বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ও ফার্মাসিস্টদের জন্য চলমান বছরটা ভালোভাবেই শুরু হয়েছিল। কারণ এ বছরের শুরুতেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০১৮ সালকে ‘ওষুধ বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ এ বছরের ‘প্রডাক্ট অব দি ইয়ার’ হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি ওষুধকে নির্বাচন করেছে। এর আগে তিনি ২০১৭ সালকে ‘চামড়া বর্ষ’ ও ২০১৬ সালকে ‘পর্যটন বর্ষ’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এবার ২০১৮ ওষুধ বর্ষ হলো। গার্মেন্টস রফতানির পরই ওষুধ খাত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা আহরণকারী এবং এ খাতের সম্ভাবনা অনেক। প্রধানমন্ত্রী ওষুধ বর্ষ ঘোষণা প্রদানকালে এ খাতকে নিয়ে তার প্রত্যাশার কথাও বলেছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের ওষুধ বিশাল জায়গা দখল করবে প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রত্যাশার যৌক্তিক কারণও রয়েছে।
গত এক দশকে কৃষি, শিক্ষা, যোগাযোগ, নারী অধিকার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে। দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমানের সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। ২০০৫-০৬ সালকে ভিত্তি ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, তখনকার প্রবৃদ্ধির তুলনায় এই সরকারের আমলে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশ ধারাবাহিকভাবে এক্ষেত্রে সাফল্য আনছে, এটি কম বড় কথা নয়। এটি নাকি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি। মনে হচ্ছে সময় যেন এখন বাংলাদেশেরই। বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ৭ গুণ। বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪১ লাখ মানুষের। দেশের মধ্যকার কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় সোয়া এক কোটি বেকার মানুষের, এ রকম বিপুল কর্মসংস্থান অতীতে আর হয়নি। গত বছর বাংলাদেশ থেকে চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছে ১০ লাখের বেশি মানুষ, যা দেশের ইতিহাসে বছরওয়ারি একটি রেকর্ড। বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩ দশমিক ৫ গুণ বেড়েছে। রফতানি আয় ২০০৬ সালে ছিল ১ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে ১০ গুণের বেশি।
তখন দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ, বর্তমান বছরে তা কমে হয়েছে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ, রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন হলে যা ১৫ শতাংশে নেমে আসবে। গত বছর এটি ছিল ২৩ দশমিক ১ শতাংশ, ২০১৬ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০০৬ সালে অতি দরিদ্র মানুষের হার ছিল ২৪ দশমিক ২ শতাংশ, এখন তা ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। তখন বিদ্যুৎ পেত দেশের ৩৮ শতাংশ মানুষ, এখন বিদ্যুৎ পায় ৮৫ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ২০১৬ সালে ছিল ৫৬০ ডলার। দেশে এখন মুদ্রাস্ফীতিও কমেছে। ২০০৬ সালে যা ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ, এখন তা কমে হয়েছে ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ রকম আরো বহু তথ্য-উপাত্ত দেয়া যাবে। বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, তা শহর ও গ্রামে মানুষের পোশাক, ঘরবাড়ি ও জীবনমানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। দেশে এখন আর খালি পায়ে, খালি গায়ে ও খালি পেটে থাকা মানুষ দেখা যায় না।
২০০৫-০৬ সালের সঙ্গে তুলনা করে স্বাস্থ্য খাতের হিসাব করলে দেখা যায়, শিশুমৃত্যুর হার তখন প্রতি হাজারে ছিল ৫৬ জন, এখন তা ২৮ জন। পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের মৃত্যুহার তখন ছিল ৮২ জন, এখন ৩৫ জন। মাতৃমৃত্যুর হার তখন ছিল লাখে ৩৯৯ জন, এখন ১৭২ জন। নারীপ্রতি সন্তান জন্মদানের হার তখন ছিল ৩ দশমিক ৮, এখন যা কমে গড়ে ২ দশমিক ১। মানুষের গড় আয়ু ২০০৬ সালে ছিল ৬৪ দশমিক ৫ বছর, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭২ দশমিক ৬ বছর।
স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে সারা দেশে আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ১১ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছিল, তার সবগুলোই তখন রাজনৈতিক হিংসায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। গত প্রায় এক দশকে শেখ হাসিনার সরকার সারা দেশে প্রতিষ্ঠা করেছে প্রায় ১৭ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সরকার এসব কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে ৩০টি ওষুধ রোগীদেরকে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ প্রদানের বাজেট এবং রোগীদের খাবার সরবরাহের বাজেট উভয়ই দ্বিগুণ করা হয়েছে।
তাছাড়া অতিদরিদ্র মানুষকে নিশ্চিত স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার জন্য সারা দেশে ১ লাখ পরিবারের মধ্যে ‘স্বাস্থ্য কার্ড’ বিতরণ করার প্রস্তুতি চলছে। এ কার্ডের মাধ্যমে তারা বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়া ছাড়াও এতে রোগ ও চিকিৎসার ইতিহাস লিপিবদ্ধ থাকবে বলে চিকিৎসক কর্তৃক তাদেরকে সেবা প্রদান সহজ হবে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যেন পর্যায়ক্রমে দেশের সব গরিব মানুষকে এ কার্ডের আওতায় আনা হয়।
দেশে একের পর এক নতুন হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করা হচ্ছে। গ্রাম এলাকার প্রত্যন্ত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শহরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত নেয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তাছাড়া মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সারা দেশে জরুরি চিকিৎসা-মতামত প্রদান সেবা চালু করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে দেশের সার্বিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা খাতও ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছে। বলা যেতে পারে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে, এক দশক আগে যা ছিল অকল্পনীয়।
স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির মধ্যে ওষুধ খাতও অন্তর্ভুক্ত। ভালো মানের পর্যাপ্ত ওষুধ সহজলভ্য না হলে স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি চলবে না। দেশে অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খাতকেও আমরা ওষুধ শিল্প ও ফার্মাসিস্টরা এগিয়ে নিয়ে চলেছি। এবং এরই মধ্যে এ খাতে কিছু চমত্কার সাফল্যও আমরা দেখাতে পেরেছি।
পৃথিবীতে আর কোনো দেশ ওষুধ খাতে যেই সাফল্যটি অর্জন করতে পারেনি, আমরা সেটি পেরেছি। আমরা এখন দেশের বার্ষিক চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ দেশেই তৈরি করছি। কোনো উন্নত দেশও এটি পারেনি। বাংলাদেশকে এখন তার বার্ষিক চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ ওষুধ আমদানি করতে হয়। ভিয়েতনাম তার বার্ষিক চাহিদার মাত্র ৬০ শতাংশ দেশে উৎপাদন করতে পারে, ফিলিপাইন করে ৬৫ শতাংশ। উন্নত দেশ হওয়ার পথে প্রায় চলে গেছে যে মালয়েশিয়া, তারা করে ৭০ শতাংশ আর উন্নত দেশ বলে পরিচিত সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে তা ৮০ শতাংশ।
আমরা এখন উচ্চ প্রযুক্তির সাসটেইন্ড রিলিজ ফর্মুলেশন, আই ড্রপস, মিটারড ডোজ ইনহেলার, অ্যারোসল, ইনজেকশন, লার্জ ভলিউম প্যারেনটেরালস, প্রি-ফিলড সিরিঞ্জ, লাইওফিলাইজড ভায়াল ইত্যাদিসহ সব ধরনের ডোজেস ফর্মের ওষুধ উৎপাদন করতে পারি।
যে ওষুধগুলো আমরা এখন উৎপাদন করছি, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সব ধরনের সাধারণ ওষুধ, পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপেরসহ সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েডসহ বেশকিছু হরমোন, সব জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী, কার্ডিয়াক সমস্যার প্রায় সব ওষুধ, ইনসুলিনসহ প্রায় সব অ্যান্টিডায়াবেটিক, অনেকগুলো অ্যান্টিক্যান্সার ওষুধ ইত্যাদি। উন্নত বিশ্বের যেসব ওষুধের পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেগুলোর প্রায় সবই আমরা তৈরি করছি। আরো বেশকিছু বিখ্যাত ওষুধের পেটেন্টের মেয়াদ শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে। সেগুলো নিজ দেশে উৎপাদনের জন্যও বাংলাদেশ তৈরি।
