বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের দিকপাল পণ্ডিত প্রয়াত অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একটি অনন্য সম্মানের অধিকারী ছিলেন, তিনি ছিলেন সার্বজনীন ‘স্যার’। তাঁর নিজের ছাত্র হোক বা না হোক, বয়োকনিষ্ঠ গুণগ্রাহীরা সবাই তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের পর যদি বাংলাদেশে আর কেউ এ অনন্য সম্মানের অধিকারী হয়ে থাকেন, তো তিনি হলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি, কিন্তু সর্বদাই আমি তাঁকে ‘স্যার’ বলেই জেনেছি এবং নিজের অজান্তেই নিজেকে তাঁর ছাত্র মনে করে ধন্য হয়েছি। শুধু আমি একা নই, বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাঙ্গণে আর সবার কাছেই তিনি অবিসংবাদিত ‘স্যার’।
এ সম্মান শুধু তাঁর বয়সের স্বীকৃতি নয়; ব্যক্তিত্ব ও কর্মক্ষেত্রে অনেকগুলো অসাধারণ গুণের অধিকারী হওয়ার বলেই এ সম্মান তিনি অর্জন করেছেন। কর্মক্ষেত্রে তিনি সেই দুর্লভ পণ্ডিত, যিনি শুধু পাণ্ডিত্যের চমক দেখিয়ে বিদগ্ধজনের প্রশংসা কুড়ানোকে জীবনের অভীষ্ট বলে মনে করেননি; বরং জ্ঞানের পসরাকে জনকল্যাণের বেদিতে উত্সর্গ করাকেই জ্ঞানার্জনের একমাত্র সার্থকতা বলে বিশ্বাস করেছেন এবং প্রতিনিয়ত এ বিশ্বাসের বাস্তব রূপায়ণে সচেষ্ট হয়েছেন। তাঁর এ জীবনাদর্শের পরিচয় আমরা পাই তাঁর কর্মজীবনের প্রথম লগ্নেই। একজন তরুণ অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর পরই তাঁর তেজস্বী লেখনী প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। রাজনীতির অঙ্গনে একনায়কত্বের কালো হাত যে সময়ে মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধে উদগ্রীব, সে সময়ে এমন দুঃসাহসিক প্রতিবাদ একজন তরুণ শিক্ষকের সমূহ ক্ষতিসাধন করতে পারত, বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রসিদ্ধি লাভের সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিতে পারত। কিন্তু সেই ভয় রেহমান সোবহানকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তুলতে নিরস্ত করতে পারেনি। সেই প্রতিবাদী ভূমিকার পরম্পরাতেই তিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে একজন অগ্রপথিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন; রাজনীতিবিদ না হয়েও স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনীতিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। ইতিহাস তার সাক্ষী।
স্বাধীনতা উত্তরকালেও তাঁর লেখনী তাঁর জীবনাদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। বড় আশা করে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়েছিলেন, ভেবেছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনের পথ সুগম করে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এ ব্যর্থতা, এ ক্ষোভ তাঁকে প্রতিনিয়তই পীড়া দিয়েছে। তার প্রমাণ আমরা দেখি স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি রচনায়, প্রতিটি বক্তব্যে। বৈষম্যের নির্মমতা অবলোকনে যে আর্তনাদ ধ্বনিত হয়েছিল তাঁর লেখনীতে আজ থেকে অর্ধ শতাব্দীরও পূর্বে, আজো তার প্রতিধ্বনি শুনি তাঁর লেখনীর প্রতিটি আঁচড়ে।
জীবন সায়াহ্নে এসে আজ তিনি তাই অনেকাংশেই হতাশ। এ হতাশা শুধু বৈষম্য নিরসনে সমাজের ব্যর্থতার কারণেই নয়; তাঁর হতাশার অন্যতম কারণ তাঁর, যারা উত্তরসূরি তাদেরও ব্যর্থতা— বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে প্রচণ্ড আবেগ তাঁর লেখনীকে আজীবন অনুপ্রাণিত করেছে, পরবর্তী প্রজন্মের লেখনীতে সেই আবেগের উচ্ছ্বাস ধরে রাখার ব্যর্থতা। সঙ্গত কারণেই তিনি হতাশ হয়েছেন, কিন্তু পরাজয় স্বীকার করেননি, আদর্শের লড়াইয়ে পরাজয় স্বীকার করাও যে তার জীবনাদর্শের পরিপন্থী। উত্তরসূরিদের তাই তিনি এখনো নিরলসভাবে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য; উত্সাহ দিচ্ছেন তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে জনকল্যাণের বেদিতে উত্সর্গ করার জন্য। আমরা কি পারব এ মহান শিক্ষকের সুযোগ্য শিক্ষার্থী হতে?
লেখক: অধ্যাপক, আলসটার বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য






