অবাক হয়ে যাই, সেই প্রায় ৫০ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হিসেবে তখন তাঁকে দেখেছি ক্লান্তিহীন লিখে যাচ্ছেন অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে, বক্তৃতা দিচ্ছেন তুখোড়ভাবে, এখনো ২০১৭ সালে সেই অধ্যাপক রেহমান সোবহান কর্মতত্পর। একজন নিরলস সমাজ চিন্তাবিদ হিসেবে তাঁকে আমি জানাই আমার গভীর শ্রদ্ধা।
অর্থনীতি বিভাগে ১৯৬৫ সালে ভর্তি হই বিএ অনার্স করার জন্য। অধ্যাপক রেহমান সোবহান আমাদের কোনো ক্লাস নেননি। কিন্তু তাঁকে দেখি উচ্চ শ্রেণীর কয়েকটি ক্লাস নেয়ার সময়। দৃপ্ত পদক্ষেপে ক্লাস লেকচারের জন্য কাগজপত্র নিয়ে ক্লাসে যাওয়ার সময় কিছুটা দূর থেকেই তাঁকে দেখেছিলাম। তখন একটা বিষয় আমার মনে হতো, অন্যান্য অনেক অধ্যাপকের মতো শুধু পাঠ্যবইয়ের কপি, হাজিরা খাতা ও ডাস্টার সঙ্গে নিয়েই তিনি যেতেন না; সঙ্গে থাকত বিভিন্ন সাময়িকী, গবেষণাপত্রের কাগজপত্র। এর বিশেষ কারণ ছিল যে, তিনি পাঠ্যপুস্তকেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকতেন না। দেশ ও মানুষের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে ছাত্রদের ধারণা দিতেন। তাত্ত্বিক অর্থনীতির সঙ্গে তিনি অর্থনীতির প্রায়োগিক দিকটিও সাবলীলভাবে তুলে ধরতেন। সেজন্যই তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্রছাত্রীরা তরুণ বয়স থেকেই সমাজ ও মানুষের বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধান সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ হয়।
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রথম থেকেই ছিল অবহেলিত। শাসক শ্রেণীর বেশির ভাগই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বাসিন্দা। চাকরি, ব্যবসা এবং সর্বোপরি রাজনীতি— সবক্ষেত্রেই ছিল তাদের প্রচণ্ড প্রভাব। পূর্ব পাকিস্তানের স্বর্ণ আঁশ পাট থেকেই পাকিস্তানের বেশির ভাগ বৈদেশিক আয় হতো, কিন্তু সেটার সিংহভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। অর্থাত্ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুটি ক্ষেত্রেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি ছিল বঞ্চনার শিকার। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন পূর্ব পাকিস্তানের কিছু অর্থনীতিবিদ, এর মধ্যে অধ্যাপক রেহমান সোবহান ছিলেন উল্লেখযোগ্য। ‘দুই অর্থনীতি’র বিভিন্ন যুক্তি এবং এর গ্রহণযোগ্যতা তিনি তুলে ধরেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। ধীরে ধীরে বাঙালির অন্যান্য কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে আরো তীব্র ও সোচ্চার। ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি ভিত তৈরি হয়। সেই সময় ‘মাসিক ফোরাম’ নামক একটি পত্রিকা সবার দৃষ্টি কাড়ে। আমার প্রথম প্রত্যক্ষ পরিচয় তাঁর লেখার সঙ্গে ‘মাসিক ফোরাম’-এর মাধ্যমেই। ১৯৬৯ সালে অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও মানবাধিকার কর্মী বেগম হামিদা হোসেনের যৌথ প্রচেষ্টায় সেটা প্রকাশিত হতো। লেখাগুলো পড়ে আমাদের বঞ্চনার বিষয়গুলো জানতে পারতাম এবং সেসঙ্গে অন্যান্য বাঙালির মতো আমি ও আমাদের অধিকার আদায়ের বিষয়ে উজ্জীবিত হতাম।
প্রথম থেকেই তাঁর ভঙ্গি ছিল ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ (Political Economy), দুটি বিষয়ই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সেজন্যই তিনি অর্থনীতির বিভিন্ন সমস্যাকে রাজনৈতিক পটভূমির পরিপ্রেক্ষিতে পর্যালোচনা করেছেন। আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ছিল মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা। সে উপলব্ধি থেকেই তিনি মৌলিক গণতন্ত্র, পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী ভৌতকাঠামো প্রকল্পের ওপর সমন্বিত একটি পর্যালোচনামূলক বই প্রকাশ করেন ১৯৬৮ সালে। এটি একটা উদাহরণ মাত্র। পরবর্তী জীবনে এমনই প্রচুর নিবন্ধ, গবেষণা ও বক্তৃতা তিনি প্রকাশ করেছেন।
পরবর্তী জীবনে তিনি অর্থনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে যেসব কাজ করেছেন, সেগুলোর প্রধান উদ্দেশ্যই হলো— দেশ ও মানুষের কল্যাণ সাধন, বিশেষ করে সাধারণ দরিদ্র মানুষের কল্যাণ। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে তাঁর অবদান বিশ্বায়ন ও আঞ্চলিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রায় সব ক্ষেত্রেই।
বিখ্যাত গ্রিক রাষ্ট্র ও সমরনায়ক পেরিক্লিসের কথা:
‘What you leave behind is not what is engraved in stone monuments, but What is woven into the lives of others.’ (Pericles, 430 B.C.)
কি লেখা, কি বক্তৃতা, কি বাচনভঙ্গি এবং সর্বোপরি সংবেদনশীল মনোভাব— সবগুলো নিয়েই অধ্যাপক রেহমান সোবহান তৈরি করেছেন অগণিত ভক্ত ও গুণগ্রাহী। এটাই হচ্ছে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন। তাই তিনি একজন কর্মবীর সফল মানুষ।
লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক






