এটা সত্য যে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের তুলনায় বর্তমানে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (জিডিপি) সার্বিক কৃষি খাতের (শস্য, বন এবং মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ উপখাতগুলোর সমন্বয়ে সার্বিক কৃষি গঠিত) অবদান কমে গেছে। স্বাধীনতার প্রথম দশকে জিডিপির অর্ধেকের বেশি আসত কৃষি খাত থেকে। এখন তা দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশের নিচে। জিডিপিতে কৃষি খাতের সরাসরি অবদান কমে গেলেও এখনো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে কৃষি। তাছাড়া সার্বিক জিডিপিতে কৃষির রয়েছে পরোক্ষ অবদান। বিশেষ করে বৃহৎ সেবা খাতের মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বিপণন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন, সংরক্ষণ ও যোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের রয়েছে মূল্যবান অবদান। আর অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘এখনো দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত’ (সূত্র: অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০১৭-১৮)।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সব সরকারই কৃষির উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-৭৮) মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হলেও কৃষি উন্নয়নের বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৮০-৮৫) যেসব উদ্দেশ্য গ্রহণ করা হয়, সেগুলোর মধ্যে একটি ছিল ‘অতি অল্প সময়ে খাদ্যে স্বনির্ভরতা এবং কিছুটা উদ্বৃত্ত অর্জনের জন্য খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা’। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনায় কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৮৫-৯০) সার্বিক কৃষি খাতের উন্নয়নে, বিশেষ করে খাদ্যশস্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব প্রদান অব্যাহত থাকে। ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৪ শতাংশে, যদিও জিডিপিতে এ খাতের অবদান কিছুটা কমে আসে (সূত্র: তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা)। ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয় ভাগে উন্নত বীজ, সার, ক্ষুদ্র সেচ, বালাইনাশক, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ইত্যাদির ওপর বিশেষ জোর দেয়ায় কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশে। দেশে শতাব্দীর প্রলয়ঙ্করী বন্যায় আউশ ও আমন ফসল ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা হ্রাস পেলেও (৩ দশমিক ২ শতাংশ) পরের অর্থবছরে সার্বিক কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায় (সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৫)। ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে যখন দেশে উৎপাদিত প্রধান খাদ্যশস্য চালের মোট পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৭৮ লাখ ৫২ হাজার টন, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ২ কোটি ৩০ লাখ ৬৭ হাজার টনে। পরের অর্থবছরে (২০০০-০১) দেশে উৎপাদিত মোট চালের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ৮৫ হাজার টনে পৌঁছে। ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে আমাদের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য গমের উৎপাদন ছিল ১০ লাখ ৪ হাজার টন; ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৯০ হাজার টনে, যা এ যাবত্কালে দেশে উৎপাদিত গমের সর্বোচ্চ পরিমাণ (সূত্র: Database on Food Situation Bangladesh, December 2003, Ministry of Food)।
কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার নিম্নমুখী হওয়ার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শস্য উপখাত। বণিক বার্তার ৯ জুনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরসহ তিন অর্থবছর ধরে শস্য উপখাতে প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশের নিচে। ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে দশমিক ৮৮ এবং দশমিক ৯৬ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দশমিক ৯৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রবৃদ্ধির এ হার আমাদের বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭ শতাংশের অনেক নিচে।
খাদ্যশস্য উৎপাদনে হতাশাজনক প্রবৃদ্ধির প্রভাব পড়ে আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য চাল উৎপাদনে। ২০১১-১২ থেকে ২০১৬-১৭ সময়কালে দেশে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক শূন্য শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রকৃত চাল উৎপাদনের তথ্য সরকার প্রকাশ করেছে বলে জানা যায়নি। ওই অর্থবছরে চাল উৎপাদনে প্রথম অবস্থানে থাকা বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সক্ষম হলেও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আমনের উৎপাদন উপর্যুপরি বন্যার কারণে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিপিডির মতে, আমনের ক্ষতির আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। তাই ওই অর্থবছরে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হারে উন্নতির কোনো আশা করা যায় না।
সরকারি তথ্যে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে চালের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হওয়ায় দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়। ২০১০-১১ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলে চাল আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন। ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি খাতে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ১৩ হাজার টন। ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কমে এলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৯০ হাজার টন। ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চাল আমদানির ওপর যথাক্রমে ১০ ও ২৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় আমদানির পরিমাণ ভীষণভাবে কমে যায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শুধু বেসরকারি খাতে চাল আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৩ হাজার টন। এ বছর সরকারি খাতে চাল আমদানি করা হয়নি। চালের আমদানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় এবং সিলেটে হাওড় অঞ্চলে অকাল বন্যায় বোরোর উৎপাদন সরকারি হিসাবে ১০ লাখ টন কমে যাওয়ায় চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। দেশের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০-৫২ টাকায় পৌঁছে। চালের ঘাটতি মেটাতে এবং দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকার বেসরকারি খাতে চাল আমদানিকে উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। চাল আমদানির ওপর পুরো শুল্ক রহিত করা হয়। আমদানিকারকরা শুল্ক মওকুফ করে নিয়ে চাল আমদানিতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। গত জুনের শেষদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ২০ জুন পর্যন্ত খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৯ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯ টনে। এর মধ্যে প্রধান খাদ্য চালের পরিমাণ ছিল ৪১ লাখ ৮ হাজার ৯৩ টন (সরকারি খাতে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫০ টন এবং বেসরকারি খাতে ২৯ লাখ ৯০ হাজার ৪৩ টন), যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এ বিপুল পরিমাণ চাল আমদানির ফলে চালের দাম অনেকটা কমে আসে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে চাল আমদানিতে প্রত্যাহারকৃত ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনরায় আরোপের সিদ্ধান্তের ফলে মোটা চালের দাম বেড়ে ২০১৭ সালে নজিরবিহীন হয়।
আমাদের খাদ্যশস্যের তালিকায় চালের পরই দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গমের উৎপাদন চাহিদার পাঁচ ভাগের একভাগ মাত্র। দেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ টন গমের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন ১২-১৩ লাখ টনে সীমাবদ্ধ। গত অর্থবছরের ২০ জুন পর্যন্ত ৫৮ লাখ ৬৫ হাজার ৭৬ টন (সরকারি খাতে ৪ লাখ ৯০ হাজার ১৭ টন এবং বেসরকারি খাতে ৫৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৯ টন) গম আমদানি করা হয়, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে।
খাদ্যশস্য ছাড়াও অন্যান্য খাদ্যপণ্য যেমন— চিনি, লবণ, গুঁড়ো দুধ, ডাল, ভোজ্যতেল, ফলমূল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ফলমূলে আমরা আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরে দেশের ১৫টি চিনিকলে উৎপাদিত চিনি দিয়ে চাহিদা না মেটায় এক লাখ টন চিনি আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। এক সময়ের স্বয়ংসম্পূর্ণ পণ্য লবণও আমদানি করতে হচ্ছে। গত অর্থবছরে পাঁচ লাখ টনের বেশি লবণ আমদানি করা হয়েছে। দেশে বছরে বিভিন্ন ধরনের ডালের চাহিদা প্রায় ১২ লাখ টন। এর মধ্যে উৎপাদন হয় আড়াই থেকে তিন লাখ টন। বাকি চাহিদা পূরণে ভারত, নেপাল, তুরস্ক, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে বছরে গড়ে ২ হাজার কোটি টাকার ডাল আমদানি হয়। দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটানো হয় মূলত আমদানি করেই। বাংলাদেশের প্রধান মসলাজাতীয় পণ্য পেঁয়াজ। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন এবং উৎপাদন হয় প্রায় ২০ লাখ টন। বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮২ শতাংশ। এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিএসএস) কর্তৃক ২০১৪ সালে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদনশীলতার ওপর পরিচালিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, পেঁয়াজ উৎপাদনে উৎপাদনশীলতা সন্তোষজনক এবং এটি আবাদে কৃষক লাভবান হন। এ পণ্যটির উৎপাদনশীলতা আরো বাড়াতে হবে, যাতে আমরা পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারি। আরেকটি প্রয়োজনীয় মসলা রসুনের চাহিদা মেটাতে হয় মূলত আমদানির মাধ্যমে। এক সূত্রে জানা যায়, দেশে পাঁচ লাখ টন রসুনের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদনের পরিমাণ কম-বেশি দেড় লাখ টন। আদা আরেকটি দরকারি মসলা। প্রাপ্ত এক তথ্যে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে আদা উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার টন এবং আমদানি হয়েছে প্রায় ৯৯ হাজার টন।
আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক খবরও রয়েছে। সার্বিক কৃষি খাতে মত্স্য উপখাতের উন্নয়ন সন্তোষজনক। মাছ উৎপাদনে আমরা স্বনির্ভরতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। মত্স্য উপখাতের উন্নয়ন প্রশংসনীয় হলেও প্রাণিসম্পদ (গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি) উপখাতের অবস্থা মোটেই সন্তোষজনক নয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তার ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় এ উপখাতের অগ্রগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মাছের ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে, গবাদি পশুপাখির ক্ষেত্রে তা মোটেই লক্ষণীয় নয়। মুরগি ও হাঁস পালনে কিছুটা অগ্রগতি হলেও চতুষ্পদ প্রাণীর মানোন্নয়ন এবং সরবরাহে কোনো অগ্রগতি নেই। কৃত্রিম প্রজনন ছাড়া কার্যকরী কোনো উন্নয়ন উদ্যোগ সেক্ষেত্রে নেই। এমনকি তাদের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও দুর্বল। দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা বিবেচনায় চতুষ্পদ প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে তাই সবিশেষ নজর প্রদান জরুরি হয়ে পড়েছে।
মত্স্য ছাড়া আর যে কৃষিপণ্যের উৎপাদনে আমরা সাম্প্রতিককালে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হয়েছি, তা হলো এক সময়ের সোনালি আঁশখ্যাত পাট। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে ১২ লাখ ৬৬ হাজার একর জমিতে উৎপাদিত পাটের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৫৩ হাজার টন। ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত উৎপাদনের এ ধারা বহাল থাকে। ওই অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ লাখ ২২ হাজার টন। ২০১০ সালে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন ২০১০’ প্রণয়ন এবং এ আইনের অধীনে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার বিধিমালা ২০১৩’ প্রবর্তনের পর দেশে ও বিদেশে পাটের চাহিদা বেড়েছে। ফলে পাটের জমি ও উৎপাদন বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৬ লাখ ৭৫ হাজার একর জমিতে উৎপাদিত পাটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ লাখ ৫৯ হাজার টন (সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮)।
খাদ্যশস্যে স্বনির্ভরতা অর্জনসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস এবং খাদ্যবহির্ভূত কৃষিপণ্যের উন্নয়নের জন্য যা সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে, তা হলো কৃষি খাতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন। এজন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন, সেগুলো হলো—
ক. বাড়িঘর নির্মাণ, শিল্প স্থাপন, রাস্তা নির্মাণ ইত্যাদি কারণে দেশে কৃষিজমির পরিমাণ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি কৃষিজমি চলে যাচ্ছে আবাসন খাতে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাড়িঘর নির্মাণে। তাই কৃষিজমি অকৃষি খাতে স্থানান্তর এক রকম বন্ধই করতে হবে এবং ২০১৪ সালে সমবায়ভিত্তিক ভবন নির্মাণে নেয়া পরীক্ষামূলক ‘পল্লী জনপদ’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে সারা দেশের গ্রামাঞ্চলে এর বিস্তার ঘটাতে হবে।
খ. খাদ্যশস্য, বিশেষ করে প্রধান খাদ্যশস্য চালে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে সার্বিক প্রচেষ্টা নিতে হবে। উত্তরাঞ্চলের সার্বিক কৃষি খাত রক্ষায় এবং পরিবেশ বিপর্যয় এড়াতে আমাদের তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতেই হবে। তাই যত শিগগিরই সম্ভব তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা বণ্টনে চুক্তি সম্পাদনে ভারতকে রাজি করাতে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এতে সফলতা না এলে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকারকে আন্তর্জাতিক ফোরামে যেতে হবে।
গ. দেশের উত্তরাঞ্চলে ভূ-উপরিস্থ পানি ধরে রাখার আধারগুলো সংস্কারের মাধ্যমে সেগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়ানো গেলে এবং গ্রীষ্মকালে ওই পানি বোরো চাষে ব্যবহার হলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বহুলাংশে কমে যাবে। এতে উত্তরাঞ্চলে বোরো চাষ হ্রাসের ঝুঁকি নেয়ার প্রয়োজনীয়তা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
ঘ. ২০১৫ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ কর্তৃক ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি’ প্রকাশ করা হয়েছে। এটি ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য প্রযোজ্য। কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এতে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন এবং বীজের সঠিক মান নির্ধারণ, উচ্চফলনশীল আলু, ডাল ও শাকসবজির জাত উদ্ভাবন ও বিতরণ, উন্নত শস্য উৎপাদন প্রযুক্তি কৃষকদের মাঝে সম্প্রসারণ এবং মাঠপর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ। নীতি বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এতে বাড়বে কৃষিপণ্যের উৎপাদনশীলতা, জমি স্বল্পতায় ভোগা বাংলাদেশে যা খুবই দরকার।
ঙ. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশে শীতের প্রকোপ ও স্থায়িত্ব কমে যাওয়ায় উষ্ণ আবহাওয়া-সহনশীল জাতের গম উদ্ভাবনের ওপর জোর দিতে হবে।
চ. সাম্প্রতিক বছরগুলোয় খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়ায় চাহিদা মেটাতে দেশ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়লেও কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ একই অংকে (৯ হাজার কোটি টাকা) ঘুরপাক খাচ্ছে। কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে।
ছ. মনুষ্যসৃষ্ট যেসব কারণ কৃষির প্রবৃদ্ধির পথে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেগুলো মোকাবেলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট হুমকি মোকাবেলায় প্রশমনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
সবশেষে বলতে চাই, কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান কর্মকাণ্ড এবং জীবনীশক্তি। তাই জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য কৃষিতে উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিকল্প নেই। ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ অর্জন সম্ভব হলে এখন তা ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি হেক্টর জমিতে ১০ টনের বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হলে আমাদের প্রতি হেক্টরে তা তিন-চার টনে সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? খাদ্যে, বিশেষ করে খাদ্যশস্য চাল ও গমে যেভাবে আমদানি নির্ভরতা বেড়ে চলেছে, তা অব্যাহত থাকলে আমাদের উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
লেখক: সাবেক খাদ্য সচিব






