১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলাম। খবর পেলাম, সদ্য প্রতিষ্ঠিত থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগে (সিপিডি) জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়ে এলে পরবর্তীতে ওই প্রতিষ্ঠানে রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে যোগদান করার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই এক সকালে চলে গেলাম তত্কালীন ইস্কাটন গার্ডেনের সিপিডি কার্যালয়ে। প্রশাসন-বিষয়ক পরিচালকের সঙ্গে দেখা করে আমার জীবনবৃত্তান্ত জমা দিলাম। সিপিডি কার্যালয় থেকে বের হয়ে আসছি; তখন কার্যালয় প্রাঙ্গণে একটি গাড়ি ঢুকল। আর তা থেকে নামলেন আমাদের ছাত্রজীবনে কিংবদন্তিতুল্য প্রফেসর রেহমান সোবহান, যিনি তখন সিপিডির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, ঢোক গিলে সালাম দিলাম। সালামের জবাব দিতেই স্যার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? বললাম, স্যার আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে এবার মাস্টার্স দিয়েছি, এখানে সিভি ড্রপ করতে এসেছিলাম। তিনি বললেন, অনার্সের রেজাল্ট কী? বললাম, ‘ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড পজিশন’। জিজ্ঞেস করলেন, মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস পাবে? সঙ্গে সঙ্গে আমার উত্তর, অবশ্যই স্যার, শুধু ফার্স্ট ক্লাস নয়, আমার পজিশন উপরের দিকেই থাকবে। আমার গলার কনফিডেন্স টের পেয়েই কিনা জানি না, তিনি বললেন, এসো, ভেতরে এসো। কম্পিত বুকে স্যারের পেছন পেছন গেলাম তার রুমে, বসলাম মুখোমুখি। শুরু হলো ইন্টারভিউ। একে তো লেজেন্ডারি প্রফেসর রেহমান সোবহান, তার ওপর কোনো মানসিক প্রস্তুতি ছাড়া জীবনের প্রথম চাকরির ইন্টারভিউ। পরবর্তী প্রায় আধা ঘণ্টা কোন প্রশ্নের কী উত্তর দিয়েছি, তা মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে, আমার উত্তরে স্যারের মুখে স্বস্তির হাসি ছিল, আর ছিল নতুন নতুন জিজ্ঞাস্য।

প্রশ্ন আর উত্তরের স্রোতে টাল সামলাতে সামলাতে একসময় শুনলাম স্যার তার পিএসকে ডেকে বলছেন, নাজনীনকে এখনই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়ে দাও। মার্চের ১ তারিখ থেকে ও রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে সিপিডিতে জয়েন করছে। এভাবেই আমার পরিচয় প্রফেসর রেহমান সোবহানের সঙ্গে, যার কাছ থেকে পরবর্তী প্রায় দেড় বছর সিপিডিতে থাকাকালে শিখেছি অনেক কিছু।

তখন গবেষণার তেমন কিছুই জানতাম না। আমার কাজ ছিল প্রফেসর রেহমান সোবহান ও প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমানের গবেষণাকাজে সাহায্য করা। রেহমান স্যারের সঙ্গে সে সময় কাজ করেছি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রিজওনাল ইন্টিগ্রেশনের সম্ভাবনা নিয়ে। স্যার যখন কাজ বুঝিয়ে দিতেন, মুগ্ধ হয়ে ভাবতাম তিনি কীভাবে জানেন কোন জায়গাগুলো বুঝতে আমার কঠিন লাগবে। কাজ বোঝানোর সময় বারবার জিজ্ঞেস করতেন, বুঝতে পেরেছি কিনা। মনে আছে, একদিন আট-দশটি বই ও রিপোর্ট দিয়ে আমাকে তিনদিন সময় দিলেন ওগুলো পড়ে কয়েকটি বিশেষ ইস্যুর ওপর সারসংক্ষেপ দিতে। পরবর্তী তিনদিন আমার নাওয়া-খাওয়া হারাম হয়ে গেল। জানলাম, বুঝলাম চাপের মধ্যে কীভাবে কাজ করতে হয়। যে সারসংক্ষেপ দিয়েছিলাম, তা বোধহয় স্যারের পছন্দ হয়েছিল; নইলে আবার কেন একগাদা রিপোর্ট দিয়ে আরো কিছু বিষয়ের ওপর সারসংক্ষেপ করে দিতে বললেন। এভাবে হাতে-কলমে কাজ শিখেছি স্যারের কাছ থেকে। আমার আরো দায়িত্ব ছিল, সিপিডির বিশেষ প্রকাশনা Independent Review of Bangladesh’s Development (IRBD)-এর প্রাথমিক ড্রাফটের ওপর রেহমান স্যার যে কমেন্ট লিখতেন, তা ঠিকমতো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কিনা, সেটি পরীক্ষা করে দেখা। এটি ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জের। কারণ ড্রাফটের ওপর স্যারের হাতে লেখা কমেন্ট এত ব্যাপক থাকত যে, তার কোনটা কোন জায়গায় ঢুকবে, তা ছিল এক বিরাট পাজল। একেকটা পাজল সমাধান করতে পারলে আমার মুখের হাসি বড় হতে থাকত। স্যার কী শব্দ লিখেছেন, অনেক সময় সেটা বোঝার জন্য নানাজনের টেবিলে ছোটাছুটি করতাম।

আমার মতো যারা রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ছিল, একেবারেই জুনিয়র, কাজের বাইরেও তাদের সুযোগ- সুবিধার দিকে ছিল স্যারের বিশেষ খেয়াল। কোনো সেমিনারে আমরা খেয়েছি কিনা, আমাদের সুবিধা-অসুবিধা নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করতেন। খাবারের কথা উঠতেই মনে পড়ল, ‘মিষ্টি’ স্যারের খুব প্রিয়। কোনো অনুষ্ঠানে ‘মিষ্টি’, বিশেষ করে ছানার মিষ্টি সরবরাহ করা হলে, তা সঙ্গে সঙ্গে স্যারের মুখে চলে যেত!

কাজের সুবাদে গবেষক ও ব্যক্তি রেহমান সোবহানকে যেমন দেখেছি, তেমনি তার লেখনীর মাধ্যমেও তাঁকে চিনেছি। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে তাঁর প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক ফোরাম’ পত্রিকার কিছু আর্টিকেল পড়ে অবাক হয়েছি এই ভেবে যে, পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানিদের অর্থনৈতিক বঞ্চনা নিয়ে এত সাহসিকতার সঙ্গে কীভাবে লিখেছেন! তাঁর এসব লেখনীর মাধ্যমে চিনেছি এক সাহসী অকুতোভয়, স্বাধীন চিন্তার অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানকে। ১৯৬১ সালে তাঁর লেখা গবেষণাপত্র ‘Indivisibility of the National Economy of Pakistan’-এ তিনি তুলে ধরেছিলেন, পূর্ব-পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তা। তিনি সাহসের সঙ্গে বলেছিলেন, পাকিস্তানে তখন এক দেশে দুটো অর্থনীতি বিরাজ করছিল। এভাবেই দেশের প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে এ মানুষটি তাঁর কর্মক্ষেত্র থেকে ঠিক ভূমিকা রেখেছেন বরাবরই।

১৯৯৮ সালে যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়ার স্কলারশিপের আবেদনের প্রয়োজনে রেহমান স্যারের কাছ থেকে রিকমেন্ডেশন লেটার নিতে গেলাম। তিনি স্কলারশিপ অথরিটির কাছে পাঠিয়ে দিলেন খামবন্ধ রেফারেন্স। ক’দিন পর যখন স্কলারশিপ হয়ে গেল, তখন স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে হঠাত্ তিনি টেবিল থেকে একটা কাগজ নিয়ে বললেন, দেখো আমি তোমার রিকমেন্ডেশন লেটারে কী লিখেছিলাম। পড়ে অবিশ্বাস হতে থাকল তাঁর কথাগুলোর যোগ্য আমি কিনা তা ভেবে। সবশেষ বাক্যটি পড়ে চোখে জল এসে গেল! ওই বাক্যে স্যার যা লিখেছেন, তার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘আমার জীবনে পেশা ও নানা সুবাদে অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট যত গবেষক ও পেশাজীবীর সঙ্গে কাছ থেকে মেশার সুযোগ হয়েছে, (যার সংখ্যা ৫০০ হবে) তাদের মধ্যে সম্ভাবনার দিক থেকে নাজনীনকে আমি নির্দ্বিধায় উপরের দিকের ৫ শতাংশের মধ্যে র্যাংক করব।’ জীবনের প্রথম কর্মক্ষেত্রের রেহমান স্যারের মতো বসের কাছ থেকে এরূপ রিকমেন্ডেশন পাওয়া আমাকে শুধু অনুপ্রেরণাই দেয়নি, মনে মনে সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছি, ‘স্যারের ধারণা সত্য করার সর্বোচ্চ চেষ্টা আমি করব।’

প্রফেসর সোবহানের ৮০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমার দাওয়াত ছিল। তাঁর অনেক ছাত্র-সহকর্মী-গুণমুগ্ধের কাছ থেকে শুনছিলাম তাঁর জীবনের নানা দিকের কথা। যখন আমার বলার পালা এল, তখন কথা তেমন না বলে মৌসুমী ভৌমিকের একটি গানের কটা লাইন গেয়েছিলাম—

আমি শুনেছি তোমরা নাকি এখনো গল্প লেখো

এখনো স্বপ্ন দেখো, গান গাও প্রাণ ভরে

মানুষের বাঁচামরা এখনো ভাবিয়ে তোলে

তোমাদের ভালোবাসা এখনো গোলাপে ফোটে।।

আস্থা হারানো এ মন নিয়ে আমি আজ

তোমাদের কাছে এসে দু’হাত পেতেছি,

আমি দুচোখের গাও ভরে শূন্যতা দেখি শুধু

রাত ঘুমে আমি কোনো স্বপ্ন দেখি না, তাই

স্বপ্ন দেখব বলে আমি দুচোখ পেতেছি...

আমার প্রিয়, শ্রদ্ধেয় রেহমান সোবহান স্যার আরো বহুদিন আমাদের স্বপ্ন দেখাবেন, সে শুভকামনায় এ লেখা শেষ করলাম।

 

লেখক: সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বিআইডিএস