১৯৫৭ সালে আমি রেহমান সোবহান সম্পর্কে জানতে পাই কেমব্রিজে (সেন্ট জন্স কলেজ)। তিনি এর কিছুদিন আগেই সেখান থেকে চলে আসেন। ১৯৬১ সালে ঢাকায় তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। তাঁর সম্পর্কে আমাকে অবগত করেন জামাল নজরুল ইসলাম এবং হারুনুর রশিদ। তাঁরা দুজনই কেমব্রিজে স্নাতকের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ষাটের দশকে তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকবার সাক্ষাত্ হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে আমরা বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাই।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে আমেরিকায় রেহমানের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সে সময় তিনি বিভিন্ন মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী সংগঠনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সুস্পষ্ট যৌক্তিকতা তুলে ধরছিলেন।

১৯৭১-এর সে স্মৃতিতে রেহমানকে খুঁজে পাই একজন খুবই আবেগী, অকুতোভয় ও সত্যবাদী-বোদ্ধা হিসেবে, যার কোনো কিছু হারানোর ভয় নেই।

আজ আমি এমন একটি সুযোগ পেয়েছি, যার মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের একটি অসাধারণ সময়ের, একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ও তাঁর অসাধারণ চিন্তাচেতনা, কাজের সঙ্গে আমাদের যুবসমাজ ও পরবর্তী প্রজন্মকে পরিচয় করানোর। আমি এবং এখানে উপস্থিত অনেকেই তাঁর প্রজন্মের গর্বিত অংশীদার। তিনিই হলেন প্রফেসর রেহমান সোবহান। আজকের এ অনুষ্ঠান, প্রফেসর রেহমান সোবহানের ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য, তাঁর শিক্ষা, গবেষণা, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইস্যুভিত্তিক লেখালেখির সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আজ আমরা উদযাপন করছি অসামান্য অর্জনে গাঁথা এক বর্ণাঢ্য জীবনকে, যা অবশ্যই নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।

রেহমান সোবহানের বুদ্ধিবৃত্তিক পেশাজীবনের পরিচালনায় এবং তাঁর প্রকাশিত বিজ্ঞতার জন্য যে প্রশংসা তাঁর প্রাপ্য, এ বর্ণাঢ্য জীবনকে সংক্ষেপে দু-তিনটি শব্দে বলা যায়, ‘অন্যায় ও অবিচারের প্রতিবাদ।’

পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর অসংখ্য লেখা, বক্তৃতা ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অমর্ত্য সেনের ভাষায়, একজন ‘Quintessential Political Economist’ হিসেবে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতি-বিষয়ক লেখায় বারবার একটি বিষয় উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে, তা হলো ‘ন্যায় ও সাম্য’। ১৯৬১ সালে শুরু হওয়া সেই সংগ্রাম আজো অব্যাহত, তাঁর প্রারম্ভিক চেতনা এখনো অটুট এবং এখনো প্রথম জীবনের আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে সঙ্গী করেই তিনি সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।

খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের গতি ও দিকনির্দেশনা, অনেকের মতে, তাঁকে খুবই হতাশ ও ব্যথিত করেছে, যা তাঁর ‘Two Societies’ বইটিতে প্রতীয়মান হয়েছে। এটি বললে ভুল হবে না যে, ‘ন্যায়’ এবং ‘সাম্য’র লক্ষ্যে রেহমানের যে চেতনা, তা দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশেও ছড়িয়ে গেছে। তিনি তাঁর চিন্তাচেতনাকে অমর্ত্য সেন ও মাহবুবুল হক, উপমহাদেশের দুই প্রথিত অর্থনীতিবিদের কাতারেই নিজেকে যুক্ত করেছেন। যুক্তিভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে নীতিগত অগ্রাধিকার দিয়েছেন দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়টিকে। বাংলাদেশের সঙ্গে রেহমান সোবহানের সম্পর্ক শুধু জাতীয়তাবাদভিত্তিক নয়; এ সম্পর্ক ন্যায়, সাম্য, ও সুবিচারের প্রতি তাঁর সুদৃঢ় আস্থা এবং দরিদ্র ও সুযোগ-সুবিধাহীন মানুষের জন্য চিন্তাপ্রসূত।

বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর এ সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে, তিনি পাকিস্তানে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে, ব্যক্তিগতভাবে অন্যায় এবং অবিচারকে খুবই কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রফেসর রেহমান সোবহান এমন একজন অর্থনীতিবিদ, যিনি দরিদ্র/দুর্বল/পিছিয়ে পড়াদের সুরক্ষার স্বার্থে আনীত নীতিগত সিদ্ধান্ত ও তার বাস্তবায়নের প্রতি সদা দৃষ্টিশীল— যিনি দরিদ্র ও অরক্ষিত মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতি ও তার implementation-কে সবসময়ই একই সূত্রে দেখেছেন ও এখনো দেখছেন।

এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি তাঁকে ড. ইউনূস ও স্যার ফজলে হাসান আবেদের উপযুক্ত সহকর্মী হিসেবে গণ্য করতে চাই, যা আমাদের দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। তাই আমি বলতে চাই যে, বর্তমান প্রজন্মের জন্য প্রফেসর রেহমান সোবহান দেশ ও বিদেশের মধ্যে একটি প্রশস্ত সেতুবন্ধ সৃষ্টি করেছেন এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্ম ও মানুষের জন্য নিজেকে বিশ্বায়নের মাত্রায় নিয়ে যাবেন।

একটি কথা না বললেই নয়। রেহমান সোবহান যখন ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, আমি তখন একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব, পরিকল্পনা কমিশন ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব।

যখন আমরা একসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশন, বিআইডিএস অথবা সিপিডির বোর্ড বা নাগরিক আন্দোলনে, যেখানেই কাজ করি না কেন, তাঁকে পেয়েছি একজন দূরদর্শী, অসাধারণ পরিচালক, ও নেতা হিসেবে।

পরিকল্পনা কমিশনে তাঁর প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে সদ্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানকে জনস্বার্থে নিয়োজিত করা, বিআইডিএসকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি করা, ১৯৯০ সালে এক মাসের কম সময়ের মধ্যে ২৯টি টাস্কফোর্স গঠনপ্রক্রিয়াকে পরিচালনা ও সম্পন্ন করা, এবং সিপিডিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিসম্পন্ন নাগরিক ‘থিংকট্যাংক’ হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তাঁর অসাধারণ কর্মদক্ষতা ও কর্মকুশলতার স্বাক্ষর রেখেছেন ও পরিচয় দিয়েছেন।

সর্বশেষে আমি তাঁর অসাধারণ একটি গুণের কথা বলতে চাই: তিনি কখনো অন্তর্মুুখী নন।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য তিনি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের এক বিশাল সেতুবন্ধ। নতুন প্রজন্মের জন্য তিনি অনুবেদনা ও আন্তর্জাতিকতার এক উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন; যা সভ্যতার জন্য অপরিহার্য।

প্রফেসর রেহমান সোবহান সভ্য-নাগরিক নীতির স্থপতি (A Civilized Architect of Public Policy) হিসেবে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। কামনা করি তিনি দীর্ঘজীবী হোন এবং আমাদের অনুপ্রাণিত করতে থাকুন।

 

লেখক: সাবেক অর্থমন্ত্রী