সময়টা ছিল ষাটের দশকের শেষের দিকে, নির্দিষ্টভাবে বললে ১৯৬৯ সাল; যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। বিভাগে ফিরে এলেন একজন তরুণ শিক্ষক, দেখতে সুদর্শন এবং শুনতে পেলাম তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু আমরা একটু হতাশ হয়েছিলাম এই কারণে যে, আমাদের বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক এরই মধ্যে নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল; আর তাই এ শিক্ষককে আমরা পেলাম না। কিন্তু ক্লাস রুমে বক্তৃতা শোনার সুযোগ না হলে কী হবে, তাঁর লেখা পড়ার সুযোগ এসে গেল; যখন তাঁর সম্পাদনায় বের হতে শুরু করল সাপ্তাহিক ফোরাম পত্রিকা।

হ্যাঁ, আমি অধ্যাপক রেহমান সোবহানের কথাই বলছি। যাঁর কাজ ক্লাসের বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। উত্তাল ষাটের দশকে তিনি শিক্ষকতার সঙ্গে সঙ্গে গবেষণা করেছেন, জোরালো বক্তব্য রেখেছেন তদানীন্তন পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মধ্যকার বৈষম্য সম্পর্কে এবং তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাঙালির রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য শক্তিশালী করতে।

তবে আমাদের (অর্থাত্ আমি আর আমার সহপাঠীদের) বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়ার জন্য। অনার্স পরীক্ষার পর এমএ ক্লাস শুরু হয়ে গেল অল্পদিনের মধ্যেই। আর তাঁকে পেলাম উন্নয়ন অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে। তাঁর হাত ধরেই উন্নয়নের তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক দিকগুলোর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। তবে সঙ্গে সঙ্গে এও বলতে হয় যে, তিনি তাঁর বক্তৃতা উন্নয়নের গতানুগতিক তত্ত্বগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বিকল্প ধারার বক্তব্যগুলোর সঙ্গেও। ফলে আমরা তখন থেকেই বুঝে গিয়েছিলাম, যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, মূলধারার তত্ত্বগুলো যে সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, এমন কোনো কথা নেই। উন্নয়নের সমস্যা বুঝতে ও তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে খোলা মন নিয়ে সমস্যার গভীরে যেতে হবে।

অধ্যাপক সোবহানের ছাত্র হওয়াটা শুধু যে সৌভাগ্য ছিল, তা-ই নয়; তাঁর কাছ থেকেই আমি পেয়ে গিয়েছিলাম অর্থনৈতিক উন্নয়নের গভীরে যাওয়ার প্রাথমিক অনুপ্রেরণা। তারই ধারাবাহিকতায় এবং পরবর্তীকালে অধ্যাপক (পরে নোবেল বিজয়ী) অমর্ত্য সেনের অধীনে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় আমি প্রবেশ করি উন্নয়ন অর্থনীতি সম্পর্কে গবেষণার জগতে। তাই আজ এ দুই শিক্ষককেই স্মরণ করি শ্রদ্ধার সঙ্গে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ক্লাসে তখন যাঁরা পড়াতেন, তাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন বিদেশে উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত। সে সময় শিক্ষার মাধ্যম ছিল ইংরেজি এবং সব শিক্ষকই ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতেন। কিন্তু অধ্যাপক সোবহানের বাচনভঙ্গি ছিল আর সবার চেয়ে আলাদা। শুধু বিষয়বস্তু নয়, বাগ্মিতার দিক থেকেও তিনি ছিলেন অনন্য। সবমিলে তিনি হয়ে উঠলেন আমাদের অতি প্রিয় একজন শিক্ষক।

ক্লাসে অধ্যাপক সোবহানের বক্তৃতা শোনা যেমন এক আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা ছিল, তেমনি ছিল ফোরাম পত্রিকায় তাঁর সম্পাদকীয় এবং অন্যান্য লেখা পড়া। ১৯৬৯ এবং ১৯৭০ সালে এ পত্রিকা হয়ে ওঠে বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির আন্দোলনের এক প্রধান অস্ত্র। সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করে থাকতাম পরবর্তী সংখ্যাটিতে কী লেখা থাকবে, তা দেখা ও পড়ার জন্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অধ্যাপক সোবহানের অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল সেই পত্রিকা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করলাম, তখন হতে পারতাম অধ্যাপক সোবহানের সহকর্মী। কিন্তু তখন তিনি নতুন দেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটু দূরে। পরবর্তীকালে কর্মজীবনে সেই দূরত্ব থেকে গেলেও আমার সৌভাগ্য হয়েছে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে পেশাগত যোগাযোগ রাখার। তাঁর এবং আমার গবেষণার বিষয়ে কিছুটা একাত্মতা থাকায় কোনো কোনো সময় একই মঞ্চে বসে আলোচনারও সুযোগ হয়েছে।

আমার কর্মজীবনের একটা বিরাট অংশ কেটেছে দিল্লি ও জেনেভায়। সে দুটি শহরেই অধ্যাপক সোবহানের পদচারণা বেশ নিয়মিত; আর তার ফলে আমাদের মধ্যে যোগাযোগ থেকেছে অক্ষুণ্ন। পেশাগত সেমিনার-সভার বাইরেও সুযোগ হয় আড্ডা দেয়া এবং গল্পগুজব করার। সেসব আড্ডার স্থানে যেমন বৈচিত্র্য, তেমনি বৈচিত্র্য বিষয়বস্তুতেও। কখনো দিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের লাউঞ্জ, কখনোবা জেনেভার লেকের পাড়ের কোনো রেস্তোরাঁ, আবার কখনোবা ঢাকার কোনো অনুষ্ঠান। বিষয়বস্তুতে অর্থনীতি এবং রাজনীতি যেমন থাকে; তেমনি থাকে খেলাধুলা, খাবার-দাবার ইত্যাদি। এসব আড্ডা থেকে বুঝতে পারি তাঁর ভেতর থেকে নিরত উত্সারিত হচ্ছে মানবকল্যাণের লক্ষ্যে নতুন নতুন সব ধ্যান-ধারণা।

কয়েক সপ্তাহ আগে আমরা যারা ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলাম, তাঁরা মিলিত হই আমাদের বন্ধুত্বের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে। সে খবর অধ্যাপক সোবহান পেয়েছেন তা আমি জানতাম না। কিন্তু তার ক’দিন পর আমার সঙ্গে প্রথম দেখাতেই তিনি বললেন, ‘এটা কেমন হলো, তোমরা তোমাদের শিক্ষককে বাদ দিয়ে একসঙ্গে হলে! তোমাদের সে সময়ের শিক্ষকদের মধ্যে একমাত্র আমিই মনে হয় বেঁচে আছি।’ আমাকে স্বীকার করতে হলো যে, এটি আমাদের চিন্তার ঘাটতির জন্য হয়েছে। আর পরে ভেবে দেখলাম তাঁর দ্বিতীয় বাক্যটির মধ্যেও কিছুটা সত্যতা রয়েছে। আমাদের ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে আমরা দুই ধরনের শিক্ষক পেয়েছি: একদিকে ছিলেন সদ্য এমএ পাস করা তরুণ সব অধ্যাপক, যাঁরা দু-এক বছর শিক্ষকতা করে সরকারি চাকরিতে চলে যেতেন। অন্যদিকে ছিলেন অধ্যাপক সোবহানের মতো শিক্ষক, যাঁরা শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এ দ্বিতীয় ধরনের শিক্ষকদের মধ্যে যাঁরা আমার শিক্ষক ছিলেন, তাঁদের প্রায় কেউ আজ আর নেই। অধ্যাপক সোবহান রয়েছেন এবং আজো জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করে চলেছেন আমাদের সবাইকে এবং পুরো সমাজকে।

 

লেখক: আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এমপ্লয়মেন্ট সেক্টরের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা