বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বৃহত্তম খাত হচ্ছে ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস (এফএমসিজি)। এ মুহূর্তে সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী দেশের এফএমসিজির বর্তমান বাজার আকার ৩০০ বিলিয়ন বাংলাদেশী টাকার সমান। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এ মার্কেট যেভাবে বিকাশ লাভ করেছে, তার দিকে দৃষ্টি দিলে অবশ্যই বলতে হবে এফএমজির বাজারটি খুব দ্রুত সম্প্রসারণ করছে।

শুরুতে অর্থাত্ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল বিধ্বস্ত এবং যেহেতু অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তরের সঙ্গে এ ধরনের পণ্যের ভোগ সরাসরি সম্পৃক্ত, এ কারণে সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকেও এফএমজি বাজারটি সেভাবে বিকশিত হয়নি। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে তুলনামূলকভাবে বাজারটি বেশ দ্রুত হারে সম্প্রসারণ হতে থাকে। তবে একটি বেঞ্চমার্ক হিসেবে আমরা বলতে পারি, ২০০০ সালের পর থেকে এ বাজার খুব দ্রুত হারে বাড়তে থাকে। এর পেছনে মৌলিক কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশ ২০০০ সালের পর থেকে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। দেশের অর্থনীতি যেহেতু দ্রুত হারে অগ্রসর হচ্ছে, তাই এর সঙ্গে এ বাজারও ধাবিত হচ্ছে উন্নয়নের দিকে।

আমরা যদি গত কয়েক বছরকে আমলে নিই, দেশী ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হিসাবে আমরা দেখছি যে এফএমসিজি বাজারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার ১৫ শতাংশ (আনুমানিক), যেটি খুবই আশাব্যঞ্জক। এ প্রবৃদ্ধি কিন্তু দেশের অর্থনীতির যে উন্নয়ন ঘটছে, তারও একটি নির্দেশকও বটে। এফএমসিজির বাজারটিকে আমরা মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি। একটা হচ্ছে খাদ্যদ্রব্য (ফুড মার্কেট), আরেকটি অ-খাদ্যদ্রব্য (নন-ফুড মার্কেট) এবং অন্যটি ওটিসি বা ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেট। এ তিনটি ভাগেরও কিন্তু গতি-প্রকৃতি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, এফএমসিজির বাজারে ৫১ শতাংশ খাদ্য, ৪৭ শতাংশ অ-খাদ্য ও ওটিসি বাজার ২ শতাংশের মতো। খাদ্য বাজারের দিকে তাকালে দেখতে পাব কোন কোন ক্ষেত্রে দেশী কোম্পানিগুলো কর্তৃত্ব করছে, আর কোন ক্ষেত্রে বিদেশী বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। যেমন খাদ্য পদের মধ্যে একটি হচ্ছে শিশুখাদ্য এবং আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী শিশুখাদ্যের ৬৫-৭০ শতাংশ কর্তৃত্ব করছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। বাকিটা রয়েছে দেশী কোম্পানির হাতে। ঠিক উল্টো চিত্র আমরা দেখি জুসের ক্ষেত্রে। দেশে জুসের প্রায় ৯৫ শতাংশ (আনুমানিক) বাজার দখল করে রয়েছে আমাদের দেশী কোম্পানিগুলো। প্রায় ৫ শতাংশ রয়েছে বিদেশী কোম্পানির কাছে। একইভাবে নুডলসের ক্ষেত্রেও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ভালো করছে। আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, নুডলসের মাত্র ৩৫ শতাংশ বিদেশী কোম্পানি দখল করে আছে। ৬৫ শতাংশ দখল করে আছে দেশী কোম্পানিগুলো। কিন্তু বেভারেজের ক্ষেত্রে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখি। আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী ৫৫ শতাংশ দখল করে রয়েছে পেপসিকোলা ও কোকা-কোলা কোম্পানি। বিশেষ করে গত ১০ বছরে কোকা-কোলা কোম্পানি আক্রমণাত্মক প্রসারমূলক ব্যবসায়িক কৌশলের কারণে এ মার্কেটে অনেকটা একচেটিয়া কারবারের দিকে যাচ্ছে। কোকা-কোলা কোম্পানি কর্তৃত্ব করতে যাচ্ছে। অনেক দেশী কোম্পানি বেভারেজ তৈরি করেছে, চেষ্টা করেছে বাজারে একটি পজিশন করে নেয়ার জন্য। তবে হাতেগোনা দু-একটি কোম্পানি ছাড়া বেশির ভাগ কোম্পানিই সে ধরনের অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। আবার নন-ফুডের ক্ষেত্রে একটা বড় আইটেম হচ্ছে ওয়াশিং পাউডার। এক্ষেত্রে ইউনিলিভার বাংলাদেশ একাই আনুমানিক ৬৫ শতাংশ দখল করে আছে। বাকিটা রয়েছে দেশী ও বিদেশী কোম্পানির দখলে। সাবানের ক্ষেত্রে বিদেশী কোম্পানি কর্তৃত্ব করছে ৫০ শতাংশের মতো (আনুমানিক)। টুথপেস্টের ক্ষেত্রেও একই চিত্র বিরাজমান। তবে টুথপাউডারের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। দেশী কোম্পানিগুলো ৯০ শতাংশের বেশি বাজার দখল করে রয়েছে। অন্যদিকে ওটিসি বাজার অনেক ছোট। ওটিসি বাজার অর্থাত্ বোরোলিন ক্রিম, ওরস্যালাইন অথবা খুব জরুরি ওষুধ, যেগুলো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ব্যবহার করা হয়; এখানে দেশী-বিদেশী সব প্রতিষ্ঠানই রয়েছে।

তবে সামগ্রিকভাবে বললে বর্তমানে এফএমসিজি বাজার খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর প্রবৃদ্ধি খুবই আশাব্যঞ্জক। তবে ক্ষেত্রবিশেষে প্রবৃদ্ধির ভিন্নতা রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশী কোম্পানিগুলো ভালো করেছে, কোনো ক্ষেত্রে বিদেশী কোম্পানিগুলো। তবে দেশী-বিদেশী কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকা জরুরি। এটা থাকলে অন্যদের মধ্যে দেশী কোম্পানিগুলো কীভাবে বিদেশী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, টিকে থাকতে হয়, আরো ভালো করতে হয় দীর্ঘমেয়াদের জন্য— এ ধরনের দক্ষতা অর্জন করবে। অনেকে বলেন, বিদেশী কোম্পানির সুযোগ-সুবিধা হ্রাস করা উচিত, দেশী কোম্পানি বা শিল্পগুলো যেন বিকাশ লাভ করতে পারে সেজন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেয়া উচিত। তবে এ বিষয়ে আমি একটু ভিন্ন মত প্রকাশ করি। দেশী কোম্পানির জন্য প্রথম দিকে কিছুটা সংরক্ষণবাদ কার্যকরী, কিন্তু অর্থনীতি যখন পরিণত হওয়ার দিকে যেতে থাকবে তখন অবাধ প্রতিযোগিতাই আমাদের উত্সাহিত করা উচিত। এখানে যদি কোনো ধরনের বৈষম্য না হয়, তাহলে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। বিশ্বায়নের যুগে সংরক্ষণবাদের মাধ্যমে স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে সুযোগ-সুবিধা দেয়ার অর্থ হলো, তাদেরকে অদক্ষতার দিকে নিয়ে যাওয়া। তবে দেশী কোম্পানিগুলো যেন আরো বড় বড় কলকারখানা অথবা এ ধরনের সেটআপ বা যন্ত্রপাতি স্থাপনের ক্ষেত্রে উত্সাহিত হয়, সেক্ষেত্রে হয়তো সরকার কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। যেমন আমরা দেখেছি ফ্যাক্টরি বাবদ যখন যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়, সেক্ষেত্রে ডিউটি অনেকটা কম নেয়া হয়, এটা অবশ্যই সরকারের ভালো পলিসি। কিন্তু এসব যন্ত্রপাতির স্পেয়ার পার্টস যখন বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, তখন ডিউটি অনেক বেশি। ফলে আমাদের কোম্পানিগুলোকে কখনো কখনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এটা যে রাতারাতি কমিয়ে দেয়া হোক, সেটাও নয়। আবার আমদানি প্রক্রিয়ায়ও অনেক সময় স্বচ্ছতার কিছুটা ঘাটতি থাকে, এটাও ঠিক। কাস্টমস কর্মকর্তাদেরও এ ব্যাপারে একটি সঠিক ভূমিকা পালন করা উচিত। কারণ অনেক সময় আন্ডার ইনভয়েসিং হয়, যার কারণে সরকার প্রচুর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।

