সরকারি নজরদারির মধ্যেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ‘বুম’ বা হঠাৎ বিকাশ ঘটছে, মুদ্রণ মাধ্যম আগেকার মতোই অপেক্ষাকৃত স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু ব্যবসায় খাতের কাছে নতজানু হয়ে পড়েছে, সাংবাদিকের নিরাপত্তার বিষয়টি আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, নিবর্তনমূলক নানা আইনি পদক্ষেপের কারণে সাংবাদিকদের স্বনিয়ন্ত্রণ বেড়েছে— সাম্প্রতিক সময় এই হলো বাংলাদেশের মিডিয়ার প্রবণতা, যে প্রসঙ্গগুলোকে ছোট পরিসরের এ লেখাটিতে ছুঁয়ে যাওয়া হবে।

ঐতিহাসিকভাবেই প্রেসের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের অগণতান্ত্রিক সরকারগুলোর প্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা আমরা জানি। বর্তমানের ‘গণতান্ত্রিক’ সময়েও মিডিয়া পুরোপুরি স্বাধীন নয়। মুদ্রণ মাধ্যমকে কিছুটা ছাড় দিলেও সরকার ইলেকট্রনিক মাধ্যমকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। এ প্রক্রিয়াটি শুরু হয় টেলিভিশনের বা রেডিওর লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই। সরকারঘনিষ্ঠ না হলে লাইসেন্স পাওয়ারই তেমন কোনো উপায় নেই। সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারণে, কোনো কোনো চ্যানেলের কাজই হলো নানাভাবে সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাওয়া।

বিটিভির সংবাদ প্রকৃত অর্থে সরকার এবং সরকার দলের প্রপাগান্ডা, তা পুরোটা সময় বসে দেখা যায় না। কিন্তু বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদ দেখেও মনে হয় তা যেন বিটিভিরই পরিমার্জিত সংস্করণ। উপস্থাপনা ও আঙ্গিকে কুশলতা রয়েছে কিন্তু আধেয়তে সেই প্রধানমন্ত্রীর স্লট, কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর মুখে কেবিনেট-মিটিংয়ের সিদ্ধান্তের বয়ান। মুদ্রণ মাধ্যমে আমরা ক্যাবিনেট-মিটিংয়ের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে সংবাদ হতে দেখি না, কিন্তু ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তা রীতিমতো শিরোনাম আকারে হাজির হয়। তবুও রুটিন কাজ করতে গিয়ে অনিচ্ছুক সাংবাদিকের নৈর্ব্যক্তিক ক্যামেরায় অনেক সত্য উঠে আসে। সেটা সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠলে, হস্তক্ষেপ করা হয়। সাম্প্রতিক নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় টেলিভিশনগুলোয় লাইভ কাভারেজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আর মিডিয়াগুলোয় নানা নির্দেশনা অনিয়মিতভাবে হলেও দেয়া হয়ে থাকে।

সত্যিকার অর্থে বিটিভি আর আমাদের সম্প্রচার মাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব করছে না। পাবলিক এ প্রতিষ্ঠানটিকে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, সরকারগুলোই দায়িত্ব নিয়ে এ কাজটি করেছে। তবে বেসরকারি টিভি-চ্যানেলগুলোর ওপরও, অন্তঃত সংবাদের ওপর, কড়া-রকমের নিয়ন্ত্রণ সরকারের রয়েছে। এটা সত্যি পরিহাসের বিষয় যে, প্রধানত ‘সংবাদ মাধ্যম’ হওয়ার পরও সংবাদপত্র সরকারের প্রত্যক্ষ খবরদারির হাত থেকে অপেক্ষাকৃত মুক্ত, কিন্তু প্রধানত ‘বিনোদন মাধ্যম’ হওয়ার পরও টেলিভিশনগুলোর সংবাদ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সেন্সরের কবলে রয়েছে।

তবে মুদ্রণ মাধ্যমের ওপর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও সরকারের দিক থেকে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ বা চাপ রয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো বিজ্ঞাপন বণ্টন এবং আরেকটি হলো হুমকি-ধমকি ও সতর্কীকরণ। এমনকি বেসরকারি বিজ্ঞাপনদাতাদের দুটি সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিতে বিরত রাখার মতো ব্যতিক্রমী ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে ঘটেছে।

বর্তমানের মিডিয়া খাতটি বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মাধ্যম নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দ্রুত ‘বিকশিত’ হয়েছে। এই বিকাশ হয়েছে বেসরকারি পর্যায়ে এবং বেসরকারি ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এর মালিকানায় থাকছেন। বাংলাদেশের সরকারি খাত যদি ‘দুর্নীতিপরায়ণ’ হয়, তাহলে বিগত দেড় দশকে বিশ্বায়নের কারণে যে বেসরকারি খাত বিকশিত হয়েছে তা হলো ‘দুর্বৃত্ত’। সংবাদ মাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের কথা এ দেশে খুব আলোচিত ও চর্বিত বিষয় হলেও বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তেমন আলোচিত নয়। সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রায় সবগুলোই ওই ‘দুর্বৃত্ত’ বেসরকারি খাতের মালিকানাধীন হওয়ার কারণে এগুলো নিয়ে তারা একেবারেই আলোচনা করে না; সেটাই স্বাভাবিক। বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণ সরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণের চাইতে কম ভয়ঙ্কর নয়।

বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রত্যক্ষ চাপ, পণ্যের খবরাখবর দেয়ার নানা আবদারের কথাটি নাই বা ধরলাম, যে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিনিয়ত পত্রিকাকে বিজ্ঞাপন দেয়, তার কোনো ‘দুর্বৃত্তায়ন’-এর খবর একটি পত্রিকা কীভাবে ছাপবে? ছাপছেও না। ‘বাজারে এসেছে নতুন পণ্য’জাতীয় সংবাদগুলো, যার অর্থমূল্য থাকলেও সংবাদমূল্য সামান্যও নেই, বিজ্ঞাপনদাতাদের চাপেই যে প্রকাশ করতে হয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিজ্ঞাপন তো বিজ্ঞাপনই, কিন্তু সংবাদের ছদ্মবেশে সে হাজির হলো তা অনেক কার্যকর হয়।

সেলফোন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে মিডিয়া হাউজগুলোর সম্পর্ক বা লেনদেন নিয়ে আলাদা অনুসন্ধানী রিপোর্ট হতে পারে। আমি নিশ্চিত জানি, অনেক অনেক পাঠক চিঠিপত্র পাতায় সেলফোন কোম্পানিগুলোর প্রতারণা, ভুল বিল, বিলের উচ্চহার, প্যাকেজ/অফারের নামে ধাপ্পাবাজি নিয়ে প্রচুর চিঠি লিখেছেন— তাদের চিঠিগুলো ছাপা হয়নি। এসব অন্যায় নিয়ে শক্ত কোনো রিপোর্ট, কোনো সম্পাদকীয় পত্রিকাগুলো লেখেনি, চ্যানেলগুলো কোনো আইটেম প্রচার করেনি। যদিওবা কোনো সংবাদ হয়, নিশ্চয়ই নিয়মিত হয়, তা প্রোমোশনাল: কোন নতুন প্যাকেজ এল ইত্যাদি। যদি সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ স্লটের স্পন্সর হয়ে সংবাদের শিরোনামগুলোর শিরোনাম হয় ‘অমুক ব্যাংক সংবাদ শিরোনাম’ কিংবা ‘তমুক ফোন খেলার খবর’ তাহলে চ্যানেলগুলোর আর উপায় থাকে না এদের ব্যাপারে ক্রিটিক্যাল হওয়া। নইলে সংবাদ মাধ্যগুলো বেসরকারি খাতের দ্রুত বিকাশের পক্ষেই কাজ করে থাকে।

বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে সাংবাদিকের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম ঝুঁকিপ্রবণ দেশ। অনেক সাংবাদিক শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন, আহত হয়েছেন অনেকে, নিহতের সংখ্যাও কম নয়। হত্যাকাণ্ডের পেছনে স্থানীয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও দুর্নীতি কয়েকটি কারণ, কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডগুলোর, বলতে গেলে কোনোটিরই বিচার না হওয়া ঝুঁকির পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেয়।

সনাতনী মূলধারার মিডিয়ার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক মাধ্যম। পাঠক সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে বিশ্বের নানা দেশে দৈনিকগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা অনলাইন সংস্করণে অভিবাসন করছে— এ দুয়ের মধ্যে রয়েছে মুদ্রণ মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ব্যাপক হ্রাস এবং ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন বৃদ্ধি। বাংলাদেশেও এ প্রবণতার ছাপ লক্ষ করা যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনদাতারা মুদ্রণ সংবাদপত্রকে আর পছন্দের মাধ্যম হিসেবে ভাবছেন না। মুদ্রণ সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন স্থির বা স্ট্যাটিক, কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন গতিশীল বা অ্যানিমেটেড আকারে পরিবেশিত হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, বিজ্ঞাপনের পণ্য অনুযায়ী ইন্টারনেট টার্গেট ভোক্তাকে খুঁজে দিতে পারে। ফলে বিজ্ঞাপনদাতা বা পণ্যের উৎপাদক মুদ্রণ মাধ্যমের অনির্দিষ্ট পাঠকের তুলনায় ডিজিটাল মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ভোক্তার কাছে সরাসরি পৌঁছে যায়। গুগল কিংবা ফেসবুকের মতো বড় প্লাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর পছন্দ ও অনলাইনের গতিবিধি অনুযায়ী আলাদা আলাদা ডাটাবেজ তৈরি করে ফেলে এবং সেই তথ্য তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে। এই ডাটাবেজ অনুযায়ী বিজ্ঞাপনদাতারা সুলভে খাঁটি টার্গেট অডিয়েন্সকে খুঁজে পায় এবং তার কাছে বিজ্ঞাপন পরিবেশন করতে পারে। অনলাইনের এই সুবিধা বেশ কার্যকর, অন্তত বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য। তবে ভিন্ন ব্যাপারও আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে সংবাদের উৎস হিসেবে। আবার মূলধারার মিডিয়া তার সংবাদ বা অনুষ্ঠান প্রচারের জন্য সামাজিক মাধ্যমকে কাজে লাগাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের কারণে মুদ্রণ মাধ্যম সামনের দিনগুলোয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেশি।

আশঙ্কার বিষয়, নানা আইনি পদক্ষেপের কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা ব্যাহত হচ্ছে। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বিরাজ করেছে। আইসিটি আইনটি ডিজিটাল মাধ্যমের জন্য প্রযোজ্য এবং যেহেতু এখন সব মিডিয়ারই ডিজিটাল সংস্করণ থাকে, তাই ওই ধারাটি দিয়ে মামলা ও হয়রানির আশঙ্কা ছিল। ফলে স্বনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ সেন্সরশিপ বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তা চরমে পৌঁছাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ প্রবর্তিত হয়ে গেলে। বিভিন্ন ধারায় পরোক্ষভাবে সাংবাদিকতায় প্রভাব ফেলবে, কিন্তু ৩২ ধারাটিতে ১৯২৩ সালের দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যার কারণে তদন্তমূলক সাংবাদিকতা করার আর সুযোগ থাকবে না। কোনো অফিসে ‘অবৈধভাবে’ প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে। এর আগে ২০১৪ সালে সম্প্রচার আইন প্রবর্তনের ক্ষেত্রেও কঠোর সব বিধি রাখা হয়েছে, যাকে শেষ পর্যন্ত নিবর্তনমূলক আইন হিসেবে গণ্য করা যায়।

পরিশেষে বলা যায়, সরকারপক্ষের সঙ্গে মিডিয়ার সম্পর্ক সবসময়ই আপাত বিরোধিতার এবং এই বিরোধিতা খুব ফলপ্রসূ হতে পারে যদি দুই পক্ষেরই জনস্বার্থ সংরক্ষণ ও অর্জনের উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হলো, সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় তারা ক্ষমতায় আসেন ক্ষমতা কুক্ষিগত করা ও নিজেদের লোকদের বৈধ-অবৈধ নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়ার জন্য। আর আজকাল বিভিন্ন মিডিয়াও যেন চালু হচ্ছে কেবলই ব্যবসা করার জন্য অথবা একে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।

 

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক