অধ্যাপক রেহমান সোবহানের বিষয়ে কিছু লিখতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। তিনি বাংলাদেশে একজন অসাধারণ অর্থনীতিবিদ হিসেবে সুপরিচিত। উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বিশ্লেষণ বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়িয়েছে। তিনি একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক এবং দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের স্বার্থরক্ষায় একজন অদম্য প্রবক্তা/সৈনিক।

পাকিস্তানের চৌহদ্দি বা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি ভিন্ন এ মর্মে দুটি অর্থনৈতিক তত্ত্বের উন্নয়নে রেহমান সোবহানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান তাঁর দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের যে দাবি উঠেছিল, বলতে গেলে তার গোড়পত্তন করেছেন রেহমান সোবহানই। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে, অর্থনীতি-বিষয়ক বিশেষ দায়িত্ব ছিল তাঁর।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান একজন প্রতিষ্ঠান নির্মাতা। বাংলাদেশের প্রথম প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য, যার পদমর্যাদা ছিল মন্ত্রীর সমান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক, গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে পালনকৃত ভূমিকা থেকে প্রতিষ্ঠান নির্মাতা হিসেবে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানের চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

তার লেখা প্রায় ৩০টি বই/একক গ্রন্থ এবং প্রায় ১৪০টি প্রফেশনাল জার্নাল প্রবন্ধ থেকে অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাঁর বহুমুখিতার ধারণা পাওয়া যায়। বহুমুখী অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে রেহমান সোবহান অর্জন করেছেন ২০০০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পুরস্কার, যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার। আমি তৃপ্ত বোধ করি যে, পরের পুরস্কারটি দেয়ার সিদ্ধান্তে আমি যুক্ত ছিলাম।

আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও তিনি তার মেধার স্বীকৃতি পেয়েছেন। এর মধ্যে তিনি ছিলেন (ক) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সাউথ এশিয়া সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজ (খ) ভিজিটিং স্কলার, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি (গ) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও মেম্বার, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি অব অ্যাশ ইনস্টিটিউট, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এবং (ঘ) মেম্বার, ইউনাইটেড নেশনস কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানিং।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে তাঁর প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলাম আমি। সময়টা ১৯৫৭ সাল। তিনি আমাদের পড়াতেন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ইতিহাস এবং ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস। তাঁর লেকচারগুলো ছিল বুদ্ধিমত্তা উদ্দীপক, বাস্তবতার নিরিখে সতর্ক বিশ্লেষণভিত্তিক। আমি তাঁর কাছে যা শিখেছি, তা জাতিসংঘের নীতি বিশ্লেষক হিসেবে কর্মজীবনে আমাকে দারুণ সহায়তা করেছে।

পেশাগত দিক থেকে বিভিন্নভাবে তাঁর সঙ্গে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে উন্নয়ন নীতি-সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে আমরা একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেছি। ইউনাইটেড নেশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোস্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকে (ইউএনইএসসিএপি) কাজ করার সময় পূর্ব এশিয়ায় গ্রোথ ট্রায়াঙ্গলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একই ধরনের ব্যবস্থার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার জন্য একটি প্রকল্প শুরু করি। এ প্রকল্পের সম্ভাবনা বিশ্লেষণের দায়িত্ব অর্পণ করি অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে। এর ফলে প্রকাশিত হয় তাঁর বই ‘ট্রান্সফরমিং ইস্টার্ন সাউথ এশিয়া: বিল্ডিং গ্রোথ জোনস ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন’। মালদ্বীপ সরকারকে তাদের একটি পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে টেকনিক্যাল সহায়তা দিতে আমি তাঁর সাহায্য চেয়েছিলাম। জাতিসংঘ থেকে অবসর নেয়ার পর আমি দেশে ফিরে আসি। এর পর আমি তাঁর তত্ত্বাবধানে সিপিডির জন্য দুটি পেপার প্রস্তুত করেছিলাম, এগুলো ছিল

বিনিময় হার ও সহায়তা নীতি-সংশ্লিষ্ট।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমি সবসময় অধ্যাপক রেহমান সোবহানের অসীম স্নেহ পেয়ে এসেছি। তিনি ২০১৪ সালে প্রকাশিত আমার বই ‘সিলেক্টেড ম্যাক্রোইকোনমিক ইস্যুজ: থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস’-এর ভূমিকা লিখেছিলেন, যার জন্য আমি তাঁর প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

আমি তাঁর দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কামনা করি। কেননা উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তাঁর প্রগাঢ় উপদেশ থেকে দেশ উপকার পেতেই থাকবে।

 

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা