যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে, ধনীদের দ্রুত সম্পদ বৃদ্ধির তালিকার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রশ্ন হচ্ছে ওয়েলথ-এক্সের এ তথ্যের মানে কী? অনেকে মনে করছে, বাংলাদেশ অনেক ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অনেকে ধরে নিয়েছে, বাংলাদেশ তাহলে চীনের চেয়ে বেশি ধনী হয়ে গেছে। তা কিন্তু নয়। মূল বিষয়টি হলো, একটি সমাজের আয় কাঠামোর মধ্যে আয়ের ওপর অতি ধনীদের নিয়ন্ত্রণটা সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশে আয়বৈষম্যের বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। সম্প্রতি অতি ধনীদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির তথ্যটি আরো একটি বিষয় নিশ্চিত করে, তা হলো বাংলাদেশে বৈষম্য বৃদ্ধির যে আশঙ্কা আমরা করছিলাম, তা আরো বেড়ে যাচ্ছে। বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ার নানা দিক রয়েছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন— চীন, ভারত, হংকং কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতার মধ্যে বাংলাদেশের শীর্ষে অবস্থান বৈষম্য বৃদ্ধি আশঙ্কাকে নিশ্চিত করল। অন্য প্রশ্নটি হলো, বৈষম্য বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি কীভাবে হচ্ছে এবং বিষয়টি নিয়ে আমরা কতটুকু চিন্তিত হব। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ পর্যায়ে যে আকাঙ্ক্ষা, তার জন্য এটি আনন্দের নাকি দুশ্চিন্তার কারণ। তাহলে দুভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা দরকার। এক. দ্রুত ধনীর সংখ্যা কীভাবে বাড়ছে? দুই. ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি দুশ্চিন্তার নাকি আনন্দের?
প্রথমত. কীভাবে অতি ধনীর সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে ঘুরেফিরে যে বিষয়টিতে আসতে হবে, তা হলো বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে বৈষম্যের বিশ্লেষণটা কম হচ্ছে। কিছু সূচক দিয়ে বৈষম্যের পুরো বিষয়টা বোঝা মুশকিল। এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন করা উচিত, অতি ধনী যারা হয়েছে, তারা কোন কোন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত? যেমন চীনের আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গোটা অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলেছেন। বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক হয়েছেন। এভাবে অতি ধনী হওয়ার প্রক্রিয়া অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব রাখে, যা অতি ধনী হওয়ার এক ধরনের ধারণা।
অন্য ধারণাটি হলো, অতি ধনী হচ্ছে কিন্তু অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়টি পরিষ্কার নয়; উল্লেখযোগ্য নতুন কোনো সেক্টর ডেভেলপ হয়েছে কিনা! নতুন কোনো শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়েছে কিনা অথবা নতুন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে কিনা! যেমন— ফেসবুক, গুগলের মতো উদ্যোগ বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বটে। বাংলাদেশের অতি ধনী হওয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বাংলাদেশীরা অতি ধনী হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে কোনো দৃশ্যমান কর্মযজ্ঞ নেই, যা কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে সার্বিকভাবে অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের অতি ধনীরা কীভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখছে, তা স্পষ্ট নয় কিংবা যোগসূত্রটা ঠিক পরিষ্কার নয়।
ওয়েলথ-এক্স যেমন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অতি ধনীদের সংখ্যা বৃদ্ধির তালিকা করেছে, তেমনি ২০১৬ সালে ঢাকার ওপর একটি গবেষণা কার্যক্রম আমরা পরিচালনা করেছিলাম। সেখানে শহরের আয় কাঠামোর বিশ্লেষণে আমরা দেখেছি, ঢাকার প্রায় ৪০ শতাংশ সম্পদের মালিক বা আয়ের অধিকারী মাত্র ৫ শতাংশ পরিবার। বিপরীতভাবে প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবার ২১ শতাংশ আয়ের অধিকারী। মাত্র ৫ শতাংশ পরিবার কিসের মাধ্যমে এত পরিমাণ আয় করছে? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহলে ঢাকায় কি ব্যাপকভাবে কোনো পরিবর্তন হয়েছে? কিংবা এ শ্রেণীর অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞগুলো মূলত কী? যারা অতি ধনী হচ্ছে, তাদের আয়ের সূত্রগুলো কী? এগুলো যদি rentier বা unearned income হয়, সেক্ষেত্রে অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন হচ্ছে না, অথচ এ ধরনের আয়ের অনেক সুযোগ আছে।
রেন্ট নানা ধরনের হতে পারে। যেমন— জমিভিত্তিক রেন্ট, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রবেশের জন্য রেন্ট এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলোর ওপর মনোপলি তৈরির মাধ্যমে রেন্ট। যেমন জমির অতিমূল্য কিংবা জমির বর্তমান মূল্য ও সুযোগ-সুবিধাগুলো অনেক বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। যেহেতু জমির পরিমাণ সীমিত, তাই এর সূত্র ধরে এক ধরনের জমির নিয়ন্ত্রণভিত্তিক রেন্ট তৈরি হচ্ছে। যার মানে দাঁড়ায়, এখানে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অতি ধনী হচ্ছে না, প্রতিযোগিতার জায়গাগুলো সরিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে প্রতিযোগিতাকে বাদ দিয়ে মনোপলি তৈরির মাধ্যমেই অতি ধনী হচ্ছে, যা দুর্ভাগ্যজনক। ধনী ও অতি ধনীর মধ্যে এ তফাতটিও আমাদের বুঝতে হবে। তার মানে হচ্ছে, অতি ধনী হওয়ার প্রক্রিয়া বাংলাদেশে মূলত অন্যায্য পন্থায় হচ্ছে। ধনী হওয়া কোনো দোষের বিষয় নয়, যদি তা শ্রমের মাধ্যমে, ঝুঁকি নেয়ার সাহসের মাধ্যমে, উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে যারা অধিক সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে বিষয়টি উপলব্ধি করা জরুরি যে, তারা অর্থনৈতিক কোনো ন্যায্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, বরং নানা ধরনের রেন্টের মাধ্যমে এবং প্রতিযোগিতার সুযোগগুলো বন্ধ করে দিয়ে রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট ইকোনমিক মনোপলি তৈরির মাধ্যমে অতি ধনীতে পরিণত হচ্ছে। যেসব খাত থেকে অতি দ্রুত লাভ উঠে আসে, তারা তা ব্যবহার করছে। কষ্ট করে বা পরিশ্রমের বিনিময়ে এ লোকগুলা অতি ধনী হচ্ছে না। তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি না যে, ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে এ ধনিক শ্রেণী সৃষ্টি হচ্ছে না, বরং বিভিন্ন অপপন্থা যেমন— রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা, রাজনৈতিক ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট প্রক্রিয়ায় তারা অতি ধনী বনে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে জমির অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে জমির দাম নিয়ন্ত্রণ। রাষ্ট্রায়ত্ত জমি দখল। এ ধরনের কমিশনভিত্তিক অতি ধনী হওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। লক্ষণীয়, আগে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে হয়তো কমিশন ছিল ১ শতাংশ। বতর্মানে পুরো প্রকল্পে কমিশনটাই একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে গেছে। তৃতীয় হচ্ছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে অতি লাভজনক সেক্টরগুলোয় এক ধরনের মনোপলি তৈরি করা। বিশেষ করে সেবা খাত, অবকাঠামোসহ বিশেষ কিছু সেক্টরে আমরা এ প্রবণতা লক্ষ করি।
এছাড়া রাতারাতি অতি ধনী বনে যাওয়ার অন্য যে কারণটি রয়েছে, তা হলো সরাসরি অর্থনৈতিক অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা। যেমন— শেয়ারবাজারে কারচুপি, ব্যাংকিং সেক্টরে লুট। মূলত অর্থনৈতিক অপরাধের মাধ্যমে অতি ধনী তৈরি হওয়ার প্রবণতা আমরা দেখি। এছাড়া অভিনব কিছু দুর্নীতির পন্থার কথাও আমরা জানি। এর মধ্যে রয়েছে অযৌক্তিক প্রকল্প ব্যয়। বিষয়টি দুভাবে অযৌক্তিক। এক. প্রকল্প ব্যয়কে অতিমূল্যায়িত করা হচ্ছে। দুই. প্রকল্প বিলম্বিতকরণের মাধ্যমে ব্যয় বৃদ্ধির একটি সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। অযৌক্তিক প্রকল্প ব্যয়ের মাধ্যমেও অতি ধনী হওয়ার প্রক্রিয়া বিরাজমান।
অতি ধনী হওয়ার কারণে আয়বৈষম্য বাড়ছে বলে আমরা চিন্তিত। তবে এর চেয়ে বড় চিন্তার কারণ হওয়া উচিত, এরা কোন প্রক্রিয়ায় অতি ধনী হচ্ছে, তা নিয়ে এর সূত্র ধরে যে আলোচনাটা চলে আসা প্রয়োজন, তা হলো বাংলাদেশ বর্তমানে কী ধরনের উন্নয়ন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে? বাংলাদেশ যে উন্নয়ন কৌশল নিয়ে এগিয়ে চলেছে, সেখানে অর্থবহ মধ্যম আয়ের একটি অর্থনীতি ও সমাজ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে কিছু পরিসংখ্যান ভিন্নভাবে উপস্থিত করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। যেমন— মানুষের গড় আয়ের বিষয়টি যখনই বলা হবে, তার সঙ্গে সঙ্গে নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের গড় আয়ের কথাটি উল্লেখ করতে হবে। বাংলাদেশের গড় আয় এক ধরনের ফাঁকিজুকির তথ্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ গড় আয় সম্পর্কে যখন বলা হয়, তখন নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের আয়ের তথ্য প্রদান করা হয় না। এখন থেকে দেশের অর্থনীতিবিদদের এগুলো তৈরি করতে হবে। দেশের মানুষের গড় আয় নিয়ে আলোচনা করে আর কোনো লাভ নেই। তাছাড়া প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়ে অতি প্রচারের কারণে বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি হয়েছে। অবৈধ উপায়ে অতি ধনী হওয়ার প্রক্রিয়াটা আড়াল করার একটা কৌশল হচ্ছে ঘুরেফিরে প্রবৃদ্ধির আলোচনাটাকে উপস্থাপনের চেষ্টা।
যেখানে আমরা ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগকে তুলনামূলকভাবে স্থবির দেখতে পাচ্ছি, সেখানে প্রবৃদ্ধির যে পরিসংখ্যানগুলো দেয়া হচ্ছে, সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা একটি প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আমি বলব, যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনাটা হচ্ছে না বা অর্থনীতিবিদরাও আলোচনা করছেন না, সেটা হচ্ছে অতি ধনী হওয়ার কৌশল নিয়ে। এর সঙ্গে বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের সংকটের বিষয়টি চলে আসে। বলা হয় বাংলাদেশে পরিসংখ্যানগত বেকারত্ব খুবই কম, যেমন ৩-৪ শতাংশ। এখানে এমএ পাস পিয়ন রয়েছে— বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের সংকটকে এক কথায় এভাবে প্রকাশ করা যায়। এমএ পাস পিয়ন এ বাস্তবতার মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারি, এখানে অর্থবহ কর্মসংস্থান তৈরির সংকট হচ্ছে।
বাংলাদেশের মানুষ বসে থাকে না। এমএ পাস করে পিয়ন পদে হলেও সে কাজ করে। কিছু না থাকলে রাস্তার পাশে বসে সে একটা কিছু করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানেও সে চাঁদাবাজির শিকার হয়। কেউ আবার কায়িক পরিশ্রম করে। কিন্তু মূল সংকট হচ্ছে, অর্থবহ কর্মসংস্থানের সংকট। যেখানে আয়ের পরিমাণ এমন হবে, পরিবারের লোকজন খেয়ে-পরে বাঁচার চেষ্টা করবে। অতি ধনীদের পরিমাণ বৃদ্ধি, বৈষম্য বৃদ্ধির কিংবা কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনো অর্থনৈতিক একটা গতিশীলতা রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ বসে থাকতে চায় না, তার ধাক্কাতেই অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির একটা বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। অনানুষ্ঠানিক খাতগুলো এখানে ভূমিকা রাখছে।
এখানে বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার যে, সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের বিরুদ্ধে কিন্তু বিষয়টি নয়। আয় অন্যায্য পদ্ধতিতে অতি ধনী হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েই মূল প্রশ্ন। কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে, উদ্যোগী ভূমিকার মাধ্যমে যদি কেউ ধনী হতে চায়, তাহলে কিন্তু কারো আপত্তি নেই।
নতুনভাবে আবারো নির্বাচনের প্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে। তার মানে রাজনৈতিক নেতাদের আবারো জনআকাঙ্ক্ষার জবাবদিহিতার সামনে পরীক্ষা দিতে হবে। এ সময়ে উন্নয়ন কৌশলের ঘাটতি-বিচ্যুতি-ভ্রান্তি বা ভ্রান্ত পথে যাওয়ার যে প্রবণতা, সে বিষয়গুলো নিয়ে একটা জোরালো আলোচনা জনসমক্ষে আসা উচিত। এখন মূলত অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে হবে যে, আমরা কোন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছি।
আমি বাজেট বক্তৃতাগুলো দেখি। সাম্প্রতিক সময়ে একটা কৌতুকময় প্রবণতা লক্ষণীয়। বাজেট বা অর্থনৈতিক ডকুমেন্টগুলোতে দুটি অংশ দেখতে পাই। একটা হচ্ছে সাহিত্য, অন্যটা অর্থনীতি। সাহিত্যটা বেশি চমকপ্রদ হচ্ছে। বিবরণগুলো বর্ণাঢ্য হচ্ছে। আকাঙ্ক্ষাগুলো শুধু কথার ফুলঝুরিতে আরো বিস্তৃত হচ্ছে। অথচ অর্থনীতির কৌশল বিস্তৃত ব্যাখ্যায় উদ্ভাবন কিছু দেখি না। এ অংশটা অত্যন্ত গতানুগতিক। অর্থনীতির কৌশলটা সঠিক পথে এগোনোর জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যে পথে হাঁটা উচিত, তা হচ্ছে সংস্কারের পথ। যেমন ব্যাংকিং সেক্টর, প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার কিংবা প্রকল্পের দায়িত্ব বণ্টনের পদ্ধতি সংস্কারের প্রয়োজন। সুনামগঞ্জের উদাহরণ টানা যেতে পারে। যদি প্রশ্ন করা হয়, এখানে আগাম বন্যা কেন হলো? উত্তর হচ্ছে, বন্যা প্রতিরোধের জন্য বাঁধ তৈরির চুক্তিগুলো সম্পাদিত হয়েছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়। রাজনৈতিক বিবেচনা সব জায়গায় থাকে, কিন্তু এখানে এটি এমনভাবে চলে আসে যে, চুক্তির ক্ষেত্রে যোগ্যতার মাপকাঠিকে বিসর্জন দিয়ে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পায়। রাস্তা সংস্কারের জন্য হাজার হাজার টাকা বাজেট বরাদ্দ হচ্ছে। কিন্তু রাস্তার মান উন্নত হচ্ছে না। এক কথায় দেশের রাস্তা-ঘাটের অবস্থা বেহাল।
হাতেগোনা কয়েকটি জায়গায় হয়তো ভালো রাস্তা রয়েছে, কিন্তু প্রধান সড়ক থেকে গলির দিকে গেলে ক্রমেই রাস্তার খারাপ অবস্থাই দৃশ্যমান হয়। রাস্তা সংস্কারের নামে করা বিভিন্ন চুক্তি অর্থনৈতিক কৌশলের একটি দিক হয়ে গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কর্মকাণ্ডের যে চুক্তি, সেটা দেয়া হচ্ছে মূলত রাজনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্ত বা আশীর্বাদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর কাছে; যারা যোগ্যতার বিষয়টিকে মোটেও মুখ্য বিষয় হিসেবে গণনা করছে না কিংবা মুখ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণের প্রয়োজনও মনে করছে না। দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত কাজের প্রথম ৫০ শতাংশ অন্য জায়গায় চলে গেছে। এসবের কিছু অবধারিত অনুসর্গ রয়েছে। যেমন পুঁজি পাচার। এটি অন্যায্য পথে অতি ধনী হওয়ার অন্যতম অনুসর্গ।
গ্লোবাল ইন্টেগ্রিটি ইনডেক্সে বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে পুঁজি পাচারের পরিসংখ্যানে আমরা দেখতে পাই, ক্রমেই পুঁজি পাচারের পরিমাণ বাড়ছে। এ পুঁজিগুলো কোথায় যাচ্ছে, আমরা তা জানি। কীভাবে সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বনেদি এলাকা অতি ধনী কয়েকজন বাংলাদেশীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে কিংবা নিউইয়র্কের মতো জায়গায় উচ্চমূল্যের বসতির মালিক বনে যাচ্ছে কিছু বাংলাদেশী, যাদের হাত দেশ থেকে পুঁজি পাচারের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযোগ রয়েছে বলে প্রচার আছে।
আমাদের এখন অর্থনৈতিক কৌশলগুলো নিয়ে বড় পরিসরে পুনরায় চিন্তার প্রয়োজন। বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়া উচ্চপ্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক কৌশলের মধ্যে কর্মসংস্থান, সংস্কারের বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনিক সংস্কারের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। কেন আমাদের মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে এত বেশি দীর্ঘসূত্রতা যোগ হচ্ছে? ব্যয় চার গুণ বাড়ছে? এ বিষয়গুলোয় জবাবদিহিতা প্রয়োজন। এখানে অবধারিতভাবে যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, বিলম্বটা পরিকল্পিত কিনা? পরিকল্পিত বিলম্ব দুর্নীতির নতুন কৌশল হয়ে গেছে। প্রকল্প্যের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ লুটপাট করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো জায়গায় কেন এক কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করতে ধনী দেশের চেয়েও বেশি খরচ হচ্ছে, তার কিন্তু কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। এ সংস্কারের জায়গাগুলো অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ ন্যায্য পথে ধনী ও অতি ধনী তৈরি করার মতো এক ধরনের যোগ্যতা তৈরি করেছে। এ দেশে উদ্যোগী উদ্যোক্তাশ্রেণী রয়েছে। সার্বিক জনগণের মধ্যে পরিশ্রমী মানসিকতা বিদ্যমান। যেখানে সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সেখানে মানুষের ঝুঁকি নেয়ার সাহস করার মতো মানসিকতা আছে। কিন্তু দুঃখজনক যে, এ মানুষগুলোকে মোক্ষম সুযোগগুলোর বাইরে রাখা হচ্ছে। এদের সেভাবে নীতিসহায়তার জায়গায় আনা হচ্ছে না। কৃষি নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা দরকার। কৃষিকে প্রবৃদ্ধির চালকে রূপান্তর করা প্রয়োজন। কৃষিকে আমরা মূলত খাদ্যনিরাপত্তার জায়গা হিসেবে দেখি, কিন্তু খাতটিকে কীভাবে প্রবৃদ্ধির চালকের জায়গায় আনা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেয়া উচিত।
ঢাকা শহরের ওপর একটি গবেষণা করতে গিয়ে আমি পূর্ব ঢাকার বাড্ডা, আফতাবনগর, বসুন্ধরা, বনশ্রীতে গিয়েছিলাম। সেখানে আদর্শনগর বলে একটা জায়গায় যাওয়ার পর আমার মনে হলো, এটি বুঝি যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জায়গা। কেন? তার কারণ হলো রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ভাড়া বাড়িতে কারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তার বড় একটা ধাক্কা এসে যেসব জায়গায় পড়ে, আদর্শনগরও তেমন একটি জায়গা। অনেক কারখানা এখানে ছিল, কিন্তু সবগুলোকে চলে যেতে হয়েছে। কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পর দেখলাম, জায়গাগুলোতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেমে গেছে। দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিকেরা যে বাসাগুলোতে থাকত তা সব শূন্য।
কারখানাগুলো বন্ধ হলো। অথচ ঢাকা শহরের যে সম্প্রসারণ ঘটছে, এখানে নতুন কী অর্থনৈতিক কার্মকাণ্ড সম্পাদন হচ্ছে, এ প্রশ্নটা রাখা দরকার? পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার বিপরীতে কী এল? উত্তরটা হচ্ছে অ্যাপার্টমেন্ট। এ তালিকায় আরো রয়েছে রেস্টুরেন্ট ও ভোগ্যপণ্যের দোকান ইত্যাদি। এ পর্যায়ে আরো যে প্রশ্নটি আমার মধ্যে তৈরি হয় তা হলো, ঢাকার অতি ধনী বা উঁচুপর্যায়ের যারা বসবাস করছে, এখানের রেস্তোরাঁগুলোয় আসছে, নিয়মিত ভোগ্যপণ্য ক্রয় করছে, তার আয়টা কীভাবে হচ্ছে? অর্থাৎ কোন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সে অর্থ উপার্জন করছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি দেখলাম, তাদের আয়টা মূলত ভাড়া থেকে আসছে। যেমন— দূরের কোনো এক উপজেলা চেয়ারম্যান, যে ঢাকায় থাকে, সে কীভাবে এ অর্থ উপার্জন করছে? উত্তরটা হলো, তার এলাকার চুক্তিভিত্তিক কাজগুলো থেকে প্রভাব খাটিয়ে সে যে অর্থ তুলে নিচ্ছে, ঢাকার জীবনযাপনে ওই অর্থ খরচ করছে। এ ধরনের হাজার হাজার উদাহরণ রয়েছে। তার মানে ঢাকার বাইরের কোনো এলাকা থেকে আয়টা আসছে এবং অর্থটা ভোগ বাবদ ঢাকায় ব্যয় করা হচ্ছে। ওই টাকা দিয়ে নতুন ফ্ল্যাট, বাসা, গাড়ি ইত্যাদি কেনা হচ্ছে এবং এ বিবিধ সেবা দিতে আবার কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে।
অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে তাই পুনরায় চিন্তা করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। দু-তিন দশক ধরে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালক পোশাক শিল্প ও প্রবাসী আয়। এ দুটি খাতের মধ্যে বিশেষ করে প্রবাসী আয় বর্তমানে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। পোশাক শিল্প আরো হয়তো ১০-১৫ বছর প্রবৃদ্ধির চালকের আসনে থাকবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম লক্ষ থাকা উচিত প্রবৃদ্ধির নতুন চালকগুলোকে শুধু আবিষ্কার করা নয়, সেগুলোকে নীতিসহায়তা, নীতিসমর্থন ও সার্বিক সমর্থনের জায়গায় নিয়ে যাওয়া। আমাদের অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণে এ আলোচনাগুলো অনুপস্থিত। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধির শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট রয়েছে। এগুলো নিয়ে শত শত সেমিনার হচ্ছে, কিন্তু সংকটটা মিটছে না।
কয়েক দিন আগে গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০১৮-এর প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, যেখানে উঠে এসেছে এশিয়া মহাদেশে উদ্ভাবনের দিক দিয়ে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। সামাজিক কিছু সূচকে আমরা ভালো অবস্থানে থাকলেও সার্বিকভাবে অর্থনীতির অর্থবহ মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগুলোয় বড় ধরনের সংকট রয়ে গেছে। তাই অতি ধনী হওয়ার পরিসংখ্যানটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে পেছনের বিষয়গুলোকে তুলে ধরে। বিশেষ করে কী প্রক্রিয়ায় অতি ধনী হচ্ছে? এ সূত্র ধরে আসে অর্থনৈতিক কৌশলের সংকট। অর্থনৈতিক কৌশলের সংকটটি আসছে রাজনৈতিক শাসনের ধরন থেকে। এটি বোঝার ভুল নয়। রাজনৈতিক শাসনের যে প্রক্রিয়ায় অতি ধনী হচ্ছে, অর্থনৈতিক কৌশলের সংকট হচ্ছে, কর্মসংস্থানের সংকট হচ্ছে, পুঁজিবাজারে সংকট হচ্ছে, মানসম্মত শিক্ষার সংকট হচ্ছে— বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ সময় আমাদের রাজনৈতিক শাসনের ধরনটা নিয়ে চিন্তা করাটা খুব জরুরি। একই সঙ্গে এর সূত্র ধরে অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্মাণের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসা প্রয়োজন।
লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
নির্বাহী চেয়ারপারসন, পিপিআরসি






