বিষয়টি ছিল ফলপ্রসূভাবে কাকতালীয়। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের অবদান নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখার অনুরোধ পাই যে সপ্তাহে, সেই একই সপ্তাহে রেহমান সোবহানের কাছ থেকে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের স্মরণে তাঁর দেয়া বক্তৃতার একটি অনুলিপি পাই। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন আমাদের উভয়ের অনুপ্রেরণা। রেহমান সোবহানের সঙ্গে শৈশব থেকে একসঙ্গে বড় হওয়ার সুযোগ আমি পেয়েছি। প্রায় আট দশক ধরে আমি তাঁর সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টি বিনিময় করে আসছি। ‘আনট্র্যাংকুইল রিকালেকশনস’ শিরোনামে তিনি একটি অসাধারণ স্মৃতিকথা লিখেছেন, যেখানে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা বণর্না করেছেন। অতীতকে স্মরণ এবং সেগুলো ভাষায় প্রকাশ করার তাঁর অসাধারণ ক্ষমতার প্রতিফলন এ বই। বইটি সত্যিকার অর্থেই চিত্তাকর্ষক।
একাডেমিক বা শিক্ষক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সংকল্পের কথা এখানে উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। অর্থাত্ সচেতনভাবেই অধ্যাপক রেহমান সোবহান সরকারি চাকরি বা বংশগত ব্যবসার দায়ভার গ্রহণের চাপ প্রতিরোধ করেছেন। নিজের সংকল্পের জোরে তিনি এ চাপ ও আকর্ষণগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন এবং অর্থনীতি নিয়ে পড়ার জন্য কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে জায়গা করে নেন। অর্থনীতি এমন একটি শাস্ত্র, যেটি বিপুল পরিমাণ দারিদ্র্য, বিশাল বৈষম্য ও সার্বিক অনুন্নয়নে ক্লিষ্ট আমাদের সমাজে পরিবর্তন আনতে পারবে, এ বিশ্বাস থেকেই অর্থনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।
পঞ্চাশের দশকে যখন অধ্যাপক রেহমান কেমব্রিজের স্নাতক শ্রেণীর (আন্ডারগ্র্যাজুয়েট) ছাত্র, আমি তখন অক্সফোর্ডে পড়তাম। আমাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাত্ হতো। আমাদের সাক্ষাত্গুলোয় কীভাবে আমাদের দেশে পরিবর্তন আনা যেতে পারে, এ নিয়ে প্রাণবন্ত বিতর্ক হতো। তাঁর সমকালীনদের মধ্যে ছিলেন তাঁর আজীবন বন্ধু, অমর্ত্য সেন। ওই সময় বিশ্বাস করা হতো যে, অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিতের চাবিকাঠি হচ্ছে অর্থনীতি। সম্ভবত ইংল্যান্ড থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ডিগ্রি নিয়ে ফেরার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগ দেয়ার কয়েক বছর পর তিনি অর্থনীতির ওপর রাজনীতির প্রভাব লক্ষ করতে এবং আর্থসামাজিক পরিবর্তনের জন্য কৌশল প্রণয়নে রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে শুরু করেন।
১৯৫৯ সালের প্রথম দিকে আমি ঢাকায় ফিরে আসি। ওই সময় রেহমান অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর পার করেছেন। আমরা শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের একটি দলের অংশ হয়ে যাই। আমরা নিজেদের বলতাম ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব সোস্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেস (এনএএসইপি)। আমাদের মধ্যে প্রগাঢ় আলোচনা হতো এবং এ আলোচনাগুলো প্রবন্ধ আকারে পত্রিকায় প্রকাশ হতো। পালাক্রমে এ প্রবন্ধগুলো প্রচারপত্র/ক্ষুদ্র বই হিসেবে মুদ্রিত হতো। এ সিরিজে ‘দ্য চ্যালেঞ্জ অব ডিসপ্যারেটি’ শিরোনামে রেহমান প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এ আলোচনা ও প্রকাশনার জেরে গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা এসেছিলেন এবং আমাদের বলেছিলেন যে, তারা এ ‘নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের’ তদন্ত করতে চান। এটি আমাদের সবার জন্য একটি কঠিন সময় ছিল এবং রেহমান কখনো কল্পনা করতে পারেননি যে, অবিচার এবং এর বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেয়ার বিষয় নিয়ে লেখা প্রবন্ধ ‘নাশকতামূলক; হিসেবে গণ্য করা হতে পারে।
আঞ্চলিক বৈষম্যকে বাঙালি অর্থনীতিবিদরা কঠিন বাস্তবতা হিসেবে গণ্য করা শুরু করেন, যেটি পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে, নিজেদের সম্পদ ও সুযোগ থেকে এ অঞ্চলের মানুষকে বঞ্চিত করছে। এটি রেহমানের স্বাতন্ত্র্যসূচক অবদান যে, তিনি তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে এ ইস্যুগুলো সামনে নিয়ে এসেছিলেন, অবিচার নিয়ে সচেতনতা উসকে দিয়েছিলেন এবং এর বিরুদ্ধে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ষাটের দশকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবিচারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে এবং যেটি চূড়ান্ত পর্যায়ে গড়ায় ১৯৬৬ সালে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ছয় দফায়। ওই সময় রেহমানের অনেক অবদানের একটি ছিল ‘ফোরাম’ নামের একটি পত্রিকা চালু করা। তিনি ছিলেন এর নির্বাহী সম্পাদক। ছয় দফা স্বায়ত্তশাসন দাবির মূল্যবান বিবরণাদির বাহক হয়ে ওঠা পত্রিকাটিতে দেশ ও দেশের বাইরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রবন্ধ লিখতেন।
ছয় দফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানে নিপীড়ন বৃদ্ধি পায় এবং চূড়ান্ত পরিণাম হিসেবে জাতীয় পরিষদের একটি অধিবেশন আকস্মিক স্থগিত করা হয়, যেখানে ছয় দফা স্বায়ত্তশাসন দাবি কার্যকরের জন্য সাংবিধানিক সংশোধনী আনার কথা ছিল। এর পর ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাঙালিদের ওপর সামরিক অভিযান শুরু হয়, যা ওই আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধে রূপ দেয়।
গণহত্যার জন্য চালানো এ সামরিক হামলা প্রতিহত করতে লাখো মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেন, যার মধ্যে সংসদের নির্বাচিত সদস্যরাও ছিলেন, যারা একটি অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যার রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। রেহমান সোবহান সেসব শিক্ষাবিদের মধ্যে অন্যতম, যারা এ অস্থায়ী সরকারের সঙ্গে কাজ করেছিলেন এবং সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থনে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। নিজ বইয়ে, রেহমান সোবহান ওই সময় তাঁর মূল্যবান অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর, সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার প্রথম পরিকল্পনা কমিশন গঠন করে, যার প্রধান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা এর সদস্য হন: নূরুল ইসলাম হন ডেপুটি চেয়ারম্যান, রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমান ও মোশাররফ হোসাইন হন সদস্য। কয়েক লাখ লোকের পুনর্বাসন ও বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য পদক্ষেপ নিতে এঁরা মূল্যবান ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরিকল্পনা কমিশন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে, যেটি এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল, যেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের গুপ্তহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে রেহমান সোবহান সরকার ত্যাগ করে অর্থনৈতিক গবেষণা ও লেখালেখির জন্য বিদেশে চলে যান। এর পর ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে ফের অধ্যাপনা শুরু করেন। অবসর নেয়ার পর রেহমান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ সংস্থার চেয়ারম্যান। নীতি ইস্যুতে এ সংস্থাটি তথ্যভিত্তিক আলোচনা আয়োজন করার মাধ্যমে একটি মূল্যবান ভূমিকা পালন করছে।
জনগণের ইস্যুতে তিনি এখনো লেখেন, কথা বলেন। সংবিধানের আলোকে প্রায়ই সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে নিজের মতামত প্রকাশ করেন। তিনি এখনো বিবেকের সম্মানিত কণ্ঠস্বর। তিনি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার, যা স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য এবং যার জন্য আমরা এখনো সংগ্রাম করে যাচ্ছি, আদায়ের জন্য মৌলিক পরিবর্তনের সমর্থনে কথা বলেন। ২০১৭ সালে ৩০ জানুয়ারি তার দেয়া স্মারক বক্তৃতার শিরোনামই এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে: ‘‘বাংলাদেশ’স পারমানেন্ট লিবারেশন স্ট্রাগল: কন্সট্রাকটিং এন ইনক্লুসিভ ডেমোক্রেটিক সোসাইটি”।
লেখক: সংবিধান প্রণেতা






