বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং সেবার প্রচলন ও এর বাস্তবায়নের প্রয়াস চলছে বেশ জোরেশোরে। আর একটি উন্নয়নশীল দেশ তথা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং গ্রামীণ উন্নয়নের গুরুত্ব সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত। এক্ষেত্রে অনেক সফলতার মাঝেও এ কথা সত্য যে, দেশের মানুষের একটি অংশ এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে আছে, তবে তাদেরকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় এনে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। দেশের, বিশেষত গ্রামীণ স্বল্প আয়ের জনগণকে আর্থিক সেবার আওতায় এনে গ্রামীণ তথা দেশের সার্বিক উন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। এর পরও অস্বীকার করার উপায় নেই, এখনো দেশের ব্যাংকিং খাতের ঋণ ও ব্যাংকিং সুবিধা মূলত ব্যবহার করছে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং বড় ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। নিম্নবিত্ত সাধারণ জনগণ এবং ছোট শিল্প ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখনো পর্যন্ত ব্যাংকের ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বা সেক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের প্রচেষ্টায় এবং কিছু ব্যাংকের বিশেষ দক্ষতায় সামগ্রিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বিশেষত সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাত-সম্পর্কিত নীতিমালায় এ বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রতিস্থাপন করেছে এবং বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং খাতের সেবার আওতায় আনার জন্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ রকম পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বেশকিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেশের পশ্চাত্পদ জনগণকে আর্থিক সেবার আওতায় আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের এসব কার্যক্রম ও পদক্ষেপ এরই মধ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রামীণ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় পরিবর্তন এনেছে ব্যাংকিং সেবায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার। মনে করা হচ্ছে, তথ্যনির্ভর ব্যাংকিং সেবা অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিংয়ের বিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে সামনের দিনগুলোয়।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রথম পদক্ষেপ হয়ে থাকে ব্যাংকিং খাতকে সম্পৃক্ত করে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করা। বিশেষত মোবাইল ব্যাংকিং সেবা স্বল্প সময়ের মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে অর্থ লেনদেনের সহজ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং এরই মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে গ্রামীণ জনজীবনে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। বিশেষত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। এ ধরনের লেনদেন বা পেমেন্ট সেবা একেবারে ব্যাংকিং কার্যক্রমের সংজ্ঞার মূল স্থপতি না হলেও সার্বিকভাবে আর্থিক সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং বলতে আমরা সব ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রমকে বুঝি না। শুধু মোবাইল ব্যবহার করে লেনদেন কার্যক্রম বা অর্থ স্থানান্তরকে বুঝিয়ে থাকি। এ পর্যন্ত ১৯টি ব্যাংককে অনুমতি দেয়া হলেও ১৮টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে। বিভিন্ন সেবার মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘বিকাশ’ এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’ মোবাইল আর্থিক সেবা বাজারে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। মার্চ, ২০১৮ সালের মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছয় কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে সচল ব্যবহারকারীর (অ্যাক্টিভ ইউজার) সংখ্যা দুই কোটির বেশি। এত দ্রুতগতিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিস্তার আর্থিক লেনদেনকে সহজতর করেছে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। দৈনন্দিন কেনাকাটা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জীবনযাপনে, বিশেষত স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিস্তারের প্রভাব বেশ লক্ষণীয়। এ আর্থিক সুবিধার প্রকৃত প্রভাব এবং পরিবর্তন গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে দিয়েছে। যে গতিতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিস্তার লাভ করছে, তাতে আশা করা যায় অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের জনগণকে সম্পূর্ণভাবে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং উৎসাহব্যঞ্জক হলেও এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন মোবাইল আর্থিক সেবার অন্তর্ভুক্তি প্রকৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রথম ধাপ। এখন সময় এসেছে সর্বজনীন আমানত ও ঋণ সেবা বিস্তারে তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করা এবং সম্পূর্ণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। দেশের একটি বড় অংশকে এখনো বিদ্যমান ব্যাংকিং আমানত ও ঋণসেবার আওতায় আনা যায়নি। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বেশকিছু ব্যাংকের পদক্ষেপের পরও একটি বড় অংশের নিম্ন আয়ের মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতায় এলেও তাদের ব্যাংকের ঋণসেবার আওতায় আনার জন্য ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ ও আমানত সেবা ব্যতীত আমাদের মতো দেশে একটি টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বেশির ভাগ জনগণ এখনো কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দেশের কৃষি ও গ্রামীণ খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী খুব সামান্যই ঋণসেবা প্রদান করতে পেরেছে। প্রকৃতপক্ষে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো অনেক ক্ষেত্রে মহাজন বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংকিং সেবা যেমন— বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এসএমই ঋণ, ক্ষুদ্রঋণ ইত্যাদি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক গৃহীত পদক্ষেপগুলো লক্ষণীয় পরিবর্তন এনেছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক এজেন্ট ব্যাংকিং প্রচলনের অনুমতি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা। এজেন্ট ব্যাংকিং একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিং মূলত সার্বিকভাবে সব ধরনের ব্যাংকিং বা আর্থিক সেবা, যা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বুথের মাধ্যমে সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা প্রদান করতে পারে। অতি সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে। যার ফলে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের পরিসর আরো বাড়ছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সহজে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়া শুরু হয়েছে। যদিও দেশের মোট ১৭টি ব্যাংক এরই মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে। যেসব ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে জোরেশোরে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার বিস্তারে কাজ করছে, সেগুলোর মধ্যে ব্যাংক এশিয়া, দ্য সিটি ব্যাংক এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক উল্লেখযোগ্য। দেশে প্রথম এ সেবা চালু করেছে ব্যাংক এশিয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, এর গ্রাহক সংখ্যা ১৮ লাখে পৌঁছেছে, যার মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশের অধিক গ্রাহক প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায়। একটি অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক দিক হলো, মোট গ্রাহকের প্রায় ৪০ শতাংশ মহিলা। জুন, ২০১৮ পর্যন্ত মোট এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজারের ওপর, যারা ২ হাজার কোটি টাকার অধিক আমানত সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছেন এবং ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। ঋণের বিচারে হয়তো এ পরিমাণ তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। তবে এটি একটি চমত্কার শুরু। প্রকৃতপক্ষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো সুযোগ তৈরি করেছে গ্রামে তাদের সেবা বিস্তারের। সরকারি ভাতা বিতরণ এবং পরিষেবা বিল আদায় করার পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ ও আমানত সংগ্রহে এজেন্ট ব্যাংকিং জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু কিছু ব্যাংক চলতি, সঞ্চয়ী, স্থায়ী আমানতসহ ছোট আকারের ক্ষুদ্র, এসএমই ও আবাসন ঋণ এজেন্টের মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে দেয়া শুরু করেছে। এমনকি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সারা দেশে কার্ড ব্যবসাকেও ছড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা চলছে, যার আওতায় অদূর ভবিষ্যতে উপজেলা পর্যায়ে কার্ডের বিতরণ ও ব্যবহার এবং দোকানে দোকানে ‘পয়েন্ট অব সেলস’ ব্যবহার করে গ্রামীণ মানুষকে কেনাকাটা করতে দেখা যাবে বলে আশা করা যায়।
ব্যাংকিং খাতে তথ্যপ্রযুক্তি ও মোবাইল ব্যবহারের একটি বড় সুবিধাভোগী হলো, রেমিট্যান্স সেবা গ্রহণকারী। একথা অনস্বীকার্য যে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য নিশ্চিতকরণে অত্যন্ত জরুরি। আর এক্ষেত্রে মূল অবদান রাখছে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার কিছু দেশে কর্মরত বাংলাদেশের স্বল্প দক্ষ শ্রমিক এবং এর বড় অংশ গ্রামীণ নিম্ন আয়ের মানুষ। প্রকৃতপক্ষে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমেই রেমিট্যান্স সেবাকে এত দ্রুততর এবং কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই হুন্ডি বা অবৈধ উপায়ে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষত মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই এ ধরনের সেবা গ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর রেমিট্যান্স সেবা প্রায় সম্পূর্ণভাবে শাখা ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতা থেকে বেরিয়ে এসে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবায় রূপান্তরিত হয়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং আর্থিক সেবা প্রদানের পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত শিক্ষা, সচেতনতার বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। যে শাখার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো স্বল্প আয়ের গ্রামীণ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি, সে কাজটি বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়েছে মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা। আজকের গ্রামীণ এবং স্বল্প আয়ের মানুষ আর্থিক সেবা গ্রহণের পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত তথ্য ও জ্ঞান আহরণের সুযোগ পাচ্ছে ঘরে বসে বা নিজের এলাকাতেই। গ্রামীণ কিছু স্কুলেও ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়েছে, যা আর্থিক সেবা-সংক্রান্ত শিক্ষার বিকাশে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া তথ্যনির্ভর আর্থিক সেবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তথা দেশের সম্পদ ব্যবহারের বিবেচনায় পরিবেশবান্ধব এবং সবুজ ব্যাংকিংয়ের আওতাভুক্ত। বলা হয়ে থাকে, অনলাইন ব্যাংকিং সবুজ ব্যাংকিংয়ের প্রাথমিক ধাপ। বর্তমানে বাংলাদেশে সবুজ অর্থায়নের বেশির ভাগ গ্রাহক গ্রামীণ স্বল্প আয়ের জনগণ, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিকাশে ভূমিকা রাখছে।
তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার বিকাশে প্রকৃত অর্জন নিশ্চিত করতে হলে সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা অর্থাৎ আর্থিক লেনদেন, ঋণ ও আমানতের সার্বিক বিকাশের বিকল্প নেই। এবং এর মাধ্যমেই সত্যিকারের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে এখন সময় এসেছে তিনটি ব্যাংকিং পণ্যকে আলাদাভাবে বিবেচনায় এনে কার্যকরী কৌশল বাস্তবায়নের। প্রকৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য এ পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির তিন ধরনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রথমত. আর্থিক লেনদেনে অন্তর্ভুক্ত জনগণ, দ্বিতীয়ত. আমানতে অন্তর্ভুক্ত জনগণ এবং তৃতীয়ত. ঋণে অন্তর্ভুক্ত জনগণ। লেনদেন ও আমানত সংগ্রহে শুধু তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ এক্ষেত্রে সফলতার মূল নিয়ামক হলো সেবার দ্রুততা ও মান। কিন্তু ঋণ প্রদান, এর কার্যকরী ব্যবহার এবং আদায়ের জন্য সেবার দ্রুততা ও মানের পাশাপাশি আরো বেশকিছু নিয়ামক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; যা অর্জনের জন্য বিশেষ কৌশলের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে ব্যাংকিং সেবা কীভাবে কিছু কিছু শোষণমূলক অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ব্যবস্থাকে ভেঙে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য ও জনপ্রিয় করা যেতে পারে, সেটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবার দ্রুত উন্নয়নে এবং স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছে আর্থিক সেবা নিয়ে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবাকে উৎসাহিত করতে হবে। মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহার মোবাইলভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রকে সহজসাধ্য করলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ ধরনের আর্থিক সেবাকে ব্যাংকের সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল এজেন্টের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স প্রবাহের কিছু পর্যবেক্ষণ এ-সংক্রান্ত ঝুঁকিকে নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করেছে এবং এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক তাত্ক্ষণিকভাবে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
স্পষ্টত মোবাইল বা ব্যাংকিং এজেন্টের মাধ্যমে খুব সহজে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এবং প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে হবে এবং এ ধরনের সার্বিক কর্মকাণ্ডকে আর্থিক সেবা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নজরদারিতে থাকারও প্রয়োজন আছে। বিশেষত মোবাইল এবং অন্যান্য ব্যাংকিং এজেন্টকে অবশ্যই যথাযথ নজরদারি ও দায়বদ্ধতার আওতায় রাখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্পরতা প্রশংসনীয়। যেমন ২০১৭ সালে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে দৈনিক ক্যাশ ইন ২৫ হাজার থেকে নামিয়ে ১৫ হাজার টাকা করা হয়েছে এবং ক্যাশ আউট ২৫ হাজার থেকে কমিয়ে ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া মাসিক ক্যাশ ইনের পরিমাণ ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে কমিয়ে ১ লাখ টাকা এবং ক্যাশ আউট ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে কমিয়ে ৫০ হাজার করা হয়েছে। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ স্বল্প আয়ের মানুষের আর্থিক লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা মেটানোর ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে অবৈধ লেনদেনকারীরা নিরুৎসাহিত হবে বলে আশা করা যায়। এছাড়া এ-সংক্রান্ত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে এরই মধ্যে দেশে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ২০১৭ সালে মোবাইল সেবাবিষয়ক অ্যান্টি মানি লন্ডারিং ও টেররিস্ট ফিন্যান্সিং-বিষয়ক আইন-সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে। এখানে উল্লেখ্য, এ বিষয়ে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) ২০০৬ সালে কার্যক্রম শুরু করেছে এবং ২০১০ সালে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
মোবাইল বা এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা ছায়া বা শ্যাডো ব্যাংকিংয়ের সংজ্ঞার আওতাভুক্ত। ‘ছায়া ব্যাংকিং’ অবৈধ বা অনৈতিক কোনো ব্যাংকিং বা আর্থিক সেবা নয়। কিন্তু ব্যাংকের মূল কার্যক্রম যেভাবে সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত এবং পর্যবেক্ষণের আওতাভুক্ত, তেমনটি নয়। এক্ষেত্রে যেহেতু ব্যাংকের পাশাপাশি অন্য পক্ষ যেমন মোবাইল কোম্পানি বা এজেন্টদের (যারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, এমন) সম্পৃক্ততা থাকে, সেহেতু ব্যাংকের মতো করে তাদেরকে কঠোর আইন, নিয়ম ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে তার প্রয়োজনও নেই। কারণ কঠোর আইনের প্রয়োগ ও বাধ্যবাধকতা এ ধরনের উদ্যোগকে ব্যাহত করতে পারে। তবে এ ধরনের কার্যক্রমকে অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশক অনুসারে পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি যেসব ব্যাংক এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িত, সেসবের ভূমিকাও অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত এজেন্ট নির্বাচনে ব্যাংকের অত্যন্ত বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। অবশ্য এরই মধ্যে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তত্পরতা অত্যন্ত ইতিবাচক। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিশেষত নতুন নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং এ-সংক্রান্ত সচেতনতার অভাব অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবেলার মাধ্যমে সত্যিকারের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সুফল অর্জনই আগামী দিনের ব্যাংকিংয়ের লক্ষ্য। ইতিবাচক নীতিমালা, কার্যকর আইন ও যথাযথ নজরদারির ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের বিকাশে যে ক্ষেত্র তৈরি করেছে, তার সদ্বব্যবহার করে বাংলাদেশের স্বল্প আয়ের সাধারণ জনগণকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা হবে, এটাই কাম্য।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)






