সম্প্রতি ওয়েলথ-এক্স নামে একটি প্রতিবেদন বিশ্বে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের প্রকাশিত বিষয়গুলো নিয়ে আগেও আলোচনা ছিল। কিন্তু তাদের এবারের প্রতিবেদন সারা দুনিয়ায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করার কারণ, সারা পৃথিবীতে এখন বৈষম্য নিয়ে অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, সমাজচিন্তক সবাই উদ্বিগ্ন। উদ্বিগ্ন এজন্য যে, সম্পদের অতি কেন্দ্রীভূত অর্থনীতির আগ্রাসী চরিত্র সর্বত্র রাজনীতিকেও গ্রাস করে নিতে উদ্যত হয়েছে। ফলে যেসব দেশে গণসচেতনতা ও জনগণের নৈতিক মান নিচু, সেসব দেশে অর্থনীতির অগণতান্ত্রিক চরিত্র রাজনীতিকেও অগণতান্ত্রিক ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছে। আর বাংলাদেশের অতি ধনীদের সম্পদ সারা বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে— এ তথ্যটিও এবারের রিপোর্টে বিশেষভাবে এসেছে। ফলে বাংলাদেশও শেষ পর্যন্ত অতি ধনী ব্যবসায়ীদের কবলে পড়তে চলেছে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনীতিও তাদের কব্জার মধ্যে চলে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এতে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে, ধনবৈষম্য বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও শেষাবধি শ্লথ হয়ে যাবে।
আমরা জানি, বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য’গুলোর (এসডিজি) মধ্যে বৈষম্য নিরসনও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সুতরাং এখানে যখন ঘোষণা করা হয়— উন্নয়নে কাউকে বাইরে রাখা যাবে না, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, না করলে উন্নয়ন টেকসই হবে না; তখন এর অর্থ দাঁড়ায় বিশ্বব্যাপী একটি সহমত তৈরি হয়েছে, যেখানে বৈষম্য একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। বৈষম্য নানা ক্ষেত্রে নানা বিষয়ে নানা মাত্রায় হতে পারে। শ্রেণীতে শ্রেণীতে বৈষম্য হতে পারে। জেন্ডারবৈষম্য হতে পারে। শিক্ষায় বৈষম্য হতে পারে। স্বাস্থ্যে বৈষম্য হতে পারে। নগর-গ্রামে বৈষম্য হতে পারে, আর মিশেল ফুঁকোর মতে, শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সামাজিক সুবিস্তৃত ক্ষমতার যে জাল তৈরি করা হয়, সেখানে রয়েছে ‘ক্ষমতার বৈষম্য’ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের খেলা। তবে মার্ক্সের বিশ্লেষণ অনুসারে, সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যে বৈষম্য শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সব বৈষম্যের ভিত্তি, সেটি হলো আয় ও সম্পদের বৈষম্য। এ দুয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ পরস্পর পরিপুরক সম্পর্কও বিদ্যমান। যাদের আয় বেশি থাকে, তাদের ভোগ বেশি হলেও তাদের হাতে কিছু না কিছু সঞ্চয় উদ্বৃত্ত থাকে। অর্থাৎ তাদের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আয়ের স্বল্প থেকে স্বল্পতর শতাংশ ভোগে ব্যয় হয় এবং সঞ্চয় অনুপাত বেশি হতে থাকে। বহু বছর আগে জন মেনার্ড কেইনস দেখিয়েছিলেন যত গড় আয় বৃদ্ধি পাবে, তত আয়ের গড় ভোগ প্রবণতা কমতে থাকবে। সঞ্চয়ের গড় প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। এটি আমরা সাধারণ জ্ঞান দিয়েও বুঝতে পারি। আমার যদি আয় কম হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় অপরিহার্য খাদ্যদ্রব্য ও মৌলিক চাহিদা মেটাতেই ৮০-৯০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়ে যাবে। বাকি ১০ শতাংশ দিয়ে আমরা অপরিহার্য খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় নির্বাহ করব। এরপর যা থাকবে, সেটি হলো শূন্য বা নেতিবাচক সঞ্চয়। যেহেতু প্রয়োজনীয় অনেক অভাব পূরণ হবে না, সুতরাং তখন আমাকে অতীতের সঞ্চিত সম্পদ বন্ধক দিয়ে ঋণ করে বর্তমান ভোগ ব্যয় চাহিদা পূরণ করতে হবে। শুধু আয় নয়, সম্পদের দিক থেকেও আমি তখন দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হতে থাকব। উল্টো দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যারা খুব ধনী, তাদের আয়ের খুব সামান্য অংশ ব্যয় করেই তারা তাদের প্রয়োজনীয় ভোগ ব্যয় মিটিয়ে ফেলেন। খাদ্যে তারা আর কতইবা ব্যয় করবেন। তবে তাদের বিলাসী ভোগ্যপণ্য রয়েছে। কেউ নিজস্ব ইয়াটে গিয়ে শীতকালে ঘুরে বেড়াতে চান। কেউ হয়তো আমেরিকার ব্যয়বহুল প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে চান। কেউ হয়তো পৃথিবীর বহু প্রকৃতিনন্দন স্থানে একাধিক বাগানবাড়ি রাখতে চান, যাতে এক জায়গায় এক রকম আনন্দে থাকবেন, আরেক জায়গায় আরেক সময় আনন্দে থাকবেন। এ ধরনের ভোগকে আমরা সাধারণত তুলনামূলক বিচারে বলে থাকি বিলাসী ভোগ। বিলাসী ভোগের অধিকার প্রত্যেক ব্যক্তির আছে, কিন্তু তা অর্জিত আয় ও সম্পদভিত্তিক হতে হবে এবং তার পরও ভোগের নির্লজ্জ প্রদর্শন সমাজের জন্য মঙ্গলকর হয় না।
অতি ধনীদের হাতে বিলাসী ভোগের পর যে অর্থ বেঁচে যায়, তারা সেই অর্থ নিয়ে করবেন কি— এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও বটে। সুতরাং প্রয়োজনীয় ভোগ ব্যয়, তারপর বিলাসী ভোগ ব্যয়, তার পর অতিরিক্ত অর্থ সম্পদে পরিণত করাই শ্রেয় বলে তারা ভাবেন, কারণ তা লাভজনক। সম্পদে পরিণত করলে লাভ কী? সম্পদ যদি উৎপাদনশীল হয়, অর্থাৎ সেটা যদি শ্রম নিয়োজনমূলক কোনো বিনিয়োগ হয়, তাহলে তা উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি করে এবং তা থেকে আরো বাড়তি আয় পাওয়া যায়। এতে আপেক্ষিকভাবে শোষণ হলেও পশ্চাত্পদতা বা ভাসমান ছিন্নমূলতা দূর হয়। এতে নতুন কর্মসংস্থান হয়। কিন্তু এ ধরনের বৈধ উৎপাদনশীল পন্থায় সম্পদ বৃদ্ধিতে সব ধনী সন্তুষ্ট হতে পারেন না। সম্পদশালীরা প্রায়ই মুনাফার নেশায় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং যেনতেন প্রকরণে সম্পদ বাড়াতেই থাকেন, আয়ও বাড়াতে থাকেন। এভাবে এ ক্লাবের সদস্যরা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ওয়েলথ-এক্স এ বিষয়টিই আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাঁচজন ধনীর (ওয়েলথ-এক্সের ভাষায় ধনীদের মধ্যে সবচেয়ে কর্মকুশল যারা, তারা হচ্ছেন ‘Peak Performers’) সম্পদের তথ্য তারা প্রদান করেছে। তাদের নাম ও নাগরিকত্বও তারা প্রকাশ করেছে। এ থেকে দেখতে পাই, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ তিনজন ধনীর সবাই আমেরিকায় বাস করেন। এরা হচ্ছেন— জেফ বেজস (৭৮৮৮০০ কোটি টাকা), বিল গেটস (৬৯৯২০০ কোটি টাকা) এবং আমানিয়া অর্তেগা গাওনা (৫৩৪৪০০ কোটি টাকা)।
বিশ্বব্যাপী খুব উচ্চ ধনীদের ক্লাবের সদস্য পদের যোগ্যতা নির্ণয়ের একটি অপেক্ষাকৃত নিচু মাপকাঠি ওয়েলথ-এক্স নির্ধারণ করেছে। ৩ কোটি ডলার বা ২৪০ কোটি টাকার বেশি অর্থ ও সম্পদের মালিক যারা, তারাই হলেন অতি উচ্চ ধনী।
কে কত দ্রুত আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারবে, সেটি নিয়ে এসব অতি ধনী দৈত্যদের মধ্যে এক ধরনের অনৈতিক প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। এ প্রতিযোগিতার ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যারা খুব বড়লোক হয়ে যাচ্ছেন, তারা ওই জায়গা থেকে প্রত্যেকে নিজ নিজ সাম্রাজ্য আরো বড় করে গড়ে তুলতে চাইছেন। দেশের ভেতরে উৎপাদনশীল শিল্প বিনিয়োগের বদলে বাইরে সম্পদ সৃষ্টি ও নানাভাবে ব্যাংক ক্রয় বা টাকা দিয়ে টাকার খনি কেনার চেষ্টাও এসব অতি ধনীর কারো কারো মধ্যে দেখা যাচ্ছে! নিজের পুঁজি নিয়ে সন্তুষ্ট না থেকে অন্যদের পুঁজিও তারা ব্যাংকের মাধ্যমে নিজের কর্তৃত্বে নিয়ে আসছেন। জমিজমা, পুকুর-নদী দখলের অভিযান তো অব্যাহত আছেই। তারা অনেকেই অসৎ রাজনীতিবিদ ও অসৎ আমলাদের ঘুষ দিয়ে কিনে ফেলছেন। এভাবে সমাজে দুর্নীতিও সংক্রমিত হচ্ছে এবং তাদের অনুপার্জিত আয়ও বাড়ছে। বাংলাদেশে মধ্যম মানের দেশপ্রেমিক উৎপাদনমুখী ধনীদের দ্বারা কিছুটা শিল্পায়ন হয়েছে, কিন্তু এরই মধ্যে গুটিকতক অতি উচ্চ ধনী হাউজ তৈরি হয়ে গেছে, যারা এখন আর উৎপাদনশীল বিনিয়োগে বা Captain of Industry হতে উৎসাহী নন। এসব হাউজ এখন ছদ্মনামে টিভি-রেডিও-প্রচার মাধ্যম-এমপি শিপ ইত্যাদিও কিনতে শুরু করেছেন। তারা এখন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ফলে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোয় মধ্যবিত্তের বদলে ধনিক শ্রেণীর প্রভাব নাটকীয় হারে বেড়ে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক খবর যেটি ওয়েলথ-এক্স আমাদের দিচ্ছে, তা হলো যারা পৃথিবীতে ৩ কোটি ডলারের বেশি সম্পদভুক্ত, তাদের মতো যারা বাংলাদেশে আছেন, সেই ক্লাবে থাকা বাংলাদেশীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। পৃথিবীর অন্য সব দেশের হারের তুলনায় এটি বেশি এবং সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশের যারা এ ক্লাবে ঢুকেছেন, তারা পৃথিবীর শীর্ষ ধনীদের তুলনায় হয়তো অনেক ক্ষুদ্র। কিন্তু তার পরও তাদের সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে। অর্থাৎ সবচেয়ে ছোট যারা, তাদের সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে। একথাও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সম্পদ বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি হলে আয় বৃদ্ধির হারও সবচেয়ে বেশি হবে। কারণ আয় বৃদ্ধি না হলে নতুন সম্পদ তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬-৭ শতাংশ যেটি অন্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি। কেউ হয়তো বলতে পারে, বাংলাদেশে যেহেতু আয় বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি, সুতরাং যাদের সম্পদের পরিমাণ বেশি, তাদের আয়ও বেশি হারে বাড়বে। আসলেই এসডিজি নির্দেশনা অনুযায়ী বৈষম্য নিরসনকারী প্রবৃদ্ধি কৌশল আমাদের দেশে অনুসৃত হচ্ছে না। আমাদের এখানে যে নীতি অনুসৃত হচ্ছে, সেটি হলো বাজার অর্থনীতি। বাজার অর্থনীতির নীতি অনুযায়ী যাদের আয় ও সম্পদ কম, তাদের আয় ও সম্পদ কম হারে বাড়বে আর যাদের আয় ও সম্পদ বেশি, তাদের বেশি হারে বাড়বে। সুতরাং আয় বৃদ্ধির হার ধনীদের বেশি হবে, গরিবদের কম হবে। ধনী আরো ধনী হবে, গরিবের আয় বৃদ্ধি পেলেও অতটা বাড়বে না। তবে হয়তো আমরা গড়ে এটি বলতে পারব না— ‘গরিব আরো গরিব হচ্ছে।’ উভয়ের সম্পদ ও আয়ই হয়তো গড়ে কমবেশি বাড়ছে, তবে ধনীদের সম্পদ ও আয় বৃদ্ধির গতি অপেক্ষাকৃত বেশি। গরিব যতটুকু উপরে উঠছে, ধনী তার তুলনায় অনেক বেশি উপরে উঠছে। সুতরাং আপেক্ষিকভাবে বৈষম্য অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এটি আমরা নিজেদের চোখেই আশপাশে দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জনগণের সম্পদের বৈষম্য পরিমাপ করে না, তাই আমাদের এখানে সম্পদের করও নেই। উন্নত দেশের মতো সম্পদ নিয়ে আমরা কোনো পরিসংখ্যানও পাই না। কিন্তু আয়ের বৈষম্য মাপার জন্য বিবিএস জিনি সহগ ব্যবহার করে থাকে। পাঁচ বছর পরপর বিবিএস খানা আয়-ব্যয়ের জরিপ করে। সেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশে ১৯৮৮-৮৯ সালে আমাদের বৈষম্য পরিমাপের জিনি সূচক ছিল দশমিক ৩৭। এখন এটি হয়ে গেছে দশমিক ৪৮ শতাংশ। উন্নয়ন লিটারেচারে কোনো দেশের আয়বৈষম্য সূচক দশমিক ৫০ হলে, তখন ওই দেশকে উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং বৈষম্য একটি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বলে ধরা হয়। বাংলাদেশ আয়বৈষম্যের বিপজ্জনক পর্যায়ের প্রান্তসীমায় অবস্থান করছে। বাংলাদেশ যদি অদূর ভবিষ্যতে এ আয়বৈষম্য কমাতে না পারে, তাহলে চীনের মতো মিডল ইনকাম ফাঁদে আটকে যেতে পারে। চীন এখন নিজেই স্বীকার করছে তারা যদি বিদ্যমান আয়বৈষম্য না কমাতে পারে, তাহলে মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদ থেকে বের হয়ে উন্নত দেশ হতে পারবে না। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশ যদি চীন থেকে শিক্ষা নিতে চায়, তবে তাকে এখনই আয়বৈষম্যের রাশ টেনে ধরতে হবে। কিন্তু যেটি গুরুত্বপূর্ণ কথা এবং ওয়েলথ-এক্সের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, এ আয়বৈষম্য বৃদ্ধির একটি প্রতিফলন ঘটেছে সম্পদবৈষম্যে। কারণ যাদের আয় বেড়েছে, তারা সেই আয় দিয়ে নতুন নতুন সম্পদ তৈরি করেছেন। যারা ৩ কোটি ডলার ক্লাবের সদস্য, তাদের আয়ও বেড়েছে বেশি, সম্পদও বেড়েছে বেশি। কালের কণ্ঠের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১২-১৭ কালপর্বে এ বাংলাদেশী অতি ধনীদের সম্পদের প্রবৃদ্ধির হার ছিল বার্ষিক ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এ থেকে অনুমান করা যায়, আয় বৃদ্ধির হারও বার্ষিক ১০-১২ শতাংশের কম ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশে এ আয় বৃদ্ধির বৈধ পন্থার সঙ্গে অবৈধ পন্থাও জড়িত ছিল। সেটিও নানাভাবে আজ স্বতঃপ্রতীয়মান। সাম্প্রতিককালে অবৈধ আয় বা সম্পদের তিনটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে—
একটি হলো, ব্যাংকঋণ নিয়ে ঋণ ফেরত না দেয়ার পরিসংখ্যান। খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে এরই মধ্যে। সোনালী, বেসিক, ফারমার্স ইত্যাদি ব্যাংক কেলেঙ্কারির খবর পরিসংখ্যানসহ আমরা সবাই জানি।
দুই হলো, সম্পদ পাচারের পরিসংখ্যান; যা গত ১০ বছরে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার সমান বলে জানাচ্ছে Global Financial Integrity Report, May, 2017। এও আমরা জেনেছি যে, সুইস ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশী ধনীদের টাকার পরিমাণ ২০১৭ সালে ছিল ৪ হাজার ৬৮ কোটি।
তৃতীয়ত. প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ লুটপাটের নানা কিচ্ছা-কাহিনী (এসব বিষয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্যের জন্য দেখুন আলি রিয়াজ, ‘অতি ধনীর সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে কেন?’, দৈনিক প্রথম আলো, ৬ সে. ২০১৮)।
কি জিনি সহগ কি অর্থ পাচারের পরিসংখ্যান কি ওভার ও আন্ডার ইনভয়েস করে সম্পদ পাচারের ইনডেক্স কি ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুটের ইনডেক্স কি ‘বেগম পাড়ার’ ইনডেক্স— সব দিকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশ একটি বিপজ্জনকভাবে অনুপার্জিত আয়ভিত্তিক বৈষম্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বৈষম্য নিয়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার জন্য অর্থনীতিবিদ এস আর ওসমানী একটি কাজ করেছিলেন। এটি করা হয়েছিল সরকারেরই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ব্যাকগ্রাউন্ড পেপার হিসেবে। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন, পালমা অনুপাতের বিচারে বাংলাদেশ উচ্চবৈষম্যের দেশ। দেশের সব নাগরিকের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের হাতে যত শতাংশ আয় থাকে, তাকে সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশের হাতে যত শতাংশ আয় থাকে তা দিয়ে ভাগ করলে পালমা অনুপাত পাওয়া যায়। জিনি সহগের সমালোচনা হওয়ায় বর্তমানে সহজে বোধগম্য ‘পালমা অনুপাত’ দিয়ে বিশ্বে বৈষম্য পরিমাপ করা হয়। এস আর ওসমানী তার নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেখা গেছে প্রতি বছরই পালমা অনুপাত বেড়েছে। সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ধনীর হাতে আয়ের বেশির ভাগ জমা হচ্ছে। সর্বনিম্ন ৮০ শতাংশ গরিবের হাতে আয়ের নিম্ন থেকে নিম্নতর অংশ জমা হচ্ছে। এস আর ওসমানী আরো একটি বিষয় দেখিয়েছেন, শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা যে হারে এ কালপর্বে বেড়েছিল, তাদের প্রকৃত আয় সে হারে বাড়েনি। অর্থাৎ তারা অবদান রেখেছেন বেশি, পেয়েছেন কম!
সর্বদিক দিয়ে বিচারে আমরা একটি বৈষম্য সৃষ্টিকারী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছি। যে বেশি কাজ করছে তাকে তুলনামূলক কম দিচ্ছি, শোষণ করছি, যেমন— শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণী। যে ভালো কাজ করছেন, তাকে একদম শূন্য না দিলেও যে তার চেয়ে কম ভালো করছেন বা এমনকি খারাপ কাজ করছেন তাকে অনেক বেশি দিচ্ছি। আমরা ন্যায়নীতি লঙ্ঘন করছি, বৈষম্য বাড়াচ্ছি। এটি ক্রমে আমাদের সমাজে হিংসা-বিদ্বেষ-বিক্ষোভ সৃষ্টি করছে। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ভাষায়, পাকিস্তান আমলে আমরা দুই অর্থনীতির মধ্যে ছিলাম। এক অর্থনীতি ছিল নির্যাতিত-নিপীড়িত। আরেক অর্থনীতি ছিল শোষক ও শাসক। আমরা তখন বিদেশী শোষক-শাসক অর্থনীতির বিরুদ্ধে নিপীড়িত বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করেছিলাম। এখন তিনি বলছেন, বাঙালি জাতির মধ্যেই দুটি শ্রেণী ও দুটি অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। এ ডাইকোটমি সমাধান না করলে আমাদের উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি রাজনৈতিকভাবেও বিপন্ন হবে এবং এসডিজির লক্ষ্যও আমরা অর্জন করতে পারব না। টেকসই ও মানসম্পন্ন মধ্যম আয়ের দেশও আমরা হতে পারব না। এ কথা ঠিক, অতি দারিদ্র্য কমেছে, দারিদ্র্যের হারও কমছে। কিন্তু মুড়ি হয়েছে মুড়কি আর সন্দেশ হয়েছে রাজভোগ। এটি দিয়ে আসল উন্নয়ন হবে না, এটি টেকসইও হবে না।
রাষ্ট্রের সহযোগিতায় সম্পদশালী গোষ্ঠী তৈরি ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্য নিয়েও কিছু দেশ উন্নতি করেছে। মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া উন্নতি করেছে। ওইসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ক্রোনি ক্যাপিটালিজমে দুর্নীতির পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হলে বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যদি মেরিটোক্রেসির (Meritocracy) বেসিসে পরিচালিত না হয় এবং আইন-কানুনগুলো যদি প্রতিনিয়ত ঘুষের মাধ্যমে কেনাবেচা হতে থাকে, তখন কোনো নিয়ম-বিধি-স্ট্যাবিলিটি থাকে না। স্ট্যাবিলিটি না থাকলে বিনিয়োগও থাকে না। Capital Flight বেড়ে যায়। ফরেন ইনভেস্টমেন্টও কমে যায়। Cost of Business অল্প কিছু বৃহৎ ক্রোনি বাদে বাকিদের জন্য অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। তখন অনেক সৎ ধনীও আর দেশে থাকতে চান না। এসব কারণে এটি পরিষ্কার যে, ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের যেটুকু দুর্নীতি এসব দেশে হয়েছিল, তা একটি সীমার মধ্যে ছিল। সেটি গিয়ে রাষ্ট্রের আইন-কানুনকে বেপরোয়াভাবে প্রভাবিত করতে পারেনি। রাষ্ট্র ও ব্যক্তিখাত এসব দেশে উভয়ই শক্তিশালী হওয়ায় উভয়ই উভয়ের কাছে কিছুটা ধরা ছিল (Mutual Hostage)। বাংলাদেশে এখন রাষ্ট্র এতই দুর্বল ও লোভী হয়ে পড়েছে যে বড় হাউজগুলোকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
এখান থেকে অর্থনীতির উত্তরণে সম্পদ পাচার রোধ করার জন্য আমাদের একটি কঠোর আইন করতে হবে। কিন্তু তার আগে সরকারকে নিজে ন্যাশনালিস্ট হতে হবে। সরকারকে মেরিটোক্র্যাসির বেসিসে প্রশাসন সাজাতে হবে। যেহেতু লুটপাটকারীদের দ্বারা সরকার প্রভাবিত হচ্ছে এবং লুটপাটকারীরাই সরকারকে নিয়ম-কানুন তৈরি করতে এবং নিয়ম-কানুন ভাঙতে অনুপ্রাণিত করছে; এমন নিয়ম তৈরি করছে, যাতে লুটপাট সহজ হয় এবং প্রশাসনকে এমনভাবে দলীয়করণ করছে, যাতে লুটপাটকারী প্রশ্রয় পায়, আইন ভঙ্গ করলেও শাস্তি না হয়, সেটিকে আমরা এক কথায় বলছি সুশাসনের সংকট। সুশাসনের সংকটের কারণে বাইরে থেকে কোনো অর্থ আর এখানে আসছে না। ভেতরের অর্থও ভেতরে থাকছে না, বাইরে চলে যাচ্ছে। অতত্রব এ সংস্কৃতি পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঐকমত্য তৈরি হতে হবে। বিরোধী দল ও সরকারি দল উভয়কেই একমত হতে হবে— আইন-কানুন সবার জন্য সমান হবে। সেটি বিরোধী দলের জন্য যেমন প্রযোজ্য, তেমনি সরকারি দলের জন্যও। লুটপাট করে কেউ রক্ষা পাবে না। কিন্তু এখন আমরা দেখি, যখন আওয়ামী লীগ সরকারে থাকে তখন আওয়ামী লীগপন্থীরা অবাধ লুটপাটের সুযোগ পায়। আবার বিএনপি যখন ক্ষমতায় থাকে তখন বিএনপিপন্থীরা অবাধ লুটপাটের সুযোগ পায়। এ দুয়ের কীর্তিকলাপ দেখে ‘যে যায় লংকায় সেই হয় রাবন’— এ রকম একটি কথা ভেবে নিয়ে আমাদের দেশবাসী হাত গুটিয়ে বসে আছে। তারা বিক্ষুব্ধ হচ্ছে, প্রতিবাদ জানাচ্ছে, নিন্দার ঝড় তুলছে, সেমিনারে অনেক বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান যেমন গণঅভ্যুত্থান তৈরি করে এগিয়ে গেছেন, সে রকম এখানে তৈরি হচ্ছে না। সেটি তৈরি হবে কি হবে না, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু বিকল্প নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এখানে লাগবে, সেটি আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে হতে পারে, বিএনপির ভেতর থেকেও হতে পারে। উভয়েই যদি ব্যর্থ হয়, তবে তৃতীয় একটি শক্তি লাগবে। সেটিকে জনগণের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়াতে হবে, সামরিক বাহিনীর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ালে চলবে না। সুতরাং সব মিলিয়ে আমরা একটি সন্ধিক্ষণে আছি। দেখা যাক বাংলাদেশের আগামী ইতিহাস কোন দিকে অগ্রসর হয়।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






