রেহমান সোবহান বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। জীবনের চলার পথে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সঙ্গে তিনবার দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ আমার হয়েছে। এ অভিজ্ঞতা থেকেই আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। ১৯৭০ সালে কলেরা রিসার্চ সেন্টারে (বর্তমানে আইসিডিডিআর,বি) মেডিকেল গবেষণার মাধ্যমে আমার ক্যারিয়ার শুরু করি এবং ১৯৭০ দশকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রায় এক দশক ঢাকায় ফোর্ড ফাউন্ডেশনে কাজ করেছি। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ ঘটে, যখন যথাক্রমে ভারতের ফোর্ড ফাউন্ডেশনের জন্য কাজ করি ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ১৫ বছর ধরে অধ্যাপক রেহমান সোবহান এবং আমি বার্ষিকভাবে কলকতা গ্রুপে যোগ দিচ্ছি, যা আয়োজন করেন নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন। এ আয়োজনের উদ্দেশ্য ভারতের— প্রতিবেশী বাংলাদেশসহ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পর্যালোচনা করা।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান সত্যিকারভাবেই জাতীয় সম্পদ, কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে সংঘটিত সাইক্লোন আমি দেখেছিলাম, যাতে মারা গেছিল প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। বলতে গেলে অল্প কিছু সময় পরই পাকিস্তানি বাহিনী এ দেশের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রেহমান সোবহান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারণা শুরু করেছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে আসেন, দেশের সেবা করার জন্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য পালনকৃত ভূমিকার জন্য অধ্যাপক রেহমান সোবহান জাতীয় সম্পদ, এ দাবি বৈধ।

যেহেতু অধ্যাপক রেহমান সোবহানের অনেক সহকর্মী ও পারিবারিক সদস্যের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব ছিল, তাই রেহমানের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল ১৯৮০ ও ১৯৯০ দশকেও। এ দশকগুলোয় বাংলাদেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি প্রধান/ চেয়ারম্যান ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট (বিআইডিএস), গ্রামীণ ব্যাংক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)। আমিও বিআইডিএসের প্রথম দিককার ‘ভিজিটিং স্কলারদের’ একজন ছিলাম এবং বাংলাদেশের গ্রামে ক্ষুদ্র-উদ্যোগের বেড়ে ওঠা দেখেছি। অবশ্যই অধ্যাপক রেহমান এ দেশের নীতি উন্নয়নের প্রধান একজন।

১৫ বছর ধরে অধ্যাপক রেহমান ও আমি কলকাতা গ্রুপে অংশগ্রহণ করেছি। এটি একটি বার্ষিক ওয়ার্কশপ, যার আয়োজক অমর্ত্য সেন, যিনি ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অমর্ত্য সেন ও রেহমান ক্যামব্রিজে একসঙ্গে পড়েছেন। পরে তাঁকে বাংলাদেশের প্রতিচি ট্রাস্টের প্রধান হওয়ার অনুরোধ করেন এবং রেহমান তা গ্রহণ করেন। নোবেল জয়ের অর্থ দিয়ে অমর্ত্য সেন এ ট্রাস্ট গড়ে তুলেছেন, উদ্দেশ্য বাংলাদেশে সামাজিক উন্নতিকে সহযোগিতা করা (ভারতেও এটি রয়েছে)।

অধ্যাপক রেহমান আমার বন্ধু ও সহকর্মী ছিলেন, এটা দাবি করে আমি গর্বিত। তাঁর দুই সহধর্মিণীকেই আমি চিনি। সম্ভবত রওনক জাহান বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক বিজ্ঞানী এবং তাঁর মরহুম সহধর্মিণী, সালমা সোবহান ছিলেন একজন আইনজীবী, বাংলাদেশে নারী ও আইন নিয়ে প্রথম গবেষণার কাজগুলোর একটি তার। অধ্যাপক রেহমানের ভাই, ফারুক সেক্রেটারি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স হিসেবে দারুণ সফল এবং তার ছেলে জাফর এখন বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক।

অধ্যাপক রেহমান বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, একজন সত্ ব্যক্তি। তিনি সত্যিকারভাবে একজন বুদ্ধিজীবী; যার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে গভীর জ্ঞান রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাষী, তবে একই সঙ্গে বিনয়ী। তিনি শুধু নিজে বলেন না, অন্যের কথাও গুরুত্ব দিয়ে শোনেন। অধ্যাপক রেহমান একজন তর্কাতীত নেতা। তিনি শুধু বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্বই দেননি, বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক উত্তরাধিকারের হাতে দায়িত্বও ছেড়েছেন। দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে থাকা একজন নেতার জন্য খুব অস্বাভাবিক। কিন্তু তিনি এটা করতে পেরেছেন। এটি প্রতিফলিত করে নিজের উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য। নীতি উন্নয়নে যুক্ত থাকলেও তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন। বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারবদ্ধতা এবং অন্যকে বাহবা দেয়ার তাঁর গুণের কারণে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি সবার সহকর্মী হিসেবে থাকা তাঁর একটি ইউনিক গুণ। অধ্যাপক রেহমান সোবহান সারা জীবন সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য লড়ে গেছেন ও যাচ্ছেন।

এজন্য এটা বললে অত্যুক্তি হবে না— অধ্যাপক রেহমান সোবহান বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ।

 

লেখক: প্রেসিডেন্ট, চায়না মেডিকেল বোর্ড