সবুজ বিপ্লবের রাজনীতি, বিষ ও প্যাকেজ
গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে কৃষির কৃেকৗশলে পরিবর্তন আনার পরিপ্রেক্ষিতে বীজের ধারণায় ও বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনা হয়। সরকারি উদ্যোগে হলেও সেটা ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। ফসলের একাংশকে বীজ হিসেবে সংগ্রহে রাখা, বীজ বাছাই, পরের মৌসুমে বিছন তৈরি এবং জমির বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে বিভিন্ন জাতের ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত কৃষক পরিবারই নিত, যেখানে কৃষক নারীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকত। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষভাবে চীনে কৃষকদের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট ক্ষমতা দখল করে নেয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা পালন করায় এশিয়ায় কৃষক ও কৃষি আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিবেচনার বিষয় হয়ে গেল। চীনের মতো বৈপ্লবিক ভূমি সংস্কার না করে কৃষিতে প্রযুক্তি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে কৃষি ব্যবস্থার সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকৌশলে পরিণত হলো। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার জনসংখ্যাও পাশ্চাত্য দেশের উত্কণ্ঠার কারণ হয়ে উঠল। ফলে খাদ্য সংকটের জন্য যুদ্ধবিগ্রহ, খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা, অধিক মুনাফার জন্য খাদ্যের আড়তদারি ইত্যাদি সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে খাদ্যের অভাবের জন্য প্রধানত জনসংখ্যাকে দায়ী করা শুরু হলো। সমাধান হচ্ছে, কৃষকের হাজার বছরের জ্ঞানচর্চার বিকাশ নয়, বরং আধুনিক বৈজ্ঞানিক কৃেকৗশলের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। খাদ্যের সংজ্ঞা নির্ণয়ে দানাদার খাদ্যকে প্রধান খাদ্যের (Staple Food) মর্যাদা দেয়া হলো, খাদ্যের পুষ্টিগুণের চেয়ে পরিমাণের ওপর জোর দেয়া হলো। মেক্সিকো সরকার ও রকফেলার ফাউন্ডেশন ১৯৪৩ সালের দিকে ‘সবুজ বিপ্লব’কে একটি কৃেকৗশলগত প্যাকেজ হিসেবে হাজির করার জন্য ‘বিশেষ গবেষণা’র উদ্যোগ নিল। সে উদ্যোগ ১৯৬০-এর দশকে পরিগঠিত হলো আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট হিসেবে। স্থানীয় পরিবেশ, প্রকৃতি, প্রাণবৈচিত্র্য এবং চাষের জমির বিচিত্র ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ধানের জাতকে দুটো ভাগে ভাগ করা শুরু হলো। একটি উচ্চফলনশীল (উফশী) প্রযুক্তি, অন্যটি উফশীর চেয়ে হীন ও নিম্নমূল্যের বিপুল সংখ্যার ফসলের জাত ও প্রজাতি। তারা হয়ে গেল অনুৎপাদনশীল মূর্খ কৃষকের নিম্নমানের বীজ।
কিন্তু তথাকথিত অনুন্নত দেশগুলোকে রকফেলার ফাউন্ডেশনের নীতি ও কৃেকৗশল চাপিয়ে দেয়া সহজ ছিল না। সেটা আরোপ করতে হয়েছে বিশ্বব্যংকের ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে। ষাটের দশকে বিশ্বব্যাংকের শর্ত মেনে তত্কালীন পাকিস্তানের আয়ুব খান সরকার উফশী বীজ প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি পদ্ধতি চালু করেছিলেন, যার মূলে শুধু উফশী বীজ নয়, একই সঙ্গে ছিল রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার এবং তা এসেছিল সুদূর আমেরিকার ফোর্ড ও রকফেলার ফাউন্ডেশনের আর্থিক কল্যাণে। এ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোই সহযোগিতা করেছিল প্রাণ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশগুলোয় বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কৃষিকে ‘উন্নত’ করতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এসব রাসায়নিক পদার্থের বা বিষাক্ত দ্রব্যের জন্য বাজার তৈরির দরকার ছিল। ‘সবুজ বিপ্লব’ বা Green Revolution তাহলে নিছকই বৈজ্ঞানিক ব্যাপার ছিল না। একটি কৃেকৗশলগত প্যাকেজ, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আধুনিক বিজ্ঞান, যুদ্ধের বিষাক্ত রাসায়নিক উদ্বৃত্তের বাজার তৈরি, সর্বোপরি কৃষক নয়, কৃষি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরির গবেষকদের হাতে তুলে দেয়া ইত্যাদি সবকিছুরই মিশ্রিত প্যাকেজ ছিল। অধিক উৎপাদন করে মানুষকে ক্ষুধা থেকে বাঁচানোর কথা বলা হয় বটে, আসলে সবুজ বিপ্লবের মূল কাজ ছিল ল্যাবরেটরিতে উদ্ভাবিত উফশী বীজের সঙ্গে কৃত্রিম সার ও কীটনাশক এবং তার সঙ্গে সেচ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। করপোরেট কৃষির বীজ বপন এখান থেকেই শুরু।
সবুজ বিপ্লবের সমস্যা
শতাব্দী শেষ না হতেই আধুনিক কৃষি বা সবুজ বিপ্লবের সমস্যা দেখা দিল। মাটি নষ্ট, পানি নষ্ট, ফলন কমে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, ফসলের মূল্য না পাওয়া ইত্যাদির কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের বেঁচে থাকাই কষ্টের ব্যাপার হয়ে গেল। এরপর নব্বইয়ে দেখা গেল, হাইব্রিড বা সংকর বীজের ছড়াছড়ি। ভালো বীজ উৎপাদন ও বিতরণের সরকারি উদ্যোগ থেকে সরে এসে ঢুকল প্রাইভেট কোম্পানি, বিশেষ করে যারা এতদিন রাসায়নিক কীটনাশক বিক্রি করেছে, তারাই হাইব্রিড বীজের ব্যবসায় ঢুকে পড়ল। বাংলাদেশে এখন উফশী ও হাইব্রিড বীজের কারণে কৃষক দেশীয় বীজ হারাতে বসেছেন। অথচ হাইব্রিড বীজে আপাতদৃষ্টিতে অধিক ফলন হলেও খাদ্যের মান একেবারে কমে গেছে। ‘টাটকা’ ও ‘চকচকে’ সবজি ও ফল উৎপাদন করতে গিয়ে কীটনাশক ও নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। রোগ-বালাই বেড়ে গেছে। স্বাস্থ্য সূচকে অসংক্রামক ব্যাধির হার, বিশেষ করে ক্যান্সার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। মোট মৃত্যুর ৬১ শতাংশ এখন শুধু অসংক্রামক রোগের কারণেই হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক হারে কীটনাশকের ব্যবহার এর অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, বাজারে বিক্রীত সবজির ৬৭ শতাংশ (যা অধিকাংশই হাইব্রিড) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া উফশী বা হাইব্রিড কোনোটাই কৃষকের কাছে জনপ্রিয়তা পায়নি। নির্দিষ্ট কিছু ফসলের জন্য সরকারের যে কৃষি উপকরণ সহায়তা দেয়া হয়, সেটা উফশী বীজ কিংবা হাইব্রিড ফসলের জন্যই। আধুনিক কৃষি শুরু হওয়ার পর থেকে সার-কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে। বার্ষিক কৃষি পরিসংখ্যান গ্রন্থে (Yearbook of Agricultural Statistics in Bangladesh, 2009) দেখছি, ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ১৯৯৩ সালে ছিল ৭৬৬০ দশমিক ৩৯ টন, ২০০৭ সালে তা হয়েছে ৩৭৭১২ দশিমক ২০ টন, অর্থাৎ ৩৯২ শতাংশ বেড়েছে। উল্লেখ্য, ধান ও অন্য ফসলে হাইব্রিড বীজের ব্যবহার ১৯৯৮ সাল থেকে অনেক গুণ বেড়ে গেছে।
কৃষিতে কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের পর থেকে খাদ্যনিরাপত্তার ধারণা পাল্টাতে শুরু করেছে। এখন নতুন ধারণা হচ্ছে, নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা। জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নয়, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কীটনাশক ব্যবহার কমানোর জন্যে সমন্বিত কীটনাশক ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করেছে এবং এরপর নিরাপদ খাদ্য প্রকল্প, যার অন্যতম প্রধান দিক হচ্ছে খাদ্যে রাসায়নিক দূষণ শনাক্ত করে খাদ্য উৎপাদন, বিক্রয় ও ভোগ করার পুরো চেইন নিরাপদ করা। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির উদ্যোগে ২০০১ সালে সুইডেনের স্টকহোমে persistent organic pollutants (POPs) ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জন্য একটি চুক্তি হয়, যা Stockholm convention on persistent organic pollutants (POPs) নামে পরিচিত। আন্তর্জাতিকভাবে আন্দোলনের ফলে এ চুক্তিতে ৫০টি রাষ্ট্রের স্বাক্ষর পাওয়া যায় এবং মাত্র তিন বছরের মধ্যে ২০০৪ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ আইনে পরিণত হয়। এ আইন আন্তর্জাতিকভাবে সব রাষ্ট্রের জন্য মেনে চলা বাধ্যতামূলক। পেস্টিসাইড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক এ বিষয়ে বিশেষ অবদান রেখেছে। এ আইনের আওতায় ১২টি কীটনাশকের ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এ তালিকা ২০০৯ সালের মধ্যে ২১টি কীটনাশকে এসে দাঁড়ায়িছে।
সবুজ বিপ্লব মাত্র ৩৬ বছরের মধ্যেই (১৯৯৬ সালে) জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সমালোচনা মুখে পড়ে যায়। তাদের ভাষায় “The Green Revolution of the 1960s and 1970s brought high yielding plant varieties to the fields of the developing world. It also brought greatly increased use of insecticides.” সবুজ বিপ্লব ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে উন্নয়নশীল দেশে উফশী ফসল মাঠে এনেছে, কিন্তু একই সঙ্গে কীটনাশকের ব্যবহারও বাড়িয়েছে। ফলে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে উপকারী পোকাও ধ্বংস হয়েছে। ফলে বিজ্ঞানীরা সমন্বিত কীটনাশক ব্যবস্থাপনা (IPM) উদ্ভাবন করেছেন। এ পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে উৎপাদনে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা ও কৌশলে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ফসল ফলানো এবং কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনা। ২০০০ সাল থেকেই বিভিন্ন দেশে আইপিএম ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ কীটনাশক ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। আইপিএমের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, এ পদ্ধতি কীটনাশক ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দেয়, কিন্তু বন্ধ করতে বলে না। ফলে কীটনাশকের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, কোথাও ব্যবহারও খুব একটা কমে না। তবে এটা ঠিক, কৃষক কীটনাশক ব্যবহার কমাতে, এমনকি বন্ধ করতে খুব আগ্রহী।
কিন্তু কীটনাশক ব্যবহার কমাতে হলে কিংবা বন্ধ করতে হলে শুধু উৎপাদন পদ্ধতি বদলালেই হবে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বীজের ব্যবহার। উফশী কিংবা হাইব্রিড বীজের সঙ্গে কীটনাশক ব্যবহার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রযুক্তি বদলের ক্ষেত্রে বীজের ধরনের পরিবর্তন খুব দ্রুত নজরে পড়ে।
কৃষি খাতের করপোরেট চরিত্র ও বহুজাতিক দখলদারি
উফশী ও হাইব্রিড বীজ প্রযুক্তির পরিবর্তনের এ প্রেক্ষাপট দেয়া হলো কৃষি খাতের করপোরেট চরিত্র ও বহুজাতিক কৃষি কোম্পানি খাদ্যচক্রে একচেটিয়া কায়েমের তত্পরতা বোঝার জন্য। আগে দেখেছি, বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি এতদিন যারা কীটনাশক, ওষুধ কিংবা অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবসা করত, তারা এখন কৃষি ফসলের বীজের ব্যবসায় নেমেছে। তারা শুধু বীজের ব্যবসা করেই সন্তুষ্ট নয়, বীজের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনের জন্য বীজ অবৈধভাবে নিয়ে যাচ্ছে কিংবা পেটেন্ট করে ফেলছে। বীজ চুরি করে কিংবা পেটেন্টের মাধ্যমে করপোরেশন বীজের প্রকৃতির মালিক হয়ে যায়। হাজার বছরের কৃষিতে হাজার জাতের বীজ উদ্ভাবন করেও কৃষক কখনো বীজের ওপর মালিকানা নেননি, কারণ বীজ প্রকৃতির অংশ এবং প্রকৃতি উৎপাদন চক্রের মুহূর্ত। কেউ বীজ সৃষ্টি করতে পারে না, একটু-আধটু বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারে মাত্র। বীজ মাঠ থেকে হারিয়ে কোম্পানির দখলে যাওয়ার অর্থ বীজের উৎপাদন চক্রে ফিরে যাওয়ার স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত করা এবং কার্যত বীজ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি দেশে কৃষি ব্যবস্থার ওপর করপোরেট ও বিদেশী আধিপত্য কায়েম করা। কিন্তু সে সময় থেকে বহুজাতিক কোম্পানি বীজের ব্যবসায় হাত দিয়েছে, বীজের ওপর পেটেন্ট নিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় দেনদরবার শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ETC প্রকাশিত Who owns nature শীর্ষক প্রতিবেদন (২০০৯) অনুসারে মালিকানাধীন বীজের বাজার (অর্থাৎ যে বীজে ব্র্যান্ড নাম আছে এবং কোম্পানির একচ্ছত্র মালিকানা রয়েছে) তাদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে এবং গুটিকয়েক কোম্পানির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ রয়েছে। যেমন ২০০৭ সালের হিসাব অনুযায়ী মনসান্তো ৪ হাজার ৯৬৪ মিলিয়ন ডলারের বীজ ব্যবসা করে এবং মালিকানাধীন বীজের বাজারের ২৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এরপর রয়েছে ডুপন্ট (১৫ শতাংশ) ও সিনজেনটা (৯ শতাংশ)। মাত্র ১০টি কোম্পানি পৃথিবীর মালিকানাধীন বীজের বাজারের ৬৭ শথাংশ দখল করে আছে। তার মধ্যে উল্লিখিত তিনটি কোম্পানি ৪৭ শতাংশ বাজার দখল করে আছে।
নতুন দিক হচ্ছে, এ কোম্পানিগুলো বিশ্ববাজারে একচ্ছত্র ব্যবসা কায়েমের জন্য একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের মনসান্তো জার্মানির ওষুধ কোম্পানি বায়ারের সঙ্গে ব্যবসা একত্রীকরণ বা মার্জ করছে। বিশ্বব্যাপী মনসান্তোবিরোধী আন্দোলনের কারণে মনসান্তো-বায়ার ৬৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে একত্রীকরণ হলেও মনসান্তো নাম থাকছে না, শুধু বায়ার নামই থাকবে।
মনসান্তোর জিএম ফসল প্রবর্তন ও তার কীটনাশক গ্লাফোসেট বিক্রির জন্য যেসব অনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছে, তার কুখ্যাতি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে হল্যান্ডের হেগ শহরে মনসান্তোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতীকী আদালতে সারা বিশ্ব থেকে সাক্ষী দেয়া হয়েছে এবং প্রতীকী আদালতে মনসান্তোকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
মনসান্তো নাম থাকুক বা না থাকুক, মনসান্তো-বায়ারের সঙ্গে এ মার্জ বিশ্বের কৃষিতে নতুন হুমকির সৃষ্টি করবে। প্রথমত. দুটো কোম্পানির মধ্যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বীজ (traited seeds) নিয়ে যে প্রতিযোগিতা ছিল তা থাকবে না, তারা তাদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য ইচ্ছামতো বীজের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে বীজের বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করবে। এ দুটো কোম্পানি সবজিবীজে বেশি সক্রিয়। মনসান্তোর আগাছানাশক ‘glyphosate’ ও বায়ারের glufosinate ammonium সর্বাধিক বিক্রীত পণ্য। এভাবে মার্জ করে তারা বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী কোম্পানিতে পরিণত হতে চায়, যা খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকের অধিকারের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।
মার্জ করার প্রক্রিয়া আরো কয়েকটি কোম্পানির মধ্যে চলছে, যেমন ডো ও ডুপন্ট এবং সিনজেন্টা ও কেমচীন। বাংলাদেশে এসব কোম্পানির অস্তিত্ব খুব সক্রিয়ভাবে আছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে সিনজেন্টা ও মনসান্তো।
গোল্ডেন রাইস ও বিটি বেগুন: বাংলাদেশে জিএম ফসলের বেপরোয়া ছাড়
স্বাভাবিক প্রাণকোষের বিকৃতি ঘটিয়ে তৈরি করা (genetically modified) যেসব প্রযুক্তির প্রবর্তনের ওপর বৈজ্ঞানিক নজরদারি ছাড়াও সামাজিক, আইনি ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকা অপরিহার্য, জিএম ফসল তেমনি একটি প্রযুক্তি। প্রাণ ও পরিবেশের নিরাপত্তা, প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষয়, কৃেকৗশলের ক্ষতিকর দিক, মানুষের স্বাস্থ্য ও আরো নানা দিক বিবেচনা করে প্রাণ বিকৃত করে বানানো প্রযুক্তির ওপর নজরদারি না থাকলে একটি দেশের কৃষি, পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রাণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের মতো উর্বর ও প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ একটি দেশে নির্দয়ভাবে জিএম ফসল উৎপাদনের জন্য বিদেশী কোম্পানিগুলো চেষ্টা করে যাচ্ছে। একে একে বিভিন্ন দেশ তাদের মাটি এই জিএম ফসলের জন্য ব্যবহার করতে দেবে না। কারণ জিএম ফসলের ক্ষতির দিক প্রকট হয়ে উঠছে। বিশ্ব এখন সেদিকেই যাচ্ছে। তাই জিএম ফসল প্রবর্তনকারী কোম্পানির এমন কিছু দেশ লাগবে, যেখানে জিএম ফসলের ক্ষতির কথা গ্রাহ্য করা হবে না, তারা অনায়াসে সরকারের সাহায্যে শুরু করে প্রাইভেট সেক্টরের মাধ্যমে বিকৃত বীজ চালিয়ে নিতে পারবে।
কৃষিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা জেনেটিক মডিফিকেশন প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক কিছু আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ প্রাণবৈচিত্র্য চুক্তি সনদে (CBD) অনুস্বাক্ষর করেছে ২০ মার্চ ১৯৯৪। পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর জিএমওর বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কার্টেগেনা প্রটোকল (Cartagena Protocol on Biosafety-CPB, 24 May 2000) অনুস্বাক্ষর করেছে।
দেশে একটি বায়োসেফটি প্রটোকল করার জন্য ২০০৬ সালে ন্যাশনাল বায়োসেফটি ফ্রেমওয়ার্ক (NBF) গৃহীত হয়। এ ফ্রেমওয়ার্কে বাংলাদেশে জিএমও নিয়ন্ত্রণের জন্য ভিত্তি তৈরি করা হয়। বিদ্যমান বিধিবিধানের বিবরণ এবং স্বচ্ছ কার্যকর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। ফ্রেমওয়ার্কের পাঁচটি অনুচ্ছেদের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বায়োসেফটির বিদ্যমান প্রশাসনিক বিধিবিধান বাংলাদেশের জন্য কতটা কার্যকর, তা মূল্যায়ন করা এবং যথাযোগ্য ক্ষেত্রে নতুন বিধিবিধান তৈরি করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সেই মতে বাংলাদেশ বায়োসেফটি রুলস-২০১০ প্রস্তুত করা হয়েছে। বায়োটেকনোলজি ও মারাত্মক ক্ষতিকর জীব-অণুজীব উৎপাদন, ব্যবহার, আমদানি-রফতানি, সংরক্ষণ অথবা জিএমও, এলএমওর প্রভাব থেকে পরিবেশ-প্রকৃতি, প্রাণবৈচিত্র্য, মানবস্বাস্থ্য কীভাবে রক্ষা করা যাবে, তার বিধিবিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে জিএম ফসল হিসেবে গোল্ডেন রাইস নামের জিএম ধান, যা ভিটামিন এ-সমৃদ্ধ ধান নামে প্রবর্তন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত উফশী ধান বিআর-২৯, ফিলিপাইনে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের আইআর-৬৪ (IR-64) ও ফিলিপাইনের একটি জাত RC-28-এর সঙ্গে ভুট্টার জিন ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। ভুট্টার বিটা ক্যারোটিন ব্রি ধান-২৯-এর মধ্যে ঢুকিয়ে ভিটামিন এ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রথম অবস্থায় ড্যাফোডিল ফুলের বিটা ক্যারোটিন স্থাপন করে জিএম (বা বিকৃত) গোল্ডেন রাইস প্রবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে প্রায় এক যুগ ধরে। কিন্তু এ প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিকভাবেই সফল হয়নি। তাই দ্বিতীয় পর্যায়ে ড্যাফোডিলের পরিবর্তে ভুট্টা থেকে বিটা ক্যারোটিন নেয়া হয়েছে। সিনজেন্টা কোম্পানির তৈরি জিএম ধানের নাম দেয়া হয়েছে ‘গোল্ডেন রাইস’। বাংলাদেশকে তারা পরীক্ষাগার ও বাজারজাতের স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে। ধান ও ভুট্টার মতো দুটি ভিন্ন জাতের ফসল একত্র করলে তার ফলাফল কী হতে পারে, বৈজ্ঞানিকভাবে তার কোনো তথ্য ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ এখনো উদ্ভাবকরা দেননি।
ধানের স্বাভাবিক চরিত্রে বিকৃতি ঘটিয়ে এর মধ্যে বিটা ক্যারোটিন ঢুকিয়ে অনুমান করা হচ্ছে, শরীরে গিয়ে বিটা ক্যারোটিন ভিটামিন এ-রূপে রূপান্তরিত হবে। ভিটামিন এ’র ঘাটতি ও রাতকানা রোগের যুক্তি দেখিয়ে গোল্ডেন রাইস প্রবর্তনের সঙ্গে কোম্পানির স্বার্থ জড়িত। এর সঙ্গে গরিবের রাতকানা রোগ নিরাময়ের কোনোই সম্পর্ক নেই। কারণ ভিটামিন এ পাওয়ার উৎস বাংলাদেশের অনেক খাদ্যের মধ্যে আছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুষ্টিবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানেও অনেক গবেষণা হয়েছে। অনেক ধরনের শাক যেমন— কাঁটানটে, শজনেপাতা, কলমি, পুঁইশাকসহ আবাদি ও অনাবাদি শাকের তালিকা রয়েছে। তাছাড়া গাজর, মিষ্টি কুমড়া, মিষ্টি আলু, শিম, ঢেঁড়স ডাটাসহ অনেক ভিটামিন এ-সমৃদ্ধ সবজি আছে। ফলের মধ্যে পাকা পেঁপে, বাঙ্গি, কাঁঠাল, আম, কলা, আনারসসহ বিভিন্ন ফলে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ আছে, যা আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। ঢেঁকিছাঁটা চালের মধ্যে ভিটামিন এ পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান এবং বিশেষ করে ধান উৎপাদনকারী দেশ। এ মুহূর্তে স্বাভাবিক প্রাণকোষের বিকৃতি ঘটিয়ে তৈরি করা ধান বা জিএম ধানের অনুপ্রবেশ ঘটালে আমাদের দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ফসল ধানের ওপর নানা ধরনের হুমকি সৃষ্টি হবে।
গোল্ডেন রাইসের গবেষণা আগে হলেও জিএম বা বিটি বেগুন ২০১৩ সালে তড়িঘড়ি অনুমোদন নিয়ে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে মাঠপর্যায়ে চাষের মাধ্যমে সরকারিভাবে প্রবর্তন করে বাংলাদেশ জিএম খাদ্য ফসল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বিশ্বের আরো ২৮টি দেশের কাতারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করা হয়। বিটি বেগুন জিন কৌশলে বিকৃত একটি জিএম সবজি ফসল। ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস (বিটি) ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্রিস্টাল জিন বেগুনে সংযোজন করা হয়েছে। অর্থাৎ দুটি ভিন্ন প্রাণের জিন (উদ্ভিদ ও প্রাণী), সংযোজন করা হয়েছে। ফলে এ ফসল ট্রান্সজেনিক। উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, বেগুনের ফল ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ভারতের মহারাষ্ট্র হাইব্রিড বীজ কোম্পানি (মাহিকো) বহুজাতিক বীজ কোম্পানি মনসান্টোর সহায়তায় বেগুনের জিন বিকৃতির কাজটি সম্পন্ন করে ২০০৫ সালে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি) এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ABSP-II প্রকল্পের অর্থায়নে বারি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। সরকারি প্রতিষ্ঠান এ পরীক্ষা করলেও সার্বিক নিয়ন্ত্রণ আগাগোড়া মনসান্তো ও তার সহযোগীদের হাতেই থেকেছে।
বেগুন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সব শ্রেণীর মানুষের জন্য অতিপ্রিয় ও প্রয়োজনীয় সবজি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুন্দর সুন্দর নামের বেগুন আছে। তারই মধ্যে নয়টি স্থানীয় জাতের বেগুনে বিটি জিন ঢুকিয়ে জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে বহুজাতিক কোম্পানি মনসান্তো ও তার ভারতীয় অংশীদার মাহিকো। আমাদের দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের হাতে কৃষকের নয়টি বেগুনের জাত তুলে দিয়েছে কৃষকের অজান্তে। এ বেগুনের ওপর মালিকানাও নিয়ে নেয়া হয়েছে চুক্তি করে।
বেগুনের ওপর জেনেটিক কারিগরি করার সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। ডি ক্যানডোল (১৮৮৬) অরিজিন অব কালটিভেটেড প্লান্টস (আবাদি ফসলের আদি উত্পত্তিস্থল) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, প্রচীনকাল থেকে বেগুন (Solanum melongena) প্রজাতি অবিভক্ত ভারতে পরিচিত। সে অর্থে বেগুন জন্মগতভাবে এশিয়া মহাদেশের একটি প্রজাতি। রুশ বিজ্ঞানী ভ্যাভিলভের (১৯২৮) মতে, বেগুনের আদি উত্পত্তিস্থল ইন্দো-বার্মা অঞ্চল। আজো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন আকার-আকৃতি ও বর্ণের বেগুন পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশে বেগুনের সর্বাধিক বৈচিত্র্য দেখা যায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে। অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে যে বেগুন পাওয়া যায়, তা কোনো না কোনোভাবে এ দেশ থেকে গেছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে ২৪৮ জাতের বেগুন আছে, কিন্তু উফশী ও হাইব্রিড জাত আসার কারণে স্থানীয় জাত বিলুপ্ত হচ্ছে এবং চাষের ধরন বদলে যাচ্ছে। স্থানীয় জাতের সব বেগুন চাষ না হলেও এখনো বাজারে গেলে কমপক্ষে ৪০-৫০ জাতের বেগুন পাওয়া যাবে। এলাকাভেদে বেগুনের বৈচিত্র্য দেখলে অবাক হতে হয়। বেগুনের বিভিন্ন নাম দেখলে বোঝা যায় তা কৃষকের কত প্রিয়। কোনো রকম পেটেন্ট ছাড়াই নাম চলে আসছে শত শত বছর ধরে। এর মধ্যে রয়েছে নয়নতারা, ঝুমকি, লইট্টা, হিংলা, ভোলানাথ, তবলা, ঢেপা, দুধ বা ডিম বেগুন, লাফা, ঘৃতকাঞ্চনসহ শত শত জাত।
এ পরিস্থিতিতে হঠাৎ বিটি বেগুন ১, ২, ৩, ৪ নামে একটি জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বা বিকৃত বেগুন কৃষক পর্যায়ে ছাড়ার যে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত। মনে রাখা দরকার, বিটি বেগুনের গবেষণা শুধু বাংলাদেশে এককভাবে হয়নি, মোট তিনটি দেশে হয়েছে। তার মধ্যে ভারতে চাষী ও ভোক্তার সংখ্যার দিক থেকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বিটি বেগুন ছাড় পায়নি স্বাস্থ্য, পরিবেশ ঝুঁকিসহ আদি উত্পত্তিস্থলে কোনো প্রকার জিএমও প্রবর্তন না করার নীতির জন্য। ভারতের টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আদি উত্পত্তিস্থলে কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া জিএম ফসল ছাড় দেয়া যাবে না। কারণ এতে ফসলের বৈচিত্র্যে ক্ষতি হতে পারে।’ কোম্পানি ভারতে সেই বিশেষ প্রয়োজন দেখাতে পারেনি। বাংলাদেশও তো সেই একই অঞ্চলের অংশ। তাহলে বাংলাদেশে কীভাবে জিএম বেগুনের ছাড় দেয়া হলো? এসব বিষয় নিয়ে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হওয়ার আগেই আমাদের সতর্ক হওয়ার বিষয় ছিল, যা পরিবেশবাদীদের অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও করা হয়নি।
বেগুনে পোকা লাগে বলে ফলনে ক্ষতির যে যুক্তিতে বিটি বেগুন প্রবর্তন করা হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। বিটি বেগুনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে দেখানো হচ্ছে, ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার কারণে ৫০-৭০ শতাংশ বেগুনের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তাই কৃষকরা এক মৌসুমে ৮০ বার কীটনাশক প্রয়োগ করেন, যার কারণে বেগুন বিষাক্ত হয়ে যায় বলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বরাতে ডেইলি স্টার (১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩) প্রকাশিত ‘Modified Brinjal Found Okay’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তথ্যের পক্ষেও কোনো প্রমাণ দেয়া হয়নি। বিটি বেগুন চাষেও কীটনাশকের ব্যবহার হয়। তার প্রমাণ আছে। কাজেই বিটি বেগুন মোটেও কীটনাশকমুক্ত নয়।
স্থানীয় জাতের বেগুনে পোকার আক্রমণ তেমন তীব্র হয় না এবং কীটনাশকও দিতে হয় না। কারণ বেগুনের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা রয়েছে। এসব বেগুনের মনোকালচার বা একাট্টা চাষ হয় না। যেসব স্থানীয় জাতের বেগুন নিয়ে বিটি করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এ পোকার আক্রমণ তেমন তীব্র নয়। বারির নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় জাতের বেগুনে পোকার আক্রমণ খুব কম হয়। যেমন ঝুমকি বেগুনে পোকা খুবই কম লাগে, মাত্র ১-১০ শতাংশ (Highly Resistant), খটখটিয়াও মোটামুটি কম লাগে ২০ শতাংশ (Fairly Resistant)। কিছু যেমন ইসলামপুরি বেগুনে ২১-৩০ শতাংশ পোকার সম্ভাবনা আছে (Tolerant) এবং ইরি বেগুন একটু বেশি লাগে ৪১ শতাংশের বেশি। কীটের আক্রমণ রোধই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে হাইব্রিড বেগুনে কেন বিটি করা হলো না?
বেগুনে শুধু এক ধরনের পোকার আক্রমণ হয় না, আরো অনেক ধরনের পোকা বা রোগবালাই হয়। যদিও ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিটি করার কারণে শুধু ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ বন্ধ করা যাবে। অন্য রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ ঠিকই থাকবে। অথচ এসব পোকার ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত সমন্বিত কীট ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতিতে রোধ করা সম্ভব এবং এতে কোনো প্রকার স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকি নেই।
একের পর এক ধান, বেগুন, আলুসহ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ফসলে জিএম প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে করপোরেট কৃষির দরজা খুলে দেয়া হচ্ছে এবং দেশের প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর হুমকি সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ হুমকি মোকাবেলার বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ও আইনগত সুরক্ষা আমাদের দেশে নেই। তাছাড়া কৃষকের বীজ রক্ষার অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জিএম বীজের নেতিবাচক প্রভাবের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছে। কারণ এ ধরনের প্রযুক্তি একদিকে স্থানীয় ফসলকে দূষিত করছে, অন্যদিকে বীজসহ সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থার ওপর বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য ও দখলদারি বাড়িয়ে তুলছে। কৃষি ব্যবস্থা যদি কোম্পানির দখলে চলে যায়, তাহলে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
প্রাণবৈচিত্র্য ও কৃষকের বীজ রক্ষার সংগ্রাম চলছেই
বীজের প্রযুক্তি যতই বড় বড় করপোরেশানের হাতে গিয়ে বিকৃত হচ্ছে, ততই পৃথিবীর বহু দেশে কৃষকের বীজ রক্ষার কাজ নতুন করে দানা বাঁধছে। কৃষক, বিশেষ করে কৃষক পরিবারের নারী তার নিজের ঘরে সবসময় বীজ রক্ষা, পুনরুৎপাদন ও বিছনের কাজ করেন; কৃষক পরিবারের মেয়েরাই প্রধানত কৃষকের বীজ ব্যবস্থা হাজার বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছেন। কৃষকের বীজ ব্যবস্থাই হলো কৃষির প্রাণ, কৃষি ব্যবস্থার ভিত্তি। ১৯৯৬ সাল থেকে যখন খাদ্যনিরাপত্তা কথাটি মূলধারার আলোচনায় এসেছে, তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যারা সরাসরি কৃষকের সাথে কাজ করেন, তারা আওয়াজ তুলেছেন খাদ্যে সার্বভৌমত্বের; খাদ্যনিরাপত্তা রাষ্ট্রের জন্য, খাদ্যে সার্বভৌমত্ব কৃষকের অধিকার ও বীজের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি রয়েছে।
১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোয় অনুষ্ঠিত বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে Convention on Biological Diversity (CBD) বা প্রাণবৈচিত্র্য সনদের অনুপ্রেরণায় বিভিন্ন দেশে প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর কৃষি শুরু হয়েছে। এর মূল কাজ হচ্ছে, কোনো প্রকার রাসায়নিক সার-কীটনাশক ব্যবহার না করা ও স্থানীয় জাতের বৈচিত্র্যময় বীজের ব্যবহার করা। শুধু উন্নয়নশীল দেশেই নয়, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। কমিউনিটি সিড ব্যাংকের আন্দোলন গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষের দিকে আরম্ভ হয়েছে। বাংলাদেশেও সেই একই সময়ে নয়া কৃষি আন্দোলন শুরু হয়। সে সময় ভয়াবহ বন্যার পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক বীজ প্রবর্তনের কারণে স্থানীয় জাতের বীজ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি কৃষকরা প্রবলভাবে তুলে ধরেন। সে কারণে নয়া কৃষি শুধু রাসায়নিক সার-বিষ বন্ধ করার চাষ পদ্ধতি নয়, বরং প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর কৃষি হিসেবে নয়া কৃষি আন্দোলন গড়ে ওঠে। শুরুতে শুধু রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বন্ধের দিকে জোর দিলেও দ্রুত পরিষ্কার হয়ে ওঠে, আসলে বীজ ঠিক না থাকলে এবং বীজের ওপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। নারী কৃষকরাই প্রধানত বিষয়টি তুলে ধরেন।
কৃষকের বীজ ব্যবস্থার গুরুত্ব ও তাত্পর্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কথাবার্তা বেশি দিনের নয়, অতিসাম্প্রতিক কালের। আড়ালে পড়ে থাকা কৃষকের জ্ঞানচর্চাকে সামনে নিয়ে এসে ফসলের বীজ এক জায়গায় সংরক্ষণ করা, বিভিন্ন জাত ও প্রজাতির ভালো-মন্দ বিচার করা, পরিবেশ ও প্রকৃতির উপযুক্ত বীজ নির্বচন করা, পরস্পরের মধ্যে বীজ, তথ্য, জ্ঞান আদান-প্রদান ও জ্ঞানচর্চার কাজকে আরো প্রণালিবদ্ধভাবে করার তাগিদ থেকে নিজ নিজ দেশের স্থানীয় ও সনাতনী ‘বীজ ব্যাংক’ আন্দোলন সাম্প্রতিক কালে পৃথিবীর নানা দেশে গড়ে উঠেছে। বিশ্বে কমিউনিটি সিড ব্যাংক বর্তমানে দেশীয় বীজ সংরক্ষণ ও প্রসারের একটি কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য কৌশল হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে। নয়া কৃষি আন্দোলন লোকায়ত জ্ঞানচর্চার এ ধারাকেই সাংগঠনিক ও বিধিবদ্ধভাবে সম্পন্ন করার জন্য বীজ সংঘ ও বীজ সম্পদ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে, যা এখন সারা বিশ্বে পরিচিত। বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ আরো গড়ে উঠেছে।
শেষ কথা
আমাদের এমন কৃষিনীতি দরকার, যা কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে। কৃষিপ্রযুক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও স্থানীয় পরিবেশ, কৃষকের জ্ঞান ও আমাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে প্রাধান্য দিতে হবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানি মিলে যে নীতি ও প্রযুক্তি আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে, তার নেতিবাচক ফল সম্পর্কে কৃষক আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠেছেন। বীজের ওপর বহুজাতিক কোম্পানির দখলদারি ও ক্ষতিকর প্রযুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। জনগণ বীজের কারিগরি, বিশেষ করে কীটনাশকনির্ভর হাইব্রিড বীজ ও জিএমওর বিষয়েও সচেতন হয়ে উঠছেন। জিএমও স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর। জিএমও ফসলের আমাদের কৃষির জন্য আবশ্যিক কোনো টেকনোলজি নয়। এর প্রবর্তন বিপজ্জনক। কারণ স্বাস্থ্যের ওপর জিএম ফসলের খারাপ প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার চেয়েও তার বাজার বাড়ানোর পদক্ষপই শুধু নেয়া হচ্ছে। করপোরেট কৃষি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পায়, অথচ প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করে জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা আমরা দেখি না। কোম্পানি নয়, কৃষক পরিবারকে শক্তিশালী করাই খাদ্যে সার্বভৌমত্ব অর্জন করার পথ। কারণ শেষাবধি কৃষকই আমাদের খাদ্য জোগান, কোম্পানি নয়।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, উবিনীগ
পরিবেশ, উন্নয়ন ও নারী অধিকারকর্মী






