাও (যেমন— রবির আইফ্লিক্স, বাংলালিংকের বাংলাফ্লিক্স) আকর্ষণীয় ভিডিও সার্ভিস নিয়ে এসেছে। ফলে ডিজিটাল ভিডিও কনটেন্ট হয়ে গেছে অনেক সহজলভ্য। আর এসব প্লাটফর্মকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ওয়েব সিরিজ।
এটা ঠিক, স্থানীয় উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোই দেশের ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বিস্তারে প্রধান নিয়ামক। সহজভাবে বলতে গেলে, স্থানীয় উদ্যোক্তারাই নিত্যদিনের চাহিদাগুলো প্রযুক্তিগত সমাধানের পথ খুঁজে পেতে পারে। বাংলাদেশের স্টার্টআপের ইকোসিস্টেম নতুন হলেও খুব দ্রুতই তা পরিণত হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করেছে। এ মুহূর্তে ই-কমার্স বা সেবাভিত্তিক স্টার্টআপগুলোই ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধির মূল নিয়ামক। বিক্রয় ডটকম, দারাজ ডটকম, পিকাবু ডটকম, প্রিয়শপ ডটকমের মতো স্টার্টআপগুলোই এ মুহূর্তে ই-কমার্সে সবচেয়ে বেশি ভালো করছে; এবং এদের সঙ্গে আছে সেবা.এক্সওয়াইজেড ও সিমেড-এর মতো ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো। গ্রামীণফোন অ্যাকসেলারেটরের মতো প্লাটফর্মগুলো স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে সহায়তা করছে। সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগও তাদের ‘আইডিয়া’ প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিতে কাজ করছে।
তবে মোবাইল ফোন প্রযুক্তি এখানেই থেমে থাকছে না। অদূর ভবিষ্যতে ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ (আইওটি) ব্যবসা-বাণিজ্যে ও প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। বর্তমানে এর ব্যবহার যানবাহন ট্র্যাকিং ও কিছু নিরাপত্তামূলক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা আরো বিপুল, যা এখনো নিরীক্ষাধীন। কুড়িগ্রামে কৃষকদের জন্য বন্যার পূর্বসতর্কীকরণে ‘আইওটি’ কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা দেখা হচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠান তাদের ইলেকট্রিক জেনারেটরের সঙ্গে আইওটির সমন্বয় করেছে, যাতে রক্ষণাবেক্ষণের সময় হলে যন্ত্রগুলো সরাসরি বিক্রেতাদের সেই তথ্য প্রদান করতে পারে। লাখ লাখ বিদ্যুৎ, গ্যাস অথবা পানির মিটার স্মার্ট গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে সম্পদের সুষম ব্যবহার সম্ভব। ‘কানেক্টেড ডিভাইস’গুলো ব্যবসায়ে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। স্মার্ট হোম ও অফিসে সংযুক্ত ডিভাইসগুলো মানুষের সহায়তা ছাড়াই অনেক কাজ করতে পারবে। বাংলাদেশের বেশকিছু স্টার্টআপ এরই মধ্যে আইওটির অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে কাজ করছে।
ডাটা বা তথ্যভিত্তিক সলিউশনগুলো ডিজিটাল পরিবর্তনের যাত্রায় বিশাল ভূমিকা রাখবে। মোবাইল কলের মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ ডাটা (‘বিগ ডাটা’ নামে পরিচিত) পাওয়া যায়, তা বিভিন্নভাবে উপকারী লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহার করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মহামারী থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানে এই ‘বিগ ডাটা’ ব্যবহার করা যায়।
তবে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক মনে হলেও আসল পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত সহায়তা। সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবাদানে এখনো প্রচুর বাধা রয়েছে। মোবাইল সেক্টরের ট্যাক্স অন্যান্য যেকোনো সেক্টরের চেয়ে বেশি। মোবাইল নেটওয়ার্কের অন্যতম কাঁচামাল স্পেকট্রামের দাম এশিয়ার দেশগুলোর গড় দামের ৬০ শতাংশ বেশি। একজন গ্রাহককে মোবাইল সেবা ও ইন্টারনেটের ওপরে ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ কর (শুল্ক + সম্পূরক শুল্ক) পরিশোধ করতে হয়। অতিরিক্ত আমদানি শুল্কের কারণে স্মার্টফোন (বিশেষ করে ফোরজি ফোন) সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
ক্লাউড হোস্টিং ডিজিটাল সেবাদানে একটি জরুরি বিষয় হলেও আমাদের টেলিযোগাযোগ আইনে ক্রেতাদের তথ্য দেশের বাইরে আদান-প্রদানে বিধিনিষেধ আছে। যে কারণে আমাদের ক্রেতারা আধুনিক ক্লাউড সার্ভিসের আসল অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ‘বিগ ডাটা’র ক্ষেত্রেও এ আইন প্রযোজ্য, কেননা বর্তমান আইন অনুসারে মোবাইল অপারেটরদের ‘বিগ ডাটা’ গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। এ আইন বর্তমানের উঠতি স্টার্টআপগুলোর প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল সেবাদানে এক ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। অ্যানালগ আমলের টেলিযোগাযোগ আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ডিজিটাল যুগের উপযোগী করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রাইভেসির ব্যাপারকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আইন তৈরি ও তার প্রয়োগ করতে হবে।
এছাড়াও, ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদের অংশগ্রহণের অনুমতি নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক্ষেত্রে খুবই প্রটেক্টিভ। এজন্য মোবাইলে টাকা লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও প্রকৃত ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের জন্য প্রয়োজনীয় পরবর্তী ধাপে যেতে পারছি না। প্রয়োজনীয় মোবাইল পেমেন্ট ব্যবস্থার অভাবে স্থানীয় অ্যাপ্লিকেশন ও সার্ভিস ডেভেলপাররা নিজেদের বাজারে তাদের বানানো অ্যাপ্লিকেশন বিক্রিও করতে পারছেন না। এই একই সমস্যা ই-কমার্সকেও প্রভাবিত করছে। এক্ষেত্রে, যত দ্রুত সম্ভব নীতিমালা তৈরি করলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করবে।
ডিজিটাল যুগে প্রবেশের পথে এর আনুষঙ্গিক ক্ষতিকর উপাদানগুলোর নেতিবাচক ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে আমাদের শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুফলের পাশাপাশি কীভাবে এর ক্ষতিকর ব্যবহার (সাইবার বুলিং, পর্নোগ্রাফি, আইডেন্টিটি থেফট ইত্যাদি) থেকে দূরে রাখা যায়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে সামাজিকভাবে, বিশেষ করে অভিভাবকদের মধ্যে, সচেতনতার বিকল্প কিছু নেই। এ ব্যাপারে অতি সম্প্রতি পাস হওয়া ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ ও এর সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে সমাজে, বিশেষ করে গণমাধ্যমে, এক ধরনের ‘ডিসকমফোর্ট’ তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল যুগের ক্ষতিকর দিকগুলো নিরসনে ব্যবস্থা নিতে হবে সন্দেহ নেই; কিন্তু সেটা এমনভাবে করতে হবে, যাতে আস্থার সংকট তৈরি না হয়।
বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন ও উন্নত কানেক্টিভিটির কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে নিজেদের কার্যকরী নানা ‘ইনোভেটিভ’ পণ্য ও সেবার মাধ্যমে মোবাইল খাত এরই মধ্যে চালিকাশক্তি হিসেবে সামনের দিকে রয়েছে; আর মোবাইল অপারেটররা ‘ডিজিটাল সার্ভিস প্রোভাইডারে’ পরিণত হয়েছে। অগমেন্টেড রিয়েলিটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও ক্লাউড কম্পিউটিং— এসব এখন শুধু উন্নত দেশগুলোর বিষয় নয়, আমাদের দেশের জন্যও এক আসন্ন বাস্তবতা, যা আমাদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে আগামীতে এক নতুন মাত্রা নিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে মোবাইল বা ডিজিটাল সার্ভিস প্রোভাইডাররাই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।
লেখক: চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার, গ্রামীণফোন লি.






