অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক স্তরে শিল্প খাতের অংশ বাড়ে

ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, কোনো দেশে যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়, তার সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আসে, যার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় উৎপাদন ও জীবিকার (বা কর্মসংস্থানের) খাতওয়ারি বিন্যাসের দিকে তাকালে। বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের আলোচনায় আরো একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। এ ধরনের দেশে সাধারণত দ্বৈত অর্থনীতি দেখা যায়। একদিকে অর্থনীতির বিরাট অংশ (যেমন কৃষি ও অন্যান্য গ্রামীণ কর্মকাণ্ড) চলে গতানুগতিক ধারায় এবং সেখানে দেখা যায় উদ্বৃত্ত শ্রম আর প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব। অন্যদিকে একটি ক্ষুদ্র অংশ (যেমন শিল্প, আধুনিক সেবা ইত্যাদি) পরিচালিত হয় আধুনিক ধারায়, যেখানে বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে গতানুগতিক খাত থেকে শ্রমিক স্থানান্তরিত হয়। এভাবে আধুনিক খাতটিতে প্রবৃদ্ধি ঘটে এবং অর্থনীতিতে তার অংশ বাড়তে থাকে। যতদিন পর্যন্ত গতানুগতিক খাতে উদ্বৃত্ত শ্রম থাকে, ততদিন শিল্প খাতে প্রকৃত মজুরি না বাড়িয়েই শ্রম নিয়োগ করা যায়। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে একপর্যায়ে উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ হয়ে যায়। তারপর শ্রমিক নিয়োগ করতে হলে মজুরি বাড়াতে হয়।

দ্বৈত অর্থনীতিতে উন্নয়নের যে প্রক্রিয়া উপরে বর্ণনা করা হলো, সে প্রক্রিয়ায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে। প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষির অংশ কমে আর শিল্পের অংশ বাড়ে। কোনো এক পর্যায়ে শিল্পের অংশ আর বাড়ে না। তখন সেবার অংশ বাড়তে শুরু করে।

কাঠামোগত পরিবর্তনের যে ধাঁচের কথা উপরে বর্ণনা করা হলো, তা বর্তমান কালের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতায় বেশ ভালোভাবেই প্রতিফলিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি— এসব দেশে প্রায় একই ধরনের বিবর্তন ঘটেছে। উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে কৃষির অংশ কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে শিল্পের অংশ বেড়েছে এবং পরে সেবার অংশ বেড়েছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের যেসব দেশ সফলতা অর্জন করেছে যেমন— দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ইত্যাদি, তাদের অভিজ্ঞতাও উন্নত দেশগুলোর মতোই; মোট উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে কৃষির অংশ কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে শিল্পের অংশ বেড়েছে। শিল্প খাতের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে দ্রুত প্রবৃদ্ধির ফলে গতানুগতিক খাতে থাকা উদ্বৃত্ত শ্রম পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির হারের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এসব দেশে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে এ খাত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দুটি দেশ ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড পুরোপুরি সফল না হলেও অনেকটাই এগিয়ে গেছে। কিছু উপাত্তের দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

দক্ষিণ কোরিয়া ষাটের দশকে (অর্থাৎ যখন সে দেশে উন্নয়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়) বেশ উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আর শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল জিডিপি প্রবৃদ্ধির দ্বিগুণ। অর্থাৎ জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ হলে শিল্পের উৎপাদন বেড়েছিল ১৪ শতাংশ। সত্তরের দশকেও শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি জিডিপির ১ দশমিক ৮ গুণ ছিল। মালয়েশিয়ায় ১৯৭০-৯৬ সাল পর্যন্ত শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল জিডিপি বৃদ্ধির হারের ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ গুণ। শিল্প খাতে শুধু যে উৎপাদন উচ্চহার বেড়েছে তা-ই নয়, সে দেশগুলোয় উন্নয়নের প্রথম স্তরে শিল্পায়নের মূল ভিত্তি ছিল রফতানিমুখী শ্রম-নিবিড় শিল্প। তার ফলে শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানও বেড়েছিল উচ্চহারে।

বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও শিল্প খাত এখনো তার চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেনি

এখন দেখা যাক বাংলাদেশ কেমন করছে। উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে, বিশেষ করে সত্তর ও আশির দশকে দেশটিতে শিল্পায়ন হয়েছে গতানুগতিক ধারায়, আমদানি প্রতিস্থাপনের ওপর ভর করে। সে সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল মন্থর এবং শিল্পের প্রবৃদ্ধিও তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। সত্তর ও আশির দশকে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ অতিক্রম করতে পারেনি। শিল্প খাতের অবস্থাও ছিল একই রকম; কোনো কোনো বছর ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিও হয়েছিল।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্প খাতের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে। ১৯৯২-৯৬ সময়ে এ খাতের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। কিন্তু পরের কয়েক বছরে প্রবৃদ্ধির হার আবার কমে যায়; ১৯৯৭-২০০১ সময়ে বার্ষিক গড় ছিল ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। তবে ২০০১ সালের পর প্রবৃদ্ধি আবার বাড়তে থাকে এবং ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো তা দুই অংকের সংখ্যা অতিক্রম করে।

বাংলাদেশের শিল্প খাতের আরো দুটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে প্রবৃদ্ধিতে অস্থিতিশীলতা, যা আশির দশকে প্রকট ছিল এবং নব্বইয়ের দশকেও কিছুটা ছিল। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে এই যে, শিল্প খাতটি মাত্র কয়েকটি শিল্পে পুঞ্জীভূত। এ খাতের মোট উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সিংহভাগই আসে একটি মাত্র খাত তৈরি পোশাক থেকে। অন্যান্য কিছু শিল্প গড়ে উঠলেও মোট উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে তাদের অংশ খুব কম। অন্যদিকে পুরনো শিল্পগুলোর যেমন— পাটজাত দ্রব্য, বস্ত্র, কাগজ, চিনি, সিমেন্ট, সার ইত্যাদির অবস্থা বেশ খারাপ।

উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮৩ সালে পাট শিল্পে নিয়োজিত ছিল তিন লাখেরও বেশি লোক, যা ২০০১ সালে নেমে দাঁড়ায় ১ লাখ ১০ হাজারে। ২০০৭ সালে ১ লাখ ১৭ হাজার হলেও পরে আবার কমে যায় এবং ২০১৬ সালে ছিল ১ লাখ ৩ হাজার। সুতি বস্ত্র খাতে ১৯৮৩ সালে প্রায় ৮৫ হাজার লোক নিয়োজিত ছিল, যা ২০০১ সালে নেমে যায় ৪১ হাজারে। তবে তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টির ফলে শিল্পটি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয় এবং কর্মসংস্থান কিছুটা বাড়ে। সিমেন্ট শিল্পেও বেড়েছে কর্মসংস্থান। কিন্তু কমে যায় চিনি, কাগজ, সার ও ম্যাচ শিল্পে। নতুন ও শ্রম-নিবিড় শিল্পের মধ্যে শুধু তৈরি পোশাক খাতেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, আর তা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। অন্যান্য শ্রম-নিবিড় শিল্প যেমন— চামড়াজাত দ্রব্য , আসবাব, ইলেকট্রনিকস, জুতা ইত্যাদিতে তেমন কোনো প্রবৃদ্ধি ঘটেনি।

নব্বইয়ের দশক থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ত্বরণ ঘটতে থাকে এবং পরের দশকে তা আরো গতি লাভ করে। রেখাচিত্র ১ থেকে দেখা যায়, ২০০১-০২ সাল থেকে জিডিপি ও শিল্প উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে, যদিও কোনো কোনো বছর আবার কমেও যায়। তবে ২০১০ সালের পর জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপর ছিল আর ২০১৫-১৬ সাল থেকে তা ৭ শতাংশ অতিক্রম করে যায়। কিন্তু শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কোনো সময়ই জিডিপি প্রবৃদ্ধির দ্বিগুণ হয়নি, যেমনটা অর্জিত হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ায়, দেশটির উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে। বস্তুত, বাংলাদেশে শিল্পের প্রবৃদ্ধি কখনই জিডিপির ১ দশমিক ৮ গুণও হয়নি। সেভাবে দেখলে মোটা দাগে বলা যায়, দেশটির শিল্প খাত সার্বিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেনি।

&dquote;&dquote;

উৎস: বিবিএস-এর উপাত্ত ব্যবহার করে নির্মিত

শিল্প খাতে উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি

শিল্প খাতের মোট উৎপাদনে বিভিন্ন শিল্পের অংশের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এ খাতের মধ্যেও বিশেষ কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৯-২০০০ সালে মোট উৎপাদনে তৈরি পোশাক খাতের অংশ ছিল ৩৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ, যা ২০১০-১১ সালে সামান্য কমে দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৫৭ শতাংশে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য খাত খাদ্যদ্রব্যের অংশও রয়েছে স্থবির। বস্ত্র, কাগজ, ফার্মাসিউটিক্যাল, আসবাব এসব খাতের অংশও কমে যায়। বেড়েছে শুধু নন-মেটালিক মিনারেল ও বেসিক মেটাল খাতের অংশ। নতুন কোনো শিল্প খাত তেমনভাবে দেখা যাচ্ছে না।

উৎপাদন বিন্যাসে পরিবর্তন না হলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আশা করা যায় না। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানে তৈরি পোশাক ও খাদ্যদ্রব্যের অংশ ২০০০-এর প্রথম দশকে প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। আর দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য খাত বস্ত্রের অংশ বরং কমেছে। সামান্য বেড়েছে বেসিক মেটাল ও নন-মেটালিক মিনারেল শিল্পের অংশ। মোট কথা, কর্মসংস্থানের কথা বললে এখনো পোশাক শিল্পই ভরসা। আর সেখানেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেখা যাচ্ছে স্থবিরতা। সে বিষয়ে যাওয়ার আগে দেখা যাক সার্বিকভাবে শিল্প খাতের কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি কেমন হচ্ছে।

সারণি ১-এ ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত পরিবেশিত উপাত্তের ভিত্তিতে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে দুয়েকটি মন্তব্য করা যেতে পারে। প্রথমত. ২০১৩ সাল পর্যন্ত মোট কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধিতে ত্বরণ ঘটছিল। আর নারীদের ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি বেড়েছিল। কিন্তু ২০১৩ সালের পর চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। একদিকে মোট কর্মসংস্থান কমে যায়, অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেশি ছিল। বস্তুত, পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি কম হলেও ধনাত্মক ছিল। সোজা কথায় এই চার বছরে নারীর কর্মসংস্থান অনেক কমেছে এবং পুরুষের কর্মসংস্থানে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হলেও মোট কর্মসংস্থান কমেছে।

সারণি ১: বাংলাদেশের শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার (%)&dquote;&dquote;

উৎস: শ্রমশক্তি জরিপের উপাত্ত ব্যবহার করে হিসাব করা

কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, ২০১৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপে কর্মসংস্থান বেশি হিসাব করা হয়েছিল। যদিও এ মতের সপক্ষে বিশেষ কোনো যুক্তি আছে বলে মনে হয় না, তবুও ২০১০ সালের পর কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি কেমন হয়েছে, তা বোঝার জন্য ২০১৩-এর সংখ্যাগুলো বাদ দিয়ে ২০১০ থেকে ২০১৬-১৭ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয়েছে এবং সারণি ১-এর শেষ সারিতে তা দেখানো হয়েছে। সে সংখ্যাগুলো ২০১০-এর আগের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, আগের তুলনায় কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির হার নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই বেশ কমেছে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এটাই ধারা; কোনো এক পর্যায়ে শ্রমের উৎপাদিকা বাড়ে, তার ফলে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির হার কমে।

এটা ঠিক, শ্রমের উৎপাদিকা বাড়াও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তা না হলে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানো সম্ভব হবে না। তবে যতদিন কোনো অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত শ্রম ও প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব বিরাজ করে, ততদিন কর্মসংস্থান ও শ্রমের উৎপাদিকা বৃদ্ধি পাশাপাশি চলতে হবে এবং তা হলেই একদিকে মজুরি বাড়বে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। যেসব দেশ উচ্চহারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বেশি করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দ্রুত উদ্বৃত্ত শ্রম ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে এটা বেশ ভালোভাবেই দেখা যায়। বাংলাদেশে এখনো উদ্বৃত্ত শ্রম নিঃশেষ হয়নি। সুতরাং এখনই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া উদ্বেগের বিষয় বলেই মনে হয়।

শিল্প খাতে নারীর কর্মসংস্থান কমেছে

বিভিন্ন শিল্পে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির দিকে তাকালে দেখা যায়, খাদ্য, বস্ত্র, ও বেসিক মেটাল শিল্পে প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক। আর পোশাক শিল্পে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৮৪ শতাংয়শ। সারণি ২-এ পরিবেশিত উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ২০১৩ সালের পর খাদ্য, বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পেই নারীর কর্মসংস্থান কমেছে। তৈরি পোশাক খাতে অবশ্য পুরুষের কর্মসংস্থান বেড়েছে, কিন্তু খাদ্যে প্রবৃদ্ধি খুব কম। বস্ত্র খাতে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক।

সারণি ২: বাংলাদেশের তিনটি প্রধান শিল্পে নারী ও পুরুষের কর্মসংস্থানের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার (%), ২০১৩ থেকে ২০১৫-১৬

&dquote;&dquote;

উৎস: শ্রমশক্তি জরিপের উপাত্ত থেকে হিসাব করা 

... এবং সেটা উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে নয়।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কেন শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের এ হতাশাব্যঞ্জক চিত্র। বিভিন্ন কারণে এটা ঘটে থাকতে পারে। প্রথমত. উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি না ঘটলে কর্মসংস্থান না বাড়াই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত. যদি এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যাতে শ্রমের প্রয়োজন কমে যায়, তবে কর্মসংস্থান না বাড়িয়েও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তৃতীয়ত. মোট উৎপাদনে পুঁজি ও যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল পণ্যের অংশ বাড়লে শ্রমের ব্যবহার না বাড়িয়েও উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। প্রথম কারণটি যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে প্রযোজ্য নয়, তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। কারণ একটু আগেই বলেছি, শিল্প খাতে উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিতে ত্বরণ ঘটেছে। সামগ্রিক চিত্রের বদলে খাতভিত্তিক অবস্থার দিকে তাকালে বিষয়টি আরো ভালোভাবে বোঝা যেতে পারে।

রেখাচিত্র ২-এ কয়েকটি প্রধান শিল্পে উৎপাদনের সূচক দেখানো হয়েছে। এ চিত্র থেকে দেখা যায়, তৈরি পোশাক ও খাদ্য শিল্পেই উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণে বেড়েছে। পাটজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে উৎপাদনে অস্থিশীলতা ছিল, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল না। শুধু বস্ত্র শিল্পেই উৎপাদন কমেছে।

&dquote;&dquote;

উৎস: বিবিএসের বাংলাদেশ স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইয়ারবুক ২০১৬ থেকে পাওয়া উপাত্ত ব্যবহার করে নির্মিত

সারণি ২ থেকে দেখা গেছে, খাদ্য ও তৈরি পোশাক খাতেই নারীর কর্মসংস্থানে বিশাল ধস নেমেছে। পুরুষের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু খাদ্যে প্রবৃদ্ধি খুব কম। বস্ত্র খাতে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক এবং শুধু এ খাতের ক্ষেত্রেই বলা যায়, উৎপাদন কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান কমেছে। অন্য শিল্পগুলোয় উৎপাদন বাড়লেও কর্মসংস্থানে তার প্রতিফলন ঘটেনি। কী কারণে কর্মসংস্থানের এ হতাশাব্যঞ্জক চিত্র? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে তৈরি পোশাক খাতের কর্মসংস্থান ও রফতানি সম্পর্কে বিজিএমইএর উপাত্ত দেখা যাক। সারণি ৩-এ পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান ও রফতানি প্রবৃদ্ধির হার পরিবেশিত হলো।

বিজিএমইএর উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ সালের পর রফতানির প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমলেও বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কর্মসংস্থান বাড়েনি। তাদের উপাত্ত অনুযায়ী ২০১১-১২ সালের পর থেকেই কর্মসংস্থান বাড়েনি। অন্যদিকে রফতানি বাড়ার ফলে কর্মীপিছু রফতানির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ এ শিল্পে শ্রমের উৎপাদিকা বেড়েছে।

সারণি ৩: তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থান ও রফতানি প্রবৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার (%), ১৯৮৪-৮৫ থেকে ২০১৭-১৮  

&dquote;&dquote;

উৎস: বিজিএমইএর ওয়েবসাইটে প্রদত্ত উপাত্ত থেকে হিসাব করা। ৬.৯.২০১৮ তারিখে ওয়েবসাইটের উপাত্ত ডাউনলোড করা হয়েছে উল্লেখ্য, ২০১১-১২ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত কর্মসংস্থান চার মিলিয়ন দেখানো হচ্ছে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এই যে, সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি পোশাক কারখানার সংখ্যা কমেছে। বিজিএমইএর উপাত্ত অনুযায়ী ২০১২-১৩ সালে মোট কারখানার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮৭৬ আর ২০১৪-১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৯৬। তবে ২০১৭-১৮ সালে সংখ্যাটি আবার বেড়ে ৪ হাজার ৫৬০-এ ওঠে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর শিল্পটি নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়, যার অন্যতম ছিল কারখানাগুলোর নিরাপত্তার মানোন্নয়ন। সে লক্ষ্যে যেসব প্রকল্প ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তার জের ধরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কত শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন, সে সম্পর্কে তেমন কোনো পরিসংখ্যান নেই। এ শিল্পে মোট কর্মসংস্থান এখন কত, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

শ্রমের প্রয়োজন কমে, এমন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে

আগেই বলেছি, উৎপাদন বাড়লেও যদি কর্মসংস্থান না বাড়ে, তবে দেখতে হবে, প্রযুক্তি ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন ঘটেছে কিনা, অর্থাৎ শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারে, এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা। এ বিষয়ে বাংলাদেশের শিল্প খাতের ওপর কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা, বর্তমান লেখকের তা জানা নেই। তবে সংবাদ মাধ্যমের ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন থেকে কিছু খণ্ডচিত্র পাওয়া যায়, যা থেকে আন্দাজ করা যায়, তৈরি পোশাক খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে এবং এতে শ্রমের ব্যবহার কমছে। উদাহরণস্বরূপ, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের (২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮) এক প্রতিবেদক বাংলাদেশের কয়েকটি পোশাক কারখানা পরিদর্শন করে জানান, সেগুলোয় জাপান ও ইউরোপে প্রস্তুত এমন কিছু যন্ত্র ব্যবহূত হচ্ছে, যার ফলে শ্রমিকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। শুধু তা-ই নয়, কিছু উদ্যোক্তা তাকে জানিয়েছেন, এ প্রবণতা চলবে। অনুরূপভাবে ২০১৬ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বলেছে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যান্ত্রিকায়নের ফলে পোশাক শিল্পে শ্রমের ব্যবহার অনেক কমে যাবে।

সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক

স্বাধীনতার আগের সময় ও স্বাধীনতার পরের এক দশক বাদ দিলেও বাংলাদেশে শিল্পায়নের ইতিহাস প্রায় চার দশকের। একটি জাতির ইতিহাসে এটি বেশি লম্বা সময় না হলেও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের জন্য এটি কম সময় নয়। এ সময়ে বাংলাদেশের অর্জন অবশ্য কম নয়। তবে শিল্পায়ন সম্পর্কে কী বলা যায়? হ্যাঁ, তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ লোক নিয়োজিত এবং শিল্পটি দেশের প্রধান রফতানি পণ্য সরবরাহ করে। কিন্তু এরপর কী? ফার্মাসিউটিক্যাল, সিরামিক, জাহাজ নির্মাণ, সাইকেল ইত্যাদি বেশ কয়েকটি নতুন শিল্পের নাম করা যায়। তবে শিল্প খাতের মোট উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে তাদের অংশ খুবই সামান্য। একই কথা বলা যায় রফতানিতে তাদের অবদান সম্পর্কে। অন্যদিকে পাট, কাগজ, সিমেন্ট, সার এসব পুরনো শিল্প বলতে গেলে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। সত্যিকারের রফতানিমুখী শিল্পায়ন বললে যে চিত্রটি ভেসে ওঠে, অর্থাৎ বেশ কয়েকটি শিল্প একই সঙ্গে গড়ে উঠে রফতানি, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে, সে রকম কিছু বাংলাদেশে হয়েছে, এটা বলা যায় না।

তৈরি পোশাক শিল্প কয়েক বছর আগ পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও সাম্প্রতিক সময়ে চিত্রটি বদলে গেছে। শিল্পটিতে নতুন কর্মসংস্থান কী হারে সৃষ্টি হচ্ছে এবং কেন এত পরিবর্তন, এ বিষয়ে গভীর পর্যালোচনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে গেছে। যেকোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটা স্বাভাবিক। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শ্রমের প্রয়োজন কমে গেলেও জোর করে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব নয়, কাম্যও নয়। তবে একটি ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে, ভ্রান্ত নীতিমালার ফলে যেন এ প্রক্রিয়া অযথা বেগবান না হয়।

শিল্প খাতে নারীর কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া একটি উদ্বেগের বিষয়। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে দেখতে হবে, পোশাক শিল্পে নারীর কর্মসংস্থান কেন কমে যাচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শ্রমের প্রয়োজন কমে গেলে তার প্রভাব নারী ও পুরুষ সবার ওপরই পড়ার কথা। কিন্তু শুধু নারীর কর্মসংস্থান কেন কমেছে, এ প্রশ্নের জবাব খোঁজা উচিত।

শিল্প খাতে (এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে) কাঠামোগত পরিবর্তনের বিকল্প নেই। একটি শিল্পের সাফল্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার সময় চলে গেছে। এখন দেখতে হবে (বা আরো আগেই দেখা উচিত ছিল) কেন এ রকম আরো কয়েকটি শিল্প গড়ে ওঠেনি এবং কেমন করে বড় পরিসরে সত্যিকারের রফতানিমুখী শিল্পায়নের পথে নামা যায়। এ বিষয়ে সফল উদাহরণের অভাব নেই। একদিকে যেমন রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশ, তেমনি রয়েছে চীন ও সাম্প্রতিক কালে ভিয়েতনাম। নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এসব দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শিল্প খাতকে একটি নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে রণনীতির প্রয়োজন, তা প্রণয়ন করা কঠিন হওয়ার কথা নয়। প্রয়োজন সদিচ্ছার এবং কাজ করতে হবে গোষ্ঠীস্বার্থ থেকে বিযুক্ত হয়ে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ; আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (জেনেভা) এমপ্লয়মেন্ট সেক্টরের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা