চলতি বছরের মার্চে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) ঘোষণা করে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে যে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়, তা পূরণ করেছে। কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) পরবর্তী সময়ে আরো দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা করবে যথাক্রমে ২০২১ ও ২০২৪ সালে। পরবর্তী সময়ে যদি বাংলাদেশ আবারো তিনটি শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়, তাহলে স্থায়ীভাবে উন্নয়নশীল দেশের খেতাব পাবে। এ সাফল্যের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ যে তিনটি শর্ত পূরণ করেছে তা আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় একই সঙ্গে একটি মাইলফলক। এক্ষেত্রে আমাদের এটা বুঝতে হবে উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া, কোনো নির্দিষ্ট কিছু নয়। এ অর্জন আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে বৈকি, আত্মতুষ্টিতে নিমজ্জিত করার কারণ হবে না। এ অর্জনের পর আমাদের একটা বিষয় বুঝতে হবে যে, এটা অনেক লম্বা সময়ের উন্নয়ন পরিকল্পনার ফল, যা একদিনে অর্জন হয়নি। উপরন্তু আমাদের অবনমনের কোনো সুযোগ নেই। এ লেখায় যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো— ক. সময় পরিক্রমায় উন্নয়ন ধারাবাহিকতা, খ. কেন অবনমন অসম্ভব সেটা দেখানো, গ. বেশকিছু চ্যালেঞ্জের দিকে আলোকপাত করার পাশাপাশি অনেক সুযোগ, যা আমাদের হাতছানি দেবে এবং ঘ. একই সঙ্গে আলোচনার সুযোগ করে দেয়া সেই সব চ্যালেঞ্জ নিয়ে, যা বাংলাদেশকে মোকাবেলা করতে হবে আসন্ন উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথে।

সময়ের সঙ্গে অগ্রগতি

সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রাকে মূল্যায়ন করতে হলে অতীতের সব সূচক আবার এক ঝলক দেখে নেয়া যাক। সেক্ষেত্রে টেবিল-১-এ আমরা সিডিপি কর্তৃক নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা এবং বাংলাদেশের অর্জনের একটা পার্থক্যমূলক চিত্র দেখতে পাব।&dquote;&dquote;

টেবিল-১: নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা এবং বাংলাদেশের অর্জন

মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা সূচকের কিছু উপসূচক আছে। টেবিল-২ এ সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের বিভিন্ন সূচকের উন্নতি আরো অনেকগুলো সূচকের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে এবং একই সঙ্গে তা মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় বৃদ্ধিতেও ভূমিকা পালন করেছে। শিশুমৃত্যুর হার কমে এসেছে অর্ধেকে এবং একই সঙ্গে মানুষের গড় বয়স বেড়েছে। জিডিপিতে কৃষির অংশগ্রহণ কমেছে ক্রমান্বয়ে। বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অসামান্য উন্নতি বিগত এবং বর্তমান সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ইঙ্গিত করে।

অবনমনের সুযোগ নেই

টেবিল-১ থেকে আমরা এটা স্পষ্ট দেখতে পারছি যে, বাংলাদেশ সব সূচকে লক্ষ্যমাত্রার থেকে অনেক বেশি এগিয়ে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ তিনটি মানদণ্ডে বাংলাদেশের এই অর্জনকে মূল্যায়ন করেছে। সে হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় হবে ২০২১ সালে ১৭২৮-১৭৮০ মার্কিন ডলার এবং ২০২৪ সালে ২২৫৯-২৫০৫ ডলার। মানবসম্পদ সূচক হবে ২০২১ সালে ৭৫ দশমিক ৪ এবং ২০২৪ সালে ৮০ দশমিক ২, যেখানে অর্থনৈতিক দুর্বলতা সূচক যা ২০১২ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৮, সেটা ২০২৪ সালে হবে ২৪ দশমিক ৭। এসব লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনা করলে বাংলাদেশের অবনমনের কোনো সুযোগ নেই, পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথেও কোনো বাধা নেই।

আমরা যা হারাব

আমরা যতটা না পাওয়ার আনন্দে ভাসছি, পাশাপাশি আমাদের কিছু সুযোগ-সুবিধাও হারাতে হবে; যা আমরা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে উপভোগ করছি। ইউনাইটেড নেশন্স কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট খসড়া হিসেবে বলেছে, আমরা মোটামুটি ৫ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবসার সুযোগ হারাব, যা সিপিডির হিসাবে দাঁড়ায় ৮ শতাংশ। মার্কিন ডলারে হিসাব করলে এর আর্থিক মূল্য হয় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৭ সালের রফতানিকৃত পণ্যের আর্থিক মূল্যের সঙ্গে তুলনা করলে এই অর্থ কিছুই না, কিন্তু কোটামুক্ত ও শুল্কমুক্ত পণ্য প্রবেশাধিকার বন্ধ হলে সেটা একটা বড় ধাক্কা হবে আমাদের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশ এই প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে সেটা কোনো বাধা না। যদিও আমরা বর্তমানে মার্কিনমুলুকে সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ২ শতাংশ শুল্ক দিই পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে, যেখানে আমাদের প্রতিযোগী বাজারের দেশ চীন, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও ভিয়েতনাম যথাক্রমে শুল্ক দেয় ২ দশমিক ৭, ৮ দশমিক ৯, ১ দশমিক ৯ ও ৭ দশমিক ২ শতাংশ শুল্ক। সেখানেও বাংলাদেশ ব্যবসা করছে এবং তারা ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এ অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, বাংলাদেশ এখন যেসব দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করছে, সেখানে উন্নয়নশীল দেশ স্বীকৃতি পাওয়ার পর সে সুবিধা হারালে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না।

আরেকটি সুযোগ আমরা হারাব আর তা হলো বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ থেকে আমরা যে ঋণ সুবিধা উপভোগ করি এবং ঋণ গ্রহণের পর ঋণের সুদহার, ঋণ পরিশোধের সময় এবং ঋণ পরিশোধের জন্য অন্তর্বর্তীকালীনের মতো সুযোগ। অর্থাৎ ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আমাদের ঋণ গ্রহণ করতে হলে এ সুযোগ হারাতে হবে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিবেচনায় বাংলাদেশের ঋণসেবা দায়ের হার এখনো অনেক কম।

এছাড়া আরো কিছু সুবিধা আমরা হারাব, যার মধ্যে আছে TRIPS চুক্তি থেকে বঞ্চিত হব এনহ্যান্সড ইন্টিগ্রেটেড ট্রাস্ট ফান্ড এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন অনুমোদিত সংস্থা ও বিশেষ সংস্থার সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হব। এগুলোও আসলে খুব বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না।

আমরা যা পাব

বিশ্লেষকরা আশা করেন, বৈদেশিক বিনিয়োগ থেকে মূলধনের বৃহত্তর প্রবাহের মাধ্যমে আমরা কিছু অর্জন করব। এই অর্জনগুলো নানাভাবে আমরা পাব, বিশেষ করে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ, বিদেশী ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ গ্রহণ, বিদেশী পুঁজিবাজারে সরাসরি বন্ড বিক্রি করতে পারা এবং বাংলাদেশের পুঁজিবাজার থেকে বিদেশীদের শেয়ার কিনতে পারার মাধ্যমে। যদিও এই অর্জনগুলো এখনো অনিশ্চিত। সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্য এটা তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। বিনিয়োগ পেতে বিনিয়োগকারী বিবেচনা করে দেশের অবকাঠামো, ন্যায্য দামে জ্বালানি প্রাপ্যতা (গ্যাস, বিদ্যুৎ), দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সুশাসন নির্দেশকের মতো বিষয়গুলো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন বিনিয়োগে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভাবগুলো সুপরিচিত। এটি বিদেশী বিনিয়োগ বাধা দেয়। এক্ষেত্রে এশিয়ার প্রায় সব উন্নয়নশীল দেশই জিডিপির অনুপাত হিসেবে অনেক বেশি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।

বিদেশী পুঁজির ক্ষেত্রে আবার যেগুলো সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয় না, সেগুলো তুলনামূলক একটু ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের বিনিয়োগ আমাদের মুদ্রার জন্য একটু হুমকিস্বরূপ এবং একই সঙ্গে ম্যাচিউরিটির সময়কাল নিয়েও ঝামেলা করে। ১৯৯৭-৯৮ এর এশিয়ান আর্থিক মন্দার সময় এই ব্যক্তিপর্যায়ের বৈদেশিক বিনিয়োগ দায়ী ছিল, যা সে সময়ে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হতো না। তবে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এ বিষয়গুলো খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না বলেই প্রতীয়মান হয়।

উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশকে অনেকটা পথ হেঁটে আসতে হয়েছে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলের (এসডিজি) অংশীদার বাংলাদেশ। সেক্ষেত্রে আমাদের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে, যা কিনা ২০৩০ সালের মধ্যে পূরণ করতে হবে। এর কয়েকটি এখানে আলোচনা করা হলো।

এসডিজির অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ দারিদ্র্য সম্পূর্ণরূপে দূরীকরণ। দারিদ্র্য মোকাবেলায় আমাদের সাফল্য সত্ত্বেও এখনো চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। কিন্তু দুশ্চিন্তার কারণ হিসেবে আমরা দেখছি দারিদ্র্য দূরীকরণের হার ক্রমেই কমছে। ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৮ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমলেও পরবর্তীতে ২০০৫ থেকে ২০১০-এ এ হার কমে ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে এ হার কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ২ শতাংশে। এ চিত্র হওয়ার কথা ছিল ঠিক উল্টো।

বাংলাদেশের অন্যতম একটি শক্তি তারুণ্য। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটা অংশ তরুণ জনসংখ্যা। বাংলাদেশের এক্ষেত্রে উচিত হবে এই জনশক্তিকে শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত জনবলে পরিণত করা। বাংলাদেশে প্রাইমারি স্কুলের পর ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি, যা একটা বড় হুমকি। এশিয়ার অন্যান্য দেশের থেকে বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে শিক্ষার হার অনেক কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আবার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার পর কোনো কাজ পাওয়া যায় না শিক্ষার নিম্নমান এবং শিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের সামঞ্জস্যতা না থাকায়। সেদিক বিবেচনায় বাংলাদেশকে এসডিজির অন্যতম শর্ত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে কাজ করতে হবে।

জিডিপির আনুপাতিক হার হিসেবে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়। ২০০০ সালে ২৪ শতাংশ ছিল, যা কিনা ২০১৬ সালে এসে মাত্র ৩০ শতাংশ হয়েছে। যতটুকু হয়েছে সেটাও সরকারি বিনিয়োগের বদৌলতে। এই বিনিয়োগের সুফল আমরা তেমন দেখিনি কারণ দুর্নীতি, প্রকল্পে কালক্ষেপণ এবং ব্যয় বৃদ্ধিসহ ভুল প্রকল্প গ্রহণের মতো প্রতিবন্ধকতা আছে। এ সমস্যার সমাধান করতে হবে অতি দ্রুততম সময়ে। গত এক দশকে জিডিপিতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের হার বাড়েনি, বরং একই রকম ছিল। দারিদ্র্যের হার কমাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন, কিন্তু সেটা করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে অনেকাংশে। অধিকতর গুরুত্বসহকারে পরিবহন অবকাঠামো, বন্দর সুবিধা এবং জ্বালানি প্রাপ্যতার সমস্যার সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নের দিকেও নজর দিতে হবে।

রফতানি খাতের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমাদের রফতানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের দিকে নজর দিতে হবে এবং শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। রফতানিযোগ্য পণ্যের বাজারেও বৈচিত্র্য আনতে হবে, নতুন বাজার তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ দেশের বাইরে কর্মরত শ্রমিকদের থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে রেমিট্যান্স হিসেবে। কিন্তু মাথাপিছু আয় এশিয়ার যেকোনো দেশের থেকে কম। এর অন্যতম কারণ অপ্রশিক্ষিত শ্রমিক। সেক্ষেত্রে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক রফতানির বিষয়ে নজর দিতে হবে, তাতে করে আমরা অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারব।

সর্বশেষ আমাদের ব্যাংকিং খাত। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম, যা এখন হুমকির মুখে। ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, দুর্বল ব্যবস্থাপনাসহ দক্ষ জনবলের অভাবে এ খাতে একটা সংকট চলছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপে ঋণ প্রদান করাসহ সংস্কার কার্যক্রমের নামে ব্যাংক অধিগ্রহণের বিষয়গুলো তো আছেই। এ বিষয়গুলো অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে এবং দ্রুততম সময়ে আমলে নেয়া প্রয়োজন।

(ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: মুহাম্মদ হাসান রাহিফ)

 লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক