বিশ্বব্যাপী আকাশসেবা বিগত শতকে মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত এয়ারলাইনসের দখলে ছিল। এগুলোর সিংহভাগই ছিল ব্যবস্থাপনাগতভাবে অদক্ষ, লোকসানমুখী এবং যাত্রীসেবার দিক থেকে অত্যন্ত নিচু মানের। এসব এয়ারলাইনস চলত মূলত নাগরিক প্রদত্ত করের টাকার ভর্তুকির মাধ্যমে। এ অবস্থা বেশকিছু দেশের ক্ষেত্রে এখনো বিদ্যমান। এয়ারলাইনস একটি সেবামূলক ব্যবসায়িক খাত। তাই অনেক দেশের সরকারই বিপুল ভর্তুকিনির্ভর এয়ারলাইনসের দায় বহন করতে অপারগতা প্রকাশ করে। অন্যদিকে নাগরিক সমাজের মাঝ থেকেও তাদের করের টাকায় কেন শ্বেতহস্তী পোষা হচ্ছে, এ দাবি জোরালো হতে থাকে। সর্বক্ষেত্রে এ দর্শন চালু হতে থাকে যে, সরকারগুলোর কাজ নীতি নির্ধারণ করা, ব্যবসা করা নয়। এর ফলে বিগত শতকে এয়ারলাইনস খাতকে ডি-রেগুলেটেড করে বেসরকারি খাতে প্রসারের পদক্ষেপ নেয়া হয়। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে এয়ারলাইনসের যাত্রা নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে। সেই হিসেবে এ খাত বলতে পারি প্রায় শিশুকাল। যাত্রার শুরু থেকেই এ খাত নানাবিধ চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এ খাতে যেমন আছে সম্ভাবনার দ্যুতি, তেমনি আছে পর্বতপ্রমাণ বাধার কালো মেঘ। বেসরকারি এয়ারলাইনসের সমস্যা ও সম্ভাবনার সম্যক রূপটা উপলব্ধি করতে হলে আমাদেরকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনতে হবে।
সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সিস, যা আইএটিএ হিসেবে সমধিক পরিচিত, বিগত ২০১৭ সালের আকাশপথে যাত্রী এবং মালপত্র পরিবহনের তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী আকাশপথে যাত্রী পরিবহনে ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন যাত্রীর মাইলফলক অতিক্রম করল, যা আগের বছরে ছিল ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন। পক্ষান্তরে একই সময় বিশ্বব্যাপী কার্গো পরিবহনে বৃদ্ধির পরিমাণ ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। আকাশপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের এ প্রভূত উন্নতি এবং বিস্ময়কর বৃদ্ধি সাধিত হয়েছে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত. বিগত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষে এবং আশির দশকের শুরুতে বিশ্বব্যাপী আকাশ পরিবহন সেবা De-regularization-এর মাধ্যমে। এতে আকাশ পরিবহন সেবায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। সর্বত্র রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অদক্ষ ও অলাভজনক জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনসের পাশাপাশি বেসরকারি মালিকানায় এয়ারলাইনস সেবা দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে। সেই ঢেউয়ে মূলত আমেরিকা এবং ইউরোপ অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করে এবং প্রায় চার দশক সময়ের মধ্যে এভিয়েশনের ক্ষেত্রে পরিপক্ব অবস্থানে চলে আসে। বিশ্বের বাকি দেশগুলো বাস্তবিক অর্থে এ অগ্রযাত্রায় অনেক পিছিয়ে পড়ে, মূলত এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সরকারগুলোর
De-regularization-এর অনীহার কারণে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল দেরিতে শুরু করলেও বর্তমানে এভিয়েশন খাতের সম্প্রসারণে এ অঞ্চল প্রথম সারিতে অবস্থান করছে।
দ্বিতীয়ত. প্রায় একই সঙ্গে সত্তর দশকের শুরুতে সাউথ-ওয়েস্ট এয়ারলাইনস লো কস্ট এয়ারলাইনস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা বিশ্বব্যাপী South-West Phenomena হিসেবে পরিচিত। আকাশপথে ভ্রমণে এ পদক্ষেপ রীতিমতো বিপ্লবের সূচনা করে। এর ফলে ইউরোপ মহাদেশে রায়নএয়ার বাজেট এয়ারলাইনস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং অল্প দিনের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। লো কস্ট ক্যারিয়ার (এলসিসি) বা বাজেট এয়ারলাইনের ক্ষেত্রে এশিয়া-প্যাসিফিক বরাবরের মতো পিছিয়ে থাকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এয়ার এশিয়ার মাধ্যমে এ অঞ্চলে বাজেট এয়ারলাইনসের যাত্রা এবং একের পর এক বিভিন্ন দেশে এলসিসির উন্মেষ ঘটতে থাকে। অনেক দেরিতে শুরু হলেও এশিয়া-প্যাসিফিক কিন্তু পিছিয়ে নেই। ইউরোপ ও আমেরিকায় বাজেট এয়ারলাইনসের অবদান যেখানে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে এরই মধ্যে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তা ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এখন বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, বর্তমান এবং আগামী দশকগুলো এশিয়া-প্যাসিফিকই আকাশ ভ্রমণে নেতৃত্বের স্থানে থাকবে।
পৃথিবীজুড়ে এভিয়েশনের ব্যাপ্তি ও প্রসার, বিশেষ করে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বলতে গেলে একটা বিপ্লবের মতো ঘটনা। প্রায় ২০ বছর ধরে চীনে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হয়ে চলছে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিগত ৫০ মাস ধরে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি করে চলেছে; লক্ষণীয় এ প্রবৃদ্ধি বছরভিত্তিক নয়, মাসভিত্তিক। পক্ষান্তরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে। বাংলাদেশ এ উন্নয়নের ত্রিভুজের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করছে। পারিপার্শ্বিক বিবেচনায়ও তাই বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের প্রবৃদ্ধি একটা অবশ্যম্ভাবী বিষয়। কিন্তু এভিয়েশন তথা বেসরকারি খাতে এয়ারলাইনসের যাত্রা শুরু অনেক দেরিতে এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনাহীনভাবে।
সেই সময়ের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট একদিকে সরকার মালিকানায় পরিচালিত চরম অদক্ষ, লোকসানমুখী, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং শূন্যের কোটায় থাকা যাত্রীসেবা মানসম্পন্ন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একচ্ছত্র দখলে থাকা বিমান সেবা খাত। অন্যদিকে ক্রমাগত লোকসানের কারণে তখন বিমান অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সার্ভিস বন্ধ করে দেয় এবং নেটওয়ার্ক গুটিয়ে ফেলে। অন্যদিকে সময়ের পরিক্রমায় তখন যাত্রী চাহিদা বাড়তে শুরু করে। এত সময় পরও বিমানের সেবার মান যে উন্নত হয়েছে বা পরিবর্তন হয়েছে, তা হলফ করে বলা যাবে না। সেই দৃশ্যপটেই বেসরকারি এয়ারলাইনসের যাত্রা শুরু।
বাংলাদেশে বেসরকারি এয়ারলাইনসের যাত্রা ও বিকাশ মূলত তিনটি ধাপে ভাগ করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অ্যারো বেঙ্গল, এয়ার পারাবত, বিসমিল্লাহ এয়ারলাইনস ও সাউথ এশিয়া এয়ারলাইনসের নাম উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে অ্যারো বেঙ্গল এবং এয়ার পারাবত অল্প সময়ের জন্য অপারেশন চালু করলেও বিসমিল্লাহ এয়ারলাইনস কার্গো এয়ারলাইনস হিসেবে আর সাউথ এশিয়া এয়ারলাইনস হেলিকপ্টার অপারেশনে মনোনিবেশ করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে বেসরকারি এয়ারলাইনস সেবায় বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে জিএমজি এয়ারলাইনসের আগমন ঘটে। এয়ারলাইনসটি অল্প সময়ের মধ্যেই উন্নত সেবা প্রদানের মাধ্যমে যাত্রীসাধারণের আস্থা অর্জন করে এবং সুনামের সঙ্গে অপারেশন কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে। কিন্তু অপারেশন এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন অতি আগ্রাসী সম্প্রসারণ কার্যক্রম হাতে নিয়ে এয়ারলাইনসটি প্রায় এক দশক যাত্রীসেবা প্রদান করে ২০১১ সালের শুরুতে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। আর তৃতীয় পর্যায় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ (বিডি), এভিয়ানা এয়ারওয়েজ এবং বেস্ট এয়ার প্রায় একই সময়ে যাত্রা শুরুর মধ্য দিয়ে। এভিয়ানা এয়ারওয়েজ এবং বেস্ট এয়ার খুবই কম সময়ের মধ্যেই অপারেশন কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। অন্যদিকে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করে অতি পুরনো উড়োজাহাজ সংগ্রহ করে হঠাৎ করেই তাদের নেটওয়ার্কের বিশাল সম্প্রসারণ করে। কিন্তু অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে এ এয়ারলাইনসও ২০১৬ সালের শুরুতে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। ধারাবাহিকভাবে ২০১০ সালে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, ২০১৩ সালে নভোএয়ার এবং ২০১৪ সালে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস পর্যায়ক্রমে অপারেশন শুরু করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে অনেক উদ্যোক্তা এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
বেসরকারি এয়ারলাইন টিকে থাকছে না কেন?
যাত্রা থেকেই দেখা যাচ্ছে— বেসরকারি এয়ারলাইনস ঢাকঢোল পিটিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যে পর্বতপ্রমাণ ক্ষতির মুখে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে কেউই টিকে থাকতে পারছে না। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে কেন বেসরকারি পর্যায়ে এয়ারলাইন ব্যবসা সাফল্যজনকভাবে দাঁড়াতে পারছে না। এক কথায় এর উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। চুলচেরা বিশ্লেষণ যদি করা হয়, তবে নানা কারণ এর মধ্যে বেরিয়ে আসবে।
আমাদের অবশ্য একটা কথা মনে রাখতে হবে, এয়ারলাইনস খাত এমনিতেই একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খাত। এ খাতে বিশ্বব্যাপী সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লা অনেক ভারী। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গত এক দশকে ২৯টি এবং মিয়ানমারে নয়টি এয়ারলাইন বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের দেশে এয়ারলাইনগুলোর অসফল হওয়ার কিছু প্রধান কারণ সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো—
১. প্রতি পদে প্রতিকূলতা: এয়ারলাইনস খাত শুরু থেকেই নানা প্রতিকূল পরিবেশ আর প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে পথ চলে আসছে। সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এয়ারলাইনসের মতো একটি অগ্রগামী এবং ব্যতিক্রমধর্মী খাতের জন্য আমলাতন্ত্রের যে সম্যক ধারণা থাকার প্রয়োজন ছিল, তা কখনো দেখা যায়নি। যার ফলে শুরু থেকেই বেসরকারি এয়ারলাইনস খাত একটি বৈরী ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে অগ্রসরমাণ। ২. সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব: উদ্যোক্তা এবং ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে এ খাতের ওপর অপর্যাপ্ত জ্ঞানের কারণে কোনো এয়ারলাইনসই সুষ্ঠু পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়নি। যার ফলে পরিকল্পনার গোড়ায়ই গলদ থাকার ফলে এয়ারলাইনসগুলো ব্যবসায়িক সফলতার মুখ দেখতে পায়নি। ৩. ভৌত অবকাঠামো: এয়ারলাইনস ব্যবসা চালু রাখা এবং সম্প্রসারণের জন্য যে ধরনের ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়, তার খুব অল্পই আমাদের দেশে বিদ্যমান। দিনে দিনে এ সমস্যা প্রকট রূপ ধারণ করছে। উল্লেখ্য, মেইনটেন্যান্স হ্যাঙ্গার থাকা একটা এয়ারলাইনের জন্য অতি জরুরি, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো এয়ারলাইনেরই হ্যাঙ্গার নেই। এয়ারলাইনের পক্ষ থেকে বারবার আবেদনের পরও হ্যাঙ্গার তৈরির জন্য স্থান বরাদ্দ করা হয়নি। ৪. বৃহৎ পুঁজি নির্ভরতা: এয়ারলাইনস ব্যবসা বিশাল পুঁজিনির্ভর। এর পরিচালনা ব্যয়ও অত্যধিক। পক্ষান্তরে ফেরতযোগ্য বিনিয়োগের প্রাপ্তি প্রায় শূন্যের কোটায়। বরঞ্চ পৃথিবীব্যাপী এয়ারলাইনস খাত ক্রমাগত লোকসানের মুখে পুঁজি হারিয়ে ফেলছে। শুধু এয়ারলাইনস খাতে বিনিয়োগের জন্য পশ্চিমা দেশ এবং অন্যান্য স্থানে একটা স্বতন্ত্র বাজার তৈরি হয়েছে, যেখান থেকে অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে পুঁজি সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় আমরা পুঁজির সেই বৃহৎ বাজারে প্রবেশ করতে পারছি না। পক্ষান্তরে আমাদের অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজার, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এয়ারলাইন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। ৫. কারিগরি দক্ষ জনবলের অভাব: এয়ারলাইনস খাত একটি অত্যন্ত উচ্চ কারিগরি জ্ঞাননির্ভর এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। পাইলট, এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ার, গ্রাউন্ড স্টাফ এমনকি এ খাতের বাজার এবং বিপণন শাখার লোকবলেরও বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী হতে হয়। কিন্তু এ খাতে প্রশিক্ষিত পাইলট এবং কারিগরি জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ারের প্রচণ্ড সংকট বিদ্যমান। এতে এয়ারলাইনসগুলোকে বিদেশী পাইলট এবং ইঞ্জিনিয়ারের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এ বিদেশী লোকবল রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা এয়ারলাইনসের সামগ্রিক বাজেটের ওপর একটি বিরাট বোঝা, যা লাভজনকভাবে পরিচালনার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। তাই দেশী পাইলট এবং ইঞ্জিনিয়ার তৈরির ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পক্ষান্তরে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এয়ারলাইনসের খাতসংশ্লিষ্ট শিক্ষিত ও দক্ষ জনবল তৈরির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ৬. মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অভাব: আমাদের দেশে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল তৈরির জন্য মানসম্পন্ন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নেই। যেমন— পাইলট তৈরির জন্য ফ্লাইং একাডেমি, এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার তৈরির জন্য টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য লোকবল তৈরির জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নেই। এভিয়েশন লোকবল তৈরিতে আইএটিএ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট বিশ্বব্যাপী পরিচিত ও বিশ্বস্ত নাম। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের ১৬ কোটি মানুষের দেশে একটি আইএটিএ অ্যাক্রেডিটেড প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নেই, যেখানে আমাদের পাশে কলকাতায় দশের বেশি ইনস্টিটিউট বিদ্যমান। ৭. অত্যন্ত অপ্রিয় হলেও সত্য বাংলাদেশে বেসরকারি এয়ারলাইনসের টিকে না থাকা এবং এর কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। প্রাথমিক পর্যায়ে বিমানকে সুরক্ষার নামে বেসরকারি এয়ারলাইনসের ওপর যে অযাচিত বাধা চাপিয়ে দেয়া হয়, মূলত সে কারণেই প্রথম ধাপের বেসরকারি এয়ারলাইন টিকে থাকেনি। ঠিক এখনো যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, তেমনটি নিশ্চিত করে বলা যাবে না। বিমানকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কারণে এ খাতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। ভর্তুকিনির্ভর হওয়ায় বিমান বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কমে টিকিট বিক্রি করে। কিন্তু বেসরকারি এয়ারলাইনসের সেই টাকায় টিকিট বিক্রি করে টিকে থাকা অসম্ভব। জনগণের করের টাকায় একটি অদক্ষ সংস্থাকে সুরক্ষা দিয়ে কার্যত ধনী গোষ্ঠীকে ভর্ভুকি দেয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
মোদ্দা কথায় এয়ারলাইনস খাত যাত্রার শুরু থেকে যে কঠিন পরিস্থিতির মুখে ছিল, প্রায় সিকি শতাব্দীর পরিক্রমায় প্রায় একই অবস্থানে রয়ে গেছে। তবে এটা অনস্বীকার্য যে আকাশপথে যাতায়াত অতীতের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে; অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপক বাজার সম্প্রসারণ ঘটেছে। এ বাজার সম্প্রসারণ অতীতের তুলনায় বর্তমানে বেসরকারি এয়ারলাইনসের টিকে থাকার সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে। বেসরকারি এয়ারলাইনসের যাত্রা শুরুর সময় এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছিল সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ (সিএএবি) সম্পূর্ণ এক নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যার জন্য সংস্থাটি মোটেও প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশিকা, নিরাপত্তা বিধান ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনায় নিশ্চিতভাবে প্রভূত মন্ত্রণালয় এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তর এ খাতকে এগিয়ে নেয়ার জন্য যে আধুনিকায়ন, দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, তা থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।
কোনো একটা খাতকে সফল হতে হলে সরকারি নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনার প্রয়োজন হয়। আমাদের তৈরি পোশাক খাতের সাফল্য তার উজ্জ্বল উদাহরণ। এ কথা অনস্বীকার্য যে বেসরকারি এয়ারলাইনস খাত সিংহভাগ অভ্যন্তরীণ আকাশপথের ভ্রমণের ব্যবস্থা করছে এবং এর মাধ্যমে সহজ ও নিরাপদ ভ্রমণের মাধ্যম হিসেবে আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। এ বিষয়টা আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট হবে, যখন আমরা লক্ষ করি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানার প্রসার ঘটছে। মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক বিনিয়োগকারীদের প্রাত্যহিক আকাশপথে যোগাযোগের মাধ্যমে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো এ গুরুদায়িত্ব পালন করছে।
তাই আর্থিক প্রণোদনা না হোক সরকারের পক্ষ থেকে শুধু নীতি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এ খাতকে একটা শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এ ব্যাপারে আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের সাফল্য বিগত পাঁচ বছরে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। আমরা ভারতের গৃহীত কর্মপন্থা এবং নীতি সহায়তা অনুসরণ করে অবশ্যই সাফল্যের মুখ দেখতে পারি। এ খাতে যেমন পর্বতপ্রমাণ সমস্যা বিদ্যমান, তেমনি আছে সীমাহীন সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি। শুধু বাস্তবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তরিকভাবে কাজের মাধ্যমে এ সীমাহীন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করা সম্ভব।
এয়ারলাইনস খাত একটি সেবামূলক বাণিজ্যিক খাত। সুস্থ এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় তাই যাত্রীসেবা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ বিষয়টা সুস্পষ্ট হয়, যখন আমরা বাংলাদেশ বিমানের একাধিপত্যর সময় এবং বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক সময়ের তুলনা করি। আগের সময়ের তুলনায় যাত্রীসেবার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার কৃতিত্বের শতভাগ দাবিদার বেসরকারি এয়ারলাইনস।
পক্ষান্তরে ভৌত অবকাঠামোগত কারণ, বিশেষ করে যাত্রী টার্মিনালে স্থানের অপ্রতুলতা যাত্রীসেবার মানে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এক্ষেত্রে এয়ারলাইনসগুলো অনেকটা অসহায়, কেননা বিমানবন্দরে ভৌত অবকাঠামোগত স্থাপনা তৈরি ও প্রদান করা তাদের এখতিয়ারের বাইরে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই এ ব্যপারে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ও সার্বিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান নিবন্ধে কার্গো এয়ারলাইনসের বিষয়ে পর্যালোচনা না করলে একটি ক্রমবর্ধমান খাতকে উপেক্ষা করা হবে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কক্সবাজারকেন্দ্রিক কার্গো এয়ারলাইনসের একটা বাজার গড়ে উঠেছে। ভবিষ্যতেও কক্সবাজার ছাড়িয়ে দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরেও এই সেবার প্রসার ঘটবে।
অন্যদিকে কার্গো পরিবহনের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ব মানচিত্রে একটি ক্রমবর্ধমান হাব বা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এ খাত সম্পূর্ণই বিদেশী স্বনামধন্য কার্গো বিমান সংস্থার নিয়ন্ত্রণে। এক্ষেত্রে দেশী কোনো বিকল্প এয়ারলাইন এখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। যদিও কিছু কার্গো এয়ারলাইনস বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ডানা মেলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক স্থাপনের অদক্ষতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে সাফল্য লাভ করতে পারেনি।
বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে শুরু থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার মুখে আজ পর্যন্ত এ খাতটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি এবং সাফল্যের মুখ দেখেনি। কিন্তু দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এ খাত নীরব ভূমিকা পালন করে। তাই একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সাফল্যজনক বেসরকারি এয়ারলাইনস খাতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এর উদ্যোক্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকার এবং অংশীদারদের একসঙ্গে ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নভোএয়ার