এছাড়া বাংলাদেশ এখন বায়োসিমিলার কিছু ওষুধ যেমন— হিউম্যান ইনসুলিন, ইরিথ্রোপোয়েটিন, ফিলগ্রাসটিম, ইনসুলিন গ্লারজিন, পেগ-ইন্টারফেরন আলফা, পেগ-ফিলগ্রাসটিম, পেগ-ইরিথ্রোপোয়েটিন উৎপাদন শুরু করেছে। নিকট ভবিষ্যতে আমরা আরো বায়োসিমিলার ওষুধ উৎপাদন করব। ওষুধের পাশাপাশি ভ্যাকসিন ও অনেকগুলো এপিআই উৎপাদনের জন্যও প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। অ্যান্টিক্যান্সার ড্রাগ এখন যেগুলো উৎপাদিত হচ্ছে, তার সঙ্গে আগামী বছর যোগ হবে আরো বেশকিছু ওষুধ। কিছু কিছু মেডিকেল ডিভাইস বাংলাদেশে উৎপাদন করার কাজও শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশে এখন বছরে প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি হয়। এ বিপুল পরিমাণ ওষুধ যদি দেশে তৈরি করা না যেত, তাহলে এগুলো আমদানি করতে হতো। শুধু তাই নয়, গত বছর বাংলাদেশ থেকে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকা মহাদেশের স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত মিলিয়ে মোট ১৫১টি দেশে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৮২২ কোটি টাকার ওষুধ রফতানি হয়েছে। ওষুধ রফতানির ক্ষেত্রে গত বছরের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ শতাংশ। দেশের অর্থনীতির উন্নতির ক্রমধারায় ওষুধের মান সঠিক থাকলে এবং চাহিদামতো সঠিকভাবে জোগান দিতে পারলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ওষুধের বিক্রি, সেসঙ্গে রফতানি আয় উভয়ই ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে।
বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ওষুধের কোম্পানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রিকোয়ালিফিকেশনের জন্য আবেদন করেছে। এর মাধ্যমে আমাদের দেশ বিশ্বব্যাপী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সরবরাহকারী হিসেবে বিপুল পরিমাণ ওষুধ রফতানি করতে পারবে। বাংলাদেশের আটটি ওষুধ কোম্পানি ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের এমএইচআরএ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়ার টিজিএ ইত্যাদি গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্রাকটিসের সনদ লাভ করেছে। এর মধ্যে দুটি কোম্পানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ সনদ লাভ করেছে। তিন বছরের মধ্যে কোম্পানির এ সংখ্যা বেড়ে কমপক্ষে দ্বিগুণ হবে বলে আশা করা যায়। যদি তাই হয় এবং যদি ওষুধ রফতানির ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায়, তাহলে ‘রূপকল্প ২০২১’-এর বছরে আমাদের ওষুধ রফতানির পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। যদি কোনো দৈবাৎ কারণে সে বছর এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নাও হয়, তার পরের বছর তো তা অবশ্যই পারি। এভাবে আরো কিছু বছর পরে একসময় আমরা বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত গার্মেন্টসকেও ছাড়িয়ে এক সময় পারি দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী খাত হতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে বাংলাদেশের দুটি কোম্পানি ওষুধ রফতানির অনুমতি পেলেও একটি কোম্পানি একটি ওষুধ দিয়ে রফতানি শুরু করে এখন ১১টি ওষুধ রফতানি করছে। অন্য কোম্পানিটি দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও এখনো রফতানি শুরু করতে পারেনি। তবে আশা করা যায় আগামী দুই বছরে আরো পাঁচটি কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রফতানির জন্য এফডিএর অনুমোদন পাবে। পৃথিবীতে গত বছর বিক্রি হয়েছে ১ দশমিক ১৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওষুধ। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয়েছে ৪৬১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ওষুধ, যার মধ্যে জেনেরিক ওষুধ বিক্রি হয়েছে ৭০ বিলিয়ন ডলারের। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের এ জেনেরিক মার্কেটটির দিকে তাকিয়ে আছি। এটিই আমাদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জেনেরিক মার্কেট, যা আগামী ২০২১ সালে বেড়ে হবে ৮০ বিলিয়ন ডলার। আমরা বিপুল পরিমাণ সঠিক মানের ওষুধ নিয়ে এ বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ করতে চাই।
যুক্তরাষ্ট্র বাদে পৃথিবীর অন্য দেশগুলোয় রয়েছে প্রায় ৩৩৬ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক জেনেরিক বাজার। এর মধ্যে গরিব দেশগুলো সংখ্যা বেশি হলেও জেনেরিক বাজারের আয়তন বেশ কম, মাত্র ১০০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আমাদের জন্য তা অনেক বেশি। আমরা এই উভয় বাজারকেই আমাদের রফতানির লক্ষ্যে রাখতে চাই। এগুলোর বাজারের উল্লেখযোগ্য অংশও আমরা চাই।
ওষুধ রফতানিতে বৈশ্বিক বাজারে আমাদের কোম্পানিগুলোর সুবিধা হলো আমাদের ওষুধের আন্তর্জাতিক মান এবং কম দাম। কম দামের কারণ হলো ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক ঘোষিত ওষুধের পেটেন্ট না মানার নীতিমালা, যা আমরা আজো মেনে চলছি। প্রধানত এ কারণে আমাদের দেশে ওষুধের দাম কম। দ্বিতীয়ত. ২০১৫ সাল পর্যন্ত আমাদের দেশকে ট্রিপসের পেটেন্ট ছাড় দিয়েছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। এরপর বর্তমান সরকার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তির পেটেন্ট ছাড়ের সীমা ২০১৫ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০৩২ সাল করতে সক্ষম হয়েছে। এতে ২০৩২ সাল পর্যন্ত ওষুধের পেটেন্ট আমাদের দেশে প্রযোজ্য হবে না এবং আমরা সেগুলো বাংলাদেশে কম দামে তৈরি করতে পারব।
আমাদের দেশে ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহূত অধিকাংশ কাঁচামাল আমাদেরকে আমদানি করতে হয়। ওষুধ খাত ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে কাঁচামালের এ বিদেশ নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে সরকার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার বাউসিয়া ইউনিয়নের তেতৈতলা গ্রামে এর জন্য ২০০ একর জমি চূড়ান্ত করে। ২০১৬ সালে এর জমি উন্নয়নের কাজ সমাপ্ত হয়। এ বিশাল এলাকায় ৪২টি কোম্পানিকে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পরিবেশ দূষণের মাধ্যমে ট্যানারি শিল্পের মতো অবস্থা যাতে না হয়, সেজন্য এখন এর বাধ্যতামূলক কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। দুয়েক মাসের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রথম এই ‘একটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট পার্ক (এপিআই পার্ক)’ উদ্বোধন করবেন। আশা করা যায় এরপর এখান থেকে আন্তর্জাতিক মানের ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন শুরু হলে বিদেশ নির্ভরতা অনেক কমে আসবে, ফিনিশড ড্রাগ ও এপিআই উভয়ের উৎপাদন ও রফতানি আরো বাড়বে।
দেশে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ, বিতরণ, বিক্রি ও নিরাপদ ব্যবহার সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারি সংস্থা হিসেবে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। ওষুধ খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণের পাশাপাশি ব্যাপক রফতানি শুরু হওয়ায় এ পরিদপ্তরটিতেও বর্ধিত জনবল ও কার্যপরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ২০১০ সালে ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরকে পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তরে উন্নীত করেন এবং এর জন্য নতুন ৩৭০টি পদ অনুমোদন করেন। নতুন পদগুলোয় এখনো নিয়োগ চলছে।
ওষুধের মান সরকারিভাবে পরীক্ষার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি ওষুধ পরীক্ষাগার রয়েছে, যা আগে উপযুক্তভাবে কার্যকর না থাকলেও বর্তমান সরকারের উদ্যোগে প্রচুর সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি অন্তর্ভুক্ত করে এগুলো আধুনিকায়ন ও উন্নত করা হয়েছে। তাই জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এসব পরীক্ষাগার অধিক মাত্রায় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
ওষুধ খাতে এ সরকারের আমলে আরেকটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো দেশে মডেল ফার্মেসির প্রচলন। এসব ওষুধের দোকানে বিদেশের মতো গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা কাজ করবেন। তারা কোনো নকল, ভেজাল, নিম্নমানের, মেয়াদোত্তীর্ণ, চোরাচালানকৃত ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন ওষুধ বিক্রি করতে পারবেন না। প্যাকেটের গায়ে লেখা দামের চেয়ে বেশি দাম রাখবেন না। সবচেয়ে বড় কথা, এখান থেকে ক্রেতারা ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার বিষয়ে পরামর্শ পাবেন। এতে রোগীরা ওষুধের ক্ষতি ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা পাবেন। ওষুধের কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য এসব ফার্মেসিতে ওষুধকে সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হবে। কেউ নিয়ম না মানলে, সেই দোকানদারের মালিককে শাস্তি প্রদানেরও ব্যবস্থা রয়েছে। এটি যে জনগণের জন্য কী বিশাল উপকার, তা ভুক্তভোগী রোগীরা এরই মধ্যে উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। এ পর্যন্ত সারা দেশে ৬৫২টি মডেল ফার্মেসি স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানের প্রায় আড়াই লাখ ওষুধের দোকানের বিপরীতে আমাদের অনেক মডেল ফার্মেসি প্রয়োজন।
এত অগ্রগতির পরও আমাদের দেশে এখনো এমন কিছু কোম্পানি আছে, যারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জিএমপি গাইডলাইন না মেনে ওষুধ উৎপাদন করছে। এমনকি অত্যন্ত উচ্চ প্রযুক্তিগত সুবিধায় তৈরি করতে হয়— এমন সব অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন, এমনকি অ্যান্টিক্যান্সার ড্রাগও একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের পরোক্ষ সহযোগিতায় তৈরি করে যাচ্ছে। এসবের উৎপাদনের পরিমাণ জাতীয় উৎপাদনের পরিমাপে নগণ্য হলেও এগুলোর বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
ওষুধ খাতে বর্তমান সরকারের আরেকটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য অবদান হলো ২০১৬ সালে ঘোষিত বাংলাদেশের তৃতীয় জাতীয় ওষুধনীতি। এতে বাংলাদেশে বিশ্বমানের ওষুধ তৈরি অব্যাহত রাখা, আরো বেশি ওষুধ রফতানি, নকল-ভেজাল-নিম্নমান ও চোরাচালানকৃত ওষুধ বন্ধ করা, এসব ওষুধ ব্যবহার করে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে কোম্পানি কর্তৃক ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ করা, ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে মডেল ফার্মেসি চালু, ভেজাল ওষুধের উৎপাদন বন্ধে খোলা বাজারে ওষুধের কাঁচামাল কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা, মেডিকেল ডিভাইস (হার্ট ভাল্ব, পেসমেকার, রিং, চোখের লেন্স) ও সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টসগুলো নিবন্ধনের মাধ্যমে দাম কমানোর ব্যবস্থা করা, ঔষধি গুণসম্পন্ন খাদ্য ও প্রসাধনসামগ্রীকে মান নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা, সব ওষুধ কারখানায় বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা ইত্যাদি বিষয়গুলো সন্নিবেশ করা হয়েছে। এসব কারণে ওষুধ শিল্প যেমন উন্নত হবে, তেমনি জনগণ উত্তরোত্তর উপকার পাবে এবং দেশের অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হবে। এবারের বাপা কনভেনশনে আমার বক্তৃতায় বাংলাদেশের জাতীয় ওষুধনীতি নিয়ে বিশদ আলোচনার আশা করি।
সরকার ঘোষণা করেছে যে আগামী কয়েক বছর পর দেশের ডাবল ডিজিট জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। উল্লিখিত সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তির উন্নয়ন ঘটলে সরকারের এই ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করতে আমরা ওষুধ খাত থেকেও অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাব।
প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘ওষুধ বর্ষ ২০১৮’ সফল হোক।
লেখক: আহ্বায়ক, জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬ প্রণয়ন উপকমিটি; সাবেক চেয়ারম্যান, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ; সাবেক চেয়ারম্যান, ফার্মেসি বিভাগ; সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






