কলোনিয়ালিজম (ঔপনিবেশিকতা) পুরনো। ওরিয়েন্টালিজম রেফারেন্স (সূত্র)। এক্সপ্লয়টেশন (শোষণ) বাস্তবতা। সময়ের পেন্ডুলাম এই তিন ভাগের মধ্যে দোল খায়। এবং দোলনের এই প্রক্রিয়ায় অনেক ঘটনা উন্মুক্ত হয়, যার কিছু সফলতার গল্প বলে, কিছু আক্ষেপের আর কিছু আশা জাগায়। ইতিহাসের পাতা বলছে, এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা— সবাই ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল এবং ঔপনিবেশিকতার পেছনে মূল চালিকা ছিল সস্তা শ্রম। ইস্ট ইন্ডিজে গোলমরিচ তিন ডুকাটে কিনতে পেরে ভাস্কো দা গামা দারুণ খুশি হয়েছিলেন, কারণ ভেনিসে একই পরিমাণ গোলমরিচ কিনতে ব্যয় করতে হতো ৮০ ডুকাটে। আজ আমরা হয়তো এখন নতুন পৃথিবীবাসী, কিন্তু এখনো কিন্তু আমরা ক্রীতদাসই রয়ে গেছি, আর সেটা হলো আধুনিক বাণিজ্যের অধীনে। যখন বিশ্বে আমাদের অংশ (এশিয়া) লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রি, নিউলি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড কান্ট্রি, এমার্জিং মার্কেট ও ফ্রন্টেইনার মার্কেটে উন্নীত হচ্ছে, তখন আমাদেরই বেশির ভাগই ক্ষমতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ রয়েছি, যেটি উদ্ভাবনসহ দক্ষতা এবং বাজারের পণ্য নির্দেশ ও নির্ধারণ করে দেয়। পুঁজিবাদের উৎপাতে, আমাদের অনেক দেশ ব্যয়বহুল পথ গ্রহণ করেছে, যেখানে প্রায় ক্ষেত্রে বলির পাঁঠা বানানো হয় স্থানীয় নিম্ন মজুরির শ্রমকে। সস্তা স্থানসমূহ প্রায়ই একই ট্রেনে উঠে পড়ে এবং আকাশকুসুম কল্পনা করে কিন্তু এর বিনিময়ে পায় বিস্তর অর্থনৈতিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক সমস্যা, যেগুলো সহজে বশ মানে না। অনেকে তো এ প্রক্রিয়ায় আত্মঘাতী বোমারু তৈরি করে, তালেবানীকরণ ঘটে এবং নির্দিষ্ট দেশের কাছ থেকে বিশেষ দুর্যোগ সহায়তা পেতে শুরু করে। এবং ব্যর্থ রাষ্ট্র চিরদিনই সে অবস্থানে থেকে যায়।
বাংলাদেশকে সৌভাগ্যবান বলতে হয়, আমরা নাছোড়বান্দার মতো সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের ট্যাগ লাগা থেকে নিজেদের রক্ষা করে রেখেছি। আমরা এখন পর্যন্ত যা শিখিনি তা হলো আমাদের অতীতের ঔপনিবেশিক বন্ধন ভুলে যাওয়া। নিজেদের উপনিবেশমুক্ত (ডিকলোনাইজড) দাবি করার বদলে, আমরা এখনো দাসত্বের বাণিজ্যিক ভাষা বলে চলেছি। আমরা এখনো যে কাজটি করিনি, তা হলো বিশ্বকে বলা যে দয়া ও মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য আমাদের পরিচিতি রয়েছে এবং আমাদের এখানে শঠতার কোনো জায়গা নেই। দেখা যায় পোশাক কারখানায় যখনই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, পশ্চিমা গণমাধ্যম সেটি স্থানীয়দের তুলনায় দ্রুত আমলে নেয় এবং দ্রুততার সঙ্গে পরিবেশন করে। এমনকি সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটলেই, আমাদের অনাবৃত বা মুখোশ উন্মোচন করার হুমকি দেয়া হয় এবং আমাদের জানার আগেই, একটি একক সংস্থার সমর্থনে ১৮০টির বেশি পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় ‘আমাদের’ নিজেদের আঙিনাই ওই ইস্যু নিয়ে তদন্ত করে। অবশ্য এমনটা ঘটছে, দেশের পোশাক খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটার পর। ওই ঘটনায় ১ হাজার ১৩৪ জন মারা যাওয়ার পর, স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাদের রঙিন ছবিটা সাদা-কালো হয়ে গেছে। ছবির আসল রং পুনরুদ্ধার করতে আমাদের আরএমজি খাতের কতদিন লাগবে তা বলা কঠিন, তবে বাণিজ্যে আমাদের উপযুক্ত আসন নির্ধারণ একটি প্রশ্ন, যার উত্তর পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের স্বপ্ন লক্ষ্য কী ছিল এবং আমাদের বর্তমান ট্রানজিট কতটা মন্দ? এটির উত্তর একমাত্র তখনই পাওয়া যাবে, যদি আমরা আমলে নিই কারা বা কী বাংলাদেশের এ খাতের পরিবর্তন ঘটিয়েছে? চারটি শক্তিশালী টার্নিং পয়েন্ট যেগুলো আরএমজি খাতের সফলতার পেছনে অবদান রেখেছে, সেগুলো হলো ১৯৭৯ সালে নুরুল কাদের, ২০০৫ সালে এমএফএর সমাপ্তি, ২০১১ সালে ইইউর উৎস শর্ত (রুলস অব অরিজিন) পরিবর্তন এবং ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধস। এ বিষয়গুলো বাংলাদেশের ওপর যেভাবে প্রভাব ফেলেছে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।
চার চালক:
১. ১৯৭৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের নির্যাতনের প্রতিবাদে নিজের খান উপাধি ত্যাগ করা নুরুল কাদের জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন দেন এবং মেধাবী তরুণদের নিয়োগ দেন। দাইয়ুর সঙ্গে মিলে কোরিয়াতে এদের পাঠান প্রশিক্ষণের জন্য এবং দেশে ১০০ শতাংশ রফতানিকেন্দ্রিক প্রথম গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন। নুরুল কাদির ও তার দূরদৃষ্টি ছাড়া দেশের আরএমজি খাত এখন যে পর্যায়ে রয়েছে, সেখানে কখনো পৌঁছাত না।
২. ১৯৭৪ সালে মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট চালু হয়, যখন উন্নত বিশ্ব অনুভব করল যে উন্নয়শীল বিশ্ব থেকে নিজেদের আমদানির সমন্বয় করার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, যেহেতু ইইউ আমদানি সীমিতকরণ প্রত্যাখ্যান করে, রফতানি বাড়তে থাকে। পরে জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড (জিএটিটি) উরুগুয়ে রাউন্ডে টেক্সটাইল বাণিজ্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এখতিয়ারে আসে। এবং সবশেষে এগ্রিমেন্ট অন টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্লোথিং এমএফএর অধীন কোটা পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত করার পথ খুলে দেয়। ২০০৫ সালের ১ জানুযারি কোটার বিলুপ্তি ঘটে এবং অনুমান করা হয়েছিল এ কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ভুগবে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের রফতানি প্রায় নাটকীয়ভাবে পরিমাণের দিক থেকে বৃদ্ধি পায়, আনুমানিক ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
৩. একটা সময় ইইউতে রফতানির জন্য অ্যাপারাল ও ক্লোথিং আনুষঙ্গিক উপকরণের বেশির ভাগ শর্ত সুতা থেকে উৎপাদনের কথা বলেছিল। দ্বিস্তর উৎপাদন নিয়মকানুন মানে হচ্ছে যে, আমদানিকৃত পণ্যের ব্যবহার ম্যানুফ্যাকচারড আউটপুট মূল্যের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ অতিক্রম করতে পারবে না। জিএসপির রুলস অব অরিজিনের এই দুই পর্যায়ের ফলাফলে ইইউতে বাংলাদেশের মাত্র ৫৫ শতাংশ রফতানি করতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের জিএসপির ব্যবহার ১৯৯৬ সালে ৪১ দশমিক ১৮ শতাংশ থেকে কমে ১৯৯৭ সালে হয় ১৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এরপর ইইউ নিজেদের শর্ত সমন্বয় করে এবং নিটওয়্যারের জন্য আমদানিকৃত সুতা অনুমোদন করে এবং এরপর থেকে, ১৯৯৮ সাল থেকে, রফতানির বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করে। বর্তমানের ইইউ-এভরিথিং বাট আর্মস ইনিশিয়েটিভে, আগের জিএসপির অধীনে বাংলাদেশ আজো ইইউতে অস্ত্র-ব্যতীত সব পণ্যের ক্ষেত্রে ডিউটিমুক্ত, কোটামুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার পেয়ে আসছে। আগে বাংলাদেশের নিজের উৎপাদিত প্রায় সব রফতানিজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ইসি বাজারে জিরো ট্যারিফ, কোটা ফ্রি প্রবেশাধিকার ছিল, যা রুলস অব অরিজিনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যা-ই হোক, ইইউ-ইবিএ স্কিম পরবর্তীতে আরো ৯১৯ ট্যারিফ লাইন চুক্তির অধীনে আসে। ইইউর জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস, যা ২০১০ সালের ১৮ নভেম্বর রুলস অব অরিজিনের শর্তসমূহ সংশোধন করে, অ্যাপারেল খাতকে রফতানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য এনে দেয়। বাংলাদেশ রাতারাতি দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্ট রফতারিকারক দেশে পরিণত হয়।
