১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। তখনকার তুলনায় গত তিন দশকে কৃষি খাতে (খাদ্য-শস্য উৎপাদন, পশু, পোলট্রি ও মত্স্য চাষ) অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। চাল উৎপাদন যেমন অনেকটাই বেড়েছে, তেমনি খাদ্য ফসলের উৎপাদনও বেড়েছে। মাছ চাষে বলা হয় রুপালি বিপ্লব ঘটেছে। চাষকৃত মাছ উৎপাদনে প্রশংসীয় প্রবৃদ্ধি এখন বাস্তবতা। পশু পালন খাতের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম হলেও গরু মোটাতাজাকরণে বিনিয়োগের কারণে লাখো তৃণমূল নারী উপকৃত হচ্ছে। অন্যদিকে হাঁস-মুরগি উৎপাদনেও বেশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এমন প্রশংসনীয় উন্নতি, একই সঙ্গে ক্ষুধা ও অপুষ্টি হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও এগুলো এখনো পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি, যা এসডিজির অন্যতম লক্ষ্য।

বাংলাদেশে জনসংখ্যা বাড়ছে, যার কারণে বাড়ছে খাদ্য চাহিদা। আয় উপার্জন ও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ ক্ষুধা ও অপুষ্টি টিকে থাকার পেছনে দুটো মৌলিক কাঠামো কারণ। সরবরাহের দিক থেকে উৎপাদনে অদক্ষতা একটা বড় সমস্যা। কৃষি খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় একটি বড় উপাদান হচ্ছে জল সেচ। কিন্তু সেচের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অদক্ষতা থাকায় প্রচুর পানি অপচয় হয়। আবার পানি সংরক্ষণ, সার্বিকভাবে বললে পানির আর্থিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় বড় গলদ রয়েছে, যা পানি সংরক্ষণ-সহায়ক নয়।

অপচয় রোধ করে পানি সংরক্ষণ, পানি ব্যবহারে দক্ষতা ও উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে, বিশেষ করে চাল উৎপাদনে অনেক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। সবার আগে যে পানি বাঁচানো যাবে, তা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ যেমন পানের জন্য ও স্যানিটেশনে, শিল্প কারখানায় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে অন্যান্য খাদ্য ফসল ও অফসল খাদ্যের মতো প্রয়োজনীয় চাষে ব্যবহার করা যাবে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে চাল ছাড়াও অন্য খাদ্যশস্যের চাহিদা বেড়েছে এবং প্রত্যাশা করা যায় আয় বৃদ্ধির সঙ্গে এ চাহিদা আরো বাড়বে। এজন্য চাল উৎপাদনে যতটা সম্ভব পারা যায়, ততটা পানি রক্ষা করতে হবে। চাল সবচেয়ে বেশি পানিনিবিড়। শস্য এবং কৃষিকাজে ব্যবহার করা বেশির ভাগ পানিই ধান চাষে ব্যবহার করা হয়। এ পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের লক্ষ্য আরো নির্দিষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।

অল্প কিছু দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি অথবা সম্ভবত চাল উৎপাদনকারী একমাত্র দেশ যেটি শুকনা মৌসুমে চাল উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ অংশে যেখানে উৎপাদিত শস্যের মধ্যে চাল প্রধান, সেখানে বর্ষা মৌসুমেই যথেষ্ট চাল উৎপাদন করা হয়।

কেবল তাই নয়, চালনির্ভর প্রধান দেশগুলোর বেশির ভাগেই সেচের জন্য ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানি ব্যবহার করা হয়। সেখানে বাংলাদেশ গভীরভাবে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বেশি নির্ভর করে (৭৫ শতাংশের মত, যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তা ২৫ শতাংশ)। এবং দেশে ব্যবহূত এ পানির উৎপাদনশীলতা অন্য যেকোনো জায়গার থেকে কম। প্রকৃতপক্ষে উপকরণের উৎপাদনশীলতা কম হওয়ায় এবং সারের মতো উপকরণগুলোর ভারসাম্যহীন ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের ভূমির উৎপাদনশীলতা অনেক কম, চাল উৎপাদনশীল দেশগুলোর সবচেয়ে নিচে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো যখন কমপক্ষে হেক্টরপ্রতি চার মেট্রিক টন উৎপাদন করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া করে হেক্টরপ্রতি ছয় থেকে সাত টন, সেখানে চালে বাংলাদেশের ভূমি উৎপাদনশীলতা হেক্টরপ্রতি তিন টন বা তার কিছু বেশি। এ কারণে গত বছরগুলোয় কিছু উন্নতি সত্ত্বেও চালের ভূমি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশের আরো কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।

এ দেশে কৃষির প্রধান অবলম্বন হলো ধান চাষ, যা অন্যান্যের তুলনায় অনেক বেশি পানিনিবিড় শস্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশের প্রধান ধান হলো বোরো, এটি চাষ করা হয় শুকনো মৌসুমে, যে সময়টা প্রধানত নির্ভর করা হয় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। কৃষি সেচ (বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল চাল উৎপাদনে), পানি বাঁচানো, উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য তিনটি নিয়ামক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো, পানির সেচ মূল্য বা চার্জিং ব্যবস্থা। দ্বিতীয়, পানি বাঁচানো প্রযুক্তি ব্যবহার এবং তৃতীয়, সেচে পানির সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি।

সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বিশেষ নির্ভরতার প্রধান কারণ হলো, দেশে চালের ৬০ শতাংশ বা এর চেয়ে বেশি উৎপাদন হয় শুকনো মৌসুমে। প্রকৃতপক্ষে, গত বোরো মৌসুমে এর আগের বছরের তুলনায় বোরো চাষের জমি আর এর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এটা কোনো উদ্বেগের বিষয় হতো না, যদি পানি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এক্ষেত্রে তা হয়নি। বোরোর জন্য বিজ্ঞানের মতো হলো, চাষের জমি প্রতি ইউনিটে প্রায় ১ হাজার-১২শ মিলিমিটার পানি প্রয়োজন। কৃষকরা অন্যদিকে যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করে তা এর দ্বিগুণ, ২৩০০-২৪০০ মিলিমিটার। তুলনায় টি.আমান ধানের ক্ষেত্রে, যার জন্য মাঝে মাঝে সম্পূরক সেচের প্রয়োজন হয়, কৃষকরা ১১০০-১৪০০ মিলিমিটার পানি ব্যবহার করেন। ধান ছাড়া বেশির ভাগ শস্যে পানি ব্যবহার বেশ কম।

এখন প্রশ্ন হলো কেন কৃষকরা এত পানি ব্যবহার করেন? এটি ব্যাখ্যা করতে গেলে অনেক কারণ সামনে চলে আসে। অনেক কৃষক মনে করেন, ধান চাষের সময় মাঠ পানিভর্তি করে রাখা চাল উৎপাদন নিশ্চিত করার সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে বিজ্ঞানীদের মত ভিন্ন। তারা মনে করেন, পালা করে (ইংরেজিতে অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং বা এডব্লিউডি) একই জমি থেকে সব সময় পানি ভরা মাঠের মতোই একই পরিমাণ চাল পাওয়া যাবে। এমনকি যখন কৃষকরা এ প্রযুক্তি জানলেও দুটি কারণে এটি ব্যবহার করতে পারেন না। প্রথম, অনেকের মতে, তারা নিশ্চিত থাকেন না যে চাষের প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকবে কিনা। তাই পানি সংকট এড়াতে তারা যতক্ষণ ও যত বেশি করে সম্ভব মাঠ পানি প্লাবিত রাখতে চান। দ্বিতীয়, এটি আগাছা ন্যূনতম অবস্থায় রাখতে সাহায্য করে, যা আগাছা পরিষ্কারের সময় ও ব্যয় বাঁচায়।

বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচের বেশির ভাগই করা হয় ১৫-১৬ লাখ অগভীর নলকূপ বা শ্যালো দিয়ে। এগুলোর মালিক ব্যক্তিগতভাবে কৃষকরা। প্রায় ১৫ হাজার নলকূপ রয়েছে বরেন্দ্র মাল্টিপারপস ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (বিএমডিএ) অধীনে এবং প্রায় ৩ হাজার ৫০০ আছে বিএডিসির অধীন। কৃষিকাজের জন্য বেসরকারি মালিকানাধীন কিছু গভীর নলকূপও রয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির ৭০ শতাংশ উঠানো হয় শ্যালো দিয়ে। যেহেতু শ্যালো টিউবওয়েল ব্যক্তিমালিকানাধীন। মালিক সাধারণত নিজের জমিতে সেচ দেন এবং এলাকাভেদে নির্ধারিত মূল্যে জমির ইউনিট আয়তন (বিঘা/একর) অনুযায়ী অন্যদের কাছে বিক্রি করেন। শ্যালো দিয়ে পানি সেচের আর্থিক মূল্য অঞ্চলভেদে একরপ্রতি সাধারণত ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা। পানির পরিমাণের সঙ্গে এ চার্জের কোনো সম্পর্ক নেই। এতে কৃষকরা যতটা সম্ভব পানি পেতে চান, যেহেতু টাকার পরিমাণ একই থাকে। এজন্য পানি সঞ্চয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানি বাঁচানোর চেষ্টা করার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ থাকে না।

বিএমডিএর গভীর নলকূপের সেচের পানি বিক্রি করা হয় পরিমাণ (ভলিউম) হিসেবে। এর জন্য কৃষকদের স্মার্টকার্ডের প্রয়োজন রয়েছে, যেটা রিচার্জ করা যায়। যদি কোনো কৃষকের নিজ জমিতে পানির দরকার হয়, তবে তিনি তার কার্ড নলকূপে থাকা স্লট মেশিনে প্রবেশ করিয়ে এটা চালু করে দিতে পারেন। যখন তিনি মনে করবেন জমিতে যথেষ্ট পানি দেয়া হয়েছে, তখনই কার্ড বের করে নিয়ে পানি সরবরাহ বন্ধ করতে পারেন। যেহেতু তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে সেচের চার্জ পরিশোধ করছেন, তাই তিনি টাকা বাঁচানোর প্রতি লক্ষ রাখেন, অর্থাৎ পানি ও একই সঙ্গে জ্বালানিও বাঁচে। যদিও এটা জানা যে আদর্শ পরিস্থিতি সব ক্ষেত্রে ঘটে না এবং অনেক মধ্যস্থতাকারী রয়েছেন, যিনি কিছু সংখ্যক কার্ড ব্যবহার করে সব কৃষককে পানি দেয়ার ব্যবস্থা করেন এবং তাদের কাছ থেকে পানির দাম আদায় করেন। এর পরও বলা যায় এটি শ্যালো টিউবওয়েলের পানির দামের ব্যবসার চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো। বিএডিসির ক্ষেত্রে স্মার্টকার্ড ব্যবহার করে সেচ দেয়ার বিষয়টি কিছুটা সীমাবদ্ধ, যদিও এ ব্যবস্থার পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

যা-ই হোক, পরিমাণ অনুযায়ী মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা এককভাবে পানি ব্যবহার কমানো ও পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে কৃষকদের এডব্লিউডির মতো পানি বাঁচানো ফসল-প্রযুক্তি ব্যবহার গ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পানি ব্যবহারের ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কৃষকরা এ ধরনের প্রযুুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী হন না। এটি একমাত্র সম্ভব একটি মাত্র পদ্ধতিতে যেখানে কৃষকদের নিজ নিজ স্মার্টকার্ড থাকবে এবং তারা সরাসরি তা ব্যবহার করবেন। দেখা গেছে, স্মার্টকার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে পানির ব্যবহার ২৫-৩০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ফসলের পানি বাঁচানো প্রযুক্তি, যেমনটা এডব্লিউডি, আরো ৩০ শতাংশ বা এ রকম পানি বাঁচায়। এভাবে এই দুইয়ের সমন্বয়ে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ পানি বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। এর অর্থ হলো, এভাবে পানির উৎপাদনশীলতা কমপক্ষে দ্বিগুণ করা সম্ভব।

সেচের পানি সরবরাহে দক্ষতা বাড়ানোর ইস্যুটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে গভীর নলকূপের ক্ষেত্রে। সব কৃষি প্রকৌশলী ভালো করেই জানেন, চুয়ানো ও বাষ্পীভবনের কারণে উত্তোলিত পানির কমপক্ষে ৩০ শতাংশ, কখনো ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হারিয়ে যেতে পারে। পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করলে এ লোকসান কমানো যাবে। জমি সংরক্ষণ করতে এসব পাইপ প্রায়ই জমির তল দিয়ে নেয়া হয়। বিএমডিএতে এ রকম সব পাইপ মাটির নিচে থাকে। বিএডিসির ক্ষেত্রে, কিছু কিছু মাটির নিচে পাইপ আছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বহুদিন ব্যবহারের কারণে ক্ষয়ে যাওয়ায় পাল্টানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিএডিসি এ পদ্ধতি বিস্তৃত ও মেরামত করার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে। কিন্তু শ্যালোর ক্ষেত্রে কী হবে?

শ্যালো টিউবওয়েলের ক্ষেত্রে এর সীমানাধীন এলাকার জন্য পানির পরিমাণ অনুযায়ী দাম পরিশোধ করার অবকাঠামো তৈরি করা প্রযুক্তির বর্তমান অবস্থা অনুযায়ী সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে মাটির নিচে পাইপ বসানোও অলাভজনক; কিন্তু এরই মধ্যে নিজেদের জমিতে নমনীয় প্লাস্টিক পাইপ ব্যবহার করে পানি নিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। এ অবস্থায়, কৃষকরা ফসলের পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারেন এবং কম পানি ব্যবহার করলে পানির দাম কমানোর দাবি করতে পারেন। এটি যদি সম্ভব হয়, তখনি কেবল ক্রেতা কৃষকরা পানি সংরক্ষণে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। তবে এটি পানি বিক্রেতাদের আয় কমিয়ে দেবে এবং এ কারণে তারা এ বিষয়টি মানতে না-ও রাজি হতে পারেন। তবে তাদেরও ব্যয় কিন্তু কিছুটা কমবে যেহেতু জ্বালানি ব্যয় হ্রাস পাবে, তবে তাদের আয়ের যে ক্ষতি হবে, তা পূরণ করার জন্য তা যথেষ্ট হবে না। যেসব পদ্ধতিতে পানি বিক্রেতাদের ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব হতে পারে, তা চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। পরিবেশ সেবা গ্রহণ বা প্রদানের (ইকো সিস্টেম সার্ভিস) যদি একটি ফান্ড গঠন করা যায়, যেটা অনেক দেশেই বিভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিভিন্নভাবে আছে, তা থেকে পানি বিক্রেতাদের ক্ষতি পোষানো যায়।

এখানে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে, সাধারণভাবে পানির ক্ষেত্রে এবং বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষেত্রে পরিবেশ সেবা বা ইকো সিস্টেম সার্ভিস মানে কী। সাধারণভাবে বাংলাদেশকে পানির দেশ বললেও বাংলাদেশ আসলে পানি সংকটে ভুগছে, বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে। বাংলাদেশে জনপ্রতি পানি জানুয়ারি-মে মাসে গড়ে ১ হাজার ৬৯ কিউবিক মিটার, বৈশ্বিক গড় যেখানে ১ হাজার ৭০০ কিউবিক মিটার। অর্থাৎ ৩২ শতাংশ কম। এজন্য যদি কোনো একটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পানি বাঁচানো যায়, তাহলে অন্য ক্ষেত্রে আরো বেশি পানি প্রদান করা সম্ভব হবে, যেমন পানের জন্য পানি ও উৎপাদনের উদ্দেশ্যে। এটা ঘটলে এটি হয়ে উঠবে অত্যন্ত মূল্যবান পরিবেশ সেবা বা ইকো সিস্টেম সার্ভিস।

ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষেত্রে আরো অন্যান্য পরিবেশ সেবা রয়েছে, যেমন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বা একুইফারে পানি জমানো, পানি শুদ্ধকরণ, পানির ব্যবহার ও জোগানে ভারসাম্য, জ্বালানি (তাপ ও শৈত্য সংরক্ষণ), জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও অন্যান্য। এগুলোর বেশকিছু সরাসরি ও অন্যগুলো পরোক্ষভাবে মানবসমাজ ব্যবহার করে ও সুবিধা পায়। বিশেষভাবে কোনো উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করে বিস্তারিত গবেষণা করা না হলে এসব সেবার পরিমাণ নির্ধারণ ও তার মূল্যের নগদীকরণ করা সম্ভব নয়। জীবন বাঁচানোর মতো ইস্যু যেমন পানি পান বা অন্যান্য কাজের জন্য বাঁচানো পানির ব্যবহার, অন্তত এসবের পরিমাণ নির্ধারণ করা বেশ সম্ভব। যদি তাই হয়, বাঁচানো পানির মূল্য হিসাব করে একটি ফান্ড তৈরি করা যেতে পারে, যেখান থেকে বেসরকারি পানি বিক্রেতাদের আর্থিক ক্ষতি পূরণ করা যাবে, যদি তারা তাদের চার্জ কমাতে রাজি হন। যদি এটি করা যায়, ৩০ শতাংশ বা এ পরিমাণ পানি বাঁচানো যাবে। শ্যালো ব্যবহার করে ৭০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি আহরণ করা হয়, এর অর্থ কমপক্ষে ২০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি বাঁচানো যাবে। একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী বছরে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাঁচানো যাবে, যেখানে পরিবেশ সেবা বা ইকো সিস্টেম সেবা চালু করার জন্য ব্যয় হতে পারে ১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এর অর্থ এ ব্যবস্থায় সুবিধা হবে ব্যয়ের ২ দশমিক ৭ গুণ। বাঁচানো পানি অন্য দরকারি কাজে ব্যবহার হলে সুবিধা বাড়বে। এসব হিসাব করলে মোট সুবিধা ব্যয়ের তুলনায় আরো বাড়বে। এ প্রস্তাব ভেবে দেখার জন্য এ হিসাব প্রাথমিকভাবে যথেষ্ট হতে পারে।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে পানির সংকট গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠবে এবং এ বিষয়টি যতটা দ্রুত সম্ভব আমলে নিতে হবে। কীভাবে এ সমস্যার সমাধান হবে, তা নিয়ে কিছু প্রস্তাব এখানে দেয়া হয়েছে। এর কোনোটাই সহজ সমাধান নয়, কারণ এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কৃষকদের বহু বছরের পুরনো আচরণ পরিবর্তন এবং বাজার ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন। এখানে প্রযুক্তিগত সমাধানের সঙ্গে সামাজিক প্রকৌশলের উদ্ভাবনেরও প্রয়োজন রয়েছে।

(ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: সাঈদ সরকার)

 

লেখক: সাবেক গবেষণা পরিচালক, বিআইডিএস