এ পর্যন্ত দেশের এফএমসিজি বাজারের ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক দেশী কোম্পানির কিছু পণ্য প্রাথমিকভাবে বেশ ভালো করলেও পরবর্তীতে সেসব পণ্য জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেনি অথবা বাজার থেকে হারিয়ে গেছে। মার্কেটিংয়ে একটি কথা রয়েছে— আপনি দৃষ্টি আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রথম দিকে আপনার পণ্য ক্রেতাদের কেনাতে পারবেন, কিন্তু পণ্য যদি মানসম্পন্ন না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর ক্রেতা পাওয়া কঠিন হবে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে অ্যারোমেটিক হালাল সাবানের কথা বলা যেতে পারে। এ সাবানের প্রচারণার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে অনুভূতি-সংশ্লিষ্ট আবেদন। এক্ষেত্রে আবেদনের বাস্তবতা কতটুকু ছিল, সেটাও একটা বিশ্লেষণের বিষয়। যেহেতু বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোক মুসলমান, তাই সাময়িকভাবে এটি ইতিবাচক সাড়া জাগিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অন্যান্য কোম্পানি হয়তো বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, আসলে এটি সঠিক নয়। আর পণ্য টিকে থাকবে নিজ গুণ বিবেচনা করেই। হয়তো বাস্তবতার সঙ্গে অ্যারোমেটিক হালাল সাবানের দেয়া বিজ্ঞাপনের ফারাক ছিল। এটি একটি বড় কারণ। উদার অর্থনীতিতে বা উন্মুক্ত অর্থনীতিতে কোম্পানি আসবে-যাবে, যে যোগ্য সে-ই টিকে থাকবে। কসকো সাবানের কথাই ধরেন। একসময় এটি এবং লাক্স সাবানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু আজ সময়ের বিবর্তনে কসকো হারিয়ে যেতে বসেছে। এফএমসিজি বাজারে টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি যেটি বোঝা দরকার, তা হলো ক্রেতারা আসলে কী চায়। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে ক্রেতার চাহিদা, পছন্দ-অপছন্দ, সখ্য, প্রবণতা, কালচারের পরিবর্তন ঘটে। তাই এ বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখে পণ্য যদি নতুন করে সাজানো না যায়, তাহলে সে পণ্যের টিকে থাকা কিন্তু সম্ভব নয়। আজকে যেটি সবচেয়ে ভালো পণ্য, নিশ্চয়তা নেই যে কালকেও এটি সবচেয়ে ভালো পণ্য হিসেবে টিকে থাকবে। যেহেতু আমরা বলি, বাজার শক্তিগুলো গতিশীল, এ কারণেই আজ যেটা সর্বোত্তম, কাল তা সর্বোত্তম না-ও থাকতে পারে।

অন্যদিকে গ্রামগঞ্জে এফএমসিজির বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে এ বাজারের সম্প্রসারণ জড়িত। যেহেতু এখন গ্রামগঞ্জের কৃষকসহ অন্যদের আয় বেড়েছে, তাই ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। টেলিভিশন বা অন্যান্য মাধ্যমে কিছুটা হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সঙ্গে এদের যোগসংযোগ ঘটছে। এসব কারণে গ্রামগঞ্জে এফএমসিজির ব্যাপক বিস্তার ঘটছে। বাংলাদেশের কিছু কোম্পানি যেমন— প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এ বিষয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে এফএমসিজির পণ্য ছড়িয়ে দিয়েছে। এসব পণ্যের ভোগ অনেকভাবে বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে একটি কথা বলা যেতে পারে— ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোমার্কেটিং নামে একটি কোর্স চালু করা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ ভারতের গ্রামেও এফএমসিজির ভোগ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। জনসাধারণ কীভাবে কেনে, কীভাবে ভোগ করে, কীভাবে তাদের আকর্ষণ করা যায়, মাইক্রোমার্কেটিংয়ের প্রধান ফোকাস সেটা। বর্তমান এফএমসিজি বাজার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বাংলাদেশেও এটা চালু করা যেতে পারে। কারণ গ্রামগঞ্জে প্রবৃদ্ধির হার খুবই ইতিবাচক। আগামীতে দেখা যাবে জীবনযাত্রার মান ও ভোগের ক্ষেত্রে শহরের সঙ্গে গ্রামের যে ব্যবধান রয়েছে, সময়ের সঙ্গে তা কমে আসছে। 

তবে সামগ্রিকভাবে দেশী কোম্পানিগুলো যেন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উত্সাহিত হয় এবং কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা সামগ্রিকভাবে যেন সুবিধা ভোগ করে, সেটাও সরকারের নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। কিছু অসুবিধা তো রয়েছেই। যেমন— অনেক কাঁচামাল বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। অনেক যন্ত্রপাতি আমাদের দেশী কোম্পানিকে উচ্চদামে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এজন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও তাদের পেছনে পড়ে থাকতে হয়। সামগ্রিকভাবে এফএমসিজি খুবই সম্ভাবনাময় একটি খাত। যেহেতু সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, তাই এ বাজারের বিকাশ আরো ঘটবে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছরে (২০১৭-১৮) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছর এটি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অর্থনীতি এগিয়ে যাওয়ার দরুন এফএমসিজি বাজারের আকার ভবিষ্যতে বাড়বে। অর্থনীতির উন্নতির সঙ্গে আমাদের ব্যয়যোগ্য আয় বাড়ছে, তাই এ বাজারের বিকাশ আরো বাড়বে। এখন এ বাজারে কোনো অবস্থাতেই যেন অসম প্রতিযোগিতা তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি অন্যদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

 

লেখক: অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, বাণিজ্য অনুষদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়