৪. ইতিহাসে নুরুল কাদের চিরদিনের জন্য জাতীয় বীর হিসেবে থাকবেন, সেখানে রানা প্লাজা থাকবে জাতীয় দুঃস্বপ্ন হিসেবে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধস জাতির ইতিহাসে চূড়ান্ত টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৯০ সালের মিরপুর ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে, ২০০০ সালে চৌধুরী নিটওয়্যারে মারা যায় ৫৩ জন, ২০০১ সালে মাইকো সোয়েটারসে ২৪ জন, নিসকো সুপারমার্কেট বিল্ডিংয়ে ৯ জন, শান নিটিংয়ে ২৩ জন, ২০০৫ সালে স্পেকট্রাম ভবন ধসে ৬৪ জন, ২০১২ সালে তাজরীন অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন, রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৪ জন আমাদের রেকর্ড ট্র্যাজেডির ধ্বংসস্তূপ। রানা প্লাজা ধসকে আমাদের জন্য ‘সুযোগ’ বলা যেতে পারে ঘুরে দাঁড়ানো ও ঘাটতি ত্রুটিবিচ্যুতি দূর করার জন্য।
বাংলাদেশের ইতিহাসে যখন এ চার কুশীলব আরএমজির ভাগ্য পরিচালনা করছে, তখন আরো চারটি ইউনিট রয়েছে, যা নিয়ে এখন দেশ সংগ্রাম করছে...।
১. ট্রেড ইউনিয়ন: একবার আমি একজন ক্ষতিগ্রস্ত প্রস্তুতকারকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। ওই সময় যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সংবাদ করেছিল যে, তার কারখানায় দুটি ঘটনায় ইউনিয়ান নেতাদের পেটানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ প্রতিবেদন তার ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তার সুনামের ক্ষতি করেছে। তার এ ঘটনায় অনেকগুলো শক্তি কাজ করেছিল এবং দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের মধ্যে অনেকেই অপব্যবহারের কথা পশ্চিমা প্লাটফর্মে বলে থাকেন। ক্রেতারা, এরই মধ্যে যারা বেসরকারি এনজিও ও মন্দ মিডিয়া কভারেজের কারণে আতঙ্কিত, তারা ওই কারখানায় ক্রয় আদেশ দেয়া থেকে বিরত থাকে এবং প্রস্তুতকারককে চাপ দেয় স্থানীয় ফেডারেশনের সঙ্গে চুক্তি করতে অথচ ফেডারেশন এ চুক্তির ফলে কারখানায় প্রবেশাধিকার পাবে, যা তারা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। এ ব্যাপারে যখন স্থানীয় নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো এবং বলা হলো বিষয়টি সামাল দিতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে, তখন সে উত্তরে বলল, সরকার নিজেই তো অবৈধ। সব প্রস্তুতকারকের নিজেদের স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে ট্রেড ইউনিয়ন গ্রহণ করার দিকে। তবে একই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ইউনিয়নকরণ বা যৌথ দরকষাকষির ধারণা নির্ধারণ করা যাবে না। যদি শ্রমিকরা ইউনিয়ন পছন্দ করে, তাহলে তা গ্রহণ করা হোক। তবে এজন্য বাইরে থেকে চাপ দেয়া উচিত হবে না।
- উপশম: রানা প্লাজা ধস-পরবর্তীতে, বাংলাদেশের আরএমজি কারখানার বিভিন্ন কাঠামোগত ত্রুটি অ্যালায়েন্স অ্যান্ড অ্যাকর্ড চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত করেছে, যেগুলো প্রতিকারযোগ্য। কিন্তু প্রতিকার করার জন্য তহবিলের প্রয়োজন রয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ ডলার। প্রথম দিকে কারখানাগুলোকে নিম্ন সুদে ঋণ পাওয়ার জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছিল এমন প্রক্রিয়ায় যেখানে দায়িত্বশীল রিটেইলাররা তাদের বিক্রেতাদের (ভেন্ডর) জন্য জামিন হবে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে গ্যারান্টি দেবে, যারা সতর্কতার সঙ্গে ঋণ দেবে। স্প্রিংকলার থেকে শুরু করে ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম থেকে অগ্নিনিরোধক দেয়াল ও ফায়ার ডোর— সবগুলোর দিকে নজর দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এবং প্রায় সবগুলোর জন্য সময়ের প্রয়োজন রয়েছে এবং এগুলোকে রূপবর্ধক চর্চা হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
৩. পণ্য সক্ষমতা: এখন বেশির ভাগ কারখানাকে স্ট্যান্ডার্ড অ্যালাইড মিনিট (এসএএম) হিসাব করতে হয় এবং একটি গার্মেন্ট প্রস্তুত করতে ঠিক কী সময় লাগবে তা নির্দিষ্ট করে গ্রাহককে জানাতে হয়। এ প্রক্রিয়ার একটি সুবিধা হলো— এতে সক্ষমতার স্তর রেকর্ড করা যায়। বাংলাদেশে দেখা যায়, একই কারখানার কাছে একই ক্রেতার ক্রয়াদেশ বারবার আসছে। বাংলাদেশ এই রেকর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সুবিধা কাজে লাগিয়ে পরবর্তীতে নতুন ও পুনরাদেশ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আরো ভালো দরকষাকষি করতে পারে। যখন গ্রাহকরা চাচ্ছে দক্ষ ব্যয়, স্মার্ট উৎপাদন ও দ্রুত টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম, তখন কারখানার জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশে বিনিয়োগ করতে হবে। অটোমেশন ধীরে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। মেশিন দ্রুত মানুষের জায়গায় নিয়ে নিচ্ছে। ২০২২ সালের মধ্যে যেসব পদে দ্রুত কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে— এমন শীর্ষ দশটি জায়গার একটি হচ্ছে লো অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং, যখন কর্মঘণ্টার ৫২ শতাংশ করবে মানুষ, মেশিন করবে ৪৮ শতাংশ। বর্তমানে কর্মঘণ্টার মানুষের ভাগ ৭১ শতাংশ ও মেশিনের ২৯ শতাংশ।
৪. পণ্য হালনাগাদ: পণ্য হালনাগাদকরণ আমাদের দেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। যদি একজন প্রস্তুতকারক একটি প্লেইন ব্লাউজ তৈরি করে, তার উচিত হবে পণ্যটি আরো আকর্ষণীয় করে তোলা, তাহলে ক্রেতাভূষণ ও অতিরিক্ত কাজের জন্য বাড়তি অর্থ দেবে। ক্রেতারা যেমন সরবরাহকারীর পণ্যসম্ভারের মধ্যে যতটা সামঞ্জস্য খোঁজে, তেমনি বহুমুখী সক্ষমতাও খোঁজে, যেটির কারণে গ্রাহকরা সহজেই অন্যান্য পণ্য আদেশ দিতে পারে এবং যার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি যোগ ও সমন্বয় করার মাধ্যমে একই প্রডাকশন লাইনেই সর্বোচ্চ পণ্য প্রস্তুত করা যেতে পারে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক কাজ করে আসছে। যখন মিয়ানমার ও ইথিওপিয়া আমাদের ব্যবসা নিজেদের কবজায় নেয়ার চেষ্টা করছে, এখন আমাদের উচিত চীন ও ভারত থেকে কিছু ফ্যাশন পণ্য চুরি করা। পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশকে আরো ভালো দাম পাওয়াকে লক্ষ্যবস্তু করতে হবে।
চারটি স্বপ্ন:
১. স্বপ্ন ৫০: ২০২১ সালের মধ্যে, বাংলাদেশ লক্ষ্য স্থির করেছে ৫০ বিলিয়ন ডলার অর্জনের। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের মোট অ্যাপারেলের ৫ শতাংশ সরবরাহ করে। বাংলাদেশ যদি ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি করতে পারে, তবে এ অংশ বেড়ে ৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যদি বাংলাদেশ সরকার এ খাতে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সুশাসন নিশ্চিত করে তবে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। যদি কারখানাগুলো, যেগুলো স্থাপন করতে কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, দ্রুত গ্যাস সংযোগ পায়, তাহলে এ শিল্প খাতের পরিস্থিতি রাতারাতি পাল্টে যাবে। যদি শুধু ছোট কারখানাগুলোকে, যেগুলো অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স অণুবীক্ষণ যন্ত্রের বাইরে রয়েছে, স্থানান্তর, সংশোধন ও ব্যবসা পুনর্গঠনে সহায়তা করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।
২. মধ্যম আয়ের দেশ: বিশ্বব্যাংকের মতে, যে দেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩৬ ডলার থেকে ১২ হাজার ৬১৫ ডলারের মধ্যে তাদের ধরা হয় মধ্যম আয়ের দেশ (এমআইসি) হিসেবে। ২০১৫ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হয়। এলডিসি থেকে বের হওয়া প্রায় নিশ্চিত, কিন্তু ২০২৪ সালের আগে নয় এবং শুধু আগামী বছরগুলোতে যদি সব টেকনিক্যাল শর্ত পূরণ করতে পারে তবেই। ইতিহাস ঘাঁটলে, ২০১১-১৫ সময়ের জন্য ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের স্ট্যাটাস অর্জন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১৯০ ডলার, যা মধ্যম আয়ের পরিমাণের আরো কাছে নিয়ে গেছে। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে, ভিত্তিবছর ১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০০৫-০৬ করায় বাংলাদেশের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৯২৩ ডলার থেকে বেড়ে হয় ১ হাজার ৪৪ ডলার এবং পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যানুসারে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
৩. সুখী শ্রমিক: গত পাঁচ বছরে শ্রমিকের আয় বেড়েছে। ২০০৬ সালে ন্যূনতম মজুরি ছিল ১ হাজার ৬৬২ দশমিক ৫০ পয়সা, ২০১০ সালে বেড়ে ৩ হাজার টাকা, ২০১৩ সালে বেড়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা হয়েছে। মজুরি সংশোধনে নিয়ে খাতটি বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যে আয় করেন তা থেকে একজন অদক্ষ শ্রমিকের এই মজুরির পরিসীমা বেশি। ছয় মাসের শিক্ষানবিশকাল শেষ হলে, শ্রমিকরা তাদের মজুরি নিয়ে দরকষাকষি করে, যেটি উচ্চপদের ন্যূনতম মজুরির চেয়ে উচ্চতর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রয়ক্ষমতা (পিপিপি) বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিকে নির্দেশ করছে।
৪. গর্বের সঙ্গে তৈরি: আরএমজি প্রস্তুতকারকরা শ্রমিক ইস্যুর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করবেন, তবে সময় এসেছে নিজেদের পর্যায় নিয়ে গর্ববোধ করার। এ পর্যায়ে আমরা ট্যাগ লাইন দিতেই পারি, ‘গর্বের সঙ্গে তৈরি’। আমাদের অনেকেই অধ্যাপক ইউনূসের দৃষ্টি আকর্ষণীয় ‘হ্যাপি ওয়ার্কার্স ট্যাগ’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি রানা প্লাজা-পরবর্তী সংকট মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে এক লেখায় এটি বলেছিলেন। বাস্তবে এটি একটি ভালো উপায় হতে পারে। শ্রমিকের বুকে এমন একটি ট্যাগ লাগানো থাকা একটি ভালো বুদ্ধি। চিন্তা করুন ৪২ লাখ শ্রমিক এই ট্যাগ জড়িয়ে কাজ করছে, পণ্য উৎপাদন করছে আরো বুঝে ও আরো অনুভূতি দিয়ে।
বাস্তবে বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য একটি দেশ এবং আমরা মানব উন্নয়ন সূচকে দারুণ উন্নতি করছি। শিশুমৃত্যুর হার ১৯৯০ সালের প্রতি ১ হাজার জনে ৯৯ দশমিক ৫ থেকে কমে ২০১২ সালে হয়েছে ৩৩ দশমিক ১, মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি ১ লাখে ১৯৯০ সালের ৮০০ থেকে কমে ২০১০ সালে হয়েছে ২৪০, জাতীয় দারিদ্র্যরেখার নিচে থাকা জনগোষ্ঠী নাটকীয়ভাবে ১৯৯০ সালের ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ২০১০ সালে হয়েছে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং নারী শিক্ষার হার উৎসাহজনকভাবে ২০১২ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৬ শতাংশ। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউর জন্য করা একটি গবেষণায় লিগাটাম ইনস্টিটিউটের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ফর দ্য প্রসপারিটি ইনডেক্সের নাথান গ্যামস্টার দেখিয়েছেন— কীভাবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে সার্বিকভাবে ১০৩তম স্থান পেয়েছে, যেখানে ভারত ১০৬। র্যাংকিংয়ের উন্নতির ৮টি নির্দেশকের মধ্যে ৬টিতে ভারতের অবস্থান নেমেছে, যখন বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি ঘটেছে। সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি, অর্থনীতি ও সুশাসনে ভারতের অবস্থান নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ ডাটা বলছে বাংলাদেশীরা ভারতীয়দের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি দিন বাঁচে, স্বাস্থ্যবান থাকে ও নিরাপদ জীবনযাপন করে।
বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিপটে, বাংলাদেশে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের উন্নতিতে আরএমজি খাত অবিসংবাদিতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। খাতভিত্তিক তুলনা দেখাচ্ছে যে, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে কৃষির অবদান হ্রাস পাচ্ছে, ১৯৮০-৮১ সময়ের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে এখন কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। অন্যদিকে জিডিপিতে শিল্পের অবদান বাড়ছে, ১৯৮০-৮১ সময়ের ১৭ দশমিক ৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১২-১৩ সময়ে হয়েছে ৩১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এটা পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করছে, কীভাবে আরএমজি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এ খাত জিডিপিতে সরাসরি অবদান রাখছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটাচ্ছে। ব্যয় করার মাধ্যমে আরএমজি শ্রমিকরাও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে গত দশকে রফতানিকেন্দ্রিক আরএমজি খাতকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে, বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
সংক্ষেপে বললে, আরএমজি খাতে ৪৪ লাখ লোক কাজ করে, যাদের বেশির ভাগই নারী। দেশের রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি আরএমজি, যেটি জিডিপিতে প্রায় ১৩ শতাংশ অবদান রাখে (১৯৯১ সালে যেটি ছিল মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ)। চীন ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশে শ্রম ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ওইসব দেশ থেকে ভ্যালু চেইনের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটছে। এটি দেশের আরএমজি খাতের প্রবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশে শ্রম ব্যয় সবচেয়ে কম। ফলে স্বাভাবিকভাবে স্থানান্তরিত এসব রফতানি আদেশ পাওয়ার সুবিধা ভোগ করছে বাংলাদেশ। সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, গত ডিসেম্বরে ন্যূনতম মজুরি ৭৭ শতাংশ বাড়ানোর পরও, বাংলাদেশ নিজের প্রতিযোগীতা সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
বিভিন্ন সমস্যার মধ্যেও আরএমজি খাত এগিয়ে যাচ্ছে। তবে মনে রাখতে হবে সময় পাল্টে গেছে এবং শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলোচনা করেই এ খাতকে আরো এগিয়ে নেয়া যাবে।
(ভাষান্তর: সাঈদ সরকার)
লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মোহাম্মদী গ্রুপ






