ঢাকা— বাংলাদেশের রাজধানী ও জাতির প্রবেশদ্বার। এটি এখন বিশ্বের ২৬তম মেগাসিটি ও ১০তম সবচেয়ে জনবহুল শহরে পরিণত হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ভৌত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে ঢাকা শহরের উন্নয়ন প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। ১৯৫১ থেকে ২০০১ সালের সময় পর্বে এ শহরের বৃদ্ধি ঘটেছে যথাক্রমে ৩০ থেকে ২০ গুণের বেশি। দুর্ভাগ্যক্রমে, এ উন্নয়ন হয়েছে অনেকটা বিক্ষিপ্ত ও অপরিকল্পিতভাবে। ফলে বিপুল ভূমি ব্যবহার হলেও শহরে রয়ে গেছে পরিবহন ঘাটতি। অকার্যকর ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও ঢাকা শহরের পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সমস্যা, যেটি বিদ্যমান ব্যবস্থা অধিক অনুপাদনশীল করায় ব্যাপকভাবে দায়ী। উপরন্তু অপরিকল্পিত ও বিচ্ছিন্ন সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়নের কারণে বিভিন্ন মোড ও সাব মোডভিত্তিক সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা কার্যকরের সুযোগ রয়েছে সীমিত।
ঢাকা মেট্রোপলিটন শহরের বিদ্যমান পরিবহন নেটওয়ার্ক
সড়ক নেটওয়ার্ক
আকার, কাজ ও শহরের চরিত্র বিবেচনায় একটি সুসমন্বিত আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা কোনো শহরের নগর এলাকার সাধারণত ২০ থেকে ৪০ শতাংশ দখল করে। বিপরীতে ঢাকা শহরে মোট এলাকার মাত্র ৯ শতাংশ সড়ক পরিসর। আরো বিস্ময়ের হলো, ডিসিসি এলাকার মোট ১ হাজার ২৮৬ কিলোমিটারের মাত্র ৬ শতাংশ পেভমেন্ট পরিসর। সড়কের মধ্যে ৬১ কিলোমিটার প্রাইমারি, ১০৮ কিলোমিটার সেকেন্ডারি, ২২১ কিলোমিটার কানেক্টর, ৫৭৩ কিলোমিটার লোকাল এবং বাকিটা সরু সড়ক। পুরো শহরে কেবল ১০৭ কিলোমিটার সড়ক ২৪ মিটারের অধিক প্রশস্ত। পেভমেন্ট প্রশস্ততার দিক থেকে কেবল ৪৫ কিলোমিটারই একটি নির্দিষ্ট পরিসর পর্যন্ত গণপরিবহনের লেন প্রদানের উপযুক্ত। প্রকৃতপক্ষে, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার মোট সড়কের মধ্যে ৮২১ দশমিক ৬১ কিলোমিটার সড়কের (৬৪ শতাংশ) প্রশস্ততা ৪ দশমিক ৭৫ মিটারের সমান বা এর কিছু বেশি। পেভমেন্ট প্রশস্ততা অনুযায়ী, এটি কেবল ৬১৮ দশমিক ১৪ কিলোমিটার (৪৮ শতাংশ)। অন্য ৪৬৪ কিলোমিটার (৩৬ শতাংশ) সড়ক অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার ব্রিগেডের মতো জরুরি যানবাহনের জন্য অপ্রবেশগম্য।
উন্নয়নশীল দেশের অন্য শহরগুলোর তুলনায় প্রতি হাজার জনসংখ্যা বা প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকার দিক থেকে ঢাকা শহরে প্রধান রোডের বিদ্যমানতা ভীষণ কম। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশের ৯ শহর এবং উন্নত দেশের ২৬টি শহরে মাথাপিছু গড় সড়ক যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৫ এবং ৪ দশমিক ৫ মিটার। যেখানে ঢাকা শহরে মাথাপিছু সড়ক মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ২১৩ মিটার। অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও পরিবহন পরিকল্পনার মাধ্যমে উত্থিত এটি ঢাকা শহরের অন্যতম অন্তর্নিহিত দুর্বলতা। এমনকি নতুন প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) বাস্তবায়নের পর মোট সড়ক নেটওয়ার্ক ১ হাজার ৪১৩ দশমিক ৬৭ বর্গকিলোমিটার এবং সড়ক ও পেভমেন্ট এলাকা যথাক্রমে ১৫ (১১ শতাংশ) ও ১১ (৮ শতাংশ) কিলোমিটার হবে। এটা ছাড়াও বিপুল অ্যালাইনমেন্ট, লে-আউট বা পুরো সড়ক নেটওয়ার্কের ওরিয়েন্টেশন সমস্যার জন্য বিদ্যমান সড়কগুলো পুরো সক্ষমতায় কার্যকর নয়।
চক্রাকার জলপথ
আশীর্বাদ যে, ঢাকায় পুরো শহরজুড়ে একটি চক্রাকার প্রাকৃতিক জলপথ আছে। এ শহর চারটি নদী দ্বারা বেষ্টিত, যা কিছু ইতিবাচক ফল দেয়। এর স্থল থেকে পানিতে ট্রাফিক ডাইভার্টের সক্ষমতা আছে। ঢাকা শহরের জলপথের মোট ১৯টি ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে। সদরঘাট থেকে খোলামরা— দুটি ঘাটের মধ্যকার একমাত্র লঞ্চ কানেক্টিং রুট এখন সচল। একক ডেক লঞ্চ দ্বারা প্রতিদিন এ রুট কেবল ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার যাত্রী বহন করে। এ চক্রাকার জলপথ শহরের বিপুল সংখ্যক যাত্রীর ব্যাপক স্বস্তি দিতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিপুল সুবিধা ও সম্ভাবনা সত্ত্বেও নদী ও নদীর পাশে জগাখিচুড়ি উন্নয়ন, সড়ক ও অন্য ট্রান্সপোর্ট মোডের সঙ্গে ইন্টারচেঞ্জের অভাব এবং অসমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার কারণে শহরজুড়ে থাকা চক্রাকার জলপথের সফল বাস্তবায়ন খুব কষ্টসাধ্য।
রেল নেটওয়ার্ক
ঢাকায় শহরের মধ্যভাগ দিয়ে উত্তর-দক্ষিণমুখী একটি একক রেলওয়ে করিডোর (শ্যামপুর থেকে আব্দুল্লাহপুর) বিদ্যমান। রেল যাত্রীরা তিনটি স্টেশন দ্বারা পরিবহন সেবা পান। সেগুলো হলো— কমলাপুর (৬ শতাংশ), তেজগাঁও (১ শতাংশ) এবং এয়ারপোর্ট (২ শতাংশ) রেলস্টেশন। প্রধান রেলস্টেশন কমলাপুর ঢাকার পূর্ব দিকের মধ্যভাগে অবস্থিত। প্রতিদিন ২০-২৫ হাজার ইনকামিং ও আউটগোয়িং রেলযাত্রীদের সেবা দিতে গিয়ে এ রেলস্টেশন গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ত জায়গায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া অন্য দুই স্টেশন তেজগাঁও ও এয়ারপোর্ট দ্বারা ১০-১৫ হাজার ইনকামিং ও আউটগোয়িং যাত্রী আসা-যাওয়া করে। বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পরিকল্পনা পর্যায়ের দিক থেকে সড়ক ও রেলের মধ্যকার সমন্বয়ের অভাবে বর্তমানে একটি অন্যটিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিভিন্ন পরিবহন মোডের মধ্যকার ইন্টারচেঞ্জ
ঢাকা শহরের বিদ্যমান মোড ও সাব-মোডগুলো (বাস-ওয়াটার-রেল-এনএমটি) একটি অন্যটির থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করছে। ইন্টারসিটি মোড, ইন্ট্রা সিটি মোড এবং ইন্টার ও ইন্ট্রা সিটি বাস সার্ভিসের মধ্যকার ইন্টারফেসের ওপর একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিচে বিধৃত হলো:
ইন্টার সিটি মোডের মধ্যকার ইন্টারফেস
বাস, ট্রেন ও লঞ্চে ঢাকা থেকে ও ঢাকা অভিমুখী আন্তঃনগর যাত্রীদের অংশ যথাক্রমে ৭৬, ৯ ও ১৫ শতাংশ। এ তিন মোডের ইন্টারচেঞ্জ বা ইন্টারফেস ফ্যাসিলিটি খুবই নাজুক। মোট বাসযাত্রী পাঁচটি বাস টার্মিনাল (যেমন- গাবতলী ২৩ শতাংশ, মহাখালী ৬, গুলিস্তান ৭, ফুলবাড়িয়া ১৫ এবং সায়েদাবাদ ২৫ শতাংশ) দ্বারা সেবা পায়। এ পাঁচ বাস টার্মিনালের মধ্যে সরাসরি কার্যকর কোনো সংযোগ নেই। গাবতলী থেকে গুলিস্তান এবং গাবতলী থেকে সায়েদাবাদে আলাদা একক বাস সংযোগ সার্ভিস আছে, তবে এ সংযোগ রুট বিভিন্ন লিংক, রাইট টার্ন, লেফট টার্ন, লোকাল রোড ও টারশিয়ারি রোড দ্বারা পুরোপুরি আঁকাবাঁকা। বড় বিষয়, এ রুট ব্যবসায়িক, আবাসিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সিবিডি এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে। সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল এবং গাবতলী ও মহাখালী টার্মিনালের সঙ্গেও কোনো সংযোগ সার্ভিস নেই।
তিনটি রেল স্টেশন— কমলাপুর (৬ শতাংশ), তেজগাঁও (১ শতাংশ) এবং এয়ারপোর্ট (২ শতাংশ) দ্বারা রেলযাত্রীরা আসা-যাওয়া করেন। কমলাপুর রেলস্টেশন শহরের পূর্ব দিকে এবং এটি সিবিডি এলাকা থেকে মাত্র দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরে। ব্যবহারকারীবান্ধব ফুটপাত বা সুবিধাজনক বিকল্পের অভাবে সিবিডি থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ আসা-যাওয়া করে। প্রতিদিন এই স্টেশন থেকে ২০-২৫ হাজার যাত্রীদের আসা-যাওয়ার জন্য শহরের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে তিনটি ইন্ট্রা সিটি ও একটি সেমি-ইন্ট্রা সিটি বাস কানেক্টিং সার্ভিস আছে। অবশ্য গাবতলী, মহাখালী ও সদরঘাট টার্মিনালের সঙ্গে কোনো কানেক্টিং সার্ভিস নেই। সুসমন্বিত ম্যাস ট্রানজিট নেটওয়ার্কের অভাবে প্রায় ৬০ শতাংশ যাত্রী ভ্রমণপূর্ব ও ভ্রমণ-পরবর্তী বাহন হিসেবে রিকশা ব্যবহার করেন। ১৬ শতাংশ যাত্রী ব্যবহার করেন মিনিবাস এবং অটোরিকশা ব্যবহার করেন ৯ শতাংশ যাত্রী। পুরান ঢাকার সঙ্গে কোনো কানেক্টিং সার্ভিস নেই। রিকশার জন্য সুন্দর নকশাকৃত পার্কিং স্পেস আছে, কিন্তু বাসের জন্য কোনো পার্কিং বে নেই। অন্যদিকে স্টেশন চত্বর থেকে কোনো কানেক্টিং বাস শুরু করে না বা থামে না। স্টেশনটি চারটি বাস রুটের মধ্যপথ (ভায়া)। সুতরাং সব বাসই পুরো বোঝাই নিয়ে স্টেশন কাউন্টারে পৌঁছায়। ফলে রেলস্টেশনের যাত্রীরা বাস চড়তে আগ্রহী হয় না এবং তারা রিকশা বা অটোরিকশা ব্যবহারে বাধ্য। তিনটি বাস কাউন্টার রয়েছে এবং সব কয়টিই ফুটপাতের ওপর।
মেট্রো-সিটির উত্তরাংশের এলাকা থেকে আসা যাত্রীদের সেবা প্রদানে টঙ্গী ও ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের মাঝখানে নির্মিত নতুন স্টেশন হলো এয়ারপোর্ট স্টেশন। ইন্টারসিটি ট্রেন পরিচালনা ও থামানোর মাধ্যমে স্টেশনটি জনপ্রিয় হয়েছে। এ জনপ্রিয়তার কারণ শর্ট জানির ভ্রমণপূর্ব ও পরের সময়ে ট্রান্সপোর্ট ফ্যাসিলিটি, এনএমটি ফ্রি ভিআইপি সড়ক দোরগোড়ায় থাকা এবং শহরের সব জায়গায় সবসময় যাওয়ার জন্য দ্রুতগামী ট্যাক্সি ও অন্য সার্ভিসগুলোর সহজপ্রাপ্যতা। অন্যদিকে সুসমন্বিত সংযোগসহ উল্লিখিত সুযোগ-সুবিধার অভাবে ধীরে ধীরে তেজগাঁও স্টেশন অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
আন্তঃনগর জলপথের যাত্রীদের বেশির ভাগই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল দিয়ে যাওয়া-আসা করেন। সবচেয়ে নিকটবর্তী বাস স্টপেজ আলোচ্য লঞ্চ টার্মিনাল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। ওই টার্মিনালমুখী অবিভাজ্য একমাত্র চার লেনের প্রধান সড়কটিও সবসময় জনাকীর্ণ থাকে। ওই সড়কের প্রায় দুই লেন সবসময় থাকে হকারদের দখলে এবং সড়কের উভয় পাশে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড হরদম চলে। প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের নিবিড়তা এত বেশি যে, এটা উপলব্ধি করা কঠিন যে সেখানে আদৌ ফুটপাত আছে কিনা। সড়কের পাশে বড় বড় বহুতল ব্যবসায়িক ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়ায় এ গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত টার্মিনালে প্রবেশগম্যতা চিরদিনের জন্য বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। ভ্রমণের আগে ও পরে প্রায় ৫৫ শতাংশ যাত্রী রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ব্যবহার করে এবং লঞ্চঘাট থেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটার পর ১৫ শতাংশ যাত্রী টেম্পো ও হিউম্যান হলার ব্যবহার করে। পার্ক টার্মিনালে কেবল তিনটি রুটের বাস থাকে। প্রধান রেলস্টেশন কমলাপুর ওই টার্মিনাল থেকে চার কিলোমিটার দূরে; কিন্তু যাওয়ার ভালো সুযোগ বা ইন্টারফেস নেই। মহাখালী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালের সঙ্গে কোনো কানেক্টিং বাস রুটও নেই।
ইন্ট্রা সিটি মোডের মধ্যকার ইন্টারফেস
ঢাকায় প্রতিদিন আনুমানিক ১৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন ইন্ট্রা সিটি ট্রিপ চলাচল করে। প্রতিদিন কমিউটার ট্রেন ও লঞ্চে ইন্ট্রা সিটি যাত্রীর অংশ যথাক্রমে ৫ হাজার ও ২ হাজার জন। বাকি ট্রিপ সড়কভিত্তিক। সড়ক, রেল ও জলের এ তিন ইন্ট্রা সিটি মোডের মধ্যকার ইন্টারফেস ফ্যাসিলিটিও খুবই দুর্বল। আসলে ইন্টারচেঞ্জ ফ্যাসিলিটি বা ইন্ট্রা সিটির সড়ক-রেল ট্রান্সপোর্ট এবং সড়ক-জল পরিবহনের মধ্যকার ভালো ইন্টারফেসের ঘাটতিই হলো অন্য মোডগুলোর খুব কম অংশের অন্যতম প্রধান কারণ।
ঢাকায় দুটি ইন্ট্রা সিটি কমিউটার ট্রেন চলাচল করে। এর একটি হলো কমলাপুর থেকে টঙ্গী (তেজগাঁও, এয়ারপোর্ট), অন্যটি হলো কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ (গেন্ডারিয়া হয়ে)। কমলাপুর-টঙ্গী রুটে প্রতিদিন ২৬টি আন্তঃগামী ও বহির্গামী মেইল ট্রেন (১৩টি আন্তঃগামী ও ১৩টি বহির্গামী) যাতায়াত করছে এবং এ রুটে যাত্রীপ্রবাহ ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার। ছুটির দিন বাদে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে প্রতিদিন ২০টি (১০টি আন্তঃগামী ও ১০টি বহির্গামী) ট্রেন পরিচালিত হচ্ছে এবং আলোচ্য রুটে যাত্রীপ্রবাহ গড়ে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার। যাত্রীপ্রতি ভাড়া বাসের চেয়ে পাঁচ গুণ কম। যদিও এ রুটে ট্রেনের যাত্রী বাসের চেয়ে অনেক কম। চূড়ান্ত গন্তব্য থেকে রেলস্টেশনের সঙ্গে ইন্টারচেঞ্জ ফ্যাসিলিটি বা কানেক্টিং ফ্যাসলিটির অভাবই কমিউটার ট্রেন সার্ভিসের কম চাহিদার প্রধান কারণ। রুটটি কম জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ ট্রেন আসায় বিলম্ব বা ট্রেন শিডিউলের অনির্ভরযোগ্যতা।
এদিকে সোয়ারীঘাট থেকে খোলামরা হলো একমাত্র ইন্ট্রা সিটি জলপথ রুট। এ রুটে প্রতিদিন দেড় হাজার থেকে দুই হাজার যাত্রী চলাচল করে। ফ্রেইট ট্রান্সপোর্টের জন্য চক্রাকার জলপথের সঙ্গে কিছু অন্য সম্প্রসারিত রুট বিদ্যমান। অধিকন্তু চক্রাকার জলপথের উভয় পাশে প্রায় ৩০টি পারাপার স্টেশন আছে এবং এসব স্টেশন ব্যবহার করে প্রতিদিন কয়েক হাজার যাত্রী নদী পার হয়। দুঃখজনক বিষয়, এসব স্টেশনের ৬০ শতাংশেরও কোনো কার্যকর সড়ক সংযোগ নেই।
সংযোগ সড়ক বা ইন্টারচেঞ্জ ফ্যাসিলিটির অভাবে মানুষ চূড়ান্ত গন্তব্যে যেতে রিকশা ব্যবহার বা হাঁটতে বাধ্য হয়।
অভ্যন্তরীণ চক্রাকার জলপথ ও সড়কের মধ্যকার ইন্টারচেঞ্জ ফ্যাসিলিটি
ঢাকা শহরের চক্রাকার জলপথে সর্বমোট ১৯টি ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে। প্রথম ধাপে আশুলিয়া থেকে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত আছে ১০টি স্টেশন এবং দ্বিতীয় ধাপে টঙ্গী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত আছে নয়টি স্টেশন। তবে এর মধ্যে কেবল আটটি স্টেশনেরই শহর এলাকার সঙ্গে ভালো সড়ক সংযোগ বিদ্যমান। অধিকন্তু বোটের মাধ্যমে নদী পারাপারের জন্য আছে ১৩টি ঘাট।
আবার সদরঘাট থেকে রায়ের বাজার পর্যন্ত তিনটি জলপথ ল্যান্ডিং স্টেশনসহ সর্বমোট ১৭টি স্টেশন রয়েছে এবং এসব স্টেশন ব্যবহার করে প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি যাত্রী পার হয়। কিন্তু বাঁধ সড়ক ছাড়া সেখানে কোনো মানসম্পন্ন ইন্টারচেঞ্জিং রুট নেই। ফলে ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রী/ গমনকারী চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছায় রিকশায় বা পদব্রজে।
সড়ক ও রেল অপারেশনের মধ্যকার ইন্টারাপশন
শ্যামপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত ৫১ রেলক্রসিং আছে। এর মধ্যে ৩২ অনুমোদিত আর ১৪টি অননুমোদিত। ৫১টি ক্রসিংয়ের মধ্যে ১৩টি কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ রুটে, অন্য ৩৮টি কমলাপুর-টঙ্গী রুটে। এছাড়া উল্লিখিত ৫১টি ক্রসিংয়ের মধ্যে ১২টি বাস অপারেটিং প্রধান রুটের ওপর। শহরের এসব লেভেল ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন ৯৮টি বহির্গামী ও আন্তঃগামী ট্রেন অতিক্রম করে। এর মধ্যে ৭৮টি ট্রেন কমলাপুর-টঙ্গী রুটে এবং ২০টি কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচল করে। কমলাপুর-টঙ্গী রুটে চলাচলকারী ৭৮টি ট্রেনের মধ্যে ৫৪টি ট্রেন (৬৭ শতাংশ) ৮: ৩০ থেকে ১০: ৩০ সময়ের মধ্যে পরিচালিত হয়। হিসাব করা হয় যে, প্রতিটি লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ইন্টারাপশন দ্বারা প্রতিদিন ৫-৬ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। প্রতিটি মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার এবং ইন্টারাপশনের জন্য জ্বালানি পোড়ে ৩০০ লিটার। কর্মঘণ্টা নষ্ট ও জ্বালানির ক্ষতি মিলে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় দৈনিক প্রায় ৫০ হাজার টাকা। আবার অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং নিয়ন্ত্রণে ২৩৮ জন কর্মী যুক্ত এবং প্রতি মাসে কেবল তাদের বেতন বাবদ খরচ হয় ৭ দশমিক ৫ লাখ টাকা।
এদিকে কমলাপুর আইসিডিতে ফ্রেইট লোড ও আনলোডের জন্য প্রতিদিন গড়ে ২১২টি ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান প্রয়োজন হয়। এসব ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান চারশর বেশি ট্রিপ দেয়। অথচ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব ট্রিপের প্রায় ৭০ শতাংশের (সাভার বা ডিইপিজেড ৩০ শতাংশ, গাজীপুর ২৭, টঙ্গী ১০ শতাংশ) গন্তব্য ও শুরু ঢাকা শহরের বাইরে। কেবল ৩০ শতাংশ ফ্রেইট চলাচল হয় ঢাকা শহরের ভেতরে। কাজেই আইসিডির জন্য বিপুলসংখ্যক ট্রাকের ট্রিপ শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় প্রতিকূল বা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। আবার নিম্ন গতি ও আকারে বড় হওয়ার কারণে লেভেল ক্রসিংয়ে ফ্রেইট ট্রেনের প্রভাব যাত্রীবাহী ট্রেনের দ্বিগুণ। বলা যায়, দুইভাবে নগরের পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; যা আবশ্যিকভাবে বলে যে, কমলাপুর আইসিডি টঙ্গী বা গাজীপুরে স্থানান্তর কিংবা ওই এলাকায় নতুন আইসিডি নির্মাণ করা উচিত।
কাজেই সড়ক ও রেল পারস্পরিকভাবে সহায়ক নয়; বরং উভয়ই একটি অন্যটিকে বাধাগ্রস্ত করছে। রেল ট্র্যাক বাড়িয়ে গ্রেড সেপারেশন এসব সমস্যা উত্তরণের অন্যতম সম্ভাব্য সমাধান ছিল, কিন্তু মহাখালী র্যাম্প ও খিলগাঁও ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণের পর বর্তমান রেল ট্র্যাক বাড়িয়ে গ্রেড সেপারেশনের সম্ভাবনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় অবকাঠামোর গভীর ভিত্তির জন্য ভূগর্ভস্থ রেল ট্র্যাক নির্মাণও কঠিন।
চূড়ান্তভাবে, উল্লিখিত ঘাটতিগুলো থেকে স্বস্তি পেতে বিভিন্ন মোড ও সাব-মোডগুলোয় ইন্টারচেঞ্জ বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি সমন্বিত মাল্টি-মোডাল পরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তনে ঢাকার বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থার বিভিন্ন খাতের কর্মীদের যুক্ত করে সামগ্রিক উদ্যোগ নেয়া নেয়া উচিত। বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
টেকসই ও কার্যকর উন্নয়ন নিশ্চিতে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে সবিস্তার ভূমি ব্যবহার ও পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। কানেক্টিং বাস সেবা প্রদান, ইন্ট্রা সিটি বাস টার্মিনাল ফ্যাসিলিটি বা ইন্টারসিটি টার্মিনালে বাস সার্কুলেটিং ফ্যাসিলিটি, ল্যান্ডিং স্টেশন ও নগর কেন্দ্রে সংযোগ সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে বিভিন্ন ইন্টারসিটি ও ইন্ট্রা সিটির মোডের মধ্যে ইন্টারচেঞ্জ ও ট্রান্সফার ফ্যাসিলিটি বৃদ্ধি প্রয়োজন। বর্তমানে অযান্ত্রিক কর্মকাণ্ড দ্বারা দখল হওয়া পরিসরগুলো পুনরুদ্ধারপূর্বক সব পরিবহন অবকাঠামো ও ফ্যাসিলিটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা চাই। বিশেষ করে ওয়াটার টার্মিনালের ক্ষেত্রে অ্যাকসেস রোড প্রশস্ত করা আবশ্যিক। সড়কসংলগ্ন ভূমির নির্বিচার নিবিড়তা বৃদ্ধি দ্বারা বিদ্যমান সড়কের সেবা মাত্রার আর অবনতি কাম্য হবে না। জনশক্তির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত ও বিপুল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ মহল উন্নয়নে একক সংস্থার অধীনে বড় মাত্রার পুঁজিঘন সড়ক অবকাঠামো প্রজেক্ট গ্রহণ করা দরকার। সমন্বিত পরিবহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সফল করতে এর দায়িত্বভার একক কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। ব্যক্তিগত ভিত্তির চেয়ে একটি কোম্পানির অধীনে বাসগুলো পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। কৌশলগত অবস্থানে সরকারকে জমি দিতে হবে, যাতে যানবাহনের জন্য নিজস্ব ডিপো/ওয়ার্কশপ মেইনটেইন করতে পারে। পরিসর সাশ্রয়ী গণপরিবহন উন্নয়নে ধীরে ধীরে আমদানি/ নিবন্ধন নিষেধাজ্ঞা আরোপপূর্বক অটো রেসট্রিকশন পলিসি, রোড প্রাইসিং প্রভৃতি প্রবর্তন জরুরি। দেশের অন্য অংশের সঙ্গে শহরের সংযোগ বৃদ্ধিতে আরো প্রবেশপথ নির্মাণ করতে হবে। জলাভূমি এলাকার জগাখিচুড়ি উন্নয়ন প্রতিরোধে স্বতন্ত্র নীতি ও নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া উন্নয়ন জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন। সড়ক নেটওয়ার্কের মধ্যেই ট্রাফিক লোড বণ্টন নিশ্চিতে বহু কক্ষ সড়ক (অরবিটাল রোড) নির্মাণ করতে হবে। রেল ও সড়কের মধ্যকার সংঘাত দূর করতে বিদ্যমান আইসিডি ও কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন কমলাপুর থেকে টঙ্গীতে স্থানান্তর একটি উত্তম প্রস্তাব। তীব্র নগর ভ্রমণ চাহিদা মেটাতে গ্রেড-সেপারেট মেট্রো লাইন হিসেবে টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত অ্যাট-গ্রেড রেললাইন উন্নয়ন করতে হবে। সবশেষে সুপারিশ হলো, অন্তর্নিহিত ভূমি সীমাবদ্ধতা ও বাংলাদেশে নগরায়ণের দ্রুত বৃদ্ধির বিষয়টি মনে রেখে সম্ভাব্য ট্রানজিটমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানোর মাধ্যমে একটি উচ্চ ঘনত্বের টেকসই করিডোর নির্মাণে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া উচিত।
(ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির)
লেখকদ্বয় যথাক্রমে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